দুর্গা-দর্শন: বাংলাদেশ দিনাজপুর রাজবাড়ির ইতিবৃত্ত

তুষার শুভ্র বসাক

১.

দুর্গাপুজোর শুরুর গল্পটা সঠিকভাবে বলা না গেলেও ভারতবর্ষের দ্রাবিড় সভ্যতায়― মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পুজোর প্রচলন ছিল। এমনকী সিন্ধু সভ্যতায়― শিবের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মাতৃরূপে দুর্গা ও তার বিভিন্ন দেবীরূপের পুজো-অর্চনা করা হত বলে জানা যায়। মার্কণ্ডেয় পুরাণের চণ্ডীতে দুর্গাপুজোর মাহাত্ম্যকথা বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। অসুর দমনে, দুঃখ-দুর্গতি নাশে― মা দুর্গার পুজো, দেব-মানবের অবশ্য করণীয়। তাই অধিকাংশ সনাতন শাস্ত্রবিশারদদের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সম্ভবত মুঘল আমলের ধনী সনাতন পরিবারগুলোতে নিত্যদিন ত্রিসন্ধ্যা দুর্গাপুজো করা হত।

ঐতিহাসিক ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর রাজজমিদারি এস্টেটের রাজা এবং বাংলার বারো-ভুঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম একজন― কংস নারায়ণ রায় কর্তৃক ৮৮৭ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের অখণ্ড বাংলায় প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেই উৎসবে প্রায় আট লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়। সেই একই বছরে রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার ভাদুরিয়ার রাজা জয় জগৎ নারায়ণ রায় প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে জাঁকজমকপূর্ণ বাসন্তীপুজোর আয়োজন করে। বর্তমানে তাহেরপুর মন্দিরে― পুরোহিত গোপাল চক্রবর্তী নিত্যদিন ত্রিসন্ধ্যা দুর্গাপুজো করে আসছে।

কিছু ঐতিহাসিকের ভাষ্যমতে, দিনাজপুর-মালদার জমিদার― স্বপ্নাদেশের পর প্রথম পারিবারিক দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। বলা হয়― এই দুর্গার রূপ ছিল অন্যরকম। লোককথা মতে, আদি দুর্গার চোখ গোলাকার ও উজ্জ্বল এবং দেবী সাদা বাঘ ও সবুজ সিংহের উপর বিরাজমান।

ইতিহাসের পরিভাষায়― দিনাজপুর রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা প্রাণনাথ রায় (রাজত্বকাল: ১৬৮২-১৭২২)। তারই পৃষ্ঠপোষকতায়― ইউরোপীয়-মুঘল ও হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নতুন করে গড়ে তোলা দিনাজপুর রাজবাড়ি মূলত তিনটি মহলে বিভক্ত; আয়না মহল, রানি মহল ও ঠাকুরবাড়ি মহল। এই ঠাকুরবাড়ি মহলের দক্ষিণে অবস্থিত দিনাজপুর রাজবাড়ির দুর্গা মন্দির। এই মন্দিরের দুর্গাপুজো প্রায় তিনশত বছরের পুরনো। জেলার অন্যান্য পুজোমণ্ডপের দুর্গাপুজোর তুলনায়― দিনাজপুর রাজবাড়ির পুজোকর্মে নানাবিধ বিশেষত্ব আছে।

বর্তমানে দিনাজপুর রাজবাড়ি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। এরপরও রাজবাড়িতে উপস্থিত হলে যে বিষয়টি প্রথমত নজরে আসে তা হল― মন্দিরের বৈভব। রাজবাড়ির প্রতিটি মন্দিরের নির্মাণশিল্প তথা কারুকাজ মনোমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক। যে মন্দিরে দেবী দুর্গার পুজোবিধি সম্পাদিত হয়, তার উচ্চতা প্রায় দুইতলার সমান। দৈর্ঘ্য-প্রস্থেও সুবিস্তৃত। চার-পদ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মন্দিরগর্ভে প্রবেশ করতে হয়। মন্দিরগর্ভ― আটটি গোলাকার হৃষ্টপুষ্ট থামে নকশাখচিত ফুলে সুসজ্জিত ও দণ্ডায়মান।

দুর্গা মন্দিরের সম্মুখে বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গণ। সেখানে আলো-ছায়ার আলপনা আঁকে রোদ্দুর। পুজোর সময় এই প্রাঙ্গণটি একটি বড় শামিয়ানার সাহায্যে ঢেকে দেওয়া হয়। অতীতে মহারাজা বাহাদুর স্যার গিরিজানাথ রায় (রাজত্বকাল: ১৮৮৩―১৯১৯) কর্তৃক তৈরি করা মহামূল্য রেশম, পশম ও জড়ির সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত নয়নাভিরাম শামিয়ানা টাঙানো হত। এই শামিয়ানার নিচে সপ্তমী থেকে নবমী-পুজোর এই তিনদিন দল-বেঁধে যাত্রাগান হত। মহারাজার জলসাঘরে বসত নর্তকীর গানের আসর। সেই আসরে দিল্লি-লখনউ থেকে আসা উচ্চাঙ্গ সংগীতের ওস্তাদগণ গান করতো। গান-নাচ উপভোগ করার জন্য এইসব আসরে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হত জমিদার-জোতদার ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ।

২.

রাজবাড়ির বেলতলা দেউড়ি দিয়ে দুর্গা মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। দুর্গা মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ অভিমুখে― সারি-সারি ঘর ও বারান্দা; ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ছাদবিহীন ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায়। ঘরগুলির মেঝে ও দেওয়াল পাকা। একসময় টিনের ছাউনিযুক্ত এই ঘরগুলি ভক্ত-দর্শনার্থীদের বসার জন্য ব্যবহৃত হত। ব্যবহৃত হত রাজকাচারীর অংশবিশেষ হিসেবেও। মন্দির সংলগ্ন উত্তরাংশের দু’টি ঘর এখনও ভাড়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

দিনাজপুর রাজবাড়ির দুর্গা মন্দিরের বেদি পূর্বমুখী। বেদির দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট ২ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৮ ফুট ৭ ইঞ্চি। বেদির পরিমাপে দুর্গাপ্রতিমার পাটাতন তৈরি করা হয়। অতীতে দুইতলা বিশিষ্ট বক্সকাঠামোতে পৃথক দুই অংশে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হত। বর্তমানে দুইতলা বিশিষ্ট বক্সবিহীন, উন্মুক্ত কাঠামোতে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়। কাঠামোর নিচের অংশে গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহের পিঠে দুর্গা, মহিষাসুর, সরস্বতী ও কার্তিক এবং উপর অংশে বৃষে উপবিষ্ট শিবের একপাশে নন্দী, অপরপাশে ভৃঙ্গীর অবস্থান। রাজজমিদারি প্রথায় রথযাত্রার শুভলগ্নে শুরু হত দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজ, চলত পুরো তিন-মাসব্যাপী।

মহালয়ার পুণ্যপ্রভাত থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত দুর্গোৎসব পালিত হত। আর এখন― বোধনে শুরু, বিসর্জনে শেষ। বর্তমানে রাজবাড়ির মূল ফটক অর্থাৎ ধর্ম দেউড়ি হতে সিংহ দেউড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় মেলা বসে। মেলায় কামার-কুমোরের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, সাজসজ্জার সামগ্রী, খেলনা, ক্রীড়াপণ্য, ফেরিওয়ালার বাঁশি-বেলুন প্রভৃতি দেদারসে বিক্রি হয়। চটপটি-ফুচকা, ঝালমুড়ি, ঘটি গরম চানাচুর, পাপড়, নানা পদের বড়া-ভাজা, মিষ্টি, চিনি বা গুড়ের মচমচে গরম জিলাপি, কদমা-বাতাসা, খুরমা-খাগরাই, নিমকি, মুরালি, মুড়ির মোয়া সমেত নানা ছাঁচের সন্দেশের পসরা সাজানো থাকে দোকানঘরগুলোতে। এই মেলায় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে নাগরদোলা। মেলায় এসবের পাশাপাশি বন্দুক দিয়ে বেলুন ফুটানো, ম্যাজিক-শো, কাঠের গোলাকার কাঠামোতে বাইক বা কার রেস এমনকি দেশীয় সার্কাস দলের নানা কর্ষদের খেলা দেখতে পাওয়া যায়।

সেসময় রাজজমিদারি প্রথানুসারে― দুর্গাপুজোয় মন্দিরগর্ভের অভ্যন্তরীণ চারটি থামে পদ্মের উপরে মোমবাতি বসানো সেড, বহির্ভাগের বারান্দার চারটি থামে আঙুরের ঝাড়ের শেড, শিবের সম্মুখে কাচের ঝুলন্ত বলের ঝাড়, প্রতিমার দু’পাশে স্ফটিকের ঝাড়সহ জালিবিশিষ্ট শেড লাগানো হত। মন্দির প্রাঙ্গণ-সহ রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে বিভিন্ন রকমের বৈদ্যুতিক বাতির সুদৃশ্য স্ফটিকের ঝাড়সহ কাচের শেড লাগানো হত। ফলে পুরো রাজবাড়ি দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে ভরে উঠত আলোক-বর্ষায়।

দুর্গাপুজোর সময় প্রাতঃকালে― প্রধান পুরোহিত হাতি-ঘোড়া সমভিব্যাহারে ঢাক-ঢোল, কাসর-ঘণ্টা বাজিয়ে শুকসাগরের উত্তর-পাড়ের ঘাটে মঙ্গল-ঘটে জল ভরাতে যেতেন। রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় স্থানীয় বাদ্যকরের ঢাক-ঢোল তো বাজতই, মালদহ থেকে বাদ্যকর আনা হত জয়ঢাক বাজানোর জন্য। রাজবাড়ির প্রধান ফটক অর্থাৎ ধর্ম দেউড়ির উভয় পাশে একটি করে এবং শুকসাগরের উত্তর-পাড়ে পাঁচটি কামান বসানো ছিল। পুজোর কয়েকদিন সকাল-সন্ধ্যা, সন্ধিপুজোর সময় এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় কামানগুলো দাগা হতো। এখন এসব শুধুই স্মৃতি। স্মৃতিস্বরূপ― এই রাজবাড়ির কিছু কামান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সংরক্ষিত আছে এই রাজবাড়ির ঐতিহ্যসমৃদ্ধ নানাবিদ পণ্যসামগ্রী; যারমধ্যে নাগদরজা ও হাতির দাঁতের তৈরি সিংহাসন অন্যতম।

রাজবাড়ির দুর্গা মন্দিরের উত্তরে ঠাকুরবাড়ি মহলে কালিয়াজিউ মন্দিরের অবস্থান। কৃষ্ণজন্মাষ্টমীর দু’দিন পূর্বে ষষ্ঠী তিথিতে কান্তজিউ মন্দিরের রুক্মিণী-কান্ত বিগ্রহকে কান্তনগর থেকে রাজবাড়ির এই মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। অতীতে― ময়ূরপঙ্খী নৌকায় চড়ে ঢেপা নদীর পথ বেয়ে, অতঃপর সড়কপথে পদব্রজে চতুর্দোলায় জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা করে বিগ্রহ আনা হত। বর্তমানে এই প্রথা প্রচলিত থাকলেও সেই বিশেষ ময়ূরপঙ্খী নৌকার কোনও অস্তিত্ব নেই। দুর্গাপুজোর সময় ভক্তহৃদয় রাজবাড়িতেই কান্তজিউ বিগ্রহ দর্শন করতে পারে। প্রথানুযায়ী― এই বিগ্রহকে তিনমাস রাজবাড়িতে রেখে রাস-পূর্ণিমার দুইদিন পূর্বে ত্রয়োদশী তিথিতে পুনরায় পদব্রজে চতুর্দোলায় জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা করে কান্তনগরে ফিরিয়ে আনা হয়।

সেসময়― দুর্গাপুজোর কয়েকদিন দেবী দুর্গার পাশাপাশি দেবী চামুণ্ডা, কালিয়াজিউ বিগ্রহ ও কান্তজিউ বিগ্রহকে দুপুরে বিভিন্ন প্রকারের ফল, লুচি-পুড়ি, ছানা-ক্ষীর, দধি-মাখন-সন্দেশ, মিষ্টি-মিষ্টান্ন এবং রাতে নানাপ্রকারের ব্যঞ্জনাদিসহ অন্ন ও ঘৃতান্ন ভোগ দেওয়া হত। অন্নভোগ তৈরি করা হতো সুগন্ধি কাটারিভোগ আতপ-চাল দিয়ে। এরপর এসব ভোগ পরিবেশিত হতো কাঁসার থালা-বাটিতে। সঙ্গে রূপা ও কাঁসার গ্লাসে পরিবেশন করা হত জল। প্রতিদিনের ভোগের প্রসাদ মহারাজা-মহারানি ও রাজকুমার-রাজকুমারীদের নিকটে পাঠানো হত। প্রতিমা-বিগ্রহাদির ভোগরাগের পর― উপস্থিত সাধারণ ভক্ত-দর্শনার্থীরা ছাউনিযুক্ত সারি-সারি ঘরগুলোতে অবস্থান করে ভোগের প্রসাদ ও চরণামৃতের স্বাদ নিতে।

৩.

রাজবাড়ির দুর্গা মন্দির সংলগ্ন উত্তরদিকের দু’টি প্রকোষ্ঠে রাজকোষাগার ছিল। রাজবাড়ির প্রতিমা ও বিগ্রহাদির পরনের জন্য সোনা-রূপার যে অলংকার ছিল, তা একটি বড় বাক্সে রেখে এই রাজকোষাগারে সংরক্ষণ করা হত। তথ্যমতে, চারজন সিপাহি পালাক্রমে এই রাজকোষাগার সর্বক্ষণ পাহারা দিতেন।

“যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে।” কন্যার প্রতি মায়ের যে টান, তার চিন্তনচিত্র শব্দশৈলীতে এভাবেই জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন এক সাধক কবি। এমন অসংখ্য কবিগানের আসর বসত ধর্ম দেউড়ির ভিতরের ফাঁকাস্থানে। রাজবাড়িতে দুর্গা-দর্শন করতে আসা ভক্ত-দর্শনার্থীরা কবিগান শুনে মুগ্ধতায় অভিভূত হত।

মহারাজা বাহাদুর স্যার গিরিজানাথ রায় মন্দির নির্মাণ ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাকে পুণ্যকাজ মনে করতেন। সেই পুণ্যকাজের একাংশ হল― মালদহপট্টি এলাকার উত্তরাংশে গরুহাটিস্থ শহর কাচারীতে শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ি নির্মাণ। এই ঠাকুরবাড়ি সরাসরি দিনাজপুর রাজবাড়ির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির দুর্গা মন্দিরে যে দুর্গাপ্রতিমা পুজো করা হত― তা রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গেই রাজবাড়িতে তৈরি করা হত। তবে এখানকার প্রতিমা তৈরি হত একতলা কাঠামোযুক্ত; যেখানে― গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহের পিঠে দুর্গা, মহিষাসুর, সরস্বতী ও কার্তিকের অবস্থান। দেবীপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে ১৬ জন বলিষ্ঠ মানুষের সহায়তায়― এই দুর্গাপ্রতিমা ঘাড়ে করে রাজবাড়ি থেকে শ্যামরায় ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে আসা হতো। এখানকার পুজোর আয়োজনও ছিল রাজবাড়ির অনুরূপ।

১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাষ হলে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৫১, সরকারকর্তৃক দিনাজপুর রাজ এস্টেটের দখল গৃহীত হয়। ফলে অনুদানের অভাবে শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির পুজো বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তবৃন্দ-কর্তৃক শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির পুজো পুনরায় প্রচলিত হয়। বর্তমানে একটি কমিটির মাধ্যমে এখনও জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই পুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানকার দুর্গাপুজোয় প্রযুক্তি, আবহসংগীত ও বাচিকশিল্পীর কণ্ঠ ব্যবহার করে মাটির প্রতিমার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয়-কাহিনি যেমন: ব্রহ্মার নিকট মহিষাসুরের বর লাভ, দুর্গা-মহিষাসুরের যুদ্ধ প্রভৃতি বিষয় উপস্থাপন করা হয়।

বর্তমানে রাজদেবোত্তর এস্টেট ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় দিনাজপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর সময় ভক্ত-দর্শনার্থীরা যেমন রাজবাড়িতে দুর্গা-দর্শন করতে আসে, তেমনি একসময় মহারাজা-মহারানি, রাজকুমার-রাজকুমারী দুর্গাপ্রতিমা ও কান্তজিউ বিগ্রহ দর্শন করতে মন্দিরে উপস্থিত হতো। প্রথানুসারে― রাজপরিবারের আগমনের সময় সাধারণ জনগণকে ঠাকুরবাড়ি বা দুর্গা মন্দিরের প্রাঙ্গণ থেকে সাময়িকভাবে বের করে দেওয়া হত। রক্ষীরা স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আগমনী বার্তার সঙ্গে ‘তফাত যাও, তফাত যাও’ ঘোষণা করত।

দশমী তিথির বিকালে প্রতিমা বিসর্জনের সময় রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমার দুই অংশ পৃথক করা হতো। এরপর ৩২ জন বলিষ্ঠ মানুষ ঘাড়ে করে দুর্গাপ্রতিমা শুকসাগরের উত্তরপাড়ে নিয়ে যেতো। অনুরুপভাবে― ১৬ জন বলিষ্ঠ মানুষের সাহায্যে শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা ঘাড়ে করে শুকসাগরে নিয়ে আসা হতে। এরপর রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা দু’টি জোড়া নৌকায় এবং শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা একটি জোড়া নৌকায় তুলে নৌকাবাইচ করা হতো। অতঃপর রাত ১০টায় তিনবার কামান দাগার মাধ্যমে প্রতিমা নিরঞ্জন দেয়া হতো। রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা আজও শুকসাগরে নিরঞ্জন দেয়া হলেও শ্যামরায় ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা শহরের অন্যান্য মন্দিরের প্রতিমার মতো শোভাযাত্রা করতে করতে পুনর্ভবা নদীর সাধুরঘাটে নিরঞ্জন দেওয়া হয়।

রাজবাড়ির চামুণ্ডা মন্দিরের উত্তরাংশে মনসা মন্দির চত্বরে প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত মনসামঙ্গল গান করা হত। বিজয়া দশমীর পরদিন থেকে কালীপুজোর আগের দিন পর্যন্ত ঠাকুরবাড়ির নাটমন্দিরে দুপুরে গীতাপাঠ করা হতো। জনশ্রুতি আছে― রাজবাড়িতে দুর্গা-দর্শন করতে এসে পণ্ডিতগণের গুরুগম্ভীর গলায় স্ত্রোত্র ও মন্ত্রপাঠ এবং বাদ্যকরের জয় ঢাকের আওয়াজ শুনে মন ভরে উঠত। এমনকী ধুপধুনা-চন্দনের সুবাসিত বাতায়নে― আলোক-উজ্জ্বল সৌন্দর্য আর নানা কর্ষদের ধুনচি নাচ দেখে ভক্তহৃদয় মোহাবিষ্ট হয়ে উঠত। এখন এর অনেককিছুই নেই, হয় না। তবে আছে ঢাক-ঢোল, কাসর-সানাই, ধুনুচি নাচ, আরতি আর ভক্তিগীতি। সঙ্গে আছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠনিঃসৃত চণ্ডীপাঠ। আছে হৃদয়ে অগাধ ভক্তি আর দুর্গা-দর্শন উপলক্ষ্যে পারিবারিক সমভিব্যাহারের আনন্দ। এই আনন্দ অনিঃশেষ; যার মূল স্লোগান― আসছে বছর আবার হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

ঐতিহ্যসমৃদ্ধ দিনাজপুর রাজবাড়ি― শ্রীশৈলেশ চন্দ্র বিশ্বাস।
দিনাজপুরের ইতিহাস সমগ্র ৪: দিনাজপুর রাজবংশের ইতিহাস― মেহেরাব আলী

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *