চুঁচুড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গোৎসব: ঐতিহ্যের ২৮৬ বছর

সোহম ভট্টাচার্য

বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো, যার ইতিহাস বা ঐতিহ্য লুকিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রচুর বনেদি বাড়ির আনাচে কানাচে। আজ কথা বলব সেরকমই একটি বনেদি বাড়ি নিয়ে, যা অবস্থিত আমার শহর চুঁচুড়াতে। আজ বলব, আঢ্য বাড়ির দুর্গাপুজোর কথা।

সুবর্ণ বণিক পরিবারদের পুজো এটি। এই পুজো সম্পর্কে বলতে গেলে আগেই একটি বহুল প্রচলিত ছড়ার কথা বলতে হয়— “আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি/ যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ি/ রেল কম, ঝমা ঝম/ পা পিছলে আলুর দম!!” ছড়াটি বেশ শোনা শোনা লাগছে, তাই না? আসলে এই ছড়ার উৎপত্তি হয় এই বাড়িরই একজন অন্যতম প্রাণপুরুষ, যোগীন্দ্রলাল আঢ্য, ওরফে যগু মাস্টারের আমলেই। ১৮৫৪ সালের ১৫ আগস্ট বাংলায় প্রথম রেলগাড়ি গড়াতে শুরু করে, হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত। সে-সময়, হুগলি স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ছিলেন যগুবাবু, পরে তা অপভ্রংশে হয়ে যায় যদু মাস্টার। এনার হাত ধরেই শুরু হয়, এই পরিবারের দুর্গাপুজো। তারপর থেকে তাঁর সাত পুত্র ও তাঁদের উত্তরপুরুষরা বংশানুক্রমে এই পুজোটি করে চলেছেন।

আরও পড়ুন: অর্থের অভাবে উত্তর কলকাতার ১২০ বছরের পুরনো বনেদি বাড়ির পুজো অনিশ্চিত

আঢ্য বাড়ির দুর্গাদেবী ব্যতিক্রমী। তিনি এখানে শিবের কোলে অধিষ্ঠাতা; দশভুজা নন, দ্বিভুজা; যুদ্ধংদেহী নন, শান্তিদাত্রী। শিব-দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ সহ গোটা পরিবার তো আছেই। চালচিত্রের মাঝখানে দেখা যায়, মহিষাসুরমর্দিনীর পটচিত্র। শোলা ও রাংতার ডাকের সাজে এবং পারিবারিক সোনা ও রুপোর গয়নায় সেজে ওঠেন প্রতিমা।

এখানে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে, তবে কুমারীপুজো, যজ্ঞ এবং চণ্ডীপাঠ পালন করা হয় শাক্ত মতে।  মহালয়ার দিন থেকেই বাড়ির প্রত্যেক সদস্য নিরামিষ আহার করেন। দশমীর দিন পুজো শেষে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা আরশিতে মায়ের প্রতিবিম্ব দেখার পর খাওয়া হয় মাছ-ভাত। তারপর প্রতিমাকে কাঁধে করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে সম্পন্ন হয় বিসর্জন। সবশেষে পালিত হয়, বিজয়ার প্রণাম ও কোলাকুলি। এককালে কাঙালি ভোজন ও বিদায়ের রেওয়াজ ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রচুর দরিদ্র মানুষের ভিড় লেগে থাকত চুঁচুড়ার পঞ্চাননতলা থেকে তোলাফটক পর্যন্ত। চাল-ডাল-আলু ইত্যাদি দেওয়া হত এবং পুজোর বেশিরভাগ খরচই করা হত এই ভোজনে।

পুজোর প্রতিমা শিল্পী থেকে শুরু করে পুরোহিত, রান্নার বামুন ঠাকুর প্রত্যেকেই বংশানুক্রমিকভাবে যুক্ত রয়েছেন আঢ্য বাড়ির উৎসবের সঙ্গে। এও শোনা যায়, কুমারী পুজোতে যে মেয়েটি বর্তমানে  পূজিত হয়, সেও প্রথম যুগের কুমারী মেয়েটির বংশেরই কন্যা।

সবশেষে আসি, এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য বা আকর্ষণ, পুজোর মিষ্টিতে। ফলমূলাদি আর মিষ্টি পরিবেশন করা হয় লটকান নামক কাঠের বিশাল তেপায়াতে করে। মিষ্টি তৈরি হয় ঠাকুরবাড়ির ভিয়ানে। এখানে বিভিন্ন বামুন ঠাকুরের সঙ্গে হাত মেলান বাড়ির মহিলারা, একসঙ্গে তৈরি করেন পুজোর ভোগ। রান্না হয় একেবারে এলাহিভাবে। সেই ভোগের থালায় শোভা পায় লুচি, ফুলুরি, হালুয়া, বেগুনভাজা, পটলভাজা, পাঁপড়, জিভে গজা, পদ্ম নিমকি, বোঁদে, পেরাকি। এছাড়াও থাকে বিভিন্ন সাইজের নাড়ু (নারকেল, মুগ এবং চুনোর নাড়ু), একটি টেবিল টেনিস বলের সাইজ থেকে শুরু করে একটি গোটা নারকেলের সাইজ পর্যন্ত হয়। সবচেয়ে বড় আকারের নাড়ুগুলি বরাদ্দ থাকে দশমীর জন্য, যা মুখে তুলেই ওই বাড়িতে পালিত হয় শুভ বিজয়া। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই বছর আঢ্য বাড়ির দুর্গাপুজো ২৮৬ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে।

ঋণ স্বীকার: হুগলি হেরিটেজ ব্লগ, শ্রীঅঞ্জন আঢ্য এবং আঢ্য পরিবারের সদস্যবৃন্দ।

ছবিগুলি নেওয়া হুগলি হেরিটেজ ব্লগ এবং গুগল থেকে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • Anuradha Bhattacharya

    A wonderful description of the traditional puja of “Adhya Bari” in Chinsurah..Thank you for giving us all these informations..

  • Indranath Ghosal

    লেখাটি খুব মনগ্রাহী ও তথ্যপূর্ণ হয়েছে। চুঁচুড়া শহরের ছেলে হিসাবে এই শহরের পুজো গুলির প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক বিশেষ ভালোবাসা আছে তাই লেখাটি আরো আপন লাগলো। লেখককে অজস্র ধন্যবাদ

  • Rina Bhowmick

    খুব সুন্দর লেখা ঐতিহ্যবাহী আঢ্য পরিবার সম্পর্কে । পড়ে সমৃদ্ধ হলাম ।

  • অনবদ্য। অসাধারন লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *