দেশান্তরের লিপি

পৌষালী চক্রবর্তী

দেশান্তরের লিপি

বেনাপোল পেরোনোর সময় ঠাকুমার আঁচলে বাঁধা ছিল তিনটে নিমফলের বীজ
আর কোমল বুকের ওমে ঢেকে রাখা পিতলের শক্ত গোপাল; কাঁধে সামান্য সংসার, পেটে এক মানবক ভ্রূণ
সীমান্তে তার সধবাবেলার তোরঙ্গ সমেত বিয়ের বেনারসি হারিয়ে গেলেও
রাষ্ট্রের উদ্যত রাইফেল আর শকুন-দৃষ্টি এড়িয়ে নীমবিজ, পিতল-গোপাল আর ভ্রূণ পৌঁছেছিল
শিরাকোল খালপাড়ে কচা বেড়ার ঘরে

আর কিশোরী বড়পিসিমার হাতে করে এসেছিল
সৈয়দ চাচার ছেলের আঁকড়ে ধরে থাকা হাতের গন্ধ

রাতের অন্ধকারে তারা নিঃসারে ঠাকুমাদের নৌকা পার করে দিয়েছিল।

সীমান্ত পেরোনোর ধকল আমার নরম-সরম, বোকাসোকা, ইস্কুল মাস্টার ঠাকুরদা নিতে পারেনি

একদিন স্বপ্নে দেখল মা কালী তাকে কোলে নিয়ে পাহাড় ডিঙোচ্ছে।

ব্যস! তারপর আর ক’দিন মাত্র প্রাণবায়ু ছিল

ঠাকুমা এখন সেলাই শেখায়।

একফোঁড়ে তোলে সধবাবেলা, ফিরতে ফোঁড়ে ফুটে ওঠে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা নিমগাছের ফুল

আগে খুব উলকাঁটা বুনত
কিন্তু এখন এত ঘর পড়ে যায়, যে কোনও প্যাটার্ন ওঠেই না।

খালপাড়ে নিমগাছ ফড়ফড়িয়ে বাড়ে
তাতে রোদ পড়লে ঠাকুমার কেবলই মনে হয় যশোরের আকাশেও বুঝি আজ এমন রোদ…

আর আইবুড়ো বড়পিসিমা হাতে শুধুই লেবুপাতা ডলে যায়
সৈয়দ চাচার ছেলের আঁকড়ে ধরা হাতের স্পর্শ, গন্ধ তুলে দেবে বলে।

আরও পড়ুন: চন্দ্রাহত

ছিটমহলের ছেলেমেয়েরা

আমাদের কাগজ একদেশের আর
পায়ের তলায় যে জমি তার মালিকানা অন্য আরেক দেশের
আমরা জানি না কবে আমাদের স্বাধীনতা দিবস
কোন দেশের পতাকা তুলতে হবে উদ্‌যাপনের দিনে
তবুও এখানে কিছু চোরাগোপ্তা স্বাধীনতা আছে
নিষ্কর জমি জুড়ে গাঁজা চাষ, তামাক পাতা আর হ্যাঁ ধানমাঠও আছে।

আমাদের কাঁটতার আছে,
গতিবিধির ওপর রাষ্ট্রদের, হ্যাঁ রাষ্ট্রদের, লালচোখও আছে
কিন্তু বিবাদ মীমাংসার জন্য, সমস্যা সমাধানের জন্য
কোনও থানা, পুলিশ, প্রশাসন নেই

আমাদের আসলে কোথাও যাওয়ার নেই,
কোথাও বসার নেই
আমাদের অঙ্ক কষার কোনও সূত্রও নেই।

তাই তোমার সকাল আর আমার সকাল কি এক হতে পারে?

তোমরা কাঁটাতার পেরিয়ে দেশভ্রমণে যেতে পারো
আমাদের বাপ ঠাকুরদারা দোকান করতেও যেতে পারত না।

তোমরা কাঁটাতারে কাঁটাতারে কবিতা টাঙাও
সীমান্তরক্ষীর হাতে রাখী বেঁধে দাও
মাঝেমাঝে এসে আমাদের ইন্টারভিউ নিয়েও যাও।

আজব দেশের আজব চিড়িয়া আমরা
পায়ের তলায় আসলে জল আমাদের
আমাদের সুখ দুঃখের কথা নিয়ে সিনেমা, সাহিত্য হয়

আর আমাদের বিষণ্ণতার
পোশাকি উপশমের নাম দেওয়া হয় ‘রাষ্ট্রহীনতা’

তবে যারা এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে জীবনে বড় হতে পারে
ভুলেও কখনও আর উচ্চারণ করেনি

বাপপিতেমোর আমল থেকে তাদের পিঠে খোদাই করা পরিচয়পত্র

‘ছিটের লোক’

আরও পড়ুন: যে জীবন হরবোলা

ডাকনাম ১৫ আগস্ট?

অমিতাভ, আজ আড়াই হাজার বছরের পর
তোমার বোধির থেকে বহুদূরে
ল্যান্ডমাইনের সীমানায় সীমানায়
প্রজাপতি স্বপ্ন চোখে ফুটপাথে ঘুমিয়েছে
যে মেয়েটি অনাথ
ঘুড়ি আটকানো চোখে স্কুলছুট
যে ছেলেটি গোলাপগুচ্ছ; ট্রাফিক পেরোয়
পড়শির সাথে মেয়ে বহুক্রোশ হাঁটে
মরুদেশে বালি খুঁড়ে জল নেবে বলে
আর যে ছেলেটি রোজ দেখে দোর দেয় মা
বেশ্যাপাড়ার সেই ধুলোখেলা উঠোনের থেকে
সীমান্ত কতখানি?
কতদূরে হারিয়েছে বাবা?
জিজ্ঞেস করা মেয়ে কাশ্মীর নামে
যে কিশোরী, কাঁখে ভাই ইটভাঁটা আঁচ

তবুও মুখের হাসি
অমলিন, তার ডাকনাম ১৫ আগস্ট?

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *