ঝাড়খণ্ডের চন্দনকেয়ারির কুরমিটোলার দুর্গাপুজো

রীনা ভৌমিক

একটা শরৎ আকাশ পাঁজাতুলো বিছাচ্ছে। নাক কুঁচকে ঘ্রাণ নিই। বাতাসে ‘যা দেবী সর্বভুতেষু’র মিঠেল গুনগুন। মারিকালকে তুড়ি মেরে একরাশ উচ্ছ্বাস দরজায় কড়া নাড়ছে দুদ্দাড়। এসো, বাঁচাকে সেলিব্রেট করি। একটা মহান জেদের ছায়ায় দু-দণ্ড চুপ কথার চাটাই বিছাই।

ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলার বৃহৎ প্রখণ্ড বা ব্লক এই চন্দনকেয়ারি। বেশ ক’টা গ্রাম বুকে নিয়ে মফস্‌সল চন্দনকেয়ারি বিন্দাস। সবুজে ছয়লাপ। একটু আধুনিকতার উগ্রতা থেকে পিছিয়ে থাকলেও গল্পের রুনুঝুনুতে এককাঠি এগিয়ে।

আরও পড়ুন: বীরভূমের বিপ্রটিকুরী গ্রামের দুর্গা

সারথি মাহাতাইন

কথা বলছিলাম, কুরমিটোলার দুর্গাপ্রতিমা প্রতিষ্ঠাত্রী সারথি মাহাতাইনের সঙ্গে। স্বর্গীয় বদীরাম মাহাতোর স্ত্রী। অকর্মণ্য স্বামীর কারণে অভাবী সারথি সুদামডিতে মোলা (কয়লার ডাস্ট), শ্মশানে মশানে পোড়া কয়লা কুড়িয়ে তা বিক্রি করে সংসার চালাত। দুই মেয়ে। তাদের ভরণপোষণ। তারপর তাদের ‘বিক্রি’ করতে হবে না? বিক্রি মানে বিয়ে। সেবার দুর্গাপুজোর সময় উপোস করে কয়লা কুড়োতে গেল সারথি। মনে খুব কষ্ট। সন্ধ্যায় চন্দনকেয়ারির সাবেকি দুর্গা মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে ভর হল। কেউ তাকে সামলাতে পারে না। গ্রামাঞ্চলে ঢাকের আওয়াজে অনেক মহিলার ভর হতে দেখা যায়। কিন্তু এ তেমন নয়। সারথির কথায়, মা বারবার ষোলোআনার পুজো চাইছেন। বাড়ি এসে সারথি স্নান করে কিন্তু খায় না। কিংবা যৎসামান্য আহার করে। দিনরাত ঘোরে চেঁচায়, আমাকে এই টোলায় ষোলোআনা মিলে পুজো দে।

সারথির অবস্থা দেখে মেয়েরা ভয় পায়। তখন বদীনাথ গত হয়েছে। তারা তাদের দূরসম্পর্কের জ্যাঠা অশ্বিনী মাহাতোকে ডেকে আনে, যিনি ঝাড়ফুঁক জানেন। সারথিকে ঝাড়ফুঁক করে জিজ্ঞাসা করা হয়, সে কেন এমন করছে? সারথির এক কথা। অশ্বিনী বললেন, দুর্গাপুজোর জন্য অনেক জোগাড় চাই। অনেক পয়সার দরকার। ষোলোআনার দ্বারা হবে না। দুর্গাপুজো ছেলেখেলা নয়। সারথিকে এই জেদ ছাড়তে হবে।

চুপ করে ভাবছিলাম, কখনও কখনও ইতিহাস আগ বাড়িয়ে জীবন ছুঁয়ে যায়। তাই বোধহয় বাধা পেয়ে সারথির জেদ তীব্র হয়। ষোলোআনা অর্থাৎ টোলার সকলে যদি পুজো না স্বীকার করে, সে একাই পুজো করবে। এ ঠাকুর মশাই ও ঠাকুরমশাইয়ের দোরগোড়ায় পাগলের মতো ঘুরতে থাকে সে। আতপচাল আর ফুল-বেলপাতা দিয়ে মায়ের পুজো করে প্রত্যহ। শনিবার পুরোহিত পুজো করে যায়। সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যেও সে কয়লা কুড়োতে যেতে ভোলে না। ন‌ইলে বাচ্চারা খাবে কী? পুজোর জন্য‌ও তো পয়সা লাগে। কোথায় পাবে?

এক গণক ঠাকুর সারথির অবস্থা দেখে বললেন, বাসন্তী পুজোয় তোর ঘরে ঘট স্থাপন করব। তিন বছর ঘট পুজো হবে। নতুন ঘট বসালে পুরনো ঘট বিসর্জন দিতে হবে। যদি এই তিন বছরে দুর্গাপুজোর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় হয় তো প্রতিমা স্থাপন করে দুর্গাপুজো করিস। ন‌ইলে তিন বছর বাসন্তী পুজোর পর ঘট বিসর্জন করে পুজো সমাপন করিস।

প্রবাদ, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর! আবার বিজ্ঞানে পদার্থের আকর্ষণের নিয়মানুসারে আন্তরিক চাওয়া কখনও বিফল যায় না। এই দুই মিথের সমন্বয়ে সজীব হল সারথির জেদের রং। দ্বিতীয় বছরের বাসন্তী পুজোর দশমীর দিন থেকে বেশ কিছু মানুষের সাথ পেল। জোগাড় হল প্রতিমা বানাবার পাটা, তার দাম নাকি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। চন্দনকেয়ারির ছেলে তদনীন্তন ভূ-রাজস্ব মন্ত্রী ও কিছু দোকানদারের দানে সিমেন্ট সুরকি জোগাড় হল। সারথির নিজস্ব ছোট্ট কুঠরি ভাঙা হল বর্ষাকালে। মন্দির তৈরির জন্য। আষাঢ় মাস। লোকের বারান্দায় কাপড় দিয়ে ঘিরে একমাস বাচ্চাদের নিয়ে কালযাপন করল সে। মন্দির তৈরি হল। জোগাড় হল পুজোর যাবতীয়। ২০১৩ সালে কুরমিটোলার ঐতিহাসিক দুর্গাপুজোর ভিত্তি স্থাপন হল। এবং মা দুর্গা শানদার পুজো পেলেন।

পুরোহিত ও সারথি

ভাবতে অবাক লাগছে ‘মা পুজো চাইছেন’ বলে একজন নিরক্ষর দিন আনা দিন খাওয়া মহিলা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার ঝুলি পাতলেন মায়ের নৈবদ্য জোগাড়ে। সারথি তখনও বলে চলেছে, মায়ের কৃপায় মন্দিরের প্রয়োজন কষ্টেসৃষ্টে জোগাড় হয়েই যায়। এমনকী নবমীর বলির পাঁঠা পর্যন্ত। এবার করোনায় লোকের একটু অসুবিধা হচ্ছে। তবু ও লোকে দান দিচ্ছে। যেটুকু কম পড়ে, কয়লা বিকে সারাবছর ধরে শোধ করি। কুরমিটোলার দুর্গামন্দির থেকে ফেরার মুহূর্তে কিছু না ভেবেই সারথির পা ছুঁয়ে প্রণাম করে ফেলি। সরলতা আর নিষ্ঠার জিতা-জাগতা প্রমাণ! পথে নেমে আকাশের দিকে তাকাই। আজকাল আকাশ বড় মেজাজি। এই তো দেড় দুই ঘণ্টা আগে বুকে সাদা মেঘ নিয়ে হাসি-মশকরা করছিল, আর এখন মুখভার। হঠাৎ ঝরঝর করে ঝরে পড়তেই আমি দৌড়ে ছাতনি গাছটার নীচে দাঁড়াই। শরতে ছাতনিগাছে ছোট-ছোট ফুল ফোটে। আশপাশ ম-ম করে গন্ধে! মৃদু এলাচ গন্ধ।  বুকভরে সেই ঘ্রাণ নিতে নিতে সারথির শেষ কথাটা মনে পড়ে গেল, ”আমি কত কথা বলব-বলব ভাবছিলাম, শোনানোর লোক পাচ্ছিলাম না। এই যে তুমি এসে আমার কথা শুনলে এও হয়তো মায়েরি ইচ্ছে…”। গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল!

ছবি ঋণ: রিঙ্কি মেহতা

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *