দিশি পুজো, বিলিতি হ্যালোইন (নিউ জার্সি, আমেরিকা)

নবনীতা সেন

মৃদু হাওয়ায় ঝরাপাতারা এলিয়ে পড়ছে সবুজ খামের ঘাসে। দক্ষিণায়ণে বিকেলের আলো শীর্ণ হয়ে এসেছে হলুদ কোনও ফুলের ঝোপে, সবুজ ওকগাছের পাতায় বাদামি রঙে আসন্ন হেমন্তের আভাস। গাছের নিচে, বাগানে, বারান্দায় কমলা কুমড়ো বসানো। কোনও কোনও কুমড়োর ভিতরে জ্বলছে ছোট্ট মোম, কোনওটায় কিম্ভুতকিমাকার নকশা কাটা। কোথাও মেপেল গাছ থেকে হাওয়ায় ঝুলছে খড়-কাপড়ে বোনা পুতুল, দরজায় মাকড়সার জাল, জানলার কাচে ঝুলন্ত কঙ্কাল। ঘরে টিমটিমে আলো। হিমমাখা বাতাস। গোটা অক্টোবর জুড়ে মার্কিনদেশ ভোল বদলে হয়ে ওঠে ভূতেদের সাম্রাজ্য। সৌজন্য হ্যালোইন।

আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের চন্দনকেয়ারির কুরমিটোলার দুর্গাপুজো

ছবি: লেখক

অথচ দেশের রাজ্যপাটে মহালয়ার পর থেকেই শরতের আদুরে রোদ। বাড়ির গাছের মাধবীলতা আরও সজীব হয়ে উঠেছে মেঘের রঙে। শ্বেতকাঞ্চন ফুটেছে। পেতলের সাজি ভরে নয়নতারা, টগর, জবা, তিন শীষওয়ালা দূর্বার সঙ্গে রোজকার পুজোর সিংহাসন সেজে উঠছে শিশিরছোঁয়া শিউলিতে। নাড়ুর জন্য গুড়ের পাক আর নিমকিভাজা চলছে হেঁশেলে। সঙ্গে পাড়ায় নতুন প্যান্ডেল, বাঁশ, কাঠের কারুশিল্প, সন্ধেবেলায় রাস্তায় আলোর রোশনাই, উপচে পড়া ভিড়।

আরও পড়ুন: মন্দির বানিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় রেল, দেড়শতাধিক বছর ধরে সেখানেই আরাধ্য দুর্গাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

ছবি: লেখক

নিউ জার্সিতে ‘কল্লোল’, ‘উৎসব’, ‘ভারত সেবাশ্রম সংঘ’ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি দুর্গাপুজো হয়। বেশিরভাগ পুজো আয়োজিত হয় শনি-রবিবার দেখে। এ-বছর অবশ্য সমস্ত পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীর সংখ্যা এবং দর্শনের সময় সীমিত। বাইরে থেকে মণ্ডপশিল্প চোখে না পড়লেও ভিতরে ঢুকলেই প্রবাসী চোখে ঝলমল করে ওঠে নীল রোদ্দুর। শাশ্বত মায়ের মুখ, শরতের শুভ্র পদ্মশিশিরের মতো মমতা মাখানো, কুশাগ্রে জাগ্রত ত্রিনয়ন। কানে ঢাকের বাদ্যি, কাসরের সঙ্গত। ধূপ, দীপ, বেলপাতা, পদ্ম, পান-সুপারি, দর্পণ, কাজললতায় সাজানো চিরাচরিত বরণডালা, মাটির রঙিন কোল সরা। সম্মুখে করজোড়ে আমরা।

আরও পড়ুন: নারায়ণপুরের সরকার বাড়ির দুর্গার চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি

ছবি: লেখক

মার্কিনমুলুকে কলাবউ আসে লাল ঘোমটা মাথায়। এই কলাবউ আসলে ন’টা শিকড়সহ উদ্ভিদ— কচু, হলুদ, জয়ন্তী, ডালিম, বেল, অশোক, মান, ধানসহ কলাগাছকে অপরাজিতার লতা দিয়ে একত্রে বাঁধা, গোটা বেলসমেত। তাই একে বলে নবপত্রিকা। দুর্গার নয় শক্তিরূপের সঙ্গে জড়িত শস্যরূপ। যেমন— ধানগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীরূপা, কচুগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকা। দুর্গোৎসব কেবল আমাদের প্রাণের উৎসবই নয়, শস্যেরও উদ্‌যাপন। দুর্গমাসুর বধের সময় দেবী শাকম্ভরী রূপে ধরিত্রীকে শাকান্নে ভরিয়ে তুলেছিলেন। এইখানে আশ্চর্য এক মিল আছে হ্যালোইনের সঙ্গে। যতই ভূতেদের উৎসব আর খুদেদের ‘ট্রিক অ্যান্ড ট্রিট’ হোক না কেন, হ্যালোইনের আদি উৎস কেলটিক জাতির শস্য উৎসব। বহু প্রাচীনকাল থেকেই আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডসহ ইউরোপে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রাচীন এবং মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভূত সেজে একে অপরকে চমকে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সঙ্গে খানাপিনা, আমোদ-প্রমোদের মাধ্যমে পয়লা নভেম্বর নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। এইসময় বাগান ভরে ওঠে টুকটুকে আপেলে, আপেলের দেবী হলেন ‘পোমোনা’। ক্ষেত ভরে ওঠে হালকা বেগুনিরঙা শালগম, ফলন্ত ভুট্টার ভারে। এইসমস্ত শস্য উদ্‌যাপিত হয় উৎসবে। কুমড়ো হল আমেরিকার প্রাচীন একটি সবজি, তারসঙ্গে খ্রিস্টধর্মের ‘অল সেন্টস ডে’ মিলিয়ে হ্যালোইন উৎসব। এদেশে দিগন্তবিস্তৃত কমলা কুমড়োর সারি দেখে মনে পড়ে শরতে গ্রামবাংলায় ঢেউখেলানো হাওয়ায় আমনধানের শীষ। রবি ঠাকুর শরৎকে বলেছেন ‘শারদলক্ষ্মী’। এরপরেই রবিশস্য বোনা হবে, শীতের মিঠে হাওয়ায় রস জমা হবে খেজুর গাছে। অবাক হই, শান্তিও পাই যখন দেখি, দেশে দেশে উৎসবের ঋতুর বহিরঙ্গ ছন্দে বৈচিত্র্য থাকলেও অন্ত্যমিল আছে গভীরে।

আরও পড়ুন: ঔষধি গাছে ঘেরা ঝাড়গ্রামের কনক দুর্গা

ছবি: লেখক

এখানে প্রতিমার নিরঞ্জন হয় না, একই মায়ের মূর্তি পুজো করা হয় বহুবছর ধরে। পূজার পরে সযত্নে রক্ষিত হয় মূর্তি, পরের বছরের জন্য। কেবল বদলে যায় মণ্ডপসজ্জা, কখনও বা প্রতিমার সাজসজ্জা। তাই বিসর্জন হয় দর্পণে। তারপর ঘট তুলে সিঁদুরখেলা। দু’দিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরা। কেমন বিষাদ বয়ে আনে প্রতিবারের মতো। তবু সব শেষে ঋতুপরিবর্তন সবচেয়ে বড় সত্যি। বাড়ির সামনের বনস্থালীর গায়ে মেঘেদের ছায়া-রোদ চলেছে। শরতের রোদ হেমন্তে আরও ম্লান হয়ে উঠবে, তারপর ক্রমশ ক্ষীণধারা হয়ে শীত আসবে গড়িয়ে। এরপর প্রতীক্ষা বসন্তের, রোগমুক্ত পৃথিবীতে পরবর্তী উৎসবের।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Goutam Chattopadhyay

    একেবারে অন্য স্বাদ দুই ভূখণ্ডের উৎসবে, বিবরণের আর প্রিয়তার। আপনার লেখা পড়ে আবার আপ্লুত।

  • Goutam Chattopadhyay

    নবনীতা, আপনার লেখা আমাকে মানসভ্রমণে নিয়ে যায়।
    প্রচ্ছদচিত্র দেখে আমার মানসপুত্র আমাকে জানাল ভাটার মত জ্বলন্ত চোখগুলোকে নাকি Jack O’ Lantern বলে!
    আমার মনে হচ্ছিল ভূতচতুর্দশীর পূর্বপথিক এই হ্যালোউইন!
    কি ভালো কি ভালো!
    আমাদের সমৃদ্ধ করুন আপনার প্রবাস অভিজ্ঞতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *