সর্বজনীন ও সম্প্রীতির আলোকে ‘ঈদ’

সাইদুর রহমান

আধুনিক সমাজে যেকোনও ধর্মীয় উৎসবের দু’টো দিক থাকে। একটি হল তার ধর্মীয় নিয়ম, রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠানের দিক। অন্যটি হল তার সামাজিক দিক। মানুষের সঙ্গে মানুষের, ধর্মের সঙ্গে ধর্মের, বর্ণের সঙ্গে বর্ণের,  জাতির সঙ্গে জাতির সম্পর্কের দিক। আধুনিক সমাজে যেকোনও ধর্মীয় উৎসবের এই সামিজিক দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের মধ্য দিয়েই ধর্মীয় উৎসব তার ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

ঈদ মুসলিম সমাজের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। ঈদ শব্দটি আরবি শব্দ। যার বাংলা মূল অর্থ ‘ফিরে আসা’। অন্য অর্থ খুশি, আনন্দ,  অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। রমযান মাসে দীর্ঘ একমাস রোযা রাখার পর খুশির সওগাত নিয়ে আসে ‘খুশির ঈদ’। ঈদ পবিত্র, ঈদ খুশির, ঈদ আনন্দের, ঈদ ক্ষমার, সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে বুকে জড়ানোর দিন হল ঈদ।

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

প্রথম ঈদ পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরির ১ শাওয়াল, ইংরেজি ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ মদিনায়, আর মক্কায় প্রথম ঈদ পালিত হয় অষ্টম হিজরি, ইংরেজি ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের প্রায় ১১ দিন পর। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. মদিনায় হিজরতের পরেই ঈদ-উল-ফিতর উৎসব পালনের নির্দেশ দেন। বদরের যুদ্ধে ‘চূড়ান্ত বিজয়ে’র স্মৃতিকে আরো আনন্দময় করে তোলার জন্য হযরত মুহাম্মদ সা. ওই বছর রমযান মাসের শেষে ঈদ উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। এর আগে ‘জাহেলিয়াত’ যুগের দু’টি উৎসব মদিনায় প্রচলিত ছিল। একটি নওরোজ, অন্যটি মিহিরজান। কিন্তু সম্ভ্রান্ত বা ধনীশ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত এই দু’টি উৎসবে সাধারণ মানুষের খুব একটা অংশগ্রহণ ছিল না। শ্রেণিবৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং অশালীনতায় ভরা ছিল ওই দু’টি উৎসব। তাই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এই দু’টি উৎসব বাদ দিয়ে বছরে দু’টি ঈদ উৎসব পালন করার নির্দেশ দেন। এর ফলে জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যহীন, সাম্য মৈত্রী ও অশালীনতামুক্ত দু’টি উৎসব। এছাড়াও ঈদ উৎসব পালনের আরো একটি ঐতিহাসিক পটভূমির কথা ইসলামের ইতিহাসে আছে। আরবের অন্যান্য সম্প্রদায়ের নানারকম উৎসবের মধ্যে ‘উকাজের মেলা’ ছিল এক ধরনের একটি উৎসব— যা নানা অশ্লীল ও রুচিহীন আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ থাকত। এই রুচিহীন, অশ্লীল উৎসবের হাত থেকে আরববাসীকে রক্ষা করার জন্য হযরত মুহাম্মদ সা. রমযান মাসের শেষে ঈদ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

আমাদের দেশে ঈদ দুইভাবে হত— চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দশক পর্যন্ত ঈদ ছিল মোটামুটি নগরকেন্দ্রিক। মূলত, রাজধানী শহরগুলোতে তৎকালীন সুলতানদের নির্মিত মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হত বেশি। ঈদ উপলক্ষে সুলতান, আমির, উমরাহদের উদ্যোগে ঈদের বর্ণাঢ্য মিছিল হত। এখানে সাধারণ মানুষদের খুব একটা অংশগ্রহণ ছিল না। সুলতানদের উদ্যোগে মসজিদ আঙিনায় নামায শেষে ঈদের খাবার-দাবার বিতরণের প্রচলন ছিল। তবে নানা ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র ও তথ্য থেকে বাংলায় ঈদ উৎসবের উদ্ভব বিষয়ে অন্য একটি মতও আছে। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও এ-দেশে নামায, রোযা ও ঈদোৎসবের প্রচলন হয়েছে তার বেশ আগে থেকেই। বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে আসার বহু আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ ও সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তর ভারত হয়ে পূর্ববাংলায় আসেন। অন্যদিকে, ‘আরবীয় এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের বণিকরা চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমেও বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এভাবেই একটি মুসলিম সাংস্কৃতিক তথা ধর্মীয় প্রভাব পূর্ববাংলায় পড়েছিল। এর ফলে জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্য বিবর্জিত সর্বজনীন আনন্দ উৎসবের।’

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ আল-আকসা: বিশ্বজুড়ে ছি-ছিক্কার আর অভিশাপ কুড়াচ্ছে ইসরাইল

কিছু ধর্মীয় আচার, রীতি ছাড়াও ঈদের কয়েকটি কমন বৈশিষ্ট্য পালন করা হয়— যার ফলে ঈদ হয়ে ওঠে সবার জন্য সবার প্রিয় এক সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া হল একটি প্রধান কর্তব্য। পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ঈদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এরফলে মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। ঈদের নামায পড়ার আগে প্রত্যেক মুসলিমকে ‘ফিতরা’ (নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ) প্রদান করতে হয়। সাধারণত, গরিব, দুস্থ, ইয়াতিম, অনাথ অসহায়, উপার্জন অক্ষম মানুষকে এই অর্থ প্রদান করা হয়। ফলে এই অর্থের বিনিময়ে গরিব, দুস্থ, অনাথ, অসহায় মানুষ ঈদের দিন আনন্দ অনুষ্ঠান, নতুন পোশাক ইত্যাদি কিনতে পারেন। তাছাড়া, দরিদ্র্য, অসহায়, সাধারণ  খোঁজখবর নেওয়া, তাদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়াও হল ঈদ উৎসবের একটি বড় সামাজিক দিক। বন্দিকে খাদ্য দান, তাদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়াও ঈদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ঈদের সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলামেশা, মনমালিন্য দূর করা এগুলোও ঈদের প্রয়োজনীয় অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। নামাযের পর পরই শুরু হয় প্রীতি আর শুভেচ্ছা বিনিময়মূলক কোলাকুলি। এই কোলাকুলি চলে সারাদিন। এই কোলাকুলি সাম্য আর ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতি।

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

আমাদের দেশে যেকোনও উৎসবে জনসাধারণের একটু বেশিই আগ্রহ থাকে। সেজন্য ঈদ উপলক্ষে গ্রামবাংলায় এমন কী শহরেও মেলা বসে। লোকশিল্পজাত নানা পণ্যদ্রব্য, খাবার জিনিসপত্র, নাগরদোলা, ছবির খেলা, পুতুল নাচ ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। কোথাও বা আধ্যাত্ম সংগীতের আসর বসে। কোথাও বা ঈদ উপলক্ষে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ করে বাংলাদেশে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে। ফলে সাহিত্য সংস্কৃতির জগতেও ঈদের একটা ভালো প্রভাব থাকে। ঈদ উৎসবের মূল বাণী হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালোবাসা, সম্প্রীতি। এই ভালবাসা শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সারাদিনব্যাপী এই উৎসবে সামাজের অন্যান্য অংশের মানুষের অংশগ্রহণ, সারাদিন ধরে মিষ্টি, সেমাই দিয়ে পারস্পরিক আপ্যায়ন, পরস্পরের বাড়ি যাওয়া, সাংস্কৃতিক ও মেলাগুলিতে সমস্ত ধর্ম, বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই উৎসব হয়ে ওঠে সর্বাত্মক এবং সর্বজনীন। আর সমস্ত স্তরের মানুষ মিলেমিশে গড়ে তোলে এক অখণ্ড মানব সমাজ। ঈদ উৎসব এই শিক্ষা দেয় যে, ‘নিজের সম্পদ নিজে ভোগ করলেই হবে না, সে সম্পদে অন্যেরও অধিকার আছে। ঈদ উৎসবের মধ্য দিয়ে কেবল মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় এবং সমাজ জীবনের সাম্য মৈত্রীর সন্ধান লাভ করে না— সমাজের সমস্ত অংশের মানুষের মধ্যেও সেই বার্তা পৌঁছে দেন। পৌঁছে দেন ঈদ ‘আত্মশুদ্ধি’ ও ‘সাম্যের বার্তা’ও। তবে একথাও ঠিক যে, ‘ঈদ’ সম্পর্কে অনেক অমুসলিম ভাইদের খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা নেই। দীর্ঘদিন দু’টি সম্প্রদায় পাশাপাশি থেকেও একে অন্যের খবর রাখিনি। ফলে, ‘ঈদ’কে শুধুমাত্র একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে না দেখে যদি সকল স্তরের মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে এর সর্বজনীনতা আরও বেশি ব্যপ্তি লাভ করবে। কারণ, প্রত্যেক ধর্ম, বর্ণ, জাতি ব্যতিরেকে মানুষে মানুষে সহজ মিলনের রাস্তাটিই হল এই ‘ঈদ’। সর্বজনীন ঈদ।     

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *