করোনা-আবহে জাতীয় চিকিৎসক দিবস: কিছু আশঙ্কা, সতর্কতা আর অঙ্গীকার

ডা. শ্রীমন্তী বাগ
(কান-নাক-গলা বিভাগ, কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ, যাদবপুর, কলকাতা)

আজ জাতীয় চিকিৎসক দিবস। এই বছরও এই বিশেষ দিনটি এসেছে কোভিড ক্রান্তিকালের সন্ধিক্ষণে। তাই ডাক্তার হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত না করে আজ আমার এই উপস্থাপনাটিকে করে তুললাম কোভিডময়। আমার এই লেখায়, কয়েকটি বহুলপ্রচলিত অথচ বহুবার উপেক্ষিত কোভিড সম্বন্ধীয় বিষয়গুলি আপনাদের সামনে সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি।

আজ সবার মনে-মনে একটাই প্রশ্ন, মুখে মুখে একটাই জিজ্ঞাসা, এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, যার নাম কোভিড-১৯, তাকে আমরা কীভাবে করব জয়? একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলব: কোভিড-১৯ আর যাই হোক, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছে যে, প্রকৃত ভালো থাকতে হলে একা একা ভালো থাকা যায় না, চারপাশের মানুষগুলোকে নিয়ে ভালো থাকতে হয়। আর, ডাক্তার হিসেবে বলব: কোভিডকে আমরা সবাই ভয় পাই, সেটা স্বীকার করতে যেমন লজ্জা পাওয়া উচিত না, তেমন সেই ভয়কে অস্বীকার করে বীরত্ব দেখানোর চেষ্টা করাও উচিত নয়।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

কোভিড ভাইরাস, যার পোশাকি নাম, SARS COV-2, মানবজাতির এমনই এক শত্রু যা আপাত অদমনীয় আর অদৃশ্য। তাই কোভিড যুদ্ধক্ষেত্রে যখন আমরা ডাক্তাররা অবতীর্ণ হই, আমাদের মাথা থেকে পা অবধি PPE-র আচ্ছাদনে ঢেকে ফেলি সেই অদৃশ্য আঘাতের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য। আমি যখন আমার হাসপাতালের বহির্বিভাগে রুগি দেখি, তখন যেমন সাবধানতা অবলম্বন করি, তেমন রাস্তায়-বাজারে-দোকানে বা আর যেকোনও জনবহুল জায়গায় যখন যাই, তখনও একটা N95 মাস্কের সঙ্গে একটা সার্জিকাল মাস্কে ভালোভাবে নাক-মুখ ঢেকে, ফেস্-শিল্ড দিয়ে মুখ ঢাকি, কারণ এই স্বল্প চেনাজানা ভাইরাস যে সাধারণত ঊর্ধ্ব-শ্বাসনালির (Upper respiratory tract) প্রবেশদ্বার দিয়ে শরীরে অনুপ্রবেশ ঘটায়, সেটাই এখনও সর্বজনস্বীকৃত। তাতে আমাদের শিক্ষিত সমাজের অজ্ঞ মানুষ অনেকাংশে আমাকে ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভীতু’ বলে টিটকিরি-টিপ্পনী করে। আমি তাদের হেসে বলি, ‘সব ভয়কে করা উচিত নয় জয়, কারণ অনেক ভয় জীবন বাঁচায়।’

মাস্ক খুলে বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই, বরং আছে অজ্ঞানতার কাপুরুষত্ব। রং-বেরংগী নকশা-খচিত কাপড়ের মাস্ক পরে সৌন্দর্য বর্ধন করার সুযোগ থাকলে আমরা ডাক্তাররা নিশ্চয়ই আপনাদের N95 বা সার্জিকাল মাস্কের ওপর জোর দিতাম না!

আরও পড়ুন: প্রতিজ্ঞা করি, আগামীকাল আবার চেষ্টা করব পৃথিবীকে আরও একটু সুস্থ করে তোলার

ভ্যাকসিন নিয়েছেন বলে মনে করবেন না যে, আপনি কোভিড-যমের হাত থেকে অমরত্ব লাভ করেছেন। সাবান আর ৭০% অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মোকাবিলায় আমি সাবানকে এগিয়ে রাখব, কারণ দু’টোই ঘনঘন ব্যবহারে বিভিন্ন চর্মরোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু স্যানিটাইজার দীর্ঘদিন টানা ব্যবহারে কোনও দুরারোগ্য চর্মরোগের সম্ভাবনা থাকে কিনা তার ওপর প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ দরকার। সাবান হোক বা স্যানিটাইজার, অন্তত ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড যাতে হাতের সংস্পর্শে থাকে খেয়াল রাখবেন। আমাদের অনেকের বদ-অভ্যাস বর্ধিত বয়সেও থেকে থাকে। যেমন― আঙুল চোষা বা নাকের ভিতর চুলকানো। সেক্ষেত্রে সজাগ থাকতে হবে অপরিষ্কার আঙুল যাতে এইসব ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত না হয়।

আরে ও দাদা, আপনাকে বলিহারি যাই, একটা বছর যদি বিয়ে বাড়িতে শ’য়ে শ’য়ে পাত পেড়ে খেতে না পারেন, বা কুম্ভমেলায় দল বেঁধে পবিত্র স্নান না করেন, তাহলে নিশ্চয়ই জীবনের পুণ্য সঞ্চয়ের ঝাঁপিতে টান পড়বে না। আচ্ছা শিক্ষিত সমাজেও কেন থাকবে কূপমণ্ডকতার অন্ধকার? আচার-অনুষ্ঠান, বারো মাসে তেরো পার্বণ ছাড়াও যে জীবন অপরিপূর্ণ নয়, সেটা এই কোভিড-ক্রান্তিকালে তো আর অজানা থাকার কথা নয়।

পৃথিবীর যেকোনও রোগের মোকাবিলা করার জন্য প্রাথমিকভাবে লাগে নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে যথাসম্ভব সক্রিয় করে তোলা। এ-এমনই এক বৈচিত্র্যময় রোগ, যা হয়তো খুব শক্তিশালী ইমিউনিটিকেও অনেক সময় হার মানায়, তাও পুষ্টিগত খাদ্যসামগ্রী যেমন সবুজ শাক-সবজি, ফল― বিশেষত সাইট্রাস (citrus) ফল যেমন― পাতিলেবু, কমলালেবু, মুসাম্বিলেবু, আমলকি ইত্যাদি; সুষম প্রোটিন যেমন― মাছ, মাংস, সোয়া প্রোটিন, ডাল ছোলা এগুলো তো খাদ্যতালিকায় রাখবেনই, দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার, টক দই, আমন্ড বা আখরোট জাতীয় বাদামও রাখবেন।

এই গরমের মরশুমে স্বাভাবিক কর্মক্ষম কিডনির জন্য দৈনিক আড়াই থেকে তিন লিটার জল আর তরল পানীয়ও কিন্তু জরুরি। প্যাচপ্যাচে গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে ORS জাতীয় পানীয় এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবেন। বাইরে না বেরোলেও বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে মাঝেমাঝে গায়ে লাগান ঝলমলে রোদের ছোঁয়া যাতে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি না হয়।

আচ্ছা আপনার কি চায়ের খুব নেশা? অনেকেরই এমন হয়। সারাদিনের মধ্যে দু-তিনবার আপনার চায়ের কাপে ফেলে দিন না কয়েকটা তুলসী পাতা, আদা, লবঙ্গ বা গোলমরিচ। খেতে সুস্বাদু না হলেও কয়েক কুচি রসুনের সঙ্গে ভালোভাবে ধোয়া কাঁচা হলুদের ছোট্ট টুকরো দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ শুরু করুন।

এগুলো হয়তো মা-ঠাকুরমাদের পুরাকাল থেকে প্রচলিত ঘরোয়া টোটকা, কোনও বড় রোগ প্রতিরোধে এদের ভূমিকা এখনও ডাক্তারিভাবে সিদ্ধ নয়, কিন্তু আমি মনে করি এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলির নিয়মিত প্রয়োগে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা বর্ধিত হয়, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। শুধু ভালোমন্দ খেলে হবে না, ভালোভাবে ঘুমাতেও হবে, দিনে অন্তত সাত-আট ঘণ্টা। হালকা ব্যায়াম সবসময় সুস্থ শরীরের পরিকাঠামো তৈরি করে। আর সবচেয়ে জরুরি অথচ সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় হল প্রতি মুহূর্ত নিজেকে খুশি রাখা। সুন্দর মন, সুস্থ শরীরের জন্য জরুরি। সদা সন্ত্রস্ত নয়, সদা সতর্ক থাকুন।

জনসাধারণের সঙ্গে শাসকমণ্ডলের কাছে আমার অনুরোধ গণভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পের সঙ্গে গণ N95 আর সার্জিকাল মাস্ক বিতরণ ক্যাম্পও করুন। যেভাবে লেখা থাকে “cigarette smoking is prohibited in public place”, সেভাবে যদি লেখা থাকে “no mask wearing is prohibited in public place”, বা চলচ্চিত্র শুরুর আগে যেমন লেখা থাকে “ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক”, তেমন “কোভিড বিধিনিষেধ লঙ্ঘন স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক”― এই জাতীয় সতর্কতাবাণী দিয়ে কি সকলকে সজাগ করা যায় না!

সর্বোপরি এই কোভিড যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কি জানেন? সংযম। উপর্যুপরি লকডাউন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা আমাদের জীবনে এনেছে একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ। পূর্বের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিঘ্ন ঘটায় হঠাৎ আমাদের জীবনযাত্রায় হয়েছে ছন্দপতন। এই অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে চাকরিহীন হয়েছেন যাঁরা, লকডাউন যাঁদের পেশায় টেনেছে সাময়িক ইতি, তাঁদের মানসিক ভারসাম্য হারানোটা অস্বাভাবিক নয়। অনেকে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে আটকে পড়েছেন, দেশে ফেরার তাড়নায় হচ্ছেন অস্থির। ছোটদের বিকাশের জন্য গৃহবন্দি জীবন খুব অস্বাস্থ্যকর। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে সাময়িক অচলতা। এত সত্ত্বেও বলব ধৈর্য আর সংযম দিয়ে যদি এগুলো সহন করতে না পারেন, আপনার বাঁচনের পথ ও আশ্বস্ত করতে পারবেন না।

সর্বশেষে বলি― এই কোভিড লড়াই শুধু ‘কোভিড বনাম মানব’ নয়, অনেকাংশে ‘মানব বনাম মানব’ও হয়ে উঠেছে, এতটাই স্বেচ্ছাচারী, লোভী আর স্বার্থপর হয়ে উঠেছে আমাদের সমাজ। কোভিড যেমন মুখে মাস্ক পরিয়েছে, তেমন অনেক মুখ থেকে মাস্ক অর্থাৎ মুখোশ সরিয়েও দিয়েছে নকল মনুষ্যত্বের মুখোশ। এই অতিমারির দূর্ভোগ পর্ব হয়ে উঠেছে মানুষের কঙ্কালসার অস্তিত্বের পরিচায়ক। যে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের প্রাণের বাজি লড়ে কোভিডাক্রান্ত রুগিদের প্রাণদানের প্রতি নিয়োজিত হল, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে, তাঁদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বদলে তাঁদের কখনও গৃহহারা, পাড়া ছাড়া করা হল, কখনও উপসর্গহীন কোভিড-বাহক ভেবে তাঁদের চারদিকে টেনে দেওয়া হল সামাজিক লক্ষ্মণরেখা। যাঁদের ওপর পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার কথা, তাঁদেরই হতে হল জনরোষ আর গণপ্রহারের শিকার। কোভিডাক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াবার বদলে, তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অছ্যুৎ করে দেওয়া হল। কোভিড রুগিদের পরিবারের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থা তাদের চূড়ান্ত শোষণ করে গেল। এগুলো কি মানবিকতার পরিচায়ক? আসুন না, আজকের এই শুভদিনে নিজেদের মধ্যে ছয় ফুটের দূরত্ব রেখেও সমস্ত মানসিক দূরত্ব মুছে দিই সহমর্মিতা দিয়ে।

একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে এই লেখা শেষ করব: ক’দিন মধ্যরাতে আমার এক চিকিৎসক বন্ধু ফোন করে ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তার গলায় ছিল বিজয়োল্লাস। আমি বললাম, “কি হয়েছে রে?” বন্ধু উত্তর দিল― “জানিস, আজ একজন সম্পূর্ণ হার্ট ব্লকের (Complete Heart block) রুগি, যার নাড়ির গতি মিনিটে ২০ হয়ে গিয়েছিল, তার আমি অস্থায়ী পেসমেকার (Temporary Pacemaker) করে প্রাণরক্ষা করতে পারলাম। একজন মুমূর্ষু মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার থেকে বড় আনন্দ, বড় তৃপ্তি একজন ডাক্তারের জীবনে আর কিছুই হয় না।” আমি বললাম, “রুগির কোভিড স্ট্যাটাস জানা ছিল?” বন্ধু বলল, “RAT করারও সময় পাইনি” আমি বললাম, “জীবনের এতবড় ঝুঁকি নিয়ে রুগিকে বাঁচানোর জন্য এত আনন্দ পেলি, কিন্তু কোনও বিশেষ স্বীকৃতি পেলি না, অথচ, বাঁচাতে না পারলে মার খেয়ে আধমরা হয়ে যেতিস!” বন্ধু উত্তর দিল, “তো কি?”

আজকের এই বিশেষ দিনে, আপনাদের কাছে আমার সবিনয় প্রশ্ন, চিকিৎসক হিসেবে এই লাঞ্ছনাই কি আমাদের প্রাপ্য? আপনাদের কাছে বিনিত অনুরোধ, একে-অপরের তফাতে থেকেও একে অপরের হাতে হাত রেখে ডাক্তার-নার্সদের সাহায্য করতে পারেন না? আর কোনওভাবে না হোক, তাঁদের মনোবল তো বাড়াতে পারেন, আপনাদের হার্দিক ভালোবাসা দিয়ে? তাই চলুন, যেমন মগজাস্ত্র দিয়ে কোভিডকে করি পরাস্ত, তেমন সচেতনতা আর সহানুভূতিশীলতা দিয়ে করি তাকে নিরস্ত।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *