পুজোর খাবারের সুলুকসন্ধান

পারমিতা ভট্টাচার্য

‘খাই খাই করো কেন’
কী করবেন বলুন দেখি, বাঙালি যে, খেয়ে আর খাইয়ে ফতুর হতে ক’জন পারে বলুন তো? আর সে যদি হয় দুগ্গাপুজোর খাওয়াদাওয়া, তবে তো… মানে জিভের তলায় কেমন জানি একটা হচ্ছে বুঝলেন… গৌরচন্দ্রিকা না করে তবে আসল কথায় আসা যাক।  

পুজো তো শুরুই হয়ে গেল। এবছর যদিও বাইরে ঘুরে ঘুরে মণ্ডপ দর্শন হবে না আর তার সঙ্গে খাওয়াও হয়তো হবে না, তবুও বলা তো আর যায় না। বঙ্গ সন্তানকুল যেভাবে দূরত্ববিধি না মেনে বাজারহাট হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাতে সবই সম্ভব। এই দেখুন না, এই আমিই পুজোর সময় বেড়াতে বেরিয়ে বাইরে খাব নিশ্চিত। সে তালিকায় মিষ্টি থাকবেই। পুজো বলে কথা।  তাই শুরুই করি শেষপাতের মিষ্টির কথা দিয়ে। দুর্গাপুজোর সময় সকালে উত্তর কলকাতায় হানা দিলে মিষ্টির টানে পায়ে পায়ে পৌঁছে যেতেই হবে নকুড়ে। ঠাকুর দেখতে দেখতে যদি সিমলা স্ট্রিটে গিয়ে পড়েন তাহলে বিবেকানন্দের বাড়ির ঠিক পিছনেই আপনি নকুড়কে খুঁজে পাবেন, যার ভালো নাম গিরিশচন্দ্র দে ও নকুড়চন্দ্র নন্দী। হেদোর উলটো দিকে বেথুন কলেজের পাশে চার্চের গা ঘেঁষেও পৌঁছে যেতে পারেন  রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে, অনাড়ম্বর সজ্জায় সজ্জিত নকুড়ে। এই দোকানের বিশেষত্ব শুধু হরেক স্বাদের সন্দেশকে কেন্দ্র করে। বলরাম মল্লিক ফেল করে যাবে এদের গুণগত মানের কাছে। ইচ্ছে হলে পাশের গলিতেই মান্না দে-র বাড়িও দর্শন করে আসতে পারেন।

আরও পড়ুন: পুজোয় ভিন্ন ধরনের স্বাদ নিতে বানিয়ে ফেলুন মুসুর ডালের দম পোলাও

গোটা উত্তর কলকাতাই আসলে বনেদি খাবার-দাবারের আঁতুড়ঘর। এই চত্বরে বনেদি বাড়ির পুজোগুলো দেখতে গিয়ে সাবেক কলকাতার প্রসিদ্ধ খাবার দোকানে ঢুঁ দেওয়া যেতেই পারে। শোভাবাজারে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়ির পুজো দেখতে গেলে মেট্রো স্টেশনের কাছে ‘মিত্র ক্যাফে’ও নিশ্চয়ই বাদ পড়বে না। এখানে এখনও ২ টাকা দামের চিকেন স্ট্যু পাওয়া যায়। এ ছাড়া, চিকেন আফগানি, মাটন কবিরাজি আর বিখ্যাত ব্রেনচপ যে না খেয়েছে, তার বাঙালি জন্ম বৃথা। ওই অঞ্চলে আরও কিছু ভালো মোগলাই খাবারের দোকান আছে যেমন— নিরঞ্জন আগার, অ্যালেন্স কিচেন প্রভৃতি। তবে পুজোর সময় একটু দেখেশুনে খাওয়াই ভালো। আরও কিছু এই জাতীয় রেস্তরাঁর হদিস জানিয়ে দিই— দিলখুশা কেবিন (কলেজ স্ট্রিট), নিউ মালঞ্চ, মামার দোকান (হাতিবাগান)। না, ঝাঁ-চকচকে পরিবেশ এসব জায়গায় পাবেন না, কিন্তু খাবার এক নম্বর।

আরও পড়ুন: পুজোয় বাইরের খাবার না খেতে চাইলে বাড়িতে বানান কাবাবি ডিম-আলুর চপ

পুজোর চারটে দিন এরকম নানান খাবার-দাবারের স্বাদে গন্ধে আমরা মোহিত হয়ে থাকি। আচ্ছা, সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে মণ্ডপ-সংলগ্ন ছোটছোট স্টল থেকে নিশ্চয়ই খান। সে ম্যাডক্স স্কোয়ার, সমাজসেবী, একডালিয়া বা যোধপুর পার্কই হোক বা চালতাবাগান, কলেজ স্কোয়ার, আহিরীটোলাই হোক— ঠাকুর দেখতে দেখতে টুকটাক পেট ভরানো চলতেই থাকে। আর লাঞ্চ বা ডিনার সারতে হলে নানান মানের ও নানা দামের হোটেল তো আছেই। হোটেলের বাইরে লম্বা লাইন দিয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা… ভজহরি মান্না, ওহ ক্যালকাটা, কস্তুরী, ৬ বালিগঞ্জ প্লেস, সুরুচি, এমন কত আরও… বাব্বা,  কি দাপট!

আরও পড়ুন: পুজোর বিকেলে চায়ের সঙ্গে মুচমুচে নুডলস পাকোড়া

দাপট হবে না? দাম তো কিছু কম নেহি, কম নেহি… তবে একটা উপায় এসব বুটিক রেস্তরাঁগুলো করেছে আমাদের জন্য। ধরুন রসনা তৃপ্তির ঠেলায় আপনি ঢুকেই পড়লেন এই জাতীয় কোনও রেস্তরাঁয়। খাবার অর্ডার করার সময় মূল্যাঙ্ক যাতে আপনার বক্ষপীড়ার কারণ হয়ে না ওঠে, তার জন্য খাবারের তলায় দাম, সংখ্যার বদলে কথায় লেখা থাকে। আর এক একটা খাবারের যা বিদঘুটে নাম, তাতে করে ওখানেই আপনি কুপোকাত হতে বাধ্য। তাছাড়া, প্লেটে যে পরিমাণ খাবার আসবে, তাতে মুষড়ে পড়লে চলবে না। তাই কবজি-ডোবানো লোকের ও রাস্তা না মাড়ানোই ভালো। তবে কেউ যদি আপনাকে ওসব স্থানে নিমন্ত্রণ পাঠায় বা অফিসের মিট, সেমিনার উপলক্ষে যেতে হয়, তাহলে মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে পৌঁছে গেলেই হল।

মিত্র কাফের বিখ্যাত ব্রেন চপ

বালিগঞ্জ প্লেসের ৬ নম্বর বাড়ি, ‘গপশপ’ নামে একটি নতুন আউটলেট খুলেছে অ্যাক্রপলিস মল ও লেক মলে। পুজোর সকালে আড্ডা জমিয়ে তুলতে যদি যান, এখানে পাবেন রাধাবল্লভি, ছোলার ডাল, কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুর দম, মাছের চপ, মাছের পকোড়া, চিংড়ির কাটলেট, মৌরলা মাছের পেঁয়াজি, মুরগির আফগানি কাটলেট, ডিমের ডেভিল, মোচার চপ, ককটেল সিঙাড়া এরকম দারুণ কিছু পদ। নানা মুখরোচক ও ফিউশন খাবার সহযোগে আড্ডার আর একটি দারুণ জায়গা দক্ষিণ কলকাতার গান পয়েন্ট কাফে ও মাড কাফে।

৬ বালিগঞ্জ প্লেসের থালি

দুপুরের খাওয়ার জন্য একটি বহু পুরনো রেস্তরাঁর উল্লেখ করছি, যেটি সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত। ঠিক ধরেছেন, ইলিয়ট রোড স্থিত বিধানচন্দ্র রায়ের স্মৃতিধন্য ‘সুরুচি’। আমিষ, নিরামিষ বাঙালি থালি ছাড়াও এখানে বিশেষ আকর্ষণীয় খাবার হল— ভেটকি চপ, ভেটকি পাতুরি, ইলিশ চচ্চড়ি, মাছের মাথা দিয়ে বাঁধাকপি, সর্ষে পাবদা, বাগদা চিংড়ির বাহার, কচি পাঁঠার ঝোল, গাছ পাঁঠার কালিয়া, মোচার চপ আর মিষ্টিতে রসমুণ্ডির পায়েস ও গোকুল পিঠে। চাইলে লুচিও পাবেন।

সুরুচি-র রসনা

এত খাবারের নাম তো দিচ্ছি, কিন্তু এবছর সর্বত্র লোকসানের বাজার। বলতে পারেন এ একরকম মানস-ভোজন আর কি! তাই পুরনো দিনের কথা মনে করেই সান্ত্বনা খোঁজা, এই আর কি!

সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি

২০১৮ সালে সপ্তমীর দিন গিয়েছিলাম বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে। বেহালা অঞ্চলের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো দিয়ে পরিক্রমার সূচনা হয়েছিল। তখন জেনেছিলাম দশমীর দিন বিদায়ের আগে মাকে যা যা ভোগ দেওয়া হয়, সবই এই বাংলার মানুষের রোজকার সাধারণ খাবার। তার মধ্যে থাকে পান্তা ভাত, খেসারির ডাল, কচু শাক, কই মাছের ঝাল আর চালতার অম্বল। এসব খাইয়ে বিদায় জানানো হয় ঘরের মেয়েকে।

Durga Puja of Shovabazar Raj Bari – A photographer's Scrapbook…
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গা। ফাইল চিত্র

শোভাবাজার রাজবাড়িতে আবার অন্নভোগের চল নেই। পরিবর্তে নানা ধরনের মিষ্টি মণ্ডা প্রভৃতি দেওয়া হয়। গরুর গাড়ির চাকার আয়তনের বিশাল বড় বড় থালায় থাকে মিঠে গজা, চৌকো গজা, পৈরাগি, পান্তুয়া, সিঙাড়া, রাধাবল্লভি, কটকটি, মোতিচুর ও দুধ-সাদা ম্যামথ লাড্ডু। ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়ি পুজোর ভোগ আবার রান্না হয় নুন ছাড়া। পাথুরিয়াঘাটা ঘোষ বাড়ির পুজোয় মাকে নিবেদন করা হয় চন্দনা ক্ষীর, কেশর রাবড়ি, নিমকি, সিঙাড়া, চন্দ্রপুলি, রাজভোগ, জলভরা তালশাঁস সন্দেশ। দর্জি পাড়ার মিত্র বাড়ির ভোগেও লবণ ছাড়া ভাজা সবজি ও ঘিয়ের লুচি প্রধান পদ। এছাড়া থাকে পোস্ত, পালংশাক, বিভিন্নরকম ডালের বড়ি এবং নানাবিধ আচার। সমস্ত বাড়ির পুজোর মিষ্টি কিন্তু বাড়িরই ভিয়েনে তৈরি হয়।

দুর্গাপুজোর ভোগ প্রসাদ। ছবি ইন্টারনেট

প্রায় কোনও বাড়ির পুজোতেই  এখন আর বলি হয় না। একবার প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্রর বাড়িতে চালকুমড়ো বলি দেখেছিলাম। এভাবেই চারটে দিন রসে বশে রেখে মা যাত্রা করেন কৈলাসে। এসে পড়ে বিজয়া। কোলাকুলি, প্রণাম ও মিষ্টি আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে বিজয়ার দিনগুলো কাটে। এখন অবশ্য এসবের পাট চুকেছে, মুঠোফোনেই সেরে ফেলি বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়, মায় প্রণাম পর্যন্ত। খুব কম বাড়িতে তৈরি হয় বিজয়ার মিষ্টি, যেমন, নারকেল নাড়ু, নারকেলের ছাঁচ, নিমকি, লাড্ডু, জিভে গজা ইত্যাদি।

ছবি ইন্টারনেট

পুজোয় খাওয়া বলতে সবচেয়ে ভালো বাড়িতে রান্না করে খাওয়া আর সঙ্গে জমাটি আড্ডা। মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল, সঙ্গে লম্বা বেগুন ভাজা, পাতে গন্ধরাজ লেবু দিন। এরপর মাছের কোনও একটি বা দু’টি পদ বেছে নিন— কাতলা কালিয়া, তেল কই, চিতল মুঠির রসা, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, পার্শে মাছের ঝাল, ইলিশ বা ভেটকি পাতুরি, সবশেষে কচি পাঁঠার কষা মাংস, অন্যথায় গন্ধরাজ মুরগি। শেষ পাতে চাটনি, মাখা সন্দেশ, রসগোল্লা, দই… আহা হা… পুরোদমে বাঙালি থাকুন না চারটে দিন। পাশ্চাত্য ও অবাঙালি সংস্কৃতির মিশেল ঘটার আগে উৎসব উপলক্ষে এরকম খাওয়া-দাওয়াতেই অভ্যস্ত ছিল বাঙালি।

ছবি ইন্টারনেট

পুজোর সময় অষ্টমীর দিন তো সব ঘরেই প্রায় নিরামিষ রান্না হয়। বাড়ির বা পাড়ার পুজো হলে মায়ের ভোগ। নয়তো সুক্তো, ডাল, লাবড়া, মোচার ঘণ্ট, ছানার কালিয়া, ধোকার ডালনা প্রভৃতি নানা পদ। নবমীতে পাঁঠার মাংস, কোনও কোনও বাড়ির পুজোয় বলির মাংস রান্না হয়, পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া। কালীঘাটে থৌকা দরে বলির মাংস বিক্রি হয় এখনও। নিয়ম ওই, আদা জিরে বাটা দিয়ে ঝোল… বড়ই উপাদেয়।

এবছর মানুষ বড়ই আতান্তরে পড়েছে, স্মৃতির সরণি বেয়ে এভাবেই হাঁটতে হবে এবছর, বরং বলা ভালো আগামী বেশ কিছু বছর। শুভ কামনা রইল সকলের জন্য, ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *