ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মাচাদো দ্য আসিসের ‘ডম কাসমুরো’

রাহুল দাশগুপ্ত

উনিশ শতকের ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসাবে স্বীকৃত মাচাদো দ্য আসিসের ‘ডম কাসমুরো’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৯ সালে। সমকালের ইউরোপের দুই মহান প্রকৃতিবাদী লেখক, ফরাসি এমিল জোলা এবং পর্তুগিজ ইকো দ্য কুইরোজের উপন্যাসগুলিতে প্রকৃতিবাদের অবাধ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া হিসাবে আসিস এই উপন্যাসটি রচনা করেন। মোটামুটি ১৮৮০ সালের পর থেকেই আসিস তাঁর ঔপন্যাসিক জীবনের দ্বিতীয় পর্বে সম্পূর্ণভাবে রোমান্টিকতা থেকে মোহমুক্ত হয়ে বাস্তববাদী ধারায় উপন্যাস রচনা করতে শুরু করেন। তাঁর উত্তরাধিকার হিসাবে পরবর্তীকালে লিখতে আসেন মারিও দ্য আন্দ্রাদে, লিমা ব্যারেটো, গ্র্যাসিলিয়ানো র‍্যামস, হুয়াও গুইমারেজ রোজা প্রমুখ দিক্‌পাল লেখকে। ব্রাজিলের কথাসাহিত্যে বাস্তববাদী ধারার সূচনা করার জন্য আসিসকে প্রায়ই স্তঁধলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। স্তঁধল যেরকম বাস্তবতার অসংগতিগুলোকে কৌতুকরসে সিক্ত করেন, আসিসের বাস্তবতাও সেরকমই কৌতুকময়।

আরও পড়ুন­: অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

আসিস তাঁর উপন্যাসে ব্রাজিলের ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায়কেই ধরতে চেয়েছেন। এই সংকটকালের বিস্তৃতি ১৮৫০-৯০ পর্যন্ত। ১৮৫০ সালে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের মুক্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয় ১৮৮৮ সালে। আসিসের উপন্যাসের সূচনাবিন্দু ১৮৫৭ সাল। গোটা কাহিনিটি কেন্দ্রীয় চরিত্র বেন্টিনহোর স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। ১৮৯০ সালে প্রৌঢ় বেন্টিনহো ১৮৫৭ সাল থেকে তার নিজের জীবনের কাহিনি পুনর্লিখন করতে চেয়েছে। ফলে সময় এই রচনায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। অতীত ও বর্তমান পরস্পরের মধ্যে অবাধে মিশে গেছে। কথক তার আত্মকথনের মধ্য দিয়ে কখনও অতীতকে স্পর্শ করেছে, কখনও বর্তমানে ফিরে এসেছে। বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতায় অতীতের মূল্যায়ন করতে চেয়েছে। ফলে যে অতীত ছিল দুঃখময়, তা-ই তার কাছে আনন্দের হয়ে উঠেছে। অতীতকে পুনর্জীবিত করার এই চেষ্টা প্রাসঙ্গিকভাবেই পুস্তের রিমেমব্রেন্স অব থিঙ্কস পাস্টের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। আসিস অবশ্য পুস্তের রচনার অনেক আগে তাঁর এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন।

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

আসিসের এই রচনায় পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় বড় পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও নির্ভরতার ছবি ফুটে উঠেছে। বেল্টোর বাবা অকালমৃত, কিন্তু তার মাকে দেখা যায় সারাজীবন সেই সুখী দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি বহন করে চলতে। এমনকী দেখা যায়, অত গুরুত্বপূর্ণ মৃত্যুর পরও স্বামীর পরিবার থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না, বরং সেই পরিবারকে আঁকড়েই বেঁচে থাকে। একই ছবি দেখা যায় কাপিতুর পরিবারের ক্ষেত্রেও। ছোট্ট অথচ সুখী পরিবার তাদেরও। সাঞ্চার বাবা তার স্ত্রীকে হারালেও একমাত্র মেয়েকে ও মৃত স্ত্রীর স্মৃতিকে নিয়ে পারিবারিক আবহে স্বস্তিবোধ করে। কিন্তু এই পারিবারিক বন্ধনের আদর্শ ছবিটি ধ্বংস হয়ে যায় পরবর্তীকালে। কর্মসূত্রে বেন্টোকে অন্যত্র চলে যেতে হয় এবং তার নতুন বিবাহিত জীবনে অনুপ্রবেশ ঘটে অবিশ্বাস, সন্দেহ, ঈর্ষার। সুন্দর পারিবারিক পরিবেশে বড় হওয়া মানুষগুলো পরিবার-বিচ্ছিন্ন জীবনে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে উঠতে থাকে। আসিস এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে এক যুগসন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

স্তঁধলের মতো আসিসও এই উপন্যাসে ধর্মকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। গোড়া থেকে রচনা করতে চেয়েছেন এক কৌতুকের পরিবেশ। বেন্টোর মা ঈশ্বরের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছেলেকে যাজক করার ব্যাপারে। এই প্রতিশ্রুতিকে ঘিরেই নানা কৌতুকপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে। দেখা যায়, মা ছেলেকে ছাড়া থাকতে রাজি নন, ছেলে তার প্রেমিকা কাপিতুকে ছেড়ে থাকতে রাজি নয়। ধর্মরক্ষা নিয়ে কাপিতুর আদৌ কোনও মাথাব্যথা নেই। পরিবারের প্রধান পরামর্শদাতা হোসে দিয়াসও চান কৌশলে পাশ কাটিয়ে যেতে যাতে তার ইউরোপ যাবার স্বপ্ন সফল হয়। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে মানবিক সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নটি। শেষপর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়। নিজের ছেলের বদলে এক পোষ্যপুত্রকে যাজক হওয়ার জন্য পাঠিয়ে।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

এই উপন্যাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অর্থ। বেন্টো বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির মালিক। তার সঙ্গে কাপিতুর বিয়েতে পরিবারের অনেকের আপত্তি। কারণ, কাপিতু এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অর্থের লোভেই যে কাপিতুর বাবা বেন্টোর সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চান, বেন্টোর পরিবারের ভেতর অনেকেই এই ইঙ্গিত করতে চেয়েছে, বিশেষ করে হেসে দিয়াস। এর থেকেই বোঝা যায়, সেই সময়ে শ্রেণিবৈষম্যের চেহারাটা ঠিক কীরকম ছিল। এস্কোবার যে বেন্টোর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কাপিতুর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তার পেছনেও রয়েছে বেন্টোর অর্থ ও সম্পত্তির প্রতি তার লোভ। বেন্টোকে আত্মহত্যার দিকেই ঠেলে দিতে চেয়েছিল তারা। কারণ তারা জানত, সত্য একদিন বেন্টোর কাছে প্রকাশিত হবেই। প্রকৃতপক্ষে, দু’জনেই চেয়েছিল বেন্টোকে অবলম্বন করে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ওপরের ধাপে উঠতে।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

প্রেম ও যৌনতা এই উপন্যাসের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম প্রেমের অনাস্বাদিত আনন্দ বেন্টো পায় কাপিতুর সূত্রে। প্রথম চুম্বন অর্থাৎ যৌনতার স্বাদও তাকে প্রথম দেয় কাপিতু। কিন্তু ক্রমেই প্রথম প্রেমের এই নিষ্পাপ পরিবেশ জটিলতর হয়ে উঠতে থাকে। বেন্টো কাপিতুকে পায় ঠিকই, কিন্তু বিয়ের দু’বছর পরও কোনও সন্তান দিতে পারে না। কাপিতু একটি সন্তানের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং এর সুযোগ নেয় এস্কোবার। এস্কোবার ও কাপিতু অবৈধ প্রণয়-সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং কাপিতুর একটি সন্তান হয়। একদিকে বেন্টো প্রতারিত হতে থাকে, অন্যদিকে এস্কোবারের স্ত্রী সাথার মধ্যে বঞ্চনার জ্বালা তীব্র হয়ে ওঠে। এরই ফলশ্রুতিতে সাঞ্চা ও বেন্টোর পরস্পরের প্রতি ক্ষণস্থায়ী দুর্বলতা তৈরি হয়। কাপিতুর সন্তানের মধ্যে এস্কোবারের চেহারা ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠতে থাকে। এভাবেই প্রথম প্রেম ও যৌনতার মধুর অভিজ্ঞতাগুলো ঈর্ষা, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণার মতো অনুভূতির অভিঘাতে তিক্ত হয়ে ওঠে। একটা গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। কাপিতু ও তার সন্তানের ভাগ্যে জোটে নির্বাসন। দুর্ঘটনায় এস্কোবারের মৃত্যু হয়। বেন্টো আত্মঘাতী হতে চেয়েও শেষপর্যন্ত নিঃসঙ্গ জীবনই বেছে নেয়। বেন্টোর মায়ের জীবনে তাঁর অকালমৃত স্বামীর সঙ্গে কাটানো যৌবনের দিনগুলো ফিরে আসে এস্কোবারের উপস্থিতিতে, যার মৃত্যুর পরে তিনিও অকাল-বার্ধক্যকেই মেনে নেন।

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

গোটা কাহিনিটিকে বেল্টো একটি অপেরার সঙ্গে তুলনা করতে চেয়েছে। স্মৃতি ও বাস্তবতা, শ্লেষ ও রূপক, সংলাপ ও স্বীকারোক্তি এখানে মিলেমিশে গেছে। কথক অনেকসময়ই প্রত্যক্ষভাবে পাঠকের সঙ্গে সংলাপ রচনা করতে চেয়েছে। তার স্বগতোক্তিগুলো নিয়েছে সংলাপের চেহারা। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাটিকে কাহিনিতে রূপ দেওয়ার সময় তাকে আগাগোড়া পরিচালিত করেছে শৈশবে শোনা একটি রূপক কাহিনি। এই রূপক-কাহিনিটি তাকে বলেছিলেন বৃদ্ধ সান্তিয়াগো। সেই রূপক-কাহিনির মূল চরিত্র ছিল শয়তান। অসীম প্রতিভাবান এক সুরস্রষ্টা ঈশ্বরের রচিত স্বর্গের প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে সে চেয়েছিল বিদ্রোহ করে সমান্তরাল এক জগৎ সৃষ্টি করতে, যেখানে একটি অপেরার মতোই জীবন-নাট্য সর্বদাই সংগঠিত হয়ে চলেছে এবং সেই সঙ্গে চলেছে পাপ ও পূণ্যের দ্বন্দ্ব। সান্তিয়াগো মন্তব্য করেছিলেন, “লাইফ ইজ অ্যান অপেরা, গ্র্যান্ড অপেরা।”

আরও পড়ুন: ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

স্মৃতিকে পুনর্গঠন করার জন্য বেল্টো সচেতনভাবেই একটি গ্রন্থ রচনার কথা বলেছে এবং সেই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামকরণের ইতিহাসও বিবৃত করেছে। তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাই সেই গ্রন্থের উৎস। সে নিজেই গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু কথক হিসাবে যেন সেই গ্রন্থের চরিত্রগুলির সঙ্গে তার একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্ব শুধু সময়ের নয়। এই দূরত্ব জীবন ও গ্রন্থের ভেতরকার দূরত্বও বটে। জীবন যখন গ্রন্থে পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই জীবনের বাস্তবতা ও গ্রন্থের বাস্তবতার মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। এভাবেই আসিস বহুস্তরে বিন্যস্ত এক জটিল আখ্যানশৈলী ব্যবহার করতে চেয়েছেন। আগাগোড়া তিনি শুধু সময়কেই পুনর্নির্মাণ করতে চাননি, জীবনকেও যেন মহাকাব্যের আকারে ধরতে চেয়েছেন। পশ্চিমি এপিকগুলোর মতোই এই গ্রন্থের কাহিনিও শুরু হয় ‘মিডিয়াস রেস’ বা মাঝখান থেকে। এবং কাহিনিটি যেন শেষপর্যন্ত মধ্যপথেই থেমে যায় বা অমীমাংসিত রয়ে যায়। গোটা কাহিনিটিকে তিনি মহাকাব্যের সর্গভাগের মতোই অজস্র ছোট ছোট সর্গে ভাগ করেছেন। কিন্তু এটি যে একটি উপন্যাসই তা বোঝা যায় খুব ছোটখাটো মুহূর্ত বা দৃশ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায়, যা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত। এইজন্য একটা ফোটোগ্রাফের বর্ণনাও একটা গোটা অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। মহাকাব্য ও উপন্যাসের উপাদান এভাবেই এই কাহিনিতে মিশে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

প্রতিগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কাহিনিতে। বেল্টো ইউরোপীয় সাহিত্যের ভালো পাঠক। সে দান্তের উদ্ধৃতি দিয়েছে, বাইবেলের অনুষঙ্গ টেনেছে, নিজেকে ওথেলোর সঙ্গে তুলনা করেছে। কিন্তু দেসদিমোনার সঙ্গে কাপিতুকে তুলনা করতে পারেনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আসলে সে এক ওথেলোকে সৃষ্টি করতে চেয়েছে, যেখানে এস্কোবার হয়ে উঠেছে ইয়াগো, কাপিতু দেসদিমোনা। কিন্তু ওথেলোর সমীকরণে ফেলে শেষপর্যন্ত সে নিজের জীবনের জটগুলো সম্পূর্ণভাবে খুলতে পারেনি। গ্রন্থের ভিতর বাইবেল থেকে গৃহীত ও লোককাহিনি থেকে সংগৃহীত শয়তান-রচিত জীবননাট্যে শেকসপিয়রের কয়েকটি চরিত্রের আদলে সে প্রকৃতপক্ষে এক অপেরা রচনা করতে চেয়েছে। সে হয়ে উঠতে চেয়েছে এক মৌলিক স্রষ্টা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *