দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘জন্মান্তর পেরিয়ে অলৌকিক জন্ম’

ধীমান ব্রহ্মচারী

গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ছোট্ট একটা কবিতার বই নাম, ‘অলৌকিক জন্ম’। না, এটাকে সংকলন বলা যাবে না। একটা প্রবাহ বা স্রোত ধারাবাহিকভাবে পাঠককের মনে গভীরভাবে অনুরণিত হবে। সেইসঙ্গে একটা স্পন্দন। যে স্পন্দন পাঠককে নিয়ে যায় মোহর উন্মাদনায়। কবির ভাষায়:

‘এবার দীর্ঘতর অন্ধকার খুঁজে নেব

আলোর বুক থেকে

খুলে দেব সব অন্তর্বাস’    —(প্রেম)

আরও পড়ুন: অমৃতের সন্ধান ও অমৃতলাল পাড়ুই

কবির কল্পনা আমাদের কত কী ভাবায়। হয়তো এমন কিছু অনুভূতি বা স্পন্দন যা সবসময়ই আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু অনুভূতির উচ্চতা আমাদের কবির কল্পনার কাছে নিয়ে যেতে অনেকসময় অক্ষম করে তোলে। জন্ম পক্রিয়া এই ব্যাপারটায় একটা আশ্চর্যের। মাতৃগর্ভে আমাদের জীবন অস্তিত্ব স্পন্দিত হওয়াটাই একটা বিরাট সত্য ও উপলব্ধির ইতিকথা যেন। এই গর্ভেই জন্ম নেয় কোনও শৈশব। কোনও অপরিসীম ঔরস। যা কোনও প্রেমের মধ্যে দিয়েই প্রেরিত হয়। সেই ঔরস কথা বলে জন্মান্তরের মধ্যে দিয়ে:

‘একটি কথা আজও বিঁধে আছে বুকে

তোমাকেই দেখাব তার দহন

কতবার চেষ্টা করেছি উপড়ে দেবার!

এই শরীরে তবু থেকে গেল বিষ

সেই মাতৃগর্ভ থেকে আমার চিৎকার

আজকেও নিসঙ্গ ঝড়…’   —(দহন)

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

বইটার পাঁচ নম্বর কবিতা এটা। এখানে নরনারীর কাঙ্ক্ষিত প্রেমের আবেদন। কিন্তু এই আবেদন একান্তই সরাসরি নয়। তা অনেকটা দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা। এখানে একটা শব্দ ‘বিষ’। এই বিষই তো পরম প্রেমিকের সম্পদ। এই বিষ ওরফে ‘ঔরস’। যা থেকে জন্ম নেবে একটা শিশু। একটা প্রতিবাদ। একটা রক্তাক্ত ফেনিল আবরণ কাটিয়ে স্তরে স্তরে নির্মাণ হবে শরীর একটা নির্জন গর্ভে। কবি খুব সুন্দর ভাবেই এই নির্জনতার এই মনুষ্য মাতৃগর্ভ অর্থাৎ আরও একটা অপার ব্রহ্মের কথা স্মরণ করেছেন। সারা বই জুড়েই রয়েছে দহন-প্রেম-স্মৃতি-দায়বদ্ধতা-ঋণ-অভিমান। আমাদের চলার পথেই আমরা পাই যেসব স্মৃতি ছবি ও সম্পদ। কবির কাছে এসব যেন অনেক মূল্যবান। স্মৃতির স্তরেই থাকে তাঁর অনুভূতির কথা:

‘আমাদের যাবতীয় মেঘ

জানালায় আটকে গ্যাছে কবে’ (বৃষ্টিদাগ)

আরও পড়ুন­: ‘হাফ কিউসেক’-এই হারিয়ে যাওয়া কিন্তু নিছকই একটা পর্যায়ে নয়, একটা গ্যালন গ্যালন

আমার খুব সাধারণ চিন্তায় এই শব্দ প্রয়োগ অনুযায়ী যদি দেখি, দেখব মেঘ মাত্রই তা উন্মুক্ততা। অবাধ বিচরণ করে করে যায় পৃথিবীর ওপর দিয়ে। সময়ে সময়ে জলকণার মতো ঝরে পড়ে পৃথিবীর বুকে। নবজাতকের পূর্ণতা পায় মাটির ফসল। এই মেঘ কিন্তু আজ আর মুক্ত নেই। সেই যেন জানালার সীমারেখা বরাবর আটকে গেছে। সেই ওটুকুই দেখা যায়, যতটুকু দেখা যায় খোলা চোখ দিয়ে। অর্থাৎ আমাদের দেখার চোখও যেন কোথাও নিজের মতো করে ছোট্ট সাম্রাজ্যের মধ্যেই ফেরি হয়ে ঘুরছে যেন।

আবার এই বইয়ের আরও একটা কবিতা ‘যন্ত্রণা’। একটু দেখি।

‘এক একটা বিকেল মায়াবী হয়ে যায়

উপোসী শরীর সহবাস খোঁজে

তোমার খেয়ালিপ্রেমে

সবকিছু পরাজয়…

এক একটা জীবন তবু নির্বাসিত হয়

হাঁটতে থাকি ছায়াপথ ধরে

প্রিয়তম নদী সরে যায় দূরে

যন্ত্রণা- অভ্যেস হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন: কবি অয়ন চৌধুরীর দেওয়া মহাবিষপানেই আমাদের মৃত্যুর প্রবাহ অপার অন্তরীক্ষে, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ!’

প্রথমেই বলি পুরো কবিতাটা না দিয়ে, এখানে কিছুটা তুলে আনলাম। আসলে এই কবিতার মধ্যে দিয়ে কবির এত বছরের সফর। তিলে তিলে নিজেকে অন্যভাবে সজ্জিত করে ফেলে আমাদের প্রেম, প্রত্যাশা আর অভিঘাত। আমরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে উঠি। নিজেদের মতো করেই হারিয়ে যায় কালের কাছে। আমাদের পাড়ার সেই কল। সেই কোলে বাসন মাজতে আসা ওবাড়ির কৃষ্ণাদি। বেপাড়ার সুবলদা প্রায় আসে দু’টো বড় বড় বোতল নিয়ে জল ভরে নিয়ে যায়। পাড়ার সুটার চায়ের দোকানের জল প্রতিদিন এসে নালায় জমা হয়। মাছি বসে। মশা ডিম পাড়ে। ঠিক তেমনভাবেই আমাদের বিকেলে যেন পার হয়ে যায়। সারা দুপুর রোদে ঝলসে ওঠে। নির্বাসিত জীবনের পথ ধরে কেউ খোঁজে ছায়াপথ। আমাদের সম্পর্ক কোথাও যেন হারিয়ে যেতে থাকে আমাদের অচৈতন্যতায়। আমাদের চোখ খোলার পর দেখি এই বিশ্ব জগৎ কতটা মায়ার। কতটা অবিরাম জ্বলতে থাকা অঙ্গার। কতটা নিদারুণ তপস্যা। সেই প্রেয়সী হারিয়ে যায়। দূরে সরে যায় একটু একটু করে, যেভাবে নদী সরে যায় কালের নিয়মানুযায়ী। শুধুই পড়ে থাকে যন্ত্রণা। পড়ে থাকে সংগোপনে থাকা কান্নার স্বর। এই যন্ত্রণা বলার নয়। এই যন্ত্রণা কোথাও যেন আমাদের সবারই অভ্যেসের।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

2 comments

  • বিষ্ণু চক্রবর্তী

    কবিতার বই টা পড়ার ইচ্ছে রইলো। আলোচনা যথেষ্ট ভালো লেগেছে। ক

  • রবীন বসু

    সুন্দর আলোচনা। কবি ও আলোচককে অভিনন্দন জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *