ত্রিপুরার দুর্গাপুজো

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

বাঙালির চতুর্থ ভুবন হল ত্রিপুরা। এখানে বাঙালির হৃদয়ে দুর্গাপুজোর একদম স্বতন্ত্র মাহাত্ম্য রয়েছে। সেই কবে কোন কালে ছিন্নমূল হয়ে শরণার্থীর মতো যাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন ত্রিপুরার পাহাড় ও সমতলে, তাঁরা প্রথম থেকেই দুই ভুবনের বাঙালিদের নিজস্ব সত্তা পৃথক করে নিয়েছেন। ফলে ত্রিপুরার দুর্গাপুজোর সম্পর্কে এক দুই কথা বলতে গেলেই প্রাক্‌-কথন টুকু না থাকলে অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে বিবরণ।

আরও পড়ুন: দিশি পুজো, বিলিতি হ্যালোইন (নিউ জার্সি, আমেরিকা)

ছবিমুড়া, এক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন। অমরপুর, ত্রিপুরা। ছবি: পার্থসারথি চক্রবর্তী

চতুর্থ ভুবনের বাঙালিরা তাদের অল্পস্বল্প আয়োজনের মাধ্যমেই স্বতন্ত্র এক সত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। পিতৃপুরুষের জন্মভূমিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন হৃদয়ের এক কোনায়। তাদের কথ্য ভাষা, দৈনন্দিন জীবনযাপন, আচার-সংস্কৃতি সব কিছুতেই রয়েছে ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব অনুভব এবং পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার স্বকীয়তা। এতক্ষণ যা যা লেখা হয়েছে, এগুলো সব অতিমারির আগেকার কথা। ১৯৪৯ সালে ভারত-ভুক্তির বহু আগে থেকেই তদানীন্তন রাজকুলের তরফে আগরতলায় দুর্গাবাড়িতে মহা ধুমধামের সঙ্গে সুসম্পন্ন হত। রাজকীয় ঐশ্বর্য এবং স্বয়ংশাসিত রাজ্য হিসেবে দুর্গাবাড়ির পুজোর সঙ্গে প্রভুর (রাজার গুরুদেব) বাড়ির পুজোর মাহাত্ম্য ছিল একদম স্বতন্ত্র।

এছাড়া রাজ পরিবারের বিভিন্ন কর্তাদের বাড়িতেও এই দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। আগরতলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতেও এই রকম ভাবে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। মূলত চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক থেকে  ক্রমশ বারোয়ারি পুজোর যাত্রা শুরু হয়।

আরও পড়ুন: কলকাতার প্রথম বারোয়ারি পুজো হয় বলরাম বসু ঘাটে

আগরতলা দুর্গাবাড়ির পুজো। ফাইল চিত্র

বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবভিত্তিক সর্বজনীন পুজোর আয়োজনগুলি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই পা ফেলতে ফেলতে বর্তমানে রাজধানী আগরতলার জয়নগরের যুবসমাজ ক্লাব, সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত, রামনগরের ব্লাডমাউথ ক্লাব, সংহতি, রামকৃষ্ণ ক্লাব, শান্তি পাড়ার ঐক্যতান যুব সংস্থা, স্মৃতি ক্লাব, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ক্লাব, রামঠাকুর সংঘ, প্যারাডাইস সামাজিক সংস্থা, টাউন ক্লাব, ইউবিএসটি, কৃষ্ণনগর বয়েজ ক্লাব, কসমোপলিটান ক্লাব, কর্নেল চৌমুহনী যুব সংস্থা, হারাধন সংঘ, পোলস্টার, কুঞ্জবন স্পোর্টিং, কুঞ্জবন বয়েজ ক্লাব, আগরতলা বিমানবন্দর সংলগ্ন ভারতরত্ন সংঘ, এই সমস্ত ক্লাবের পুজোর আয়োজন খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: অসমের নীলাচল পর্বতের দুর্গাপুজো

No description available.
আগরতলার রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গা। ২০১৮। ছবি: পার্থসারথি চক্রবর্তী

বাঙালির দুর্গাপুজোর শুরুর মুহূর্তের কিন্তু সূচনা হয়ে যায় বিসর্জনের লগ্নেই, ওই আসছে বছর আবার হবে স্লোগানে। নিত্যদিনের জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে মানুষ উৎসবের আয়োজন এবং পালনের জন্য বিন্দু বিন্দু করে সুখ জমাতে থাকে। পুজোর উৎসবে প্রত্যেকেই নিজের নিজের মৌচাকের মধু নিয়ে সমারোহের প্রাঙ্গণে হাজির হয়। গ্রাম পাহাড় থেকে রাজধানীতে নামে মানুষের ঢল। সারা ত্রিপুরা জুড়েই মাতৃবন্দনায় যে আয়োজন করা হয়, তা যেন রাজধানীর জৌলুসের কাছে ম্লান লাগে। তাই নামে জনঢল। ট্রেন, বাস, ছোট গাড়ি চেপে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসাহী জনতা, জাতি-জনজাতি নির্বিশেষে জড়ো হোন আগরতলায়। সরল-সাদাসিধে শান্তিপ্রিয় ত্রিপুরাবাসী তাদের দু’টাকা পাঁচ টাকার জীবনযাপনে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, অপেক্ষায় থাকে একটু আনন্দের! দুর্গাপুজোর মুহূর্তগুলিতে তাই রাজ্যজুড়ে আনন্দের ঢল নামে। ধনী গরিব নির্বিশেষে খুশি আর খুশি। বাড়িতে নিরামিষ খাবার খেয়েও রাত্তিরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে বিরিয়ানি মাংস ভক্ষণ। নিদেনপক্ষে কিছুই না পেলে এগরোল, মাংসের চপ খাওয়া। গাড়ি চলাচলের নিষেধাজ্ঞা মেনে প্রায় পুরো শহরটাই পায়ে হেঁটে চলা! পেটে খিদে, শরীর চলছে না, চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে! কিন্তু অন্তবিহীন পথে হাঁটার বিরাম নেই। সারাবছরের জন্য আনন্দের রসদ জমা করে নিতে হবে তো!

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ হাকিমপুরের শিকদার বাড়ির পুজোমণ্ডপের পাশে একটি মাঠে প্রতিবছর নামে অতিথিদের হেলিকপ্টার

তদেব। ছবি: পার্থসারথি চক্রবর্তী

এতক্ষণ যা বর্ণনা করলাম, এটা প্রাক্‌-মহামারির আনন্দযজ্ঞ। কিন্তু এবার মানুষের পকেটে টাকা নেই। রোজগারের সুযোগ ক্রমশ নিভু নিভু হয়ে আসছে। করোনার থাবায় আতঙ্ক রাজ্যজুড়ে। অতিমারির কারণে রাজ্যজুড়ে অশান্তির বাতাবরণ। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা  তরান্বিত করছে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে! সবমিলিয়ে নৈরাজ্য আর নৈরাশ্যের পটভূমিতে ত্রিপুরাজুড়ে বড়ই ম্লান মনে হচ্ছে এবারের পুজো। এ যেন উৎসব আনন্দের নয়। কত চেনামুখ অচেনা হয়ে গেছে। অনন্তের প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছেন তাঁরা। সেই সদা হাস্যমুখর মুখগুলোকে আর ফিরে পাব না। আজকের আবহে সকালগুলিকে রাতের চেয়েও অন্ধকার মনে হচ্ছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *