কাটোয়ার জাগ্রত দেবী মহামায়ার সুপ্রাচীন এবং স্বপ্নাদিষ্ট ‘হাড়িবাড়ির দুর্গাপুজো’

পার্থ কর

কাটোয়ার সুপ্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে বেশ এগিয়ে থাকবে পঞ্চাননতলার হাড়িবাড়ির পুজো। বেশ কিছু বিশেষত্ব এবং মিথ নিয়ে নিয়ত এগিয়ে চলেছে এই হাড়িবাড়ির দুর্গাপুজো। পঞ্চাননতলার রাস্তার একেবারে গায়েই বেশ বড় দুর্গামন্দির, মূল মন্দিরের সামনে ভক্তদের জন্য প্রশস্ত ছাদযুক্ত ফাঁকা জায়গা এবং পেছনে পারিবারিক বসতবাটী।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গোৎসব: ঐতিহ্যের ২৮৬ বছর

মন্দিরের শিবনাথ হাজরার সঙ্গে প্রতিবেদক

পুজোর প্রাচীনত্ব নিয়ে নানারকম গল্প চালু আছে— ‘গল্প’ই বলতে হবে, কারণ আসল সত্য জানার আর উপায় সম্ভবত নেই। পুজোর উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মত শোনা যায়। একটা মত অনুযায়ী, ইংরেজ আমলে কাটোয়ায় অনেক নুনের ব্যবসায়ীরা আসতেন। তাঁদেরই উদ্যোগে এবং চাহিদা মতে, বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল দেহব্যবসার কেন্দ্র। কাটোয়ার ঐতিহ্যপূর্ণ কার্তিক পুজো এবং কার্তিক লড়াই আসলে তখনকার যৌনকর্মীদের দ্বারাই সূচিত হয়েছিল বলে সকলেই একমত। একটা প্রচলিত মত অনুযায়ী, এই হাড়িবাড়ির এক যৌনকর্মী দ্বারা কার্তিক পুজোর পরিবর্তে দুর্গাপুজোর সূচনা ঘটে।

কিন্তু অন্যান্য মতামত এ কথা স্বীকার করে না। কাটোয়া নিবাসী নাট্যকর্মী ও শিক্ষক শ্রীকৌশিক মুখোপাধ্যায় জানালেন, হাড়ি সম্প্রদায়ের মহিলারা দাইমা হিসেবে কাজ করতেন। এটাই ছিল তাঁদের ‘জাতব্যবসা’। তবে এই পুজো কীভাবে তাঁরা শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ নেই বললেই চলে। এ বিষয়ে সকলেই মোটামুটি একমত যে, স্বপ্নাদেশ থেকেই হাড়িবাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা। মন্দিরের সেবায়েত শিবনাথ হাজরা মহাশয় জানালেন, এই পুজো অন্তত ৫০০ বছরের প্রাচীন পুজো। এই পরিবারেরই একজন পূর্বপুরুষ প্রথম স্বপ্নাদেশ পান পুজো করার জন্য। মন্দিরের সেবায়েত শিবনাথবাবুর কথায়— একদিন এই পরিবারের সেই প্রাচীন মানুষটি, যিনিও একজন দাইমা ছিলেন, দাওয়ায় বসেছিলেন দুপুরে স্নান করার পর। হঠাৎ একজন মহিলা তাঁর ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসে তাঁদের কিছু খেতে দিতে বলেন। কিন্তু তাঁদের তখন এতই অভাব যে, সেই পান্তাভাত ও গতরাতের কিছু বাসি তরকারিই ছিল দুপুরের খাবার জন্য। তা জানালে সেই মা তাই খেতে সম্মত হন। তখন পূর্বোক্ত মহিলা বলেন, “একটু অপেক্ষা করুন, আমি ঘর থেকে নিয়ে আসছি।”

আরও পড়ুন: অর্থের অভাবে উত্তর কলকাতার ১২০ বছরের পুরনো বনেদি বাড়ির পুজো অনিশ্চিত

শিবনাথ হাজরা ও তাঁর মেয়ে পম্পা হাজরা

ঘরের ভিতরে গিয়ে খোঁজাখুঁজি ক’রে কোনও মতে সেই সামান্য খাবার জোগাড় ক’রে তিনি বাইরে এসে দেখেন, কেউ কোথাও নেই। এমনকী আশপাশে কোত্থাও তাঁদের কোনও চিহ্ন নেই। তিনি সেই রাতেই স্বপ্ন দেখেন, দেবী দশভুজা বলছেন, “আমি যে তোর সামনে দিয়ে ঘুরে এলাম, তুই আমাকে চিনতে পারলি না! আমি দেবী মহামায়া। তুই আমার পুজো শুরু কর।”

কিন্তু এই অসহনীয় অভাবের মধ্যে তিনি কীভাবে পুজোর আয়োজন করবেন জানতে চাওয়ায় দেবী তাকে নির্দেশ দেন, কোনও মতে শুধু নিয়মটুকু মেনে ফুলজল দিয়ে দেবীর আরাধনা শুরু করতে। সেই থেকে এই পুজো শুরু। তারপর এই পুজো আয়োজন, কলেবরে ও উৎসবের আড়ম্বরে উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পুজো শুরু করার কথা আস্তে আস্তে কাটোয়া ছাড়িয়ে দূর দূর গাঁয়েগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে মানুষজন এই পুজোয় অংশ নিতে শুরু করেন… অংশ নেওয়া বলতে— তাঁরা সরাসরি এই পুজোর শ্রীবৃদ্ধির জন্য আর্থিক অনুদান ও অন্যান্য অনুদান দিতে শুরু করেন। সেইসঙ্গে শুরু হতে থাকে দেবীর কাছে বিভিন্ন রকম মানত করা। তখন থেকেই জানা যায় হাড়িবাড়ির এই দেবী অত্যন্ত ‘জাগ্রত’ এবং মানতকারীরা কেউই বিফলমনোরথ হচ্ছেন না। বর্তমানে মন্দিরের শ্রীবৃদ্ধির একটা অন্যতম কারণ এই মানতকারীদের অনুদান।

শিবনাথবাবু জানালেন, এখন অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ট্রাক ভর্তি ফল আসে পুজোর জন্য। দই মিষ্টি পরিমাণও নেহাত ফেলনা নয়। মানতকারীদের জন্য ধুনুচি নাচের ব্যবস্থা করা হয় এবং সেও দেখার মতো। একচালার এই প্রতিমার সৌন্দর্যও অনন্য। বিসর্জনের পর পরই একটা নির্দিষ্ট তিথি দেখে কাঠামো তুলে মাটি ধরিয়ে প্রতিমার পুনর্নির্মাণ হয় এবং ভক্তদের উৎসর্গীকৃত দামি ও জমকালো শাড়ি মাকে অল্প সময়ের ব্যবধানে পাল্টে-পাল্টে পরানো হয় বছরভর। সেবায়েত জানালেন, এইভাবে কোনও কোনও বছরে মায়ের দুই-তিনশত শাড়ি পরা হয়ে যায়। পুজোর জন্য আয়োজকরা কোথাও চাঁদা চাইতে যান না। ভক্তরাই যেচে এসে পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় অনুদান দিয়ে যান।

প্রাচীনত্ব এবং পুজোটির এইসব বিশিষ্টতার কথা জানতে পেরে এখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিনিয়ত মন্দিরে আসে এবং খোঁজখবর নেয় বলে শিবনাথবাবু জানিয়েছেন। তবে পুজোর প্রথম উদ্যোক্তা এবং সেবায়েতের নাম নথিভুক্ত না-করা থাকায় তা আর উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুজো আছে, থাকবে এবং স্বমহিমায় তার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *