দুর্গা বরণ

তাজিন আহম্মেদ

কী ব্যাপার বউমা কিছু বলবে?

হ্যাঁ মা এই প্যাকেটগুলো দিতে এসেছি।

কী আছে ওর মধ্যে?

কিছুদিন পরেই তো পুজো তাই গতকাল একটু শপিং করেছি। এগুলো আপনাদের জন্য। এটা বাবার, এটা আপনার, আর এটা শুভ্রাদের জন্য।

প্যাকেটগুলো সামনের টেবিলে রেখে দৃপ্তি শাশুড়িমাকে একটা প্রণাম করে। শাশুড়িমাও তার মাথায় হাত রেখে বলেন, থাক থাক তবে এই অসময়ে এই সব না করলেই পারতে। এবার পুজোয় কারো তো বেরোনো যাবে না, তাই নতুন কাপড়-চোপড়ে পয়সা না খরচা করলেই পারতে। গতকাল তুমি যখন অত প্যাকেট নিয়ে বাড়ি ঢুকলে, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তবে মুখে কিছু বলিনি। এতকাল তো রণক আর ওর বাবা বলে এসেছে— ইনকামটা তো আর তুমি করোনি আমরা করেছি, তাই খরচটাও আমাদের মতো করেই করতে দাও। এখন তুমিও ইনকাম করছ। এখন তুমিও হয়তো একই কথা বলবে। তাই মনে হয়েছিল যেচে অপমানিত না হয়ে চুপ থাকাই ভালো।

আরও পড়ুন: সে রাতে

দৃপ্তি সে নিয়ে কিচ্ছু বলে না। শুধু শাশুড়ির মুখের দিকে চেয়ে বলে— মা আমি প্যাকেটগুলো সব স্যানিটাইজ করে দিয়েছি। আপনি সময়মতো একটু দেখে নেবেন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। আমি এখন যাই, না হলে সব উল্টো-পাল্টা হয়ে যাবে, বেরোতেও দেরি হয়ে যাবে।

বউমার যাওয়া দেখতে থাকলেও শাশুড়িমার মুখরূপ বুঝিয়ে দিচ্ছিল তিনি খুব একটা খুশি হননি। আসলে দৃপ্তির কাজে বেরোনোটা তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন খুব একটা মেনে নিতে পারেননি। বিবাদটা শুরু হয়েছিল মোটামুটি একবছর আগে যখন দৃপ্তি একটা বুটিকে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, তখনই। একটা চাপা সংঘাত শুরু হয়ে গিয়েছিল এ বাড়ির অন্দরমহলে। তবে দৃপ্তি কিছুতেই পিছু হটেনি মাটি শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়েছিল।

দৃপ্তির ছোটবেলা থেকেই সেলাই-বুনাইয়ের প্রতি খুব নেশা ছিল। তাই এই বুটিকের অ্যাডটা দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। তারা বলেছিল, যাঁরা সেলাই জানেন তাঁদেরকে অল্পবিস্তর কিছু ট্রেনিং দিয়ে সরাসরি কাজে নিয়োগ করবে। সেইমতো দৃপ্তি ওদের অফিসে পৌঁছে যায় এবং সিলেক্টও হয়ে যায়। সেই শুরু তিন মাস ট্রেনিং নিয়ে চার মাস থেকে পুরো মাইনে পেতে শুরু করে। এখন মোটামুটি একবছর হতে চলেছে।

দৃপ্তি চলে গেলে তার শাশুড়িমাও কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়েন প্যাকেটগুলো একবার নেড়েও দেখেন না, কারণ এই সাতসকাল থেকে বসে পড়লে সংসারের বাকি সব কাজ উল্টো-পাল্টা হয়ে যায়। রণক নাতি বউমা তিনজনেই নয়টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। তাদের চা-জলখাবার-টিফিন সবটা দিতে হয়। যদিও দৃপ্তি অনেকটাই সহযোগিতা করে। বাকি সারাদিনের কাজের জন্য মালতী মাসি ন’টা-দশটার মধ্যে ঢুকে পড়ে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে দৃপ্তি নিয়মমাফিক তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে শাশুড়িমা আজ খুব একটা কাজে উৎসাহী নন। তাঁর মুখের থমথমে ভাবেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি খুব একটা খুশি নন। এ যে হবে, তা দৃপ্তির জানা এবং এই মুহূর্তে তিনি যে প্যাকেটগুলো ছুঁয়েও দেখেননি, সেটাও সে জানে। তাই ওই প্রসঙ্গে কোনও কথা না বলে নিজের কাজগুলো ছাড়াও শাশুড়িমা যে কাজগুলো করেন, সেগুলোও করে ফেলে কারণ সে এও জানে আজ তার শাশুড়িমা খুব একটা কাজ কিছু করবেন না। তাই তো সে আজ একটু আগেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে। রান্নাঘরের কাজ শেষ করে সে স্নানে যায়। আজ ছেলেকে প্রস্তুত করার দায়িত্ব সে তার বাবার উপর আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিল। তাই আজ আর ওই দিকটা নিয়ে ভাবতে হয়নি।

আরও পড়ুন: নবমী নিশি

রোজকার নিয়মমাফিক শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমার চা-জলখাবার বসার ঘরে দিয়ে আসে, কারণ এই সময় শ্বশুরমশাই একটু খবর দেখতে দেখতে খেতে ভালোবাসেন আর ওনাকে সঙ্গ দিতে শাশুড়িমাও খাবারটা ওখানেই খান। দৃপ্তিরাও নিজেদের মতো খেয়ে যে যার মতো তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। যাবার সময় অবশ্য বাবা-মাকে জানিয়েই বের হয়। শ্বশুরমশাই সম্মতি দিলেও শাশুড়িমা কোনও সাড়াশব্দ করেন না। গিন্নির মুখের ভাব দেখে শ্বশুরমশাই বুঝতে পারেন, আজ আবহাওয়া ভালো নেই। তাই তিনিও তাকে ঘাঁটান না।

প্রতিদিনের নিয়মমতো মালতীও সময়েই এসে যায়। তবে এখন আর শাশুড়িমা বসে থাকেন না, কিছুটা নিমরাজি হয়ে উঠে রান্নাঘরে যান। কারণ তিনি জানেন, তিনি যদি ওখানে না যান তাহলে ফাঁকিবাজ মালতী কাজে ফাঁকি দিয়ে সব কিছু উল্টো-পাল্টা করে চলে যাবে। এখন আর দৃপ্তি নেই সামলে নেবে। সব ঝামেলা তার উপরেই এসে পড়বে। সব কাজ সামলে দুপুরের চান-খাওয়া শেষ করে শাশুড়িমা তাঁর নিজের ঘরে যান। এটাও অবশ্য তাঁর রোজকার রুটিনেরই একটা অংশ।

ঘরে ঢুকে তিনি সেই টেবিলের সামনে গিয়েই বসেন, তখনও প্যাকেটগুলো একই অবস্থাতেই পড়েছিল। ইচ্ছা না থাকলেও হাত বাড়িয়ে প্যাকেটগুলো কাছে টেনে নেন। প্রথমেই মেয়ের বাড়ির জিনিসগুলো দেখেন। খুব পছন্দ হয়। তারপর কর্তারটা দেখেন, সেটাও যথেষ্ট ভালো। প্রত্যেকটাই বেশ দামি জিনিস। জিনিসগুলো দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবতে থাকেন, কত টাকাই না খরচা করে ফেলেছে! এসবই নিশ্চয় রণকের টাকায়, কারণ নিজে আর কত টাকা মাইনে পায়! দু’টো ইনকাম করছে বলে এখন যেন হাওয়ায় উড়ছে। সব শেষে তিনি নিজের প্যাকেটটা খোলেন। শাড়িটা বের করতেই উপরে একটা চিঠি পান এবং একটা খাম যার মধ্যে অনেকগুলো টাকা। অবাক হয়ে যান। চিঠি কেন? আর এই টাকাটাই বা কেন? এ আবার কোন নাটক? চিঠি পড়ার আগে শাড়িটা ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখেন, বেশ ভালো শাড়ি। শাড়িটা নামিয়ে রেখে তিনি চিঠিটা পড়া শুরু করেন—

শ্রদ্ধেয় মা,

আমি জানি আপনি এই চিঠি দেখে খুব অবাক হয়েছেন। হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ একই বাড়িতে একসঙ্গে থেকেও চিঠি কেন, মনে প্রশ্ন আসবেই। তবে বলি, এই চিঠি আমি একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে লিখছি। আসলে আমি এটাও জানি আপনি চান-খাওয়া শেষ করে ঘরে বিশ্রাম নিতে এসে এই প্যাকেটগুলো দেখবেন। তাই এই মাধ্যমটা আমার মনের কথাগুলো আপনাকে জানানোর সঠিক মাধ্যম বলে মনে হল।

মা, জানি আজ আপনি খুব রেগে আছেন, আপনার মনে হচ্ছে আমি অনেকগুলো টাকা নষ্ট করে ফেলেছি আর এ-সমস্ত টাকাই আপনার ছেলের টাকা। কিন্তু বিশ্বাস করুন এর একটা টাকাও আমি আপনার ছেলের থেকে নিইনি। কারণ আমাদের কোম্পানি আমাদেরকে পুজো বোনাস দিয়েছে আর কিছু টাকা আমি প্রতি মাসে একটু একটু করে জমিয়ে রেখেছিলাম। তা দিয়েই কিনেছি।

এখন আসি অন্য কথায়। আসলে মা আপনাকে আমার অনেক কথা বলার আছে, যা আমি আপনাকে বহুবার সরাসরি বলতে চেয়েছি কিন্তু ঠিক পেরে উঠিনি। তাই সে চেষ্টায় হাল ছেড়ে আজ এই চিঠির মাধ্যমটাই বেছে নিলাম।

মা, আমি জানি আপনি আমার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কাজ করায় খুব একটা খুশি নন। আর তার থেকেও বড় কথা আপনি আমার এই কাজটাতে একেবারেই রাজি নন। আপনি চেয়েছিলেন, যদি কাজ করতেই হয় তবে কোনও স্কুল শিক্ষিকার কাজ নেওয়া ভালো ছিল। কারণ এটাই মেয়েদের জন্য সঠিক কাজ। কিন্তু মা সব মেয়েই কি শিক্ষিকার কাজ পেতে পারে? আর তা ছাড়া আমি ছোটবেলা থেকেই সেলাইয়ের কাজে পটু ছিলাম। তাই এই কাজটার প্রতি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং আমি সফল হয়েওছি।

যাইহোক মা, আমার এই কাজে নিজের অজান্তে আসলে কিন্তু আপনিই সহযোগিতা করছেন। কারণ আপনি যদি এই সংসারের হালটা বরাবরের মতো ধরে না রাখতেন, তাহলে আমার পক্ষে কোনও মতেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কাজ করা সম্ভব হত না। আর বিশ্বাস করুন, আমি আপনার মতো এত সুনিপুণভাবে সংসার গুছিয়ে করতেও পারতাম না। এ ব্যাপারে আপনিই পারদর্শী। যদিও আপনি চেয়েছিলেন আমি আপনার কাছে থেকে সবটা শিখেনি। কিন্তু আমার মনে হল আমার একটু অন্যভাবে ভাবা দরকার। কারণ বাড়ির মহিলারা টাকা রোজগার করে না বলে কতখানি হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়, তা আমরা প্রতিটি মহিলাই উপলব্ধি করি। তাই আমি একটু অন্য রকম ভাবে ভাবলাম।

মা, আমি ভাবলাম আপনি তো এতদিন ধরে সংসারটা সুনিপুণভাবে গুছিয়ে করলেন আর এই বয়সে নতুন করে অন্য কিছু করার কথা ভাবতেও চাইবেন না। তার থেকে আমিই অন্যভাবে ভাবি। আমি বাইরে বেরিয়ে কিছু রোজগার করে আনি, যা আমাদের দুইজনের মনোবল বাড়াবে। মা দেখুন, এই চিঠির সঙ্গে একটা খামে করে ১৬ হাজার টাকা রাখা আছে ওটা আপনার টাকা। আমি গত আট মাস ধরে আপনার ভাগটা সরিয়ে রেখেছিলাম। হ্যাঁ ওটা আপনারই ভাগ, কারণ আপনি সংসারটা সামলে ছিলেন বলে আমি বাইরে বেরিয়ে কাজ করে টাকা রোজগার করতে পারছি। তাই আমার এই মাইনের টাকার উপর আমরা দুইজনেই অংশীদার। মা আপনার হয়তো পুজোতে সবাইকে নিজের থেকে কিছু দিতে ইচ্ছা করবে। এটা সম্পূর্ণ আপনার টাকা, আপনি যেমন খুশি খরচা করুন।

টাকার পরিমাণটা ভেবে যশোদাদেবী মনে মনে হিসেব কষে দেখলেন। তাহলে বউমা আমার জন্য প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে সরিয়ে রাখে। কিন্তু বউমার তো মাইনেই মাত্র ছয় হাজার। তার মানে নিজের জন্য দুই হাজার আমার জন্য দুই হাজার আর যাতায়াত-বাবদ দুই হাজার খরচা করে। চিঠি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ থমকে বসে থাকেন। তারপর আবার পড়া শুরু করেন।

মা, আপনার হয়তো মনে হতে পারে এবার পুজোয় যখন বেরোচ্ছি না, তখন নতুন জামা কাপড় পরে কী হবে? কিন্তু মা বাইরে যাব না বলে নতুন জামা কাপড় পরতে বাধা কীসের? আমরা সবাই নতুন জামা কাপড় পরব আনন্দও করব। আমি শুভ্রাদেরকেও আসতে বলেছি। ওরাও আসছে। ড্রাইভারকে সঙ্গে আনবে না আপনার জামাই নিজেই ড্রাইভ করে আসবে। কারণ পুজোর ওই কয়টা দিন ওরা এখানেই থেকে আমাদের সঙ্গে আনন্দ করবে আর ড্রাইভারকেও ওর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করতে দিয়ে আসবে।

চিঠির সর্বশেষে মা আপনাকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই আর আরও একটা কথা বলতে চাই। মা, দীর্ঘদিনের একটা অপবাদ সমাজে বাসা বাঁধে আছে ‘শাশুড়ি-বউমার মনোমালিন্য’। আসুন না মা আমরা সেটা পালটে নতুন অধ্যায় শুরু করি ‘শাশুড়ি-বউমা একে অপরের পরিপূরক’।

ইতি

আশাবাদী দৃপ্তি

চিঠিটা হাতে ধরে যশোদাদেবী ডুকরে কেঁদে উঠলেন, যার শব্দ সামনের বসার ঘরে তার কর্তার কান অবধি পৌঁছে যায়। তিনিও কারণ জানতে ছুটে আসেন। যশোদাদেবী মুখে কিচ্ছু বলতে পারেন না শুধু চিঠিটা এগিয়ে দেন। তিনিও চিঠিটা পড়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকেন। তারপর গিন্নির উদ্দেশ্যে বলেন— যশোদা এতদিন বাড়িতে বউমাকে আসতে দেখেছ আজ ভাবো ‘মা দুর্গা’ আসছেন। ওকে ভক্তিভরে বরণ কোরো। দেখবে, সব শুভ হবে।

অলংকরণ: জয়িতা ভৌমিক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *