অসমের নীলাচল পর্বতের দুর্গাপুজো

অঞ্জলি সেনগুপ্ত

একান্নপীঠের অন্যতম শক্তিপীঠ নীলাচল পর্বতবাসিনী কামরূপ কামাখ্যা। অপার রহস্যময়তা, ঋদ্ধি সিদ্ধি তন্ত্র-মন্ত্র-জাদু সব নিয়ে নীল পর্বতবাসিনীর দুর্জয় রহস্যের হাতছানিকে কে এড়াতে পেরেছে! কামাখ্যার বিখ্যাত উৎসব অম্বুবাচির মেলা অবশ্যই। তবে শক্তিপীঠে প্রাচীনকাল থেকেই দুর্গাপুজোর পরম্পরাও চলে আসছে। মা এখানে গোহাঞি। কামেশ্বরী সর্বকামনা পূর্ণকারিণীর পুজো বিধিও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অভিনব।

আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের চন্দনকেয়ারির কুরমিটোলার দুর্গাপুজো

পুজোর ভিড়ে কামাখ্যা মন্দির

কামাখ্যা ধামের দুর্গাপুজোর রীতি-নীতি অন্যান্য দেশজ রীতি অনুসারে হয় না। পুজো হয় এক পক্ষকাল ধরে। এখানে কৃষ্ণা নবমীর দিন বোধন হয়। গর্ভগৃহে কামেশ্বরীর দুর্গা রূপের আরাধনা হয়ে আসছে। ঠিক ধরেছেন, কামাখ্যা ধামে পরিচিত দুর্গাকাঠামো তৈরি হয় না। সপরিবারে দেবীমূর্তি গঠন করা হয় না। মা সর্বদাই এখানে চিন্ময়ী। তাই মৃন্ময়ীর কোনও বিগ্রহ নেই। গর্ভগৃহে যোনিপীঠে কৃষ্ণানবমী থেকে পুজো শুরু হয়। চলে এক পক্ষকাল ধরে। লোকবিশ্বাস, কামাখ্যা ধামে স্বয়ং শক্তির প্রকাশ রয়েছে। মায়ের নিম্নাঙ্গ পতিত হয়েছিল এখানে। সৃষ্টির মূল শক্তি প্রকৃতি। মা এখানে সৃষ্টিসম্ভবা যোনি মুদ্রায় স্থিত। কামাখ্যা ধামের পুজো স্বতন্ত্র হবে, তা তো স্বাভাবিক। মন্ত্রপাঠের মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণ নবমীতে কামাখ্যায় দুর্গাপুজো শুরু। প্রাচীনকাল থেকে এমনই নিয়ম চলে আসছে। পুজো শেষ হবে শুক্ল নবমীতে। এক পক্ষকাল ধরে শরৎ ও বসন্তকালে শক্তি আরাধনা চলে মায়ের ধাম কামাখ্যাতে। মহামারিকালেও নিয়ম মেনেই পুজো হবে। প্রধান পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে মায়ের বোধন শুরু হবে কৃষ্ণা নবমীতে। দশমীর পুজোতে সমাপন। অসমিয়া ভাষায় বলা হয় পয়েক পুজো বা পক্ষ পুজো। এই উপলক্ষে নবরাত্রি উৎসব পালন করা হয়, প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে কামাখ্যা মন্দিরে। দিনে তিনবার পুজো হয়। সকাল, দুপুর ও বিকেলে। সন্ধ্যার পর কোনও দর্শনার্থীর প্রবেশ অধিকার নেই। মায়ের পুজো সন্ধ্যার পর নিষেধ।

পক্ষকাল ধরে প্রতি দিন সকালে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় হবে পুজো। প্রতিদিন তিন বেলা আরতি। গর্ভগৃহের যোনি আকৃতির পাথরই এখানে পূজিত। এই উৎসবকে ঘিরেই ভক্তের ঢল নামে নীলাচল পাহাড়ে। কৃষ্ণা নবমীর দিন থেকে শুক্লা নবমী পর্যন্ত পনেরো দিনের পুজো সম্ভবত পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে কামাখ্যাতে সন্ধিপুজো হয়। কামাখ্যায় রয়েছে শতাব্দী-প্রাচীন বলি প্রথা। মহাষ্টমীতে মায়ের পুজোর সময় বলি দেওয়া হয়।

কুমারী পুজো

দুর্গাপুজোর আরও একটি বৈশিষ্ট্য কুমারী পুজো। দেবী কামাখ্যা সর্বদা কুমারী রূপে এখানে বিরাজ করেন। কামাখ্যায় ৯ বছর পর্যন্ত কুমারীদের পুজো হয় বিভিন্ন নামে। নবরাত্রির প্রথম দিন একজন কুমারী, দ্বিতীয় দিন দু’জন, এভাবে নবমীতে ন’জন কুমারীকে পুজো করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্রে কুমারী পুজো একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এক পক্ষকাল ধরে পুজোর বিধির সঙ্গে সমতা রেখে চলে চণ্ডীপাঠ। যতই বারোয়ারি পুজোর চোখ ধাঁধানো ব্যাপার থাকুক না কেন, কামরূপ কামাখ্যায় স্বয়ং মা বিরাজিতা— এই বিশ্বাস আপামর বাঙালির।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *