গণতন্ত্র ও আমরা

কাজল সেন

মাঝেমাঝেই একটা প্রশ্ন আমার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, আমাদের দেশের ভোট বা নির্বাচন করা হয় গণতন্ত্রের জন্য? নাকি ভোটের জন্যই কায়েম করা হয়েছে গণতন্ত্র? আমার জন্ম ভারত স্বাধীন হবার বছর কয়েক পরে। জন্মের পরে যখন থেকে আমার চারপাশটা জানতে ও চিনতে শিখেছি, তখন থেকে প্রতি পাঁচ বছরে বিধানসভা ও লোকসভার জন্য নির্বাচন হতে দেখে আসছি। একটা সময়ে অবশ্য পাঁচবছর হবার আগেই তৎকালীন লোকসভা বা বিধানসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন হতেও দেখেছি। শুনে আসছি, দেশের সাধারণ নাগরিকেরা ভোটের মাধ্যমে লোকসভায় ও রাজ্যসভায় তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে থাকে। প্রতিনিধিদের কাজ দেশের তথা রাজ্যের মানুষের সেবা করা। আমার সেই ছোটবেলায় যেহেতু রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ছিল কম, তাই ভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির নিজেদের মধ্যে বিরুদ্ধতা থাকলেও তারা এমন কোনও আচরণ করত না, যাতে অন্য দলকে অবমাননা করা হয়। প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যেও ছিল না কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কাদা ছোড়াছুড়ি। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, দেশের স্বাধীনতার বয়স যত বেড়েছে, ততই প্রকট হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার নামে উৎশৃঙ্খলার এক বীভৎস উল্লাস। এখন সেই পুরনো ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলির ঘোষিত নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচি যাই থাক না কেন, তাদের আচরণে ও কার্যক্ষেত্রে সেই নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচির ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক দলগুলির অধিকাংশ সদস্যদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে ব্যক্তিগত সততা এবং আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা। স্বাভাবিক কারণেই, দেশের সাধারণ নাগরিকেরা এদের সন্দেহের চোখে দেখে এবং কোনওভাবেই আস্থা রাখতে পারে না তাদের ওপর। একটা সময় ছিল, নীতি ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষেরা রাজনৈতিক দলে যোগদান করত। ইদানীং ব্যাপারটা উল্টো হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষের আকাল পড়েছে যেন রাজনৈতিক দলগুলিতে। বরং সেখানে ক্রমশ ভিড় জমিয়েছে বিভিন্ন ধান্দাবাজ ও কায়েমি স্বার্থের মানুষজন। আর তাই গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতা দখলের জন্য ব্যবস্থাটাই ভোটকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা গণতন্ত্রের প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

আরও পড়ুন: রোগ এবং রোগমুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ

পৃথিবীজুড়ে এখনও চলেছে করোনা ভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ। অসংখ্য মানুষের প্রতিদিন মৃত্যু ঘটে চলেছে সেই সংক্রমণে। অসহায় মানুষ নিজেদের বাঁচানোর যাবতীয় সাবধানতা অবলম্বন করেও বেঁচে থাকতে পারছে না। একে একে তাদের অনেককেই শামিল হতে হচ্ছে সেই মৃত্যুমিছিলে। কেউ কেউ বলে থাকে, সাধারণ মানুষেরা ততটা সচেতন ও সাবধানী নয়, তাই একদিকে যেমন মাস্ক সবসময় ব্যবহার করছে না, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, কথাটার মধ্যে আংশিক সত্যতা আছে। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও উল্লেখ করা দরকার, সম্প্রতি গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিভিন্ন রাজ্যে যে ভোট উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল, তা কি পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের সেই সচেতনতা ও সাবধানতা থেকে বিচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট নয়? প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রচারে, মিছিলে, জনসভায় যেভাবে সাধারণ মানুষকে শামিল করে তাদের সাংঘাতিক বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার জন্য দায়ী কারা? অবশ্যই দায়ী সব রাজনৈতিক দলগুলো, যারা ক্ষমতা দখলের মত্ততায় মানুষকে মারাত্মক সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিতে পারে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস আঙুল তুলেছেন নির্বাচন কমিশনের দিকে। কেন তারা এই ভোটকে কেন্দ্র করে মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল! নির্বাচন কমিশন অবশ্য তাদের দায় ঝেড়ে ফেলেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলে মানুষের মৃত্যুকে কখনও রোধ করা যায় না। আর মানুষই যদি জীবিত ও সুরক্ষিত না থাকে, তবে কীসের নির্বাচন আর কীসের গণতন্ত্র?

আরও পড়ুন: একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

কৌতুকের সঙ্গে ইদানীং আর একটা ব্যাপার লক্ষ করি, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে অনেকেই এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগদান করছে, যাদের রাজনীতির সঙ্গে এর আগে আদৌ কোনও ধারণা ছিল না এবং কোনও রাজনীতিগত আদর্শেও তারা বিশ্বাসী ছিল না। এদের রাজনীতিতে যোগদান করার একটাই মূল লক্ষ্য, বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের জন্য দলের টিকিট পাওয়া। যে দলে টিকিটের আশায় তারা এসেছে, সেই দল যদি টিকিট না দেয়, তাহলে তারা বিপক্ষ দলে চলে যায়। অর্থাৎ দলের টিকিট পাওয়াটাই একমাত্র উদ্দেশ্য, সেই দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। মজার কথা হচ্ছে, এরা সবাই বলে, তারা নাকি দেশের এবং মানুষের সেবা করার জন্যই রাজনীতিতে এসেছে। আমরা সাধারণ মানুষেরা জানি, এইসব কথা শুধুমাত্র হাস্যকর নয় বরং বিশাল ধাপ্পা। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে যারা প্রার্থী হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজন এই করোনা সংক্রমণের সময়ে কতজন রোগাক্রান্ত মানুষের সেবায় অবতীর্ণ হয়েছে, তার তালিকা কেউ দিতে পারবে? না, তা সম্ভব নয়, কেন-না সেবার আদর্শে তারা কেউই অনুপ্রাণিত নয়। এবং এটা শুধু মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, একইসঙ্গে গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *