বীরভূমের বিপ্রটিকুরী গ্রামের দুর্গা

রাজকুমার মণ্ডল

বীরভূমের বিপ্রটিকুরী। এই গ্রামের ঐতিহ্য, মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের রীতি এক অনন্য সংস্কৃতির সৃষ্টি করে চলেছে। গ্রামের বাইরে থাকা অসংখ্য মানুষের ভিড় শুরু হয় পুজোর বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। আকাশে আবির ছড়ালে যেমন তার প্রভাব প্রত্যেক হৃদয়ে প্রস্ফূটিত হয়, ঠিক তেমনই ছোটবেলার সেই বন্ধুত্বের খোঁজে বয়স তখন এক নিমিত্ত মাত্র। পাড়াল গলির সেই দেওয়াল, পাশের অশ্বত্থগাছ সবকিছু তার প্রমাণস্বরূপ হিসাবে এখনও বিরাজমান। ষষ্ঠীর দিন থেকে শুরু হয় গ্রামের বাচ্চাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতি পুজোর দু-তিন মাসে আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। কাশফুল ও দেওয়ালে আলকাতরার গন্ধ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ভালোবাসার হাত ধরে। বিগত কয়েকছর ধরে গ্রামের কিছু দাদা-দিদির দল মিলিত হয়ে এক নতুন খুশির আকাশ সৃষ্টি করেছে। সপ্তমীর সকালে গ্রামের সমস্ত প্রাণ একত্রিত হয় সাজারবাড়ির প্রাঙ্গণে। আনন্দ ভাগ করে নেয় একে-অপরের সঙ্গে। কেউ ঘট হাতে, কেউ কাঁধে দোলা নিয়ে মানুষের ভিড়ে এগিয়ে যায় তার শূন্যতা পূরণ করতে। সেই সকালের এক অনন্য রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানুষের মধ্যে।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গোৎসব: ঐতিহ্যের ২৮৬ বছর

সকাল থেকে হাজার পরিকল্পনা, অনেক চিন্তা শুরু হয় রাত্রের অনুষ্ঠানের জন্য। বিগত কয়েকমাসের পরিশ্রম আজ খুশির জামা পরবে। বাচ্চাদের নাচ-গান, আবৃত্তি, নাটক এই সবকিছু নিয়ে এক জমজমাট সন্ধ্যার শুরু হয় সপ্তমীর দিন থেকে। সেই সকালগুলো সারাবছরের থেকে একদম আলাদা। এর কোনও কারণ আমাদের সত্যিই জানা নেই। যেমন পাহাড়ের বুকে নির্বাচিত ফুল রাখলে চোখের তৃপ্তি ঘটে, ঠিক তেমন এই চারটে দিন মানুষগুলো আরও আপন মনে হয়। যাদের আগে কখনও গ্রামে দেখিনি, সেই কাকু-জেঠুদের আড্ডার আসরের যাবতীয় সরঞ্জাম দায়িত্ব নব্য যুবকের হাতে। এই ক’টা দিন জেঠুদের হাসি-ঠাট্টার মাঝে কখন কাটিয়ে ফেলি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।

“ওরে এখন আর পেছন ডাকিস না”— সেদিন সকালে পিসিমণির মুখে এই শব্দটুকুই শুনতে পায়। অনেক কাজ পরে আছে রে বাবা। ঠাকুমার পুজোর থালা থেকে মণ্ডাটা কে আগে নেবে, এবছর ক্যারম প্রতিযোগিতায় কারা জিতবে এই নিয়ে দিনের অংশ অজান্তেই কেটে যায়। কাকিমাদের হাসি-আড্ডার আসর ভরপুর সেদিন। ধূপশলাকার গন্ধে কাশফুলের বনগুলো এখন বেশ মেতে উঠেছে। ছোট্ট রাস্তা, তার উপর এক হালকা শব্দের বিস্তীর্ণ ছায়া। ছেলেমেয়েগুলো আজ নিজেদের সেই পুরনো ছবিগুলো দেখলে ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারে না। ঐতিহ্যের সংজ্ঞা কী, সেটা এই গ্রামেই শিখেছি। বিশেষত সপ্তমীর সকালে, যখন এক রঙে কিছু নতুন প্রাণের হাসি পকেটে আসে, যাদের সঙ্গে গ্রাম ভালোভাবে পরিচিত না, তারাই প্রথমে এসে ভালোবাসে। সিনিয়র-জুনিয়র ক্রিকেট ম্যাচ, তাসের আসর এইসব মিশে একটা ছাদ গড়ে ওঠে তখন। যার উপরে থাকে ভেদাভেদহীন হৃদয় ও মায়ের নির্মম আশীর্বাদ। অষ্টমী, নবমী হারিয়ে যখন দশমীর সকাল এসে নাড়া দেয় গ্রামের দরজায়, মনের কিছু অংশ প্রচণ্ড দুঃখের সঙ্গে সেই দরজা খোলে। একসঙ্গে সিঁদুরখেলা, মায়ের প্রসাদ বিতরণ শেষ হলে শুরু হয় আনন্দের শেষ অংশটুকু উপভোগ করে নেওয়ার জন্য। ‘Age is just a number’ এই কথাটার প্রকৃত অর্থ সেই সকালে উপলব্ধি করতে পারি। ছোট থেকে বড় একসঙ্গে কোমরে হাত দিয়ে ঢাকের শব্দে আবার এগিয়ে যায় সেই সমাপ্তির পথে। এক গ্রাম, যেখানে পুজোর শুরু, আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, স্মৃতিচারণ সব সঞ্চিত থাকে আগামী বছরের অপেক্ষায়।

আবার দেখা হবে সপ্তমীর সকাল, এক আকাশের নীচে। আসুন একবছর। দেখবেন আমরা গ্রামের ঐতিহ্যকে এখনও বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি কি না। আমাদের গ্রাম বিপ্রটিকুরী আমাদের ভালোবাসার সমাধিস্তম্ভ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *