স্মৃতির ভেলায় চড়ে বাঁকুড়ার বড়চাতরা গ্রামের দুর্গাপুজো

শ্রদ্ধা ঘোষ

গ্রামটির নাম বড়চাতরা, বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত। আমার গ্রাম। ছোট্ট গ্রাম, শালী নদীর তীরে অবস্থিত। বেশি বড় না হলেও ক্ষুদ্র সীমারেখার মধ্যেই গ্রামটি পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। গ্রামের প্রতিটি অলিতে-গলিতে, লাল মাটির আঁকেবাঁকে, আটচালা, খেলাপ্রাঙ্গণ, সাজঘর, ঠাকুর দালানের প্রতিটি কোনায়-কোনায়, আনাচে-কানাচে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কত রং-বেরঙের স্মৃতি, আরও হারিয়ে ফেলা কতকিছুই যেন না-থেকেও থেকে গেছে। এখানের মাধুর্য, নিত্য-নৈমিত্তিক কাজের মধ্যেও গ্রামবাসীর নিজেকে একে অপরের কাছে প্রকাশ করার ধরন, সমস্ত ক্ষুদ্রতা, হীনতা, ক্লীবতার গণ্ডি অতিক্রম করে নিজেকে নতুনভাবে অপরের মধ্যে খুঁজে পাওয়া, প্রাণধারণের গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়ে নতুনভাবে বেঁচে থাকা, এই সমস্তকিছু এক অনন্য সমারোহ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে। গ্রামের মাঝে প্রহরীর মতন দাঁড়িয়ে আছে এক বিরাট, প্রাচীন বটগাছ। দক্ষিণপ্রান্তে বড় দিঘি, যেখানে শাপলা, শালুক ও পদ্মের ঢল। অদূরেই নদীর ঘাট, নৌকা-নোঙরে করে মানুষজন এখানে আসেন। এছাড়াও গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় রয়েছে শিবমন্দির, যেখানে সকাল থেকে পুজোর জন্য অনেক মানুষ আসে। শতাব্দী প্রাচীন মহাপ্রভুর মন্দির, যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক হরিনাম সংকীর্তন হয় ও রাত্রিবেলা অবসর বিনোদন। বিবর্তনে কালের নীরব সাক্ষী হিসেবে এরা এখনও বিদ্যমান। প্রবাহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছুই পাল্টে গেলেও বছরের এই চারটে দিনের আনন্দ-উল্লাস, হই-হুল্লোড় একই রকম রয়ে গেছে, একটুকুও ভাটা পড়েনি কোনওদিনও। মনের জানালা খুলে সবাই আনন্দে মেতে উঠি এই চারটে দিনে।

আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের চন্দনকেয়ারির কুরমিটোলার দুর্গাপুজো

বছর ঘুরে খুশির মেজাজ, হই-হুল্লোড়-লুকোচুরির খেলা
মা যে এলো বছর ঘুরে, আনন্দে কাটুক শারদবেলা।

পুজোর একমাস আগে থেকে মণ্ডপ তৈরির ঠুকঠাক শব্দ, প্যান্ডেলের বাঁশের ধুপধাপ শব্দে দুপুরের ঘুম ছুটে যায়, বলা বাহুল্য কর্পূরের মতন উবে যায়। কে, কোন দিন, কী জামা পড়বে, কে, কী দায়িত্ব নেবে, আরও কতরকমের পরিকল্পনা! অবশেষে শিল্পীর হাতের জাদুতে, কাঠামোতে কাদামাটি ও রংতুলির স্পর্শে দশভুজার সাজে সেজে ওঠে মা। নদীর কুলুকুলু শব্দ, মাঝেমধ্যে ঢাকের আওয়াজ, বাড়ির ঈশান কোণে বছর দশেকের পুরনো, নুয়ে পড়া শিউলি গাছটা, রাস্তার দুইধারে কাশফুলেরা বায়ুর আলিঙ্গনে হেলেদুলে, নেচে ওঠে, আগমনীর বার্তা নিয়ে আসে প্রতিটি ঘরে ঘরে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলায় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া— দেবীপক্ষের সূচনা, আর তারপরেই হাতেগোনা আর কয়েকটা মাত্র দিন। ‘মা আসছে’।

গ্রামে ঢুকতেই ডানদিকে তুলসী মঞ্চের কাছে, মনসা মন্দিরের পাশেই ঠাকুর দালান। দুইশত বছরের পুরনো বনেদি বাড়ির পুজো হলেও গ্রামের সবাই অভিন্ন হৃদয় নিয়ে একত্রিত হয়েই পুজোর এই চারটে দিন মেতে উঠি। আশপাশের গ্রামের মানুষজন, এমনকী বাইরে থেকেও প্রচুর মানুষজন আসেন গ্রামে। পুজো দেখেন। আরতি দেখেন। ভোগ খান। চেনা মানুষদের মাঝে এই অচেনা মানুষদের সমাগম, তাঁদের ভক্তিরীতি, ভাব-ভালোবাসা, সহজেই সবার সঙ্গে মিশে আপন করে নেবার ক্ষমতা, এই সবকিছুই পুজোর আনন্দ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে। এই আনন্দের বহির্প্রকাশশ ভাষায় সীমাবদ্ধ করা সম্ভব না।

সত্যিই, পুজোর এই চারটে দিন যেন সবথেকে সুন্দর, সবকিছুর থেকে আলাদা, অন্য সমস্তকিছুকে ছাপিয়ে যায়। আশ্বিনের শারদপ্রাতে মায়ের চক্ষুদান থেকে শুরু করে ষষ্ঠীতে বোধন। তারপর বিশেষত, সপ্তমীর সকালে নতুন জামাকাপড় পরে একসঙ্গে মিলিত হওয়া, চেনা-শোনা, জানা-অজানা নানান মানুষের ভিড়ে ঢলে পড়া। ঢাকের তালে, কাশের দোলা, উলুধ্বনি, ঘণ্টাধ্বনি, কাঁসরধ্বনি, শঙ্খধ্বনি সহযোগে নবপত্রিকা স্নান, তারপর মহস্নান, দোলা নিয়ে আসা, একশত-আট পদ্মের সঙ্গে মায়ের আরাধনা। অষ্টমীর দিন কুমারী পুজো, সন্ধিপুজো এবং সেই শুভক্ষণে সবাই মিলে শাড়ি ও পাঞ্জাবি পড়ে, শুদ্ধ চিত্তে, ভক্তিভরে মাকে অঞ্জলি দেওয়া। নবমীতে সন্ধ্যারতি, শত প্রদীপ জ্বালিয়ে মায়ের বরণ এবং প্রসাদ বিতরণ। দশমীর দিনে দোলা ভাসানো, মায়ের বিদায় বেলায় মা-কাকিমাদের লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে বিবাহিতাদের সঙ্গে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠা এবং বিসর্জন শেষে বড়দের বিজয়ার প্রণাম জানানো, মিষ্টিমুখ করা। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও ‘আসছে বছর আবার হবে’ এই বলে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে মাকে বিদায় জানাতে হয়।

বিদায় বেলায়, সিঁদুর খেলায়, নোনতা জলে বিষণ্ণতা
‘আসছে বছর আবার হবে’, শুধুই পরিযায়ী অপেক্ষা।

সবার এই উৎসব যে শুধু পুজোতেই সীমাবদ্ধ থাকে তাই নয়, প্রতিদিন নিত্যনতুন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। এইসব অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও রিহার্সাল চলে দশ-বারো দিন আগে থেকে। ষষ্ঠী থেকে দশমী অবধি কোন দিন কী অনুষ্ঠান হবে, কে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে, অনুষ্ঠানের সময়সূচি, আরও কত কি! তার হাজার রকম প্ল্যানিং। এসব আনন্দের বহির্প্রকাশশকে এক আলাদা মাত্রা দেয়। যেমন— নাচ, গান, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, নাটক, কুইজ প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন দলের মধ্যে ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ, ক্যারম খেলা, মিউজিক্যাল চেয়ার, তাসের আসর, আরও কত কি! সঙ্গে বন্ধু-বান্ধবী, ভাই-বোন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দিনরাত এক করে আড্ডা, খুনসুটি, গল্প-গুজব, জমজমাটি পরিবেশ। ক্যামেরাবন্দি অনেক মুহূর্তরা। মায়ের আশীর্বাদ, ভেদাভেদহীন নিখাদ ভালোবাসা আর একই সূত্রে গাঁথা অভিন্ন হৃদয়। এসবের মধ্য দিয়েই কী করে যে চারটে দিন নিমেষের মধ্যে পেরিয়ে যায়, বোঝাই যায় না। পরে সেই সমস্তকিছু নিয়ে স্মৃতিচারণা। লেগে থাকে শুধুই বিষাদের সুর।

ছোট্ট গ্রাম যেখানে ভালোবাসার সংজ্ঞা, বন্ধুত্বের সংজ্ঞা, ঐতিহ্যের সংজ্ঞা, পুজোর আনন্দ, আড্ডা, গল্প, খুনসুটি, জানা-অজানা হৃদয়ে আনন্দের বহির্প্রকাশ, বিষাদের সুর, ‘আসছে বছর আবার হবে’ কলরব, সর্বোপরি অভিন্ন হৃদয়, স্নেহ-মায়া-মমতা ও নিখাদ ভালোবাসার উদ্ভাস সমস্তকিছুই অন্তর্নিহিত আছে। সমস্তকিছুই এখান থেকে, সবার হাত ধরে, ভালোবেসে শেখা। অন্তহীন অপেক্ষা শেষে, আবার কোনও স্নিগ্ধ শরৎ সকালে, ঢাকের তালে, শিউলির সুবাসে, বায়ুর আলিঙ্গনে কাশের দোলায়, সবাই অভিন্ন হৃদয় ও ভেদাভেদহীন নিখাদ ভালোবাসা নিয়ে ঠাকুর দালানের প্রাঙ্গণে মিলিত হব। কারণ— ‘মা আসছে’। থাকব সবাই অপেক্ষাতে একটি বছর ধরে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *