এক অবিরাম স্বীকারোক্তি

রাহুল দাশগুপ্ত

১৯
আসলে সে নিজেকে যেভাবে দেখাতে চায়
সেভাবে ফুটে ওঠে না
সে নিজের একটা ছবি আঁকতে চায়
এমন একটা সৌন্দর্য, যার নান্দনিকতা প্রশ্নাতীত
অথচ ভৌতিক হয়ে ওঠে সবকিছু
লোকে ভয় পায়, আতঙ্কিত হয়, আর তার হঠকারিতা দেখে
চমকে ওঠে
সে উদ্যমী হয়
মজার মজার কথা বলে, লোক হাসায়, নিজের দিকে
আকৃষ্ট করে সবাইকে
অগভীর কৌতুকগুলি ফুলকির মতো উড়তে থাকে
কেউ তার দিকে তাকিয়ে হাসলে সে কৃতার্থ হয়
কেউ কথা বলতে এগিয়ে এলে সে কৃতজ্ঞ থাকে
বাতিল, পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে
সে সবকিছুতে মত জানাতে চায়
সবকিছুতে অংশগ্রহণ করে
তার ভেতরে নিরাপত্তার অভাব
সে কখনও সম্মান বা শ্রদ্ধা
পায়নি
কেউ তার প্রশংসা করেনি খাঁটি মনে
সবাই তাকে কৌতুকের চোখে দেখে, ব্যবহার করে
সে হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়
কোথাও কোনও কৃতিত্ব দেখাতে পারে না সে
তার মুখে লেগে থাকে ব্যর্থতার স্থায়ী ছাপ
অসুস্থ, উন্মত্তের মতো আচরণ করে সে
প্রেমিক ও দার্শনিক হওয়ার ভাণ করে
আর নিজেকে সে যেভাবে দেখাতে চায়
তা ফুটে ওঠে না কখনোই…

আরও পড়ুন: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে

২০
ওরা তাকে বার করে দিয়েছিল
ভেবেছিল, সে আর ফিরতে পারবে না
নরকেই কাটবে তার জীবন
নরকেই পৌঁছে গেছিল সে
একের পর এক অন্ধকার গলিতে ঘুরতে ঘুরতে
শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এসেছিল তার
বেশিরভাগই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সেইসময়
সাহায্য করেছিল কেউ কেউ
দেবদূতের মতো কিছু মানুষ
তাদের মুখ বারবার মনে পড়ে তার
জীবন তাকে সাহায্য করেছে মানুষ চিনতে
সে সেই জীবনের কাছে ঋণী
জীবনের অন্যায়, বঞ্চনা আর প্রতারণা
মানুষ চিনিয়ে
দেয় খসিয়ে দেয় সমস্ত মুখোশ
কে খাঁটি আর কে খাঁটি সেজে বসে আছে
তখন তাদের অনায়াসে চেনা যায়
সে সেই দেবদূতদের কথা ভাবি
তার দুঃসময়ে যারা তাকে ছেড়ে যায়নি
দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পরম করুণাময়ের মতো
তারা কোনও সফল মানুষ নয়
সাফল্যকে লোকে যেন ঘৃণা করে
জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয়
সে ফিরে এসেছে আবার আলোয়
তার চারদিকে এখন ঝলমল করছে অনেক সূর্য
ওইসব সূর্য কী সত্যি? ওই আলো কী সত্যি?
না কী এও এক বিভ্রান্তি! আলোর ছদ্মবেশে
ধাঁধিয়ে দিচ্ছে চোখ?
করুণা কোনও আলোর জন্ম দিতে পারে?
বিশেষ করে সেই করুণায় যদি সমবেদনার বদলে থাকে
দম্ভ আর তাচ্ছিল্য?
পরোপকারের ছলে থাকে
নিজের ঢাক নিজে পেটানোর বাসনা?
গর্বিতের অনুকম্পা জুটেছে তার
এখন সে কীভাবে বাঁচবে
সেটা তাকেই ঠিক করে নিতে হবে…

আরও পড়ুন: এবার পুজোয় লেনিন বিরিয়ানি

২১
অন্তত কিছুটা তো নিরাপত্তা পেয়েছ তুমি
অন্তত শেষবার চেষ্টা করে দেখো
চূড়ান্ত খাদের দিকে নিজেকে ঠেলে দেওয়ার আগে
অন্তত সেটুকুই বলো যা তুমি বিশ্বাস করো
যা বিশ্বাস করো না তাকে স্বীকার করে নেওয়া তো
কাপুরুষতা!
বরং ভেবে নাও তুমি পৌঁছে গেছ কোনও নির্জন মঠে
অথবা আয়নার মুখোমুখি বসে আছ
সামনে জ্বলছে মোমবাতির শিখা
আর একজন চিত্রকর আঁকছেন প্রায়শ্চিত্তের ছবি
একজন পাপী যে সারা জীবন একটা ভুল জীবনকে
বহন করে এসেছে
তাঁকে নিখুঁতভাবে আঁকছেন তিনি
জীবনের অনেকটা জেনে গেছি আমি
অনেকদিন ধরে জেনেছি
কিন্তু জীবনের কোথাও জায়গা হয়নি আমার
একসময় ভাবতাম, এই দুনিয়ায় অনেকটা জায়গা নিয়ে
আছি আমি
আর তারপর সরতে থাকলাম
আসলে জীবনই আমাকে ঠেলতে লাগল
খাদের দিকে
আর বোঝাতে শুরু করল, এটাই আমার প্রাপ্য
জীবনের কাছে আমি এক আবহমান প্রার্থী
একটু জায়গা পাওয়ার জন্য দরখাস্ত হাতে দাঁড়িয়ে আছি
ভেতরে চলছে তুমুল ব্যস্ততা, ফিরে তাকানোর সময় নেই কারও
আমি দরখাস্ত তুলে ধরে আছি, দেখাতে চাইছি সবাইকে
একজন বাতিল হয়ে যাওয়া মানুষের মতো…

২২
তোমার পাশে অন্তত একজন খাঁটি মানুষ আছে
তোমার পাশে অন্তত কয়েকজন খাঁটি মানুষ আছে
তুমি তাদের অনবরত বিরক্ত করে গেছ
আর তারা তোমাকে অনিঃশেষ হৃদয়ে ক্ষমা করে গেছে
তুমি শাস্তি পেয়েছ অন্য জায়গায়
তোমাকে শাস্তি দেওয়ার অনেক লোক আছে
লোভ করে যাদের সামনে গেছ
হাঁটু গেড়ে যাদের কাছে ভিক্ষা চেয়েছ
যাদের কথা ভেবে নিজের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-আহ্লাদকে
গড়েপিঠে নিতে চেয়েছ
যাদের হাতে ব্যবহৃত হয়ে
সাফল্যের সস্তা নেশায় মজে থাকতে চেয়েছ
তোমার শাস্তি তাদের হাতেই বরাদ্দ হয়ে আছে!
তুমি দেখাতে চেয়েছ যেন দেবদূতের মতোই নেমে এসেছ
এই পৃথিবীতে
তারা তোমাকে চিনে গেছে
তারা বুঝে গেছে আসলে তুমি কাপুরুষ
চূড়ান্ত অপমানিত হওয়ার মুহূর্তেও তুমি
বিগলিত হয়ে যেতে পারো
স্তাবকের মতো হাসতে পারো
অপমানে কাঁপতে কাঁপতে মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারো
তোষামোদের ভাব
এভাবে তো আর সারাজীবন চলতে পারে না
জুতো খেয়েছ অনেক, ভুলে গেছ ফুলের বাগানের স্মৃতি
অন্তত একবার ঘুরে এসো
শুঁকে এসো খাঁটি জীবনের গন্ধ!

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

২৩
তুমি জানো না কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়
তুমি শেখোনি আত্মরক্ষা করার কৌশল!
তুমি শক্তিহীন, ভঙ্গুর, দুর্বল
ভেবো দ্যাখো, জীবনে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছ
কোন জমিতে
কী আছে তোমার যে তুমি কারও মনে আগ্রহ জাগাবে?
তোমাকে কেউ গ্রাহ্য করবে না, এটাই তো স্বাভাবিক
কেউ তোমার খবর নেবে না, এটাই তো স্বাভাবিক
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক শর্তের ওপর নির্ভর করে
কোন শর্তে তোমার কাছে আসবে মানুষ?
তোমার কোনও সাফল্য নেই
তোমার কোনও অর্থ নেই, উচ্চ পদ নেই, পারিবারিক ঐতিহ্য নেই
যোগাযোগ বা ক্ষমতা নেই
কোথাও কোনও গুরুত্ব নেই তোমার
মানুষ যা চায়, তার কোনটা দিতে পারো তুমি?
তোমার শুধু লোভ আছে, স্বপ্ন আছে, জেদ আছে, ধৈর্য আছে
আর হয়তো আছে একটা দয়ালু মন
কেউ দুঃখে আছে সহ্য করতে পারো না তুমি
কেউ একা আছে সহ্য করতে পারো না তুমি
শিশুদের চোখে জল দেখলে তোমার বুকেও দুর্যোগ শুরু হয়ে যায়
আর তুমি কথা বলে চলো অবিরাম
লঘু, অগভীর, লোকে শোনে আর হাসে
নিজেকে দেখিয়ে চলো এটা জেনেও
দেখানোর মতো কোনও কৃতিত্বই নেই তোমার
খাঁটি জীবনের খোঁজে
খাঁটি অনুভূতির খোঁজে
নিজের কাছে পৌঁছনোর জন্য কিছুই করোনি তুমি
তুমি শুধু সোনার হরিণের পিছনে ছুটে গেছ
ঘোড়দৌড়ের কথা ভেবে নিজেকে প্ররোচিত করেছ
আর ক্রমাগত নিয়ে গেছ অন্ধকারে, অতল গহ্বরে
তলিয়ে যাওয়ার অর্থহীন ঝুঁকি!

২৪
পরাধীন মানুষ বন্ধুত্ব করতে পারে না
তোমাকে করুণা করেছে কেউ
তা দিয়ে তুমি স্বাধীনতা চাইতে পারো না
ভাগ্য দিয়ে সবকিছুর দোহাই চলে না
তুমি নির্বোধের মতো আচরণ করবে
আর ভাগ্য এসে তোমাকে বাঁচাবে?
তোমার প্রতি যার সহানুভূতি আছে
তাকেও তুমি বিরক্ত করে ছাড়বে, তুমি এমনই মানুষ
তোমার সামনে রয়েছে উচ্চতা
সেখানে পৌঁছবে বলে সারাজীবন তুমি ঘাম ঝরিয়ে চলেছ
স্বপ্নের মধ্যে ঝরছে তোমার ঘাম
স্বপ্নের মধ্যে তুমি তরবারি ঘুরিয়ে চলেছ
অদম্য জেদ নিয়ে
কোথায় পৌঁছবে তুমি?
তোমার সঙ্গে যারা হাঁটতে শুরু করেছিল
সবাই যে যার জায়গায় পৌঁছে গেছে
তোমার কোনও লক্ষ্য ছিল না
নিজের পায়ের ওপর মাথা উঁচু করে
দাঁড়ানোর ক্ষমতাই তোমার নেই
তুমি আজন্ম লাঠি হাতে চলেছ
আর কেউ কেউ মজা করে কেড়ে নিয়েছে সেই লাঠি
তুমি মুখ থুবড়ে পড়েছ
কেউ তোমার কানের কাছে প্রলাপ বকেছে
আর তুমি তাকে বিশ্বাস করে এতটুকুও সতর্ক হওনি
এখন তোমার আড়ালে থাকাই ভালো
সবার পেছনে
নইলে তোমাকে দেখে যে কেউ হঠাৎ হাসিতে
ফেটে পড়তে পারে…

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

২৫
তার সমস্ত ব্যর্থতার জন্য সে একাই দায়ী
তাই এত ক্লান্ত লাগে আজকাল
তার সমস্ত আয়োজন মিথ্যে
বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করেনি
কাউকে তার কিছু বলার নেই
কাউকে কিছু শেখানোর নেই
জীবনের খুব কাছে যেতে চেয়েছে সে
জীবন একটা রহস্য
সে তার উন্মোচন চেয়েছে, তার নিজের মতো করে
কিন্তু তার ধৈর্য ছিল না
সে হেসেছে, কেঁদেছে, অভিমান করেছে, রাগ দেখিয়েছে
তার দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি
আর সেটাই তো স্বাভাবিক
ফিরে তাকানোর সময় আছে কার?
সবারই নিজের মতো করে বেঁচে-থাকার রীতি-রেওয়াজ আছে
অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকার মতো ঘৃণ্য আর গ্লানিকর
আর কী হতে পারে?
তাছাড়া ফিরে তাকিয়ে এক বিপুল শূন্যতা ছাড়া
যা দেখতে এক গহ্বরের মতো আর ভরে আছে অন্ধকারে
সেই দৃশ্য ছাড়া আর কী পেত তারা?
সারাজীবন ধরে সে শুধু লিখে গেছে
আত্মপ্রতারণার জটিল সব কৌশল
কখনও ভিক্ষে করেছে, কখনও করুণা চেয়েছে, কখনও নিজেকে
ভাঁড়ের মতো করে দেখাতে চেয়েছে
এরপর তাকে উপহাসের পাত্র ভাবাই স্বাভাবিক
এরপর কোন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ তাকে গ্রাহ্য করবে?
এরপরও যারা ভালোবাসে তাকে
এরপরও যারা বেছে নিয়েছে তাকে
স্রেফ ভালোবাসার জন্য
তাদের জন্য তার অনুশোচনা হয়
মনে মনে ক্ষমা চায় তাদের খাঁটি ও ভ্রান্ত হৃদয়ের কাছে…

আরও পড়ুন: ঈশ্বরের মেয়ে

২৬
‘এই ছবিটা তোমার জন্য এঁকেছি’—তুমি বলেছিলে
‘রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে তোমার কথাই ভাবছিলাম’
এভাবেই বলো তুমি
তুমি তার কথা এত ভাবো কেন?
সে কী ছবি আঁকার মতো একটা বিষয়?
রেস্তরাঁয় খেতে খেতে ভাবার মতো কেউ?
নিজেকে তার পোকামাকড়ের মতোই মনে হয়
গোটা জীবন ধরে যে শুধু আয়ুর অপচয় করে গেছে
আর তোমার ভালোবাসা দিন-দিন বেড়েই চলেছে
অকারণে, অন্ধের মতোই
একজন মিথ্যেবাদী, ভণ্ড ও প্রতারক
যার হৃদয় শূন্য হয়ে আছে আর ভরে আছে অন্ধকারে
তোমার ভালোবাসায় সামান্য আঁচড়টুকুও ফেলতে পারেনি
তোমার ভালোবাসা রয়েছে অনেক উঁচুতে
পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা শুভ্র বরফের মতো
নিচের দুর্গন্ধ, ছাই আর ধোঁয়া পৌঁছতে পারে না সেখানে
তুমি ছবি এঁকেছ এমন একজনকে নিয়ে
ছবি এঁকেছ গভীর ভালোবাসায়, প্রগাঢ় প্রেমে
যে আদপেই তোমার যোগ্য নয়
দুনিয়ার পবিত্র ও উৎকৃষ্ট কোনও কিছুরই সে যোগ্য নয়
সে অনায়াসে দুনিয়ার সবচেয়ে নিষ্পাপ মানুষকে
ঠকাতে পারে
মিথ্যের পর মিথ্যে বলে যেতে পারে
আর তাতে তার কোনও বিবেক-দংশনও হয় না
তোমার আত্মা প্রার্থনার মতোই নিষ্পাপ
অনুতাপের মতোই পবিত্র
এত দুর্গন্ধ সে ছড়িয়েছে তোমার জীবনে
অর্থহীনভাবে
তোমার তাতে কিছুই যায় আসেনি, তুমি আছ তোমার উচ্চতায়
আর অনেক নিচে সে পুড়ে গেছে অবিরাম আর আশ্বস্ত হয়েছে এই ভেবে
সেই উচ্চতায় কোনওদিনই পৌঁছতে পারবে না সে
সেই শিখরের দিকে তাকিয়ে সে অনুতাপ করতে পারে
ক্ষমা চাইতে পারে, আর ওখানেই তার সীমাবদ্ধতা
এর বেশি এগোনোর ক্ষমতা তার নেই
নিজেকে সংশোধনের স্পর্ধা তার নেই
নিজের পরিত্রাণের পথ সে জানে না
সে সবকিছুই হারিয়েছে
আত্মপ্রতারণার বিপুল আয়োজন ছাড়া…

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *