দেবেশ রায়ের ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’

রাহুল দাশগুপ্ত

দেবেশ রায়ের ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’ উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যানের একটি সুমহান দৃষ্টান্ত। বিষয় ও প্রকরণ, এই দু’টি দিয়েই ঔপনিবেশিক আখ্যান-রচনার কাঠামোকে আক্রমণ করেছেন এই মহৎ লেখক। এই বৃত্তান্তটিতে কোনো বৃত্তাকার কাহিনি নেই, রয়েছে কয়েকটি আপাত-বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের সমাবেশ। যেন পাশাপাশি রাখা কয়েকটি ক্যানভাসে নিরাসক্ত অথচ পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা এই দৃশ্যগুলিতে উপস্থাপিত করা হয়েছে একদল প্রান্তিক মানুষের জীবন-যাপনের অভিঘাতকে। এমনভাবে ওই জীবন-যাপনকে তুলে ধরা হয়েছে, যেন গোটা ব্যাপারটাই পাঠকের কাছে একটা রসিকতা বলে মনে হয়। কারণ ওই জীবনের কয়েকটি উদ্ভট দিককে তুলে ধরা হয়, যার উৎসে এক মরিয়া বিপন্নতা থাকলেও আপাতভাবে তা হাস্যোদ্রেক করে। আমরা হাসি, ভুলে যাই ওই বিপন্ন প্রান্তিকতার পিছনে দখলদার মানুষের সম্ভাব্য ভূমিকাকে, যা আসলে রসিকতার মোড়কে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকেই তুলে ধরতে চায়।

আরও পড়ুন: কবি অয়ন চৌধুরীর দেওয়া মহাবিষপানেই আমাদের মৃত্যুর প্রবাহ অপার অন্তরীক্ষে, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ!’

আখ্যানের গোড়াতেই পাঠকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় চ্যারকেটুর। তাকে প্রস্রাবরত অবস্থায় দেখা যায়। সে প্রস্রাব করে, কারণ প্রস্রাবের মতােই সমাজের চোখে সে পরিত্যক্ত এবং সমাজকে ওই প্রস্রাবই সে ফিরিয়ে দিতে চায়, কারণ ওটাই তার অর্জন। যে মাচানে সে শোয় সেখানে লম্বালম্বি তার শরীর আঁটে না। চ্যারকেটু সই করতে পারে কিন্তু কী সই করে তা জানে না, কোন অক্ষর লেখে তাও জানে না। নানারকম পোস্টার সংগ্রহ করে আনে চ্যারকেটু। অঞ্চল অফিসে এক কোনায়, সেক্রেটারির চেয়ারের পেছনে পোস্টারগুলো বাঁধা পড়ে থাকে। বিডিও-র গাড়ি থেকেও সে পোস্টার জুটিয়ে আনে। ভোটের সময় দল-নির্বিশেষে মিটিংয়ে গিয়ে শ্লোগান দিয়ে সে পোস্টার-হ্যান্ডবিল জোগাড় করে। সব পার্টির মিটিংয়েই সে শ্লোগান দেয়। তাতে বাচ্চার বড় মুখ, ধানক্ষেত আর পাম্প, গাই-বাছুর, ইন্দিরা গান্ধি— এরকম নানারকম ছবি। এইসব পোস্টার জোগাড় করে চ্যারকেটু গোয়ালঘরের বেড়ায় আর চালে লাগায়। বৃষ্টির ছাঁট আটকাতে এই পোস্টারগুলো খুব কাজে লাগে। তার ঝুরঝুরে ঘরে নানা রঙের নানা রকমের পোস্টার। পরিবার পরিকল্পনা, বসন্তরোগ নির্মূলকরণ, সার, পাম্প, অধিক ফলনশীল ধান, জোড়া বলদ, কঁচিদাও ধানের শিষ, ইন্দিরা গান্ধি, হাতুড়ি তারা, গাই বাছুর। জোছনা রাতে ভূমিহীন এই আধিয়ারকে শস্যের দেবতার মতো মনে হয়। পেটে তার ভাত নেই, ধানক্ষেতের ভেতর দাঁড়িয়ে ভাত দেখার জন্য সে আকাশের দিকে তাকায়। রাষ্ট্র এগিয়ে চলে, পোস্টারগুলো রাষ্ট্রের সেই অগ্রগতির বিজ্ঞাপন, কিন্তু নির্ভুম, ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন আবহমানের মতোই অপরিবর্তিত থেকে যায়, উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে তাকে আড়াল করা যায় না।

এরপর আমরা দেখি চ্যারকেটুর কাকা থেতখেতুকে, তার স্ত্রী টুলটুলি এবং তাদের তিন সন্তানকে। এরা হল দুই পুত্র, ছয় বছরের বেঙ্গু ও আট বছরের বৈশাখু আর একমাত্র কন্যা, চার বছরের খেতেশ্বরী। পুরনো-নতুনের ভেদটা চমৎকার আসে, ‘তিনদিনের বাসি খিদে আর আগামী দিন সাতেকের আগুরি খিদেটা পুরনো। যতদূর চোখ যায় ততদূর, হিমের ভারে নুইয়ে পড়া টসটসে পাকা ধানটা নতুন। ক্ষুধার্ত দুই ভাই বেঙ্গু আর বৈশাখু একমুঠো ভাতের জন্য হাহাকার করে, খাদ্যের সন্ধানে দুঃসাহসিক সব চেষ্টায় লিপ্ত হয়, গভীর দরদে সেই মর্মস্পর্শী ছবি এঁকেছেন লেখক। তাদের মা টুলটুলিও কচুকন্দ ও বুনো আলুর মতো খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। শেষ না হতে চাওয়া পাকা ধানের ক্ষেত অবাস্তব মনে হয় তার কাছে। নদীর পাড়ে মাটির গর্তে নেমে অভুক্ত শরীরে দুঃসাহসিক চেষ্টার পর একটা কচু আর একটা কেশর জোটাতে পারে সে। অজন্মার দিনে আলসার-আক্রান্ত বুভুক্ষু শরীর নিয়েও ফ্রিরেশনের আবেদন করার জন্য খেতখেতুকে বেরোতে হয়। তার লক্ষ্য জমিরুদ্দি জোতদার বা রমণী পঞ্চায়েত। পেটে প্রায় তিনদিন আগে ভাতের মাড় পড়েছিল, দেড়দিনেরও বেশি পেটে শুধুই জল। আধিয়ারকে ফ্রি রেশন বা ধানধার দেওয়ার আইন নেই। টিঙটিঙে পা-দু’টোর ওপর ঢ্যাঙা শরীরটা দেখে উদোম ন্যাংটো মনে হয়। দুই পায়ের ফাঁকে তার লজ্জাস্থানটুকু শুধু গোপন রেখে ত্যানার একটা নেংটি কোমরের দড়ির সঙ্গে ঝোলে। নেংটিটা চিমসনো পাছার ফাঁকের ভেতর ঢুকে যায়। আমাদের জোলার প্রকৃতবাদী বর্ণনার কথা মনে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন: মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’: মধ্যবিত্তের সংকট

তিনদিনের না খাওয়া শরীরে পেটে আলসারের ব্যথা নিয়ে তিন পুরুষের আধিয়ার খেতখেতু তিন পুরুষের জোতদার রমণী পঞ্চায়েতের মুখোমুখি হয়। পঞ্চায়েত কিন্তু তার দিকে ফিরেও তাকায় না। খেতখেতু ঠিক করে আলসারের কারণে যতই রক্তবমি হোক, ধানটুকু নিয়ে তবেই সে উঠবে। মনে মনে ভাবে, রক্তবমিটা যদি সে এখন করে ফেলতে পারে, তাহলে, পাঁচ-দশ কেজি ধান সে আদায় করতে পারে। আইনের মারপ্যাঁচে রমণী পথ য়েতরা নিজেদের সুবিধাটুকু যথাপূর্ব বলবৎ রেখে দিয়েছে। ভূমি-সংস্কার হওয়ার ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রান্তিক চাষিদের কোনো উপকার হয়নি। বর্গাদাররা রায়তি স্বত্ব পায়নি। কারণ মধ্য ও ধনী চাষিদের সহযোগিতাই পার্টিকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। ফলে খেতখেতু খেতখেতুই থেকে যায়। আর আবহমানের ছবি হয়ে রয়ে যায় ধানক্ষেত। ‘রোদ বা নদীর জলের মতো মানুষনিরপেক্ষ এই ধানক্ষেত, যেন, মানুষ ডুবে গেলে বা না খেয়ে থাকলেও রয়ে যায়, বয়ে যায়। বাড়িঘর-ডোবাপুকুর-মাছচাষ-যুক্তফ্রন্ট-কংগ্রেস-নানা কথায় মূল কথার খেই হারিয়ে যায়। কিংবা মূল কথাই এসে যায়। জোতদারের জমি বেনামিতে কয়েক ভাগ হয়েও ঠিকই রইল। বদলে আধিয়ারদের ভাগ-চাষের জমিই কমতে শুরু করল। পঞ্চায়েত ভূমি-আইনের মারপ্যাঁচে খেতখেতুই কখন উচ্ছেদ হবে সে কথা বলে, ধানকর্জ তো দিতেই পারে না, এমনকী কোটা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ফ্রি রেশনের নেহাতই একটা পুরুচিও দিতে পারে না। খেতখেতু জানে না, এখন সে কোন গিরির (মালিক জোতদার) অধীনে, কাকে দিতে হবে ফসলের ভাগ, কার জমি কোনটা! এমনকী আজন্ম পরিচিত নিজের জমির আলপথটুকুও সে ভুলে যায়। রাস্তাটা ধরে লেংচে লেংচে হাঁটতে হাঁটতে চলে খেতখেতু, বমি উঠে আসে, এক আধিভৌতিক নির্জনতা গ্রাস করে তাকে, দিগ্‌দিগন্তব্যাপী ধানক্ষেতের আলে সে নেমে আসে, ধানক্ষেতটা যেন ঢাল বেয়ে আকাশে গিয়ে ঠেকে, আর এইভাবে খাদ্যের সন্ধানে গোটা একটা পরিবারের এপিক বর্ণনা দিয়ে যান লেখক। যদিও মাত্র মাস দেড়েক পরই রবিশস্যের চাষের জন্য গরু লাগবে, গরু বেচতে তিনদিনের বাসি খিদে নিয়ে চ্যারকেটু শহরে গিয়ে দেখে চারদিকে সাজো-সাজো রব। একই দিনে, একই সময়ে, সবগুলো পার্টির মিছিল পড়েছে। মিছিলের পর মিছিল এগিয়ে আসে, আগে ঝান্ডা দেখা যায়, তারপর মানুষজন। কোমরের কাছে একটু ত্যানা বা গামছা ছাড়া সম্পূর্ণ ন্যাংটো কালো কুচকুচে মানুষগুলোকে আলাদা চেনা যায় না। যাদের মাথা নুয়ে এসেছে তাদের কাঁধে ঝান্ডা লাগিয়ে দিয়ে যুক্তফ্রন্ট-কংগ্রেস নিজেদের মিছিলকে সফল করে তুলতে চায়। মিছিলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক যা আমাদের ফ্লবেয়র বা তলস্তয়ের উপন্যাসের অনুপুঙ্খ বিবরণের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। যারা জমির মালিক তারা মিছিলের পাশে পাশে আসে। যারা শুধুই আধিয়ারি করে তারাই মিছিলটাকে নিয়ে আসে। আর যারা দিনহালুয়া বা ক্ষেতমজুর, তারা একটা পিণ্ডের মতো এসে মিছিলে মিশে যায়। গ্রামের ছোট ছোট মিছিলগুলো মিশে শহরের বড় মিছিলে পরিণত হয়। এই গরু বিক্রি করে আবার চাষের গরু কেনা হবে কেমন করে তা চ্যারকেটু জানে না। গরুটাকে দড়ি নিয়ে ট্রাকের ওপর তোলা হয়, এই ওপরে তোলার কাজে অনেকেই হাত লাগায়, তারপর গরুটাকে ট্রাকের আরও ভেতর ঠেলে দেয়। ট্রাকের ওপরে খালি গা, কোমরের নীচে গামছা জড়ানো, কাঁধে লাঙল, কোমরে গোঁজা কাঁচি-দাও, পাশে গরু ও তার কাঁধে রাখা হাত, সবমিলিয়ে চ্যারকেটুকে একটা প্রদর্শনীর ‘বাংলাদেশের কৃষক’-এর মাটির মডেলের মতো লাগে। চ্যারকেটু হয়ে ওঠে মিছিলের স্মারক। কিন্তু আখ্যানকার জানিয়ে দেন, কোনও অর্থেই চ্যারকেটু এই এতগুলো মিছিলের কেউ নয়, কোনোটারই নয়। যেকোনও মিছিলেই সে হাঁটা শুরু করে দিতে পারে বা না পারে। যখন যে মিছিল পেয়েছে চ্যারকেটু তাতে ঘুরেছে। কোনও মিছিলই তার নিজের ছিল না। গৌরীহাটে চ্যারকেটু ও তার গরুকে নামানো হয় না। চ্যারকেটু বুঝে যায়, যেখানে নামাবে সেখান থেকেই আবার হাঁটতে হাঁটতে গৌরীহাটে ফিরতে হবে। যে আশায় লাঙলটা নিয়েছিল, সেই বাবুর ঘরের তরকারি বাগানে হাল লাগিয়ে পয়সা কামানোর আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। সন্ধেবেলায় হাটে গেলেও আর গরু বিক্রি হবে না। তার মানে পুরো যাত্রাটিই বিফলে গেছে, অর্থ ও খাদ্য জোটার কোনও আশা নেই। জলপাইগুড়িতে পৌঁছে গরু সহ চারকেটু প্রায় বিশেষ অতিথির মতোই নামে। তারপর গরুসহই তাকে মিছিলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কাঁধে লাঙল, গরুর গলার দড়িটা ধরা, চ্যারকেটু কখনও কংগ্রেসের মিছিলে ঢুকে যায়, কখনও ঢুকে পড়ে যুক্তফ্রন্টের মিছিলে। শেষপর্যন্ত তার গরু-সহ জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু পুলিশের গাড়িতে গরু আর তাকে ভরবে কী করে? শেষপর্যন্ত গরু নিয়ে জেলে যাওয়া হয় না, পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।

মুক্তি পেয়ে চ্যারকেটু গরু নিয়ে গৌরীহাটের দিকে তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে। গরুটার পেছনে ঠেলা দিয়ে ছোট ছোট পায়ে দৌড়তে শুরু করে। খুব জোরে আকাশ ভরা শ্লোগান শুনেও দাঁড়ায় না। কিন্তু তবুও মিছিলের হাত থেকে গরু ও নিজেকে সে বাঁচাতে পারে না, মিছিল তাদের গ্রাস করতে এগিয়ে আসে। শেষপর্যন্ত খালি গায়ে গরুটার পিঠের ওপর উঠে বসে লাঙলটা মাথার ওপর তুলে ধরে, গরুটাও শিং উঁচিয়ে মিছিলটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর ট্রাক্টরের মতো বেগে সমস্ত মিছিলটা চষতে চষতে আরও সব মিছিলের দিকে ছুটে যায়। রাতে চারকেটু মিছিলশূন্য জ্যোৎস্নাময় ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ে। কাঁধে হাল, পাশে গরু, কোমরে কঁচিদাও। আখ্যানের শেষ বাক্যটি এরকম, ‘এ আল, ও আল ধরে ধরে পাকা ধানক্ষেতের পাকে পাকে নিজেকে পেঁচাতে পেঁচাতে ক্লান্ত, নিশ্চিত পায়ে, চ্যারকেটু এখনো দীর্ঘতর ক্ষুধার দিকে চলে যেতে থাকে।’ উন্নয়নের পর উন্নয়ন হয়, পোস্টারের ওপর পোস্টার জমে, মিছিলের পর মিছিল আসে, কিন্তু প্রান্তিক, শোষিত মানুষের ধারাবাহিক ক্ষুধার আখ্যান ফুরোয় না। চ্যারকেটুকে উদ্ভট সব পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে লেখক আসলে দেখাতে চান, ওপরে যতই পালিশ করা হোক, সভ্যতার অসংগতিগুলিকে ওভাবে লুকোনো যায় না। দস্তয়েভস্কির কার্নিভালের জগৎকে সম্পূর্ণ ভারতীয় বাস্তবতায় দেখাতে চান লেখক, স্বাভাবিকতাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সভ্যতার সারাৎসারকে তুলে ধরে দেখাতে চান, আসলে কী গ্লানিকর, অমানবিক ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করে চলেছি আমরা! নিজের দেশ-মাটি-মানুষের কাছে দায়বদ্ধ লেখক এভাবেই উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতাকে চিহ্নিত করে যেতে চান, যেখানে প্রভুশক্তির হাত থেকে অর্থনৈতিক মুক্তি জোটে না উত্তর-উপনিবেশিত মানুষের।

আরও পড়ুন: যে উপন্যাসে ছড়িয়ে রয়েছে সন্ত্রাস

খেতখেতুর পরিবার ও সেই পরিবারের মূল খুঁটি চ্যারকেটুকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে আখ্যানের পরিকাঠামো। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় এই পরিবারটির কাছে কোনও তাৎপর্যই বহন করে না। রাষ্ট্র ও তার ইতিহাসের পরিসরে এই পরিবারটির যেন কোনও স্থানই নেই। ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসে দেবেশ রায় স্পষ্টই জানিয়েছিলেন, এরা বনের পশুর নিয়মে বাঁচে। এদের প্রতিদিনের বাচাই এক স্বাধীন, সার্বভৌম, স্বরাট, স্বাবলম্বী বাঁচা। সেই বাঁচা, দিনের পর দিন বেঁচে থাকা নয় মাত্র, প্রতিটি দিনই একটা পুরো জীবন বাঁচা, একটা গোটা মানবজীবন বাঁচা। সেই বাঁচার নিয়মেই নিশিদিন ভারতবর্ষে যাতায়াত করে এমন একটা সড়কের পাশে মাদারির মা নিজের এক রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিসের মতোই ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’-এও আমরা ঠিক একটি দিনের বর্ণনাই পাই। কিন্তু এই একটি দিন নিছক একটি দিন হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে একটা গোটা জীবনের রূপক। একটি দিনের পরিসরে যেমন ঢুকে যায় একটা গোটা জীবন, তেমনই একটা গোটা জীবনের ব্যপ্তিকে আয়ত্ত করতে বিস্তৃত হতে থাকে সেই একটি দিন। গোটা জীবনটাই হয়ে ওঠে একটি দিনের মতো, আবার একটি দিনের মধ্য দিয়েই এইসব মানুষের গোটা জীবনের ছবিটি পরিষ্কার হয়ে যায়।

বোঝা যায়, একটি কোনও মিলনবিন্দু রয়েছে যেখানে এসে একটি দিন ও একটি গোটা জীবন একাকার হয়ে যায়। দেবেশ রায় লিখেছিলেন, এদের ‘দারিদ্র্যের মধ্যে তো কোনও গৌরব নেই, বড় বেশি অপমান আছে। সেই অপমানের বিচ্ছিন্নতাকে বিদ্রোহের বিচ্ছিন্নতা বলে ভাবার মধ্যে, … মিথ্যা কিছু থেকেই যায়।’ মহাশ্বেতার উপন্যাসে যেখানে আদিবাসী-উপজাতি জীবনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, গ্লানি, অপমান বিদ্রোহের আগুনে পুড়ে ক্ষমতার বয়ানের একটি প্রতিস্পর্ধী বয়ান রচনা করতে চায়, যেখানে বৈষম্যের প্রতিবাদ ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ও জাতের পরিচয়ের বিকল্প এবং আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত, দেবেশের উপন্যাসে বিদ্রোহের পরিবর্তে জায়গা করে নেয় ক্ষুধা, এই ক্ষুধাই হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের সেইসব মানুষের আত্মপরিচয়ের একমাত্র শর্ত, যারা ভারতবর্ষের মানচিত্রের ভেতর ভৌগলিকভাবে বাস করেও সেই মানচিত্রে বহিরাগত হিসাবেই থেকে যায়, কোনোদিনই কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় দিয়ে তাদের চিহ্নিত করা যায় না, ক্ষুধার শর্তেই তারা বেঁচে থাকে, ক্ষুধাই হয়ে ওঠে একমাত্র চিহ্নক, যা দিয়ে এইসব মানুষকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের সূত্রে গ্রথিত করা যায়। ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’ প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষুধারই আখ্যান, যেখানে তিনদিন ধরে অনাহারে থাকা একটি প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সদস্যরা ক্ষুধায় জর্জরিত হয়ে খাদ্যের সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এই সন্ধান-প্রক্রিয়ায় বিচিত্র, বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। শেষ রাতে এই আখ্যানের সূচনা যখন পেচ্ছাব করতে গিয়ে চ্যারকেটুর মনে হয়, ‘মোর পেচ্ছাবখানের আওয়াজটা স্যালায় হিম ঝরিকার নাখান আর গরুর পেচ্ছাবখানের আওয়াজটা স্যালায় বিষ্টি পড়িবার নাখান। এইভাবে আখ্যানের গোড়াতেই বনের পশুর সঙ্গে নিজেকে একটা তুলনার জায়গায় নিয়ে যেতে চায় সে। যে মাচানে চ্যারকেটু শোয় সেটায় ‘লম্বালম্বি তার শরীর আঁটে না।’ সে সই করতে পারে কিন্তু কী সই করে তা জানে না, কোন অক্ষর লেখে তাও জানে না। অক্ষর ফোটানোর উত্তেজনা বাস্তবিকই তার কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। যে পার্টিরই মিটিং থাক, শ্লোগান শুরু হলেই চ্যারকেটু সেই শ্লোগানের দলের পেছনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে গলা মিলায়। সে ঠিক বুঝতে পারে কখন শ্লোগান হবে। মিটিংয়ের শেষে যখন পোস্টার-হ্যান্ডবিল বিলি হয়, তখন চ্যারকেটু হাত বাড়ালেই দু-একটা পোস্টার পেয়ে যায়। সেই পোস্টারগুলো সে অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করে নিজের ঘরে লাগায়। বেশিরভাগই ব্যবহার করা হয় বৃষ্টির ছাঁট আর হিম আটকাতে। অক্ষর বা পোস্টার, সই বা শ্লোগান, আত্মপরিচয়ের এই মূল খুঁটিগুলি চ্যারকেটুর কাছে কোনও অর্থই বহন করে না। তার কাছে এইগুলি হয়ে ওঠে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার, টিকে থাকার অনিবার্য কৌশলমাত্র। এগুলোকে ব্যবহার করে সে নিজের অস্তিত্বরক্ষা করে, নিজের প্রাণটাকে বিনষ্ট হতে দেয় না। ক্ষুধানিবৃত্তির মধ্য দিয়ে শুধু বেঁচে থাকা, এছাড়া জীবনের আর কোনও মানেই থাকে না চ্যারকেটুদের কাছে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

অতএব দিনের আলো ফুটলে এই ক্ষুধানিবৃত্তির জন্যই গোটা পরিবার সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আখ্যানকারের বর্ণনায়, ‘ধানগুলো পেকে এমন টসটসে যে-কোনো মুহূর্তে কাটা শুরু হতে পারে। কখনো-সখনো এক-আধ পেট ভাত খেয়ে না খেয়ে, ভাতের ফেন জমিয়ে রেখে সারাদিন ধরে খেয়ে, বা মাঠঘাট থেকে কচু তুলে এনে-এনে সিদ্ধ করে খেয়ে, গেল-বছরের ধানের পুরনো খিদেটাকে সামলে-সুমলে এখন নতুন বছরের নতুন ধানকাটার সেই মুহূর্তটি গোনা হচ্ছে। খেতখেতুরাও শেষ ভাত খেয়েছে তিনদিন আগে। প্রায় তিনদিন আগে পেটে তাদের ভাতের মাড় পড়েছিল, দেড়দিনেরও বেশি পেটে শুধুই জল। একদিকে পেটে তাদের তিনদিনের বাসি খিদে আর চোখের সামনে হিমের ভারে নুইয়ে পড়া টসটসে পাকা ধান। খেতখেতু, তার স্ত্রী টুলটুলি, আট বছরের বৈশাখু, ছয় বছরের বেঙ্গু এবং সর্বোপরী ভাইপো চ্যারকেটু, যে যার মতো আহার্যের সন্ধান শুরু করে। চ্যারকেটুকে হাটে গরু বেচে রাতে ফেরার সময় চাল আনতে পাঠায় খেতখেতু। তিন-চার মাস পরে চাষের সময় গরু কোত্থেকে পাওয়া যাবে, এই চিন্তা ভাবায় চ্যারকেটুকে। কিন্তু আগে তো তিন-চারমাস বেঁচে থাকতে হবে! টুলটুলি ঝুড়ি-কাখে ধানখেতের ভেতর আলপথ দিয়ে কচু, কন্দ, বুনো আলু, শাক বা অন্য কিছু খুঁড়ে আনতে চলে যায়। সম্পূর্ণ ন্যাংটো দু’টি শিশু বৈশাখু আর বেঙ্গু ধানক্ষেতের ভেতর আলপথ দিয়ে হাঁটতে থাকে। পেটে আলসারের ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠায় লেংচে লেংচে খেতখেতুও বেরোয় দু-মুঠো চাল জোগাড় করতে। সে ঠিক করে, যদি রক্তবমিও হয়, হোক, তবু রমণী পঞ্চায়েতের কাছে কর্জ ধান বা ফ্রি রেশন নিয়ে তবেই সে ফিরবে। এইভাবে আখ্যানের গোটা পরিসরে তীব্র, ভয়াবহ ক্ষুধাই হয়ে ওঠে সেই প্রকট বাস্তবতা, যা অন্য সমস্ত বাস্তবতাকে প্রচ্ছন্ন, আচ্ছন্ন করে দেয়, তাদের ছাপিয়ে যায়।

অথচ ক্ষুধা যখন এমন উৎকট, বিকট চেহারায় আত্মপ্রকাশ করে তখন প্রেক্ষাপটে থাকে পাকা ধানে পরিপূর্ণ ক্ষেতের পর ক্ষেত। একদিকে ধানের শেষ নেই, অন্যদিকে খেতখেতু, চ্যারকেটুর মতো মানুষদের অনির্দিষ্ট ক্ষুধা আর ক্ষুন্নিবৃত্তিরও শেষ নেই। তাই গত তিনদিনের পরিপূর্ণ অনাহার আর আগামী ক’দিনের নিশ্চিত উপবাস পেছনে-সামনে রেখে নির্দিষ্ট দিনটিতে পরিবারের প্রতিটি সদস্য যে যার মতো করে সেই ধানে পরিপূর্ণ ক্ষেত-আলপথের ভেতর দিয়েই খাদ্যের সন্ধান করতে থাকে, যে খাদ্য কচু, ওল, কন্দ, বুনো আলু, মিষ্টি আলু, কেশর, বুনো মুলোর মতো কিছু, ভাতের মতো উৎকর্ষ কিছু অস্পৃশ্য হয়েই থাকে তাদের কাছে। আখ্যানকার লেখেন, ধানক্ষেতের আড়ালে-আড়ালে গরুটা নিয়ে চ্যারকেটু চলে গেলে যখন আর তাদের দেখা যায় না তখনও ওই ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্ষেতখেতুর চোখে ভিরমি লাগে। ধানক্ষেত এমন অপরিবর্তিত থেকে যায় যেন গরু আর চ্যারকেটু এই ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে কোনোদিনই যায়নি…। রাগের মাথায় খেতখেতুর মনে হয়, ‘শালা দিন। নাই, আতি (রাত) নাই, অষ্ট প্রহর অষ্ট দিকত এই এক ঝিকিমিকি ধান আর ধান। আগুন দিবার নাগে শালা সারা খেতত, আগুন দিবার নাগে।’ আর যখন ধানক্ষেতের ভেতর গরু নিয়ে চ্যারকেটুকে আর দেখা যায় না, তখন, একমাত্র তখনই সেই বাধাহীন ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় চাল নিয়ে চ্যারকেটুর ফেরাটা খুব বাস্তব হয়ে উঠতে পারে চার বছরের খেতেশ্বরীর কাছে।

ধানক্ষেতকে কিছুতেই বদলানো যায় না, এক অপরিবর্তিত, স্থির, অনড় দৃশ্য হয়ে সে প্রেক্ষাপটে থেকে যায়। ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর ভয়াবহ ক্ষুধাও অপরিবর্তিত থেকে যায়, তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক তৈরি হয় না, যে যার নিজের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে সমান্তরালভাবে থেকে যায়, কোনও মানবিক বিনিময় ঘটে না। ধানক্ষেতকে এড়াতে পারে না বৈশাখু আর বেঙ্গু, অথচ ক্ষুধাও প্রশমিত হয় না। আখ্যানকার লিখেছেন, বৈশাখু আর বেঙ্গু ওপর দিকে তাকায়। এখানে ধানক্ষেতের ভেতর থেকে ওপর দিকে তাকালে মনে হয় আকাশেই ধান পোঁতা আছে। ওরা ধানগাছের তলা দিয়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ওরা দু-হাতে ধানগাছ সরায় আর ধানগাছ ফিরে ফিরে আসে। বৈশাখু নাক টেনে চালের গন্ধ পেতে চায়। ধানের দিকে তাকিয়ে বলে, “এতো ধান আর ভাত পাম না কেনে রে। বেঙ্গু জানতে চায়, ‘ধানখেতত ভাত নাই?’ তারপর আর্তনাদ করে ওঠে, ‘জাগিলে বড় ভোক।… দাদা হামার বড় ভোক। হামাক মারি ফেলা। মুই আর বেঙ্গু থাকিম না। মুই যখ হম।’ টুলটুলিকেও ধানক্ষেত যেন গ্রাস করে নিতে চায়। আখ্যানকারের বর্ণনায়, ‘এই যে কার্তিকের পাকা ধানের খেতের ভেতর দিয়ে টুলটুলি প্রায় ছোটে, সেই পাকা ধানের খেতটাই শেষ হতে চায় না। মাঝেমাঝে আলটা নিচু, তখন ধানক্ষেত বুকের ওপর, মনে হয়, ধানক্ষেতে বুঝি ঢাকা পড়ে যেতে হবে। এত ধান, তবু ভাতের চিন্তাই করে না টুলটুলি, সে খোঁজে শিকড়, কন্দ, কচু, বুনো আলু। আর টুলটুলির স্মৃতিতে আনাগোনা করে, ‘ধানভোখা আর ধানশুখার নাচানি, ধান পাঁজির ঢং, গাইনখান মাথার উপর তুলিবার ঢক, ধান নাড়ি দিয়া পা-খান ঝাড়া, ধানের গোছা মাথাত করি ঘরত ফিরি আসা’― এইসব কিছুই। খেতখেতুর ক্ষেত্রে পরিণতি হয় আরও মারাত্মক। চাল আনতে গিয়ে শূন্য হাতে ফেরার পথে আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতের ভেতর খেতখেতু বমি করতে থাকে। আদিগন্ত ধানক্ষেত, কারণ, ‘খেতখেতু একবার এই জমিগুলির দিকে তাকায়। সব জমিই ধানখেত। ধানে-ধানে এক জমির সঙ্গে আর এক জমির কোনো পার্থক্য নেই।’ আখ্যানকার আরও বর্ণনা দেন, সে ‘একটু আশ্বস্ত হয়ে দেখে, রক্ত নয়, তার মুখ থেকে শ্লেষ্মা-মেশানো জল উগরে বেরিয়ে পাকা ধানগাছগুলোর ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, শ্লেষ্মাগুলো ধীরে ধীরে সুতোর মতো ধানগাছের শিষ ও পাতা থেকে শূন্যতায় ঝুলে যাচ্ছে।… দুই হাতে পেটটা চেপে ধরা ছিল, হাতটা না সরিয়েই খেতখেতু আবার চোখ তুলে সেই ধানখেতগুলোর ওপর দিয়েই তাকায়-কুনঠে যাম! কুনঠে যাম? এ্যানং ভোখ নিয়া মুই কুনঠে যাম?’ গোটা ধানক্ষেতটাকেই খেতখেতুর কাছে তখন গোলোকধাধার মতো মনে হয়। সে টের পায় এইবার, এই ধানক্ষেতের ভেতর পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরতে হবে, পথ পাওয়া যাবে না আর একবার পেছনে তাকালে বা পেছন থেকে কোনো ডাকে সাড়া দিলে সঙ্গে সঙ্গে ভুলা মাসান এসে ঘাড় মটকে ফেলে রেখে যাবে। তার মনে হয়, ‘ধানখেতটা যেন ঢাল বেয়ে আকাশে গিয়ে ঠেকেছে।’

আরও পড়ুন: একটি লিটল ম্যাগাজিন ও মৃণাল সেন

খেতখেতুর কাছে ধানক্ষেত যেমন গোলকধাঁধা হয়ে ওঠে, চ্যারকেটুর কাছে সেরকমই গোলকধাধা হয়ে ওঠে মিছিল। দেবেশ রায়ের উপন্যাসগুলিতে মিছিল যুগপৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ও রূপক। মিছিলে শুধু জনসমাবেশই হয় না, বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভাবাদর্শেরও সমাবেশ ঘটে, যা সভ্যতার একটি জটিল চেহারাকেই তুলে ধরে। কিন্তু চ্যারকেটু বা বাঘারুর মতো মানুষরা এইসব মিছিলে বাইরের লোক হয়েই থেকে যায়। মিছিলটি যদি হয় ইতিহাসের রূপক, তবে সেখানে শুধুমাত্র ইতিহাসের লোকজনই স্থান পায়। চ্যারকেটু বা বাঘারুর মতো যারা অতিরিক্ত, ইতিহাসের বাইরের লোকজন, মিছিলের সাপেক্ষে তাদের নিরালম্ব অবস্থান এক হাস্যকর অসংগতির জন্ম দেয়। ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’ও এর ব্যতিক্রম নয়, ফলে চ্যারকেটুও এই অসংগতিকে এড়াতে পারে না। তিনদিনের ক্ষুধা নিয়ে সে একেবারে মিছিলের ঘূর্ণাবর্তে গিয়ে পড়ে। মিছিলটি চায় ইতিহাস সৃষ্টি করতে, চ্যারকেটুর কাছে সেই ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষুধা ও খাদ্যের সন্ধান। সে মিছিলকে তার প্রয়োজন বোঝাতে পারে না, মিছিলটিও তার কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে না। ফলে বসাই টুডু ও কালী সাঁতরা যেভাবে ক্ষমতাব্যবস্থার চোখে অবোধ্য থেকে যায়, সেভাবেই চ্যারকেটু ও মিছিলটি পরস্পরের কাছে অবোধ্য থেকে যায়। তারা কেউ কারও প্রয়োজনে আসে না, কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারে না। আর যত মিছিলটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, চ্যারকেটু তত গরুটির সঙ্গে নৈকট্য বোধ করে। যেহেতু সে পশুর নিয়মেই বাঁচে, তাই গরুটি তার নিয়ম বোঝে, সে গরুটির নিয়ম বোঝে। মিছিলের গোলকধাঁধার ভেতর তারা হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক ও অবলম্বন, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ও সমঝোতা করে তারা মিছিলের বেনিয়মের ভেতর নিজেদের নিয়মটিকে বজায় রাখে, যা মিছিলের সাপেক্ষে অসংগতি সৃষ্টি করলেও তাদের নিজেদের বিশিষ্টতাকে বজায় রাখে, যে বিশিষ্টতা পশুর নিয়মকে অনুসরণ করে এবং চিহ্নিত করে যায় ইতিহাসের বাইরের লোকজনকে।

উল্লেখযোগ্য হল, যে দিনটিকে কেন্দ্র করে আখ্যানটি গড়ে উঠছে, ঠিক সেই একই দিনে, একই সময়ে, সবগুলো পার্টির মিছিল পড়েছে। চ্যারকেটু এবং তার গরু যত মিছিলের মধ্যে ঢুকে যেতে থাকে, ততই যেন পরস্পরের মধ্যে নৈকট্য বোধ করতে শুরু করে। ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের সম্পর্ক আর থাকে না, সম্পর্কের মাত্রাবদল ঘটতে থাকে, তারা যেন সমান-সমান হয়ে উঠতে থাকে। আখ্যানকার লিখেছেন, ‘গরুটা এতক্ষণ পিছনে ছিল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চ্যারকেটু যখন এইসব দেখছিল তার মধ্যে এসে চ্যারকেটুর পাশে দাঁড়িয়েছে, এমনই পাশে যে চ্যারকেন্টুর পক্ষে এখন বাঁ-হাতটা গরুর পিঠের ওপর তুলে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। চ্যারকেটুর গা ঘেঁষে একটু বাঁ-দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে গরুটা দাঁড়িয়েছিল, যেন চ্যারকেটুর মত সে-ও এইসব দেখছে। গলাটা একটু নোয়ানোই থাকে, বাঁ-শিংটা চ্যারকেটুর গায়ের সঙ্গে প্রায় লাগানো। ক্রমে দু’জনের অভিজ্ঞতাও আর বিচ্ছিন্ন থাকে না, যৌথ হয়ে ওঠে। আখ্যানকারের ভাষায়, “এই নালীর ঢালু বেয়ে রাস্তার ওপরে গরুটাকে তুলে দেওয়া ও গরুটার উঠে আসার ভেতর চ্যারকেটু ও গরুটার যৌথ অভিজ্ঞতা থেকে যায়। গরু ও চ্যারকেটু একসঙ্গেই ট্রাকে ওঠে। আখ্যানকার লেখেন, ‘গরুটার পাশে, ট্রাকের ওপর, কাঁধে লাঙল ঝুলিয়ে, গরুটার কাঁধে একটা হাত রেখে দাঁড়ালে সমস্ত দৃশ্যের ভেতর চ্যারকেটু এমন একটা প্রধানতা পেয়ে যায় যে তাকে দেখলে মিছিলের কথা মনে পড়ে। কিন্তু কোনো অর্থেই চ্যারকেটু এই এতগুলো মিছিলের কেউ নয়, কোনোটারই নয়। যে-কোনো মিছিলেই সে হাঁটা শুরু করে দিতে পারে বা না পারে।’

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

এইভাবে মিছিলের স্মারক হয়ে চ্যারকেটু গরু সহ ক্রমেই আরও বেশি করে মিছিলের গোলকধাধায় ঢুকে যেতে থাকে। এই মিছিল সবারই আত্মপরিচয়ের কোনও না কোনো মাত্রার স্মারক, আর চ্যারকেটু নিজেই স্বয়ং এই মিছিলের স্মারক, কারণ এর মধ্যে কোনও আত্মপরিচয়ই তার চিহ্নক হয়ে উঠতে পারে না, বরং সে নিজেই হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়হীন সামগ্রিক মিছিলের চিহ্নক। যেহেতু নিজেই সে পশুর নিয়মে বাঁচে তাই আত্মপরিচয়হীন গরুটিও হয়ে ওঠে মিছিলের আরেকটি চিহ্নক। আর এই দুই চিহ্নকের দ্বারা চিহ্নিত হতে হতে মিছিলটি ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে, গ্রাস করতে থাকে সেই পরিসর যে পরিসরে চ্যারকেটুর শুধুমাত্র খাদ্য সংগ্রহেই নিবিষ্ট হওয়ার কথা ছিল। গৌরীহাটে চ্যারকেটু ও তার গরুকে নামানো হয় না। চ্যারকেটু নামার চেষ্টা করে, কিন্তু শ্লোগানের কোলাহলে হারিয়ে যায় তার সেই মৃদু আর্তি। ট্রাকের পেছনে অপসৃয়মাণ রাস্তার দৈর্ঘ্যের দিকে তাকিয়ে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চ্যারকেটু। চ্যারকেটু বুঝে যায়, সন্ধ্যেবেলায় হাটে গেলেও আর গরু বিক্রি হবে না। তাছাড়া শহরের বাবুদের তরকারি বাগানে হাল লাগিয়ে পয়সা কামানোরও আর কোনও সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ অর্থলাভ আর ক্ষুধানিবৃত্তির কোনও সম্ভাবনাই নেই। ইতিহাসের মিছিল ইতিহাসের বাইরের কয়েকটি মানুষের জীবনে সেই সম্ভাবনাকে শ্বাসরোধ করে ছাড়ে। শহরে পৌঁছে ট্রাক থামলে গরু আর লাঙল কাঁধে চ্যারকেটু, দুই হতভাগ্য একসঙ্গেই তক্তা বেয়ে নামে, তাদের আর কিছুতেই পরস্পরের থেকে আলাদা করা যায় না, দুর্ভাগ্যে তাদের অভিন্ন মনে হয়।

চ্যারকেটু চলে, চ্যারকেটুর গরু চলে, চ্যারকেটু ও গরুসহ মিছিল চলে, শ্লোগানে-শ্লোগানে মিছিলটা দানা বাঁধতে থাকে। চ্যারকেটু বলার চেষ্টা করে, হে বাবু, মোক ছাড়ি দেন কেনে, মোক গৌরীহাট যাবা নাগিবে, মোক এই গরুখান বেচিবার নাগিবে, মোক চাউল কিনিবার নাগিবে, মোর বাড়িত পাঁচ-পাঁচখান না-খাউয়াইয়া মুখ বাবু, আজি গরুবেচা টাকা দিয়্যা চাউল কিনিলে উমরার খিদা মিটিবে। কিন্তু একের পর এক সোচ্চার, উচ্চকিত রাজনৈতিক শ্লোগানের আড়ালে তার আর্তি কোনও অভিঘাতই সৃষ্টি করতে পারে না। ক্ষুধার্তের প্রতি কোনও দায়িত্ববোধ অনুভব করে না মিছিল, কারণ মিছিলকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের কোনো খাদ্যের অভাব নেই, তারা মিছিল করে রাজনীতি করবে বলে, যে রাজনীতি ক্ষুধার্ত মানুষকে দাবার খুঁটির মতোই ব্যবহার করে, তাদের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা অনুভব না করেই। চ্যারকেন্টুর মাথায় ঘুরতে থাকে গৌরীহাট, মিছিলের সঙ্গে সে এক সার্বিক বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে, ঠিক যেমন মিছিল তার সঙ্গে, কেউ কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না, অথচ পরস্পরকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। কাঁধে লাঙল, গরুর গলার দড়িটা ধরা, মানুষের গিজগিজ মাথাগুলোর ওপর দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখে চ্যারকেটুর মনে হয়, ‘মোক ত যাবা নাগিবেই।’ জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে সে পরিষ্কার জানায় সে যাবে গৌরীহাট, অথচ তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে, মিছিলের সঙ্গে, আইন ভাঙাভাঙির সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। মিছিলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে, নিস্ক্রান্ত হওয়ার পথ খুঁজতে খুঁজতে গোটা দিনটাই কেটে যায়, রাত নামলে মিছিলশূন্য জোক্সময় পেরিয়ে চ্যারকেটু জোৎস্নাময় পাকা ধানখেতে ঢুকে পড়ে এবং দীর্ঘতর ক্ষুধার দিকে চলে যেতে থাকে।

এইভাবে আখ্যানে বর্ণিত গোটা দিনটি কেটে যায় একটা ক্ষুধার্ত পরিবারের খাদ্যের সন্ধানে, পরিণামে একটা কচু আর একটা কেশর ছাড়া কিছুই জোটে না, আর তাও জোটে কারও করুণাভিক্ষা করে নয়, টুলটুলির অত্যন্ত বিপজ্জনক চেষ্টায়। ক্ষুধা দিয়ে যে দিনের সূচনা হয়েছিল, আরও দীর্ঘতর ক্ষুধা দিয়ে সেই দিনের পরিসমাপ্তি হয়। ক্ষুধা ছাড়া এই মানুষগুলোর যেন আর কোনও পরিচয়পত্রই নেই, রাষ্ট্র ও তার আত্মপরিচয়ের কোনও লেবেল দিয়েই এদের শনাক্ত করা যায় না। যে ধানক্ষেতে তারা ফসল ফলায়, সেই ফসল বা জমির ওপর তাদের কোনও অধিকারই নেই, যে মিছিলে তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা হয়, তারা সেই মিছিলেরও কেউ নয়। ধানক্ষেত পাকা ধানে ভরে ওঠে, মিছিলে-শ্লোগানে প্রগতি-উন্নয়ন-পরিবর্তনের কথা শোনা যায়, কিন্তু এইসব মানুষের ক্ষুধা এক আবহমান শর্তের মতো অপরিবর্তিতই থেকে যায়। তাদের ক্ষুধানিবৃত্তির ন্যূনতম দায়িত্বও নেয় না রাষ্ট্র ও তার মিছিল-ধানক্ষেত। ওই ধানক্ষেত, ওই মিছিল হয়ে যায় রাষ্ট্রের বয়ানের অন্তর্ভুক্ত, আর অভুক্ত মানুষেরা থেকে যায় সেই বয়ানের বাইরে। তারা ধানক্ষেত ও মিছিলের সঙ্গে সহাবস্থান করে, কিন্তু সেই সহাবস্থান হয় সমান্তরালভাবে, ধানক্ষেত বা মিছিল কখনোই সেই মধ্যবর্তী দূরত্ব পেরিয়ে তাদের ক্ষুধানিবৃত্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনও ভূমিকাও গ্রহণ করে না। উপরিতল থেকে দেখলে সেই পাকা ধানে পরিপূর্ণ ধানক্ষেত ও জনতায় পরিপূর্ণ মিছিল রাষ্ট্রের প্রগতির স্মারক হয়ে থাকে, কিন্তু তলদেশে পড়ে থাকে শুধু অনিঃশেষ ক্ষুধার আখ্যান, যা পর্যাপ্ত খাদ্য ও সমবেদনার অভাবে সর্বদাই অমীমাংসিত থেকে যায়।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে থেতখেতু একসময় নিজের আত্মপরিচয় ঘোষণা করে, ‘মুই খেতখেতু রায়, স্যানং টাইমত খেতখেতু রায় বর্মন, বাপার নাম কান্দুরা, বুড়া বাপার নাম ভাদুরা, গ্রামসভা দ্বারিকামারি, অঞ্চল বাহাদুর, মৌজা বাহাদুর, পদ্মনাথের আধিয়ার আছিলো, ধর কেনে চারি পুরুষ, অ্যালায় মোর গিরি, গিরি না হয় গিরিনি, অ্যালায় মোর গিরিনির নাম…।’ খেতখেতু থেমে যায়, কারণ সে গিরিনির নাম জানে না, আর এইভাবেই তার আত্মপরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তখন সে তার পরিচয়ের ভুলটা থেকে পালাতে চায়। আমাদের মনে পড়ে ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসে বাঘারুর নাম জানতে চাওয়া হলে সে বলেছিল, ‘মোর নাম নাই রো।…গয়ানাথের নাম দেন কেনে।’ আধিয়ারের কোনও নাম নেই, জোতদারের বা গিরির নামেই তার নাম, ওইটাই রাষ্ট্রের সঙ্গে তার যোগসূত্র, কারণ গিরি রাষ্ট্রের মানুষ, আর আধিয়ার তার নিজের ইতিহাস ও ভূগোলে নির্বাসিত, যা রাষ্ট্রের বয়ানের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই কারণেই তিন পুরুষের আধিয়ার খেতখেতুকে তিন পুরুষের জোতদার, পরবর্তীকালে ‘যুক্তফ্রন্টের জোতদার’ নামে পরিচিত, রমণী পঞ্চায়েত অনায়াসে প্রমাণ করে দেয় যে খেতখেতু স্বয়ং এবং তার পরিবার আসলে পরদেশী, জমি-বাড়ির ওপর তার কোনও অধিকারই নেই, যেকোনো সময় সে জমি থেকে উচ্ছেদ হতে পারে। খেতখেতুর তখন মনে হয়, ‘পদ্মনাথ, অমনীকান্ত, নরেন সরকার সগায় এইঠেকার মানসি থাকি গেইল, আর মুই খেতখেতু হয়্যা গেইল বিদেশিয়া?’ পুরুষানুক্রমিক আকাশ মাথায় নিয়ে আদিগন্ত ধানক্ষেতের ভেতর পথভোলা এক বিদেশির মতো দাঁড়িয়ে থাকে খেতখেতু। খেতখেতুর কাছে রাষ্ট্রীয় পরিচয় যে কোনও পরিচয়ই নয়, যেকোনো সময় তাকে বিদেশি প্রতিপন্ন করা যায়, যে বিদেশ আবার কোনও রাষ্ট্রের অন্তর্গত নয়, যে বিদেশ নিজের ইতিহাস, ভূগোল ও ক্ষুধা নিয়ে নির্বাসিত, প্রান্তিকায়িত তা আবারও প্রতিপন্ন হয় এই ঘটনায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *