বাংলাদেশ সুনামগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো

পার্থ মল্লিক

সময়টা ১৪১৭ বঙ্গাব্দ, খ্রিস্টাব্দের ২০১০। এই শহর আমার কাছে পুরোটাই নতুন। সুনামগঞ্জ জেলার অধীন এই উপজেলা শহরের নাম ধর্মপাশা। তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। বাবার কাজের সুবিধার্থে এই শহরে আসা। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই ধর্মপাশা জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানেই আমার বেড়ে ওঠা, গড়ে ওঠে বন্ধু-বলয়। আজও আমি এই শহরের একজন মানুষ। এই শহর, এই শহরের মানুষগুলো এক মায়ার বন্ধনে আমায় বেঁধে রেখেছে।

এখানে সকলেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে। কারও মাঝে কোনও ভেদাভেদ নেই। এখানে প্রতিটি উৎসব সকলের অংশগ্রহণে আরও রঙিন হয়ে ওঠে। তেমনি শারদ উৎসবও এর বাইরে নয়। যখন নদীর ধারে কাশফুল হেসে ওঠে, শরতের নীল আকাশে হেসে ওঠে শুভ্র মেঘের দল, ঠিক তখন মায়ের আনন্দে এখানে প্রতিটি মানুষ হেসে ওঠে। প্রতিটি মানুষ সেজে ওঠে বর্ণিল সাজে। নতুন আলোয় ভরে ওঠে প্রতিটি মানুষের প্রাণ।

ধর্মপাশা সদরে প্রতিবছর ৪-৫টি মণ্ডপে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। এর বাইরে গ্রামে-গ্রামে অগণিত পুজোমণ্ডপ রয়েছে। সেখানেও প্রতিবছর অনাড়ম্বরভাবে পুজোর আয়োজন করা হয়। এখানে অধিকাংশ পুজোই বিভিন্ন সংঘ ও কমিটি আয়োজন করে। তবে এখানে পারিবারিক পুজোও রয়েছে।

No description available.

শুধু ধর্মপাশাতেই নয়, আমার দেখা শ্রেষ্ঠ দুর্গাপুজোগুলোর মধ্যে ধর্মপাশা চৌধুরী বাড়ির মণ্ডপে আয়োজিত পুজোটি অন্যতম। কারণ এটি কোনও সাধারণ পুজো নয়। এই পুজোর সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ঐশ্বর্যশালী এই চৌধুরী বাড়ির পুজোতে শুদ্ধ রীতিনীতি মানা হয়। যা আমি খুব কমসংখ্যক পুজোয় খুঁজে পেয়েছি। এই পুজোটি আমার কাছে শ্রেষ্ঠ পুজো হওয়ার এটি একটি অন্যতম কারণ।

No description available.

ঐতিহ্যবাহী এই চৌধুরী বাড়িতে শারদীয় দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন স্বর্গীয় শ্রী বৈদ্যনাথ চৌধুরী মহাশয়। তিনি ১২৬৬ বঙ্গাব্দে দুর্গাপুজো ও মণ্ডপ প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক এই পুজোটির বয়স একেবারে কম নয়। দীর্ঘ ১৬১ বছর ধরে, আজও সকলের অংশগ্রহণে সাফল্যের সঙ্গে এই পুজোটি হয়ে আসছে। বর্তমানে পুজোটির দেখাশোনা করেন, শ্রীপীযূষকান্তি চৌধুরী মহাশয়। স্বর্গীয় শ্রীবৈদ্যনাথ চৌধুরী মহাশয়, যিনি শ্রীপীযূষ কান্তি চৌধুরী মহাশয়ের প্রবৃদ্ধ-পিতামহ (ঠাকুরদার ঠাকুরদা)।

শ্রীপীযূষকান্তি চৌধুরী মহাশয়ের পুত্র শ্রীদেবাশীষ চৌধুরী মহাশয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পুজো-মণ্ডপে পাক-হানাদার বাহিনী অগ্নিসংযোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার চেষ্টা করার পর তারা ব্যর্থ হয় এবং মণ্ডপটি অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। তখন স্বচক্ষে অনেকেই এই বিষয়টি দেখেছেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা যায়নি।

No description available.

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, শ্রীপীযূষকান্তি চৌধুরী মহাশয় মন্দিরের সংস্কার কাজ করে মন্দিরটি পুনর্স্থাপন করেন। এই পুজোয় প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীরা প্রতিমা দেখতে আসেন। পুজোর মূল তিনদিন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে প্রতিদিন ভক্তদের জন্য প্রসাদের আয়োজন করা হয়। আমার প্রত্যাশা, চৌধুরী বাড়ির পরবর্তী প্রজন্ম এই পুজোর সকল রীতিনীতি ও তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *