শক্তিময়ী সাহসিনী দুর্গতিনাশিনী, এসো সংকটে কল্যাণকরে

সাবরিনা শারমিন চৌধুরী (ঢাকা, বাংলাদেশ)

হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসে দেবী দুর্গা জগৎকে দুর্দশা বা দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণ করেন। অর্থাৎ দুর্গাপুজো হচ্ছে সেই দেবীর আরাধনা, যিনি এই জগৎ সংসারের দুর্গতি নাশ করেন। দুর্গাপুজোর একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এর আগমনী পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিপর্ব। বাংলাদেশে শরৎ ঋতুর আগমন, এর প্রকৃতির মধ্যেই ছড়িয়ে থাকে শারদীয় দেবীর আগমনী মূর্ছনা। শান্ত বাতাসে দুলতে থাকা কাশবন, ঘন নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো ধবধবে সাদা মেঘ, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ ভোর এসবের মধ্যেই দেবী দুর্গার আগমনের পদধ্বনি পাওয়া যায়। উৎসবের আমেজ তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের এটিই চিরপরিচিত আবহ।

আরও পড়ুন: ছোটবেলার পুজো দেখতে যেতাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও চণ্ডীপুরে

ফাইল চিত্র

অন্য বছরগুলোতে এসময় ঢাকার চিত্রটা ভিন্নতর থাকে। বিশেষ করে পুরান ঢাকায়। দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে মরশুমি কারুশিল্পীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে যায়। পুজোর উৎসবে আবশ্যিক বাদ্যযন্ত্র তৈরি অথবা মেরামতের কাজে তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্যবসায়ীরা পুজোর উপকরণের পসরা সাজিয়ে বসেন। মানুষের মধ্যে আগাম শুভেচ্ছা বিনিময় শুরু হয়ে যায়। চারিদিকে একটা উৎসব উৎসব আনন্দমুখর পরিবেশ বিরাজমান থাকে।

কিন্তু এবছর চিত্রটা অন্যরকম। শহরে বা গ্রামে বাংলাদেশের কোনও অঞ্চলেই শারদীয় উৎসবের সেই চিরপরিচিত আবহটি এবার নেই। দুর্গাদেবী এবছর যখন সপরিবারে বাংলাদেশে আগমন করছেন, তখন সারাবিশ্বের মতো এ-দেশটিও এক মহারোগের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত। করোনাভাইরাস অতিমারিতে প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু ও চার লাখ সংক্রমিত মানুষ নিয়ে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন অচেনা এক আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় সংকুচিত হয়ে গেছে। একইসঙ্গে নিত্যদিন নৃশংস নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়ে এ-দেশের নারীরা সম্ভবত সর্বোচ্চ সংকটময় সময় পার করছে এ-বছরই। ঢাকার শারদীয় প্রকৃতিতে যখন দুর্গাদেবীর আগমনী বার্তা বয়ে চলেছে, তখন এই মহানগরীর নারীরা নিজেদের মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষায় রুদ্র রোষে জেগে উঠেছে, দিন ও রাতের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়ে রাস্তায় নেমেছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে ঢাকার রাজপথ কঠোর আন্দোলনে উত্তাল হয়ে গেছে। একদিকে করোনায় বিপর্যস্ত জীবন, অন্যদিকে রুদ্ররোষে নারী জাগরণ, এমনই এক ভিন্নতর পরিস্থিতিতে ভিন্ন রূপের বাংলাদেশে শক্তিময়ী, সাহসিনী, দুর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবী আগমন করছেন।  

আরও পড়ুন: তখন কালীগঞ্জ উপজেলা, দেবহাটা, গাজিরহাট, পারুলিয়া, নলতায় দলবেঁধে পুজো দেখতে শুরু করেছি 

ফাইল চিত্র

দুর্গাপুজো বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশে কোনও ধর্ম পালন বা ধর্মীয় উৎসব উদ্‌যাপনে বাধা নেই। সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন ও উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারে। তবে এ-দেশে ঈদ উৎসবের পর দুর্গাপুজো হল দ্বিতীয় উৎসব, যেটি অনেক বড় পরিসরে উদ্‌যাপন করা হয়। প্রতি বছর ঢাকা-সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজো উদ্‌যাপিত হয়। ঢাকা এই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র।

বাংলাদেশে দুর্গাপুজো কেবলই এক ধর্মীয় উৎসব নয়, সামাজিক মেলবন্ধনও বটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়াও অন্যরাও এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে, মণ্ডপ দেখতে বের হয়, আনন্দ করে। পুজোমণ্ডপগুলোতে সহস্র মানুষের ঢল নামে। দুর্গাপুজো উপলক্ষে বড় বড় মন্দির ছাড়াও পাড়ায় পাড়ায়, রাস্তার মোড়ে, অসংখ্য প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। ঢাকায় এক সময় কেবল ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রমনাকালী মন্দির উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু এখন পুরো ঢাকা শহরই উৎসবে মুখর থাকে। শহরজুড়ে শত শত পুজোমণ্ডপ, আলোকসজ্জা, বাদ্য-বাজনা, আনন্দ-হাসি-গান ও মানুষের মেলবন্ধনে পুরো একটি সপ্তাহ জুড়ে দারুণ মুখরিত থাকে ব্যস্ত এই মহানগরী। তবে এবারের দুর্গাপুজোয় ঢাকাকে এতটা আড়ম্বরে, এতটা মোহনীয় রূপে দেখা যাবে না। পুজো হবে, মণ্ডপ থাকবে, উৎসব হবে না। আয়োজন সীমিত হবে, উদ্‌যাপনে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। 

ফাইল চিত্র

আগামী ২২-২৬ অক্টোবর দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়ার পর দেবীপক্ষের সূচনা হয়। আগামী ২২ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপুজো শুরু হবে। এবার সারাদেশে মোট ৩০ হাজার ২৩১টি পুজোমণ্ডপে পুজো অনুষ্ঠিত হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার পুজোয় উৎসবের আয়োজন থাকবে না। করোনা ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে, তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এবার দুর্গাপুজোর আয়োজন অনাড়ম্বর হবে। তাছাড়া করোনার কারণে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষ, অথবা মরশুমি আয়ের মানুষেরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় তাদের পক্ষে কোনও উৎসব আয়োজনে অংশগ্রহণ করা কঠিন। শুধু দুর্গাপুজোর উৎসবই নয়, এ-বছর করোনা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে সব ধরনের রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব সীমিত পরিসরে করা হয়েছে অথবা বাতিল করা হয়েছে। এর আগে মুসলিম সম্প্রদায়ের রমযান মাসের আনুষ্ঠানিকতা, ঈদ-সহ অন্যান্য উৎসব আয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও সংক্ষিপ্ত আকারে পালন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন হয় বাতিল করা হয়েছে অথবা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সব কিছুর উপরে।

বাংলাদেশ পুজো উদ্‌যাপন পরিষদের পক্ষ থেকে দুর্গাপুজো উদ্‌যাপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ-বছর মন্দিরে আলোকসজ্জা, বিশেষ সাজসজ্জা, মেলা, আরতি প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিহার করা হবে। ভক্তিমূলক গান ছাড়া অন্য কোনও রকম গান বাজানো হবে না। কোনও আতশবাজি বা পটকার ব্যবহার করা য়াবে না। তাছাড়া এবার জনসমাগম পরিহার করতে মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রসাদ বিতরণ থেকেও বিরত থাকবে। ঢাকায় এবার কুমারীপুজোও হবে না। করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মানার তাগিদ থেকেই মূলত এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করোনা থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য মন্দিরে মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। সপ্তম তিথিতে দুপুর ১২টা ০১ মিনিটে সব মন্দিরে করোনা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি এবং সবার আরোগ্য কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। করোনা অতিমারি পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাত্ত্বিক আচারের মাধ্যমে পুজোর আয়োজন সীমাবদ্ধ রাখা হবে। সন্ধ্যার মধ্যেই আরতি সম্পন্ন করা হবে। রাত ৯টার পর মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর আর কোনও দর্শনাথীদের মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সামাজিক দূরত্ব মেনে, মাস্ক ব্যবহার করে ভক্তরা অঞ্জলি দিতে পারবেন। এর পাশাপাশি ভক্তরা যেন তাঁদের বাড়ি থেকে অঞ্জলি দিতে পারেন, সেজন্য সম্ভব হলে মন্দিরগুলোর তরফ থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থা করা হবে। বিজয়া দশমী হবে ২৬ অক্টোবর, তবে এবার বিজয়ার শোভাযাত্রা হবে না। মন্দিরগুলো তাদের নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থা করবে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিসর্জনকালীন প্রতিমা বহন করার জন্য ১টি ট্রাকে ন্যূনতম সংখ্যক লোক থাকবে। অতিরিক্তি ট্রাক/গাড়ি বা লোক থাকতে পারবে না।   

ফাইল চিত্র

করোনার কারণে দুর্গাপুজোর আয়োজন এবার সাদামাটা ও সংক্ষিপ্ত। এতে এই পুজো উৎসবকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা কারিগর, কারুশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। মরশুমি উপার্জন বন্ধ, তাঁদের কপালে দুশ্চিন্তার গভীর ভাঁজ। দুর্গাপুজোকে ঘিরে এসময় তাঁদের হাতে নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরি বা পুরাতন যন্ত্র মেরামতের প্রচুর অর্ডার থাকে, যা তাঁদের সারাবছরের পুঁজি। ছোট ছোট ইন্সট্রুমেন্টস যেমন ডুগি, তবলা, ঢোল, খামক, নাল, খঞ্জনি ইত্যাদি তৈরিতে তাঁরা ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এ-বছর অর্ডার নাই বললেই চলে। গত কয়েক মাসের করোনাকালীন কর্মহীনতা তাঁরা পুষিয়ে নেবেন এই সময়টাতে, এমনটাই তাঁদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দেশে করোনার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সে প্রত্যাশা পূরণ হল না। একই অবস্থা ঢাকার বিপণন কেন্দ্রগুলোতেও। ফুটপাথের ছোট ছোট ভাসমান দোকানগুলো থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমলে এ-সময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। ঈদ, বাংলা নববর্ষ ও দুর্গাপুজো এই তিনটি উৎসবকে ঘিরেই মূলত তাঁদের সারাবছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকে। করোনার কারণে ঈদ ও নববর্ষের ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে গেলেও নগরীর বিপণিবিতানগুলো আশায় বুক বেঁধেছিল দুর্গাপুজোকে ঘিরে। কিন্তু করোনা এখনও জেঁকে বসে আছে। একদিকে মানুষ যেমন স্বাস্থ্যগত কারণে কেনাকাটা করতে বের হচ্ছে না, আর এক দিকে মানুষের হাত শূন্য। ফলে পুজোর কেনাকাটা এবার জমে ওঠেনি। দোকান খোলা আছে, সেখানে নতুন নতুন পণ্য আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা নেই।   

ফাইল চিত্র

এই সংকটকাল, এই দুর্যোগ একদিন কেটে যাবে। দুর্গাদেবী এবার গিয়ে আবারও ফিরে আসবেন এ-দেশে তাঁর ভক্তদের মাঝে আড়ম্বরে, উৎসবে মুখর হয়ে। তাঁর আগমনী বার্তায় খুশিতে, কলতানে মুখরিত হবে বাংলাদেশের শারদীয় প্রকৃতি। ঢাকার পথঘাট, এপাড়া-ওপাড়া মরশুমি কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হবে। তাঁকে ঘিরে বেঁচে থাকা প্রাণগুলো— কারুশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, কারিগর, মাল্যকার, ব্যবসায়ী, পূজারি, ভক্ত সকলে হয়তো সেই প্রার্থনাই করবেন এবারের শারদীয় দুর্গাপুজোয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Sri Nabarun Chakraborty

    ২০২০ সালকে বিস্ময় বছর না বিষময় বছর বলবো বুঝতে পারছি না।
    বিশ সাল বাদ – দেখা যাক কি অপেক্ষা করছে। পুরো বছরটা বিশ্রামে কেটে গেল।

    উৎসব পার্বণ আনন্দ অনুষ্ঠান না হয় সুস্থ বছরে হবে। একবিংশ যেন না করে কিছু ধ্বংস সেই প্রার্থনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *