দেবী যাক বিসর্জনে

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

“ডম্বরু গুরু গুরু ঐ শোনা যায় / ভোলানাথ এলো বুঝি নিতে গিরিজায়” ফিল্ম (জয়া)-এর এই গানও যেন কি করে উমা আগমনের গান হয়ে গেছে! উমা এসেছে পিত্রালয়ে, উষ্ণ মহেশ্বরের কি আর তর সয়! সেও ভাবছে ভাদর আশ্বিন মাসে / ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে / আর না থাকিও বাপের ঘরে / বধূ হে!”

গিরিজায়া চৌদোলার ক্যারাভান সাজিয়ে এসে দাঁড়াবে সাগর / গঙ্গা / চূর্ণি / অখ্যাত কোনও জাম্পুই-এর ধারে আর ভুস করে তারা ডুব দেবে আরেক উচ্চতার অনুসন্ধানে।

আরও পড়ুন: বোলপুরের অনতিদূরে সেরান্দী গ্রামের পটের দুর্গাপুজো যেন এক জাঁকহীন জৌলুস

‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে তুমি হে ভারতবর্ষ’ বলার অর্থ সেই বৈপরীত্যকে সমদীপ্ত করা, স্মরণ করানো সুনীল সাগর মন্থন করেই যে হিমালয় পর্বতশ্রেণির মহা অভ্যুত্থান! তাই বুঝি বাংলার গৌরী গিরিজা রূপ পরিগ্রহের আগে  আশিরনখর জলে ডুব দেয়!

সেই ছবি এই তো সেদিনের যেন! কত আর হবে— ৪২ বছর আগে আলো ঝলমল জুহু বিচ, এক দশমীর বিকেল থেকে রাত। জুহু মানেই মওজমস্তি, মহামেলা, আনন্দ আর আনন্দ!

আরও পড়ুন: কোন্ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র…

ছবি: ইন্টারনেট

কিন্তু বাঙালির দশমীতে কয়েক ঘণ্টা সারাটা বিচ প্রতিমা নিরঞ্জনের ডাইভিং বোর্ড যেন! আসছে একেকটা দল, রাশভারী সাজা পুরুষেরা শেরওয়ানি সামলাতে ব্যস্ত, মহিলাগণ দ্বিতীয় পর্বের সিঁদুরখেলায় মত্ত।

দামাল যৌবন লুকিয়ে চুরিয়ে দাঁত দিয়ে খুলে ফেলছে ‘খাজুরাহো’ অথবা ‘কিংফিশার’ ল্যাগার বীয়র, না পেলে ‘লন্ডন’ পিলসনার বীয়রের বোতল। হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে বোতলগুলোকেই প্রথম ভাসান দিচ্ছে সাগরের জলে। আরেকটু বেপরোয়া যুবকেরা স্বস্তি নিচ্ছে কাঁচ্চা ‘রোজা রাম’-এর কিক-এ অথবা চরস-এর হাতেহাতে ভ্রাম্যমাণ বাট-এ! এমনকী দলছুট কামুকের চোখ ঠিক খুঁজে পায় আলো আঁধারি কোনও কোনায় কুইকি-সেক্স!

আরও পড়ুন: ৭৭ বছর পরেও আলোচনার বৃত্তে নেই রানি অফ ঝাঁসি ব্রিগেড

এখনও দীপ্যমান স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় যে, বালুচরে সাতপাক ঘুরিয়ে প্রবাসী পুত্রকন্যারা তাদের মাকে ছেড়ে আসে চড়ায়, শুধু ঘট-আমপাতা-ডাব আর ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে আসে সাগরজলে সিনান করে!

বাংলার ধর্মবিলাসী মানুষজন একটা দিন-রাত নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখেন এই লীলা। তাঁরা ডুবকে বলেন ভাসান অথবা নিরঞ্জন কিংবা বিসর্জন। সাতপাকে বিবাহ পাকা, সাতপাকে বিদায় পাকানো হয়! নদীতে ছুড়ে ফেলা হয় কেমিক্যাল রং, খড়মাটি, ধাতবাস্ত্র। নদীর দফারফা হয় হোক, তবু ধর্মবিলাস তো বজায় থাকুক!

হিমেল বিকেল থেকে সন্ধ্যাঘুমের অভ্যাস ভোলানো গভীর রাত পর্যন্ত উত্তরের এক গঞ্জের কোনও এক অগভীর, নুড়িভরা, খালসদৃশ জাম্পুই-এর পাড়ে বিসর্জনের ঢাক অবিরাম বাজতেই থাকে, পটকা ফাটতেই থাকে নির্ভাবনায়।

আরও পড়ুন: মেয়েটি আমার হৃদয়জুড়ে শিউলি ফুটিয়েছে

কামাখ্যাগুড়ি। ছবি: রুমা দেবনাথ

কামাখ্যাগুড়ি হাইস্কুলের বিশাল খেলার মাঠ জুড়ে বসেছে দশমীর মেলা। ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক  থেকে নির্গত আলিপুরদুয়ারের সঙ্গে সংযোগবহ গ্রামীণ রিং-রোডে সার দিয়ে নাচানাচি করছে লরিভরা নারী-পুরুষ, আলো আর বাদ্যি। মাইকে ললিত অথবা ধমক কণ্ঠে ঘোষিত হচ্ছে মাঠে প্রবেশের আহ্বান। রাস্তার কণ্ঠলগ্ন দিকটায় মাঠের দীঘল প্রস্থ জুড়ে একেক পল্লির ‘ঠাকুরানী’ দাঁড়িয়ে আছে তার ছানা পোনা সহ। দেবতাদেরই মনোরঞ্জনের জন্য বাজছে তাসা, গলায় ঢালা হচ্ছে ভোটাং থেকে চোরা পথে আনা ‘চ্যাংটা’!

ছবি: রুমা দেবনাথ

আহা, সুন্দরী কন্যাগুলো কত নির্ভয়ে হেঁটে যাচ্ছে, নেচে যাচ্ছে প্রাণের মিছিলে! ছেলেরা পৃথকভাবে নেচে যাচ্ছে, তাদের মৃদু  গালাগাল— গ্রাম্য রসিকতা সব ভেসে আসছে আমাদের কানে; কিন্তু চোখে পড়ছে না মেয়েদের গায়ে ঢলে পড়া অথবা কু-ইঙ্গিত ছোড়া।

ছবি: রুমা দেবনাথ

তারা চলেছে নদীর পানে যাকে ওরা জাম্পুই বলে। ৪ দশক আগে ওপারের গ্রাম থেকে এপারের হাটে, ইস্কুলে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার জন্য বর্ষায় ভরসা ছিল একটা সরু বাঁশের সাঁকো। এখন সেখানে পাকা সেতু। সেই সেতু দিয়ে এ’পাড়ের ঠাকুরবাহিনী বিসর্জন নিতে যায় ওপাড়ের গ্রামের ঘাটে।

কামাখ্যাগুড়িতে বাঁশের ঢালে ভাসান। ছবি: রুমা দেবনাথ

অহো, এ কী বিস্ময়! এই আধুনিক যুগে এসেও ওরা এখনও কত্ত পিছিয়ে! গ্রামে অঢেল তল্লা বাঁশ, ঝাড় থেকে প্রচুর কাঁচা বাঁশ কেটে একটার সঙ্গে আর-একটার ডগার দিকে শক্তবাঁধন দিয়ে লম্বাই বাড়ানো হয়েছে। এমন অনেকগুলি বাঁশজোড় বিছিয়ে রাখা হয়েছে উঁচু পাড় থেকে ঢালুতে নদীর গর্ভে।

প্রতিমা আসছে একেকটা, চড়ানো হচ্ছে বাঁশের মাচানে, মূর্তির দুই প্রান্ত ও পেছন থেকে শক্ত করে বাঁধা দড়িতে টান দিলেই তারা গড়গড় ক’রে জলে ঝপাং। পাড় থেকে ছুড়ে দেওয়া দড়ির খেই ধরে টেনে সরিয়ে দিচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকের দল।

পাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার চেষ্টা ভুলে ভাবতে হচ্ছিল আহা, ওসব লোহার খাঁচা, রেল, পুশার না বানিয়ে যদি এমন বানানো হ’ত বাংলার সর্বত্র— তাহলে তো নদীপাড়ের সৌন্দর্যে স্থায়ী আঘাত পড়ত না এবং  অনায়াসে বিপত্তিহীন ভাসান সমাপন হ’ত! গ্রামীণ মানুষ কিছু বাঁশ বিক্রি ক’রে উপার্জন করতে পারত! আবার বিসর্জনের পরে বাঁশগুলো অন্য কাজেও ব্যবহার হতে পারত!

আমার দৌড় এসে থামছে রানাঘাটের চাঁদনি (হ্যাপি ক্লাব / বড়বাজার মাঠ নামে পরিচিত) মাঠে। এই মাঠ-সংলগ্ন চূর্ণি নদীর ঘাটে যে ভাসান হ’ত তা ছিল নয়নাভিরাম। বছর কয়েক আগে অসহ্য প্রযুক্তি এসে ঢেকে দিয়েছে ঐতিহ্যকে।

রানাঘাটে ভাসান যন্ত্র

দুপুরে দুই নৌকায় পা রেখেই যেন দেবী যেতেন বিসর্জনে। পালচৌধুরী বাড়ির দেবী নিরঞ্জনের পর একে একে বালুচরে এসে দাঁড়াত অন্য বাড়ির, পল্লির মূর্তিগুলো।

This image has an empty alt attribute; its file name is 6-4-1024x711.jpg

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে মন্দমন্থরে, হাজার হাজার দর্শক জড়ো হতেন এই ভাসান দেখবেন বলে। শুধু এই ভাসান দেখার জন্যেই দূরদূরান্ত থেকে দর্শক আসতেন, আত্মীয়ের ভিড় লেগে থাকত প্রায় প্রতিটি পরিবারে। নদীতে নৌকার ভিড় জমে যেত, নৌভ্রমণ করতে করতে ভাসান দেখতেন শৌখিন মানুষজন।

বিশাল মাঠের এক পাশে হরেক জিনিসের মেলা, ও আরেক পাশে বড়সড় চৌকো এরেনা করা থাকত ‘মকফাইট’ মানে বাজি পোড়ানোর জন্যে। নানা বয়সের ছেলে-মেয়েরা ওই এরেনা থেকে নানা দিকে উড়িয়ে দিত হাউই, রকেট; ফাটাত কালিপটকা / ধানিপটকার চেইন অথবা ছোট থেকে বড় চকোলেট বোমা অথবা দোদমা; জ্বালাত তুবড়ি, ইলেক্ট্রিক তার; আরও কত কী-ই!

ক্লান্তি ধুয়ে যেত চূর্ণির জলে, ফুটে উঠত অমলিন হাসি। বাড়ি ফেরা, পথে কোনও শূন্য মণ্ডপে সিদ্ধিতে চুমুক, বড়দের ঢিপ আর ছোটদের কপালে টিপ।

ঘুমের ঘোরে ভোর রাতে বলে উঠত আসছে বছর…

উল্লিখিত ছবি ছাড়া বাকি ছবি লেখকের
কভার ছবি: ইন্দ্রজিৎ মেঘ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *