এবার পুজোয় লেনিন বিরিয়ানি

নিবেদিতা ঘোষ রায়

নীলচে ধুসর ভোর, তখনও তাতে সকালের রাঙা ছিটে লাগেনি। মাঠঘাট সব শান্ত শব্দহীন আঙুরের মতো কোমল। ঘোরতর বাদামি কুকুরগুলোকে নীলচে শেয়ালের মতো দেখায়। ভোরের দোয়েল পল্লবের স্তূপে না হোক কার্নিশের নিচে খয়েরি ডানা নিয়ে বসে থাকে। আর অতল জলের নীচ থেকে মেঘমন্দ্র স্বরে উঠে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এই সব জীবনানন্দগন্ধী বিশেষণ সাজিয়ে-গুছিয়ে চালাতে চাইলে, বৃথা খাটনি মাঠে মারা না যাক, কলমে তো একেবারে মরে-হেজে বাসি কুত্তা শোঁকা রুটি হয়ে যায়। তিনের চার বিন্ধ্যবাসিনী তলার গলিতে পেলব মধুর ভোর নিয়ে ডিল করতে গেলে, মুশকিল, এরকম কিছু নেই এখানে।

সামনেই গঙ্গা, ভোরেই ফুল বেল পাতা নিয়ে মোটামুটি হিসাবে সক্ষম বাচ্চাকাচ্চা, রওনা দিয়ে দিয়েছে। গরিব গুবরোর পাড়া। সদাই কে যেন পলতেয় আগুন দিয়েছে। হাউইয়ের মতো খোলস পেছনে ফেলে আকাশপানে ঊর্ধ্বমুখে ঝাঁপ মারছে।

আরও পড়ুন: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে

ভোরের অনেক আগে থেকেই বাসন্তীর বাবা তিন চাকা ভোঁদরের মতো দেখতে বেকারির গাড়ি নিয়ে ঢঙোর ঢঙোর করে রাত পাখি তাড়িয়ে কামারহাটি যায়। দিঘির নীলচে কুয়াশা সরিয়ে গামছা পরে তার খ্যা-খ্যা মুখপ্রক্ষালন ধ্বনিতে ক’টি নিদ্রাভঙ্গ বিরক্ত কাক উড়ে যায়। চারপাশে বস্তির টালি ঢালা টিমটিমে ঘর। দিঘির পাড়ে বাঁকা খেঁজুর গাছ। রুখু টালি টিন থেকে অ্যাসবেস্টস, ঢালাই কার্নিশ থেকে দ্বিতল ছাদ, তারও ওপরে উঁচু নিশানের মতো ফ্ল্যাট বাড়ির টব ঢাকা বারান্দা হয়ে সরু সরু গলি পথ বেয়ে পাড়া গেছে গার্লস স্কুল, গাঙ্গুলি পুকুর পেরিয়ে অন্য পাড়ায়। সাড়ে চারটের রোদ লম্বা হয়ে কাঁটা ঝোপ ভরা একটুখানি মাঠ বুকে নিয়ে পাড়ার সীমানা টেনেছে।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমন মায়াবী দীপ্ত কণ্ঠের ম্যাজিক পুরোটাই মেরে দিয়েছে দীপক ইলেকট্রিক। ভাদ্রের কটকটে রোদে দুপুর তিনটেয়, ঝমঝমে আষাঢ়ের মেঘকালো বিকেলে, বিশ্বকর্মা পুজোয়, সরস্বতী পুজোয়, বাংলা বন্‌ধের ঝিমঝিমে ভূতুড়ে সন্ধ্যায় হঠাৎ হঠাৎ যদি লোকজনের পিলে চমকে জাগো জাগো গীত আকাশ-বাতাস মথিত করে চড়াও হয়, তাহলে আসল সময় কে আর জাগবে! তাই এই সব সাড়া জাগানো বিখ্যাত ভোরে মদনের মার প্লাস্টিকের চটি ঘষার খসর খসর শব্দ গিরগিটির ল্যাজের মতো ধীরে গলিতে মিলিয়ে যায়।  

সে যাচ্ছে রান্নার বাড়িতে। ‘তব অচিন্ত্য রূপ চরিত মহিমা’ তখন শেষের দিকে। মহিমা তারও কম নয়।  

মহালয়ার আগের দিন তাদের বস্তির একটা অল্প বয়সি বউ উনুনে ডাল বসিয়ে পুকুরে গেছে বাসন মাজতে। তার আলাভোলা ফোকলা শিশু এগোচ্ছে সেই ফুটন্ত ডালের কড়াইয়ের দিকে। পাশে তার ঠাকুমা, পিসি টিভিতে সাজন কি আঁখো মে পেয়ার দেখতে ব্যস্ত। শিশু দুর্মর বেগে অপ্রতিরোধ্য পতঙ্গের মতো ডালে আকৃষ্ট হয়ে গুটি-গুটি পায়ে সেদিকে চলেছে, পেহেলি বার সাজন কে আঁখো মে পেয়ার দেখা দিয়েছে, সবাই মত্ত।

আরও পড়ুন: ‘বন্ধুত্ব’, পোকেমন যাত্রার এক অনন্য শব্দ

শিশু ডালে ডুবে গেল। সন্ধেবেলা পুরুষরা সব সাট্টার ঠেকে। মদনের বাবার রিকশাটা তিন ঠ্যাঙে অদ্ভুত জন্তুর মতো ছায়ার দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছে। মদনের মা দীর্ঘ তাল গাছের মতো, নামমাত্র চামড়া ঢাকা খটখটে হাড়। অন্ধকারে তাকে দেখলে হাতে নিয়ে খড়ের দড়ি বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো একানড়ে ছাড়া কিছু মনে হওয়া সম্ভব নয়।

কেউ রিকশা টানার নেই তো কী, মদনের মা উঠে পড়ল প্যাডেলে। বাচ্চার প্রাণ তো আগে। অনাথ ভাণ্ডার হাসপাতালের ডাক্তাররা তার জিম্মা নেবার পর রাত দেড়টায় মদনের মা রিকশা চালিয়ে ফিরল। পেছন চারজন মহিলা ঠাসাঠাসি করে বসে। বাড়ি ফিরে আবার মদনের বাপের হাতে মার। ব্যাটাছেলের মতো রিকশা টানার অপরাধে।

মদনের মা তো দশপ্রহরণধারিণী নয়, নিতান্ত রান্নার মাসি। তার মোহন রূপের বালাই নেই। দাঁত উঁচু। কিন্তু মহালয়ার আগের দিন ঘোর অমাবস্যায় তার মাথার পেছনে জ্যোতির্বলয়ের ছটা বস্তির চালার চার বিঘৎ উঁচুতে স্থির হয়ে থাকে। কেউ দেখতে পায় না।

আজ তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে, বাবুদের তর্পণ আছে। নিরামিষ পদ, আজ অনেকগুলো।

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে ওঠা আলোক মঞ্জরী, আর ধরণীর বহিরাকাশে অন্তয়িত মেঘমালার নিচে দূরে সুতৃপ্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পাশ দিয়ে মিলিয়ে যায় ভোরের দুর্গা।

এ পাড়ায় দুর্গাপুজো নেই। চোখের খোদলের গাঢ় কালি ফেস পাউডারে ঢাকার মতো দু-চারটে টিউব বিন বিনে পোকা নিয়ে গাছে জ্বলছে। এ পাড়ায় পাঁচ দিন ধরে দেবী বিন্ধ্যবাসিনীর পুজো হয়। দুর্গারই বিন্ধ্যচলীয় নাম বিন্ধ্যবাসিনী।  মহিষাসুর বধের জন্য দেবতাদের তেজে এই পর্বতেই মহিলা ল্যান্ড করেছিলেন।

শুম্ভ, নিশুম্ভ, চণ্ড, মুণ্ড রাক্ষস খোক্কস রক্তবীজ, মাথা মোটা মদব, হাতকাটা দিলু, মালখোর নন্দী বিশাল বাহিনী মহালয়ার দিনই প্রথম আলমবাজারে দল বেঁধে হাড়ি কিনতে যায়। মাত্র একশো টাকা বাজেটে দুঃসাহসিক কিছু গেঁজেল বিরিয়ানির স্টল দেবার বাসনায় কালুর বাবার থেকে বাজারের শেষে ছালঝরা আলুর বস্তা সংগ্রহ করে। মদনের ‘ৎ’-এর মতো গলা, তার ওপর দশ নম্বরি ফুটবলের মতো মাথা, মুখে গান, ‘এ পাগলা সমঝানেসে সমঝে না’।  তাকে সমঝাতে হয় না, সেই সবাইকে সমঝায়। সেদ্ধ চাল, মন্টুর ঝিমধরা মুরগি, কালুর বাবার আলু মিলিয়ে ধুমধারাক্কা মার গুড়জল কারখানা বিরিয়ানি, ৬০ টাকা প্লেট।

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

পাড়ায় পুজো নেই তো কি! দু-পাশে আছে। মধ্যিখানে হোর্ডিং-শোভিত আলোকিত পথটুকুতে, রোলকর্নার ঘুগনির স্টোভ, লাল পার্টির শালু মোড়া বই বিপণি ছিলই, বিরিয়ানিটা লেটেস্ট।

মদন, ছোটকা, নন্দীরা প্রথমে পাত্তা পায়নি। বইয়ের স্টলের পাশে একটু খোদল মতো ছিল, কিন্তু ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ব্যানার লাগানো বইপত্তরের পাশে দীর্ণ ভগ্ন চেহারার ঘন নীচ, বর্তুল গহ্বর অন্ধ গলিতে ঘোরা ফেরা করা ক’টা দাঁড়কাক বিরিয়ানি বিক্রি করবে চারটে দিন।  তাদের খ্যা-খ্যা উল্লাস, খিস্তির টুকরো উড়ে আসবে বইয়ের স্টলে, পাট ভাঙা পাঞ্জাবি আর বৃহৎ টিপ পরিহিত নারী-পুরুষের দল এ রকম আনকালচার্ড উদ্দামতাকে রুখে দিতে চেয়েছিল।

বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে তারা বাঁশ গেঁথে ফেলল। ছাউনিতে পেরেকও মারা হয়ে গেছে। এলাকার নেতা কচিদা রিকশা থেকে নেমে বললেন, ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর।’ নির্বাচনের সময় মদনরাই ঈশ্বর। শুধু নানা রূপে লুকিয়ে আছে। তার নিজেরও নানা রূপ কখনো, কৌপিনধারী, কখনও মৌনী, কখনও কপর্দকহীন, দিগম্বর। মদনদের ছ-ফুট জায়গা ছাড়া হল। মহালয় থেকে ঝামেলা গড়াতে গড়াতে ষষ্ঠীর সকাল হয়ে গেল।

এদিকে কামারহাটির রাইস প্লেট হোটেলের আব্বাস এসে গেছে। বিরিয়ানি মেকার। সমস্ত দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ওপর ডালডা, কেওড়া জল, বুড়ো হলদেটে দাগড়া শশা, পেঁয়াজের কোটিন পড়ল।  ভুলবশত, পাশের স্টলের মহামান্য লেনিন মদনদের স্টলের দেওয়ালে রয়ে গেল। আর ছুছুন্দর কা শির মে চামেলি কা তেল! ষষ্ঠীর সন্ধেটা বিরিয়ানির স্টলে লেনিন মাথায় কেটে গেল। অনেকে ভাবলো আব্বাসের বাবার ছবি। আব্বাসের বাবা সামিম আমিনিয়ার নামকরা শেফ ছিল। বহু বছর সে ২৩০ এ কামারহাটি টু ধর্মতলা করেছে। কেউ ভাবল মহম্মদ রফি।

ষষ্ঠীর দিন উড়িয়ে বিক্রি হল। রাত ন’টায় হাঁড়ি শেষ। ক’টা মাংসগন্ধী আলু তিরিশ পাওয়ারের বাল্বের মতো কেলে হাঁড়ির তলায় ফোকাস মারছে। খুবলালের দোকান খুলিয়ে চাল এনে বসাতে হল। মাংস-ফাংস নেই। আলু কী করে যেন পাঁঠার যমজ ভাই। আলু বিরিয়ানিরই চিকেনের ঝোল মেখে সেজেগুজে শেষ রাতে স্টেজ আলো করে রইল। অবশ্য জল পুলিশরা কবেই বুঝেছে, পুষ্পান্ন না পরমান্ন কী খাচ্ছে।

সপ্তমীর দিন ঝপ করে বিক্রি পড়ে গেল। পাশের স্টল থেকে লেনিন কম পড়েছে বলে তারা হারা মানিক ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। চারটে চুপসানো কাক পালকে ঠোঁট ঘষছিল। কী অজ্ঞাত, দুর্জ্ঞেয় অভিসন্ধিতে আজ আধ হাঁড়ি মালও কাটেনি।

আরও পড়ুন: বিবিধ পরব, বহু-মানভূম

সপ্তমীর সন্ধেটা মহাদেবের গাঁজা, গণেশের সিদ্ধি, নতুন কার্তিকদের কেতা, মহিষাসুরের কনফিউস্ট রোয়াবি সবমিলিয়ে যে হাওয়াটা বইতে থাকে নবমীতে, তা চরম হয়। ষষ্ঠীর সন্ধেটা একটু ঠান্ডা অভিমান মাখা, একটু বিরহী, হাফসুল খাওয়ারা রকে বসে ভাবতে শুরু করেছে উৎসব-টুৎসব আমার জন্য না, তারপর নবমীর রাত দু’টোয় দরকচা পায়ে ফোস্কা নিয়ে কেতরে ঠাকুর দেখছে। স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে ফুসলে উঠে সপ্তমীতে একটু গোঁত খায়।

হঠাৎ মদন দের স্টলে মারপিট লেগে গেল। তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। অতিরিক্ত ফুর্তিতে এসব হয়, কিছুক্ষণ পরেই ‘তুই আমার ভাই’ বলে বিড়ি ধরাবে। পাশে হেই সামালো বলে ধান রক্ষণাবেক্ষণের গান হচ্ছে।

মদনের মনে হল ওই টাক মাথা লোকটাই পয়া ছিল। আজ খুলে নিয়েছে তাই বিক্রি পড়েছে। মদন গাধার চামড়া পড়ে সিংহদের পাড়ায় ছবি চাইতে গেল।

সতেরো বছর বয়স তার, কানের গোড়ায় রদ্দা খাবার আগের পজিশনটা খুব চেনে। কেঠো চেয়ারে বসে বসে পেছনে চৌকো ছাপ পড়ে যাওয়া এক কাকু ধীরে উঠে এলেন। এইমাত্র সমুদ্র মন্থনের পুণ্য কাজটা করে এলেন যেন, ভীষণ ক্লান্ত। বই ফই এদিকেও বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি তো বড় কথা নয় বর্ণাঢ্য গম্ভীর পরিবেশটা আসল। এদিকে হেই সামালো আর আম্মা দেখ মুন্ডা বিগরা যায়ে, মিলে মিশে বিশাল ক্যাওড়া।  কাকু বললেন, ‘ক্লাস নিতে হবে! খাঁটি প্রলাতেরিয়েত এসেছে লেনিন চাইতে!’ পুজো কমিটি বলল ভাগ শালা!

স্টলে জ্যাকসান টাঙানোর পর ন’টার দিকে হুড়িয়ে বিক্রি শুরু হল। কামারহাটি রাইস প্লেটের আব্বাস জাকিররা হোটেলের টেবিল বয় মন্টু, হাজি বিরিয়ানি স্টলের টুলে কালো ছেলে দু’টো, গৌতম রেস্টুরেন্টের গৌতম সবাই যে যার মতো লড়ে যাচ্ছে। আসল যুদ্ধের অস্ত্রটা কে ধরে আছে কে জানে!

আরও পড়ুন: বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা, এক অনুপম সাহিত্যরস

সেই সব নীলচে ভোরে ‘মডেলা’ টেলারিং থেকে সারারাত জামা সেলাই করে বিশুর বাবা গলিতে ঢোকে, আর বাসন্তীর মা বেরোয়। রক্তস্নাত অসুর আর ক্লান্ত দুর্গা একসঙ্গে বিড়ি ধরায় এই গলিতে। দূর থেকে দেখা যায় না সেইসব অম্লান নৈকট্য।  

পোঁদ কালো হাঁড়ি মাজা দিয়ে মহালয়া শুরু। ভাসানে পিলপিল করে লোক বেরোবে এ গলি থেকে।  ফুল এন্টারটেইনমেন্ট! মুখচোরা মফস্‌সলের এই সব বেয়ারা গলিতে কত কিছু যে, আচমকা এসে হানা দেয়। হেজলদাগরা মেয়েমানুষ সব নিজেরাই মর্দিতা হয়ে ঘুরে বেরায়, সভ্য সৌম্য মানব সমাজ, মিডিয়ার টিক দেওয়ার জন্য তো এদের জীবন অপেক্ষা করে না, আর ভদ্রজনের কলমে উঠবার কথাও নয় এ চণ্ডীপাঠ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *