এক আলোর পৃথিবী (২)

ধীমান ব্রহ্মচারী

স্কুলের পাশাপাশি আমাদের সময়কার নিয়মনীতিও ছিল খুব কড়া। যেখানে সেখানে যাতা করা যেত না। আমরা সেগুলো মেনে চলতাম। আজকে অনেক কথায় মনে পড়ে। বিশেষ করে মনেপড়ে আমার একটা দুঃখের দিনের কথা। জানি এই কথা লিখতে লিখতে চোখে জল আসবে। মনে ধাক্কা খাবে অনেক স্মৃতি-স্বপ্ন-ইতিহাস, কিন্তু কেন জানি না একমাত্র এই একটা ক্ষেত্রেই আমি বারবার সত্যটা বলে ফেলি। ছোটবেলা থেকে জানতাম আমরা জমিদার বংশের ছেলে। তাই চাল-চলনের একটা আভিজাত্য ব্যাপার খুব অদ্ভুতভাবেই থেকে গেছে,  আজও তার কিছুটা প্রতিফলন পাই।

ছোটবেলা থেকেই আমার একটা বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, সেটা হল দরিদ্র। যদিও এটা কোনও ব্যাপার নয়। কিন্তু এটা আমার কাছে অনেক ব্যাপারই। একজন ক্ষুধার্থ পেটের কাছে খাবার অনেকটা যেমন দামি, তেমনই আবার অনেক কষ্টের। জমিদার বংশের ছেলে হয়েই থেকে গেছি শুধুমাত্র। কোনোদিন কোনো আশার লক্ষ্যে পৌঁছইনি। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন। এই দীর্ঘ সময় আমার কোনো সাইকেল ছিল না। সেই সাইকেল কেনা হল ক্লাস ইলেভেনে। আমারই এক বন্ধুর বাবার দোকানে। কি আশ্চর্য না? একটা সাইকেলের দাম তখন চোদ্দশো টাকা। সেটা জোগাড় করতেই কেটে গেল প্রায় ছ-ছ’টা বছর। মাঝে ক্লাস এইটে একটা সাইকেল জুটেছিল। সেটা বেশ ভালোই ছিল। ওটারও একটা ইতিহাস আছে।

আরও পড়ুন: অন্ধকার সময়

আমার দুই পিসি। এক পিসি থাকত গ্রামের বাড়িতে। এক পিসি কল্যাণীতে। আমাদের বাড়ির রাস্তার ধারে ছিল বড় বড় দু’টো ঘর। আমরা বাইরের ঘরই বলতাম। সেখানে যে ঘরটা একদম রাস্তার ধারে ছিল সেই ঘরে ছিল একটা চৌকি। সেই চৌকির তলায় দেখতাম, একটা ছোট্ট সাইকেল আছে। অনেক দিনের পুরনো দেখলেই বোঝা যেত। বাবা বা মা’কে অনেকবার বলতাম। উত্তর আসত ওটা ছোট পিসির বড় ছেলের। হাত দিও না। শৈশব অনেক প্রশ্নের উত্তর চায়তো আপন মনে। কিন্তু কোনো কিছুই পেত না। তাই যতবার আমরা মানে আমি,  দিদি, সামদি (শ্রাবণীদি। আমার জেঠিমার ছোট মেয়ে) সবাই যখন সেই রাস্তার ধারের ঘরে এসে খেলা করতাম বা সময় কাটাতাম, ঠিক তখনই বারবার চৌকির তলায় উঁকি মেরে দেখতাম, এই ভেবে কি মজাই না হত সাইকেলটা যদি আমার হত। এর কিছু দিন পর পরই একদিন হঠাৎ যেন চাঁদ হাতে পাওয়া হল। পিসি নাকি বলেছে সাইকেলটা আমি ব্যবহার করতেই পারি। ব্যস,  যেমনই শোনা ওমনি, পরের দিন সকালেই সাইকেলটা তরতর করে বার করে আনলাম। কত ধুলো লেগে আছে। কত ঝুল। চাকার স্পোকগুলো যেন এক একটা মশার জলের সাম্রাজ্য। কোনোরকমে মাথায় মুখে ঝুল-ধুলো মেখে টেনে-হিঁচড়ে বার করে আনলাম। সেই প্রথম সাইকেলটাকে পুরোটা দেখলাম। বিরাট একটা প্রাপ্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র এই ভাবলাম,  যাক এবার আর হাঁটতে হবে না। হাঁটা থেকে চিরতরে বিদায় নিলাম। বাবা ওপর থেকে বলল ওটা বার করে রাখ গোবর্ধন এসে নিয়ে যাবে। গোবর্ধন কাকু আমাদের খুব পরিচিত এক সাইকেল ওয়ালার দোকান। বাবার সাইকেলে যাবতীয় টুকিটাকি কাজ থেকে বড় কাজ সবই তিনি করতেন। টাকা-পয়সা দেওয়া হত মাসের শেষে। মাসিক বা মাসকাবারি এই ছিল আমাদের প্রধান ও একমাত্র এবং শেষ অবলম্বন। আমাদের সংসারের মুদি থেকে মিষ্টি আর বাজার থেকে মাছ। এমনকি জামা-কাপড়,  বই-পত্র সবই আসত মাসকাবারিতে। যাক সে কথা, গোবর্ধন কাকু এসে নিয়ে গেল দুপুর নাগাদ। তারপর একদিনের অপেক্ষা। পরের দিন দারুণ একটা অস্থিরতা কাজ করছে। এই ভেবে, কখন আসবে। কখন ক্রিং ক্রিং করে বাজিয়ে পাড়া মাত করে হই-হুল্লোড় করব। আর বলতে বলতেই বিকেল ঠিক সাড়ে চাটটে হবে। ফাঁসিতলা বলে আমাদের একটা বিখ্যাত মোড় ছিল। সেখানেই গোবর্ধনকাকুর সাইকেল সাড়ানোর দোকান। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের সেই বিকেলবেলা। সূর্য ডুবতে তখন অনেক দেরি। গরমকাল। অনেকটা সময় পর্যন্ত থাকবে আলোর রেশ।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

সেই সাইকেল। পুরো সবুজে চক চক করছে। টায়ার পুরো কালো। হ্যান্ডেলে নতুন গ্রিপার বসানো। স্পোকের ভেতরে রঙিন চুলের রিং। নতুন সিট। চেন নতুন। গোবর্ধন কাকুর দোকানের দিকে এগোচ্ছি একটু একটু করে,  আর এই রূপটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বললাম, কাকু বাবা পাঠাল। বলল, ওই তো নিয়ে নাও। ব্যস। আজ আমাকে রাখে কে। হাতে নিয়ে ক্রিং ক্রিং করতে করতে ফাঁসিতলা হয়ে সদরঘাট হয়ে, তুলসীবাড়ি, বড়বাজার,  মানাদার গলি, পণ্ডিত প্রেস হয়ে আমাদের স্কুলের মাঠ, ঘোরার শেষ নেই। ক্লাস এইটে সেই সাইকেলের স্মৃতি। এরপর সেই সাইকেল আমি বেশিদিন ব্যবহার করতে পারিনি। কারণ তো অবশ্যই ছিল। পরের কোনো পর্বে বলব নিশ্চয়।

তো সেই বিশ্বজিতের দোকান থেকে বড় হয়ে প্রথম বেশি টাকা দিয়ে নতুন সাইকেল কেনা। দারুণ একটা আনন্দ। তারপর আবার মাধ্যমিকে হায়ার ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। তারজন্য সায়েন্স নিয়ে ক্লাস ইলেভেনে পড়াশোনা শুরু। আমাদের সময় মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়ায় পর থেকেও রেজাল্ট বেরোনোর আগে পর্যন্ত যে সময়টা থাকত, তা আমরা বিভিন্ন কাজে লাগতাম। মেয়েরা টাইপ-শর্ট হ্যান্ড,  ছেলেরা স্পোকেন ইংলিস বা কম্পিউটার শিখে নিত। যেহেতু উচ্চ মাধ্যমিক, তাই আমি সায়েন্সের পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছিলাম। অঙ্ক, জীবন বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন। যদিও এই পড়া বেশিদিন টেকেনি টেনে টুনে দু’মাস। রেজাল্ট বেরলো। মাত্র ফার্স্ট ডিভিশন। যা নিয়ে সায়েন্স পড়া যায় না। তাই ফিরে এলাম আর্টসে। এখানেও আমি প্রথমে ইতিহাস নিয়েছিলাম। ছিল ভূগোল, পল সায়েন্স আর সংস্কৃত। অনেক মানুষ আছেন, তাঁরা বললেন, ভূগোলে অনার্স নিয়ে পড়তে গেলে অঙ্ক বা ইকোনমিক্স বাধ্যতামূলক। এদিকে প্রায় আড়াই মাস ইতিহাস নিয়ে স্যারের কাছে পড়া হয়ে গেছে। আবার ছোট ছোট করে আমাদের হায় স্কুলের অত্যন্ত পণ্ডিত এক ইংরেজি শিক্ষক গৌরী শংকর ঘোষ। বিরাট পণ্ডিত। বাবা তো বলত শিপ অফ ইংলিশ। তিনি বাবার পরিচয়ে আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি মোটামুটি আমাদের স্কুলের দ্বিতীয় প্রধানশিক্ষকের ভূমিকা পালন করতেন। একদিন তিনি সায়েন্সের ক্লাস করে ওপরের বিল্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে গিয়ে বললাম, স্যার এই এই ব্যাপার। শুনে বললেন, এই ফর্মটা আমার নাম করে অফিসঘর থেকে নিয়ে ফিলআপ করে জমা দিয়ে দাও। ব্যস যথা আজ্ঞা শিরোধার্য বলে জমা করে দিলাম। মাসখানকের মধ্যেই আমার ইকোনমিক্সের ক্লাসে নাম উঠে গেল। আবার পড়াশোনা চালু। কিন্তু ইকোনমিক্স কোথায় পড়ব? আবার মাথায় হাত।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ আল-আকসা: বিশ্বজুড়ে ছি-ছিক্কার আর অভিশাপ কুড়াচ্ছে ইসরাইল

এই সময় আমার দু’চারটে বন্ধু ইতিমধ্যেই ইকোনমিক্সের প্রাইভেট টিউটরের কাছে ভর্তি হয়ে গেছে। খুব ভুল না করলেও যতদূর মনে আছে আমি, পলাশ, সমরেশ, বুচু আর… আর, নাঃ আর মনে করতে পারছি না। সবাই মিলে তাঁর কাছে পড়তে যেতাম। সেই পাড়ার নামটা আর মনে নেই। ইকোনমিক্সের স্যারের নাম ছিল কী বর্মন! আমরা বর্মনবাবু বলেই ডাকতাম। তাঁর বাড়ির কাছেই ছিল আমার ক্লাস এইটের স্যার। নাম অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কুড়ি বছর পর নামটা লিখতেই গা-টা শিউরে উঠল। সেই কুড়ি বছর আগের এক শীতের রাত। জীবনের চরমতম অপমান-লজ্জা শুধুমাত্র মুখ বুজে মাথা নিচু করে মেনে নিয়ে হয়েছিল, নিয়তি তাড়িত নিয়মে।

এই অরুণ স্যারের কাছে যখন পড়তে ঢুকেছিলাম। তখন স্বাভাবিকভাবেই মাইনের কথাবার্তা বাবার সঙ্গে হয়নি। হয়েছিল একটা অদ্ভুত বিনিময় প্রথার প্রচলনের মাধ্যমে। আমরা খুব একটা জানতাম না। এখানে আমরা বলার কারণ, আমি আর দিদি দু’জনেই এখনই পড়তাম। ক্লাস এইট। তারপর নাইন। শেষে টেন। মানে মাধ্যমিক পাস করে তাঁর থেকে বেরিয়ে এলাম। এই আসা যে জীবনে একটা বিরাট দাগ কেটে যাবে তা জানা ছিল কই। একদিন শীতের রাত্রি। আমি,  তখন নতুন সাইকেল নিয়ে বর্মন স্যারের কাছে পড়তে ঢুকব। গলির মুখেই দেখি পলাশ কথা বলছে একজনের সঙ্গে। কাছে এগোতেই দেখলাম অরুণবাবু। ক্লাস টেন থেকে বেরিয়ে আসার পর সেই দিনই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। আবার নতুন দেখা। আমি দেখা মাত্রই সাইকেল থেকে নেমে বললাম,  স্যার মানে কেমন আছেন। একটু সংকোচ-লজ্জা ছিলই। কেন-না তিনি পড়িয়েছেন। তিনি জ্ঞান দান করেছেন। শিক্ষার জ্ঞান দিয়েছেন। কিন্তু আমি তো তাঁকে গুরুদক্ষিণা দিতে পারিনি। অপারগ হয়েছি। বাবা তাঁর সঙ্গে মিথ্যে কথা বলছে। বাবা তাঁকে মাইনে দিতে পারেনি। সেই সংকোচ একটু ছিলই। সেই লজ্জাও কোথাও কোথাও মাথা নত করে দিত। যাক, তিনি তো দেখলেন,  দেখেই বললেন, এই তো ব্রহ্মচারী। আজ পেয়েছি। এবার… সেই কুড়ি বছর আগের সেই রাতের কথা কুড়ি বছর পর লিখছি, সত্যিই আমরা কত অসহায় ছিলাম। আজ বুঝি। খুব খুব ভালো করে বুঝতে পারি কতটা দরিদ্র ছিলাম আমরা। তিনি বলতে বলতে আমার হাত থেকে সাইকেলটা কেড়ে নিলেন। আমি হতবাক। বাক্-রুদ্ধ হয়ে অকস্মাৎ কোনো কথাই বলতে পারলাম না। উনি কেড়ে নিয়ে আমার থেকে সাইকেলটা হাঁটাতে হাঁটাতে বলতে বলতে গেলেন, যাও বাবাকে বলো আমার চাল দিতে হবে না। আমি সাইকেল বেচে পাওনা চালের টাকা তুলে নেব।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

স্তব্ধ থেকে স্তব্ধতার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। চোখের কোণে আজকেও যেমন জল এলো। এসেছিল সেদিনও। বিরাট শিক্ষার ভার-জ্ঞান-ঔরস নিয়ে যে শিক্ষককে এতদিনে পুজোর আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধা করতাম, তা মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল।  স্যারের চাল না পাওয়া কথার স্বরগুলো কানে বেজে উঠছিল, যেখানে প্রতিধ্বনি দিয়ে বলতেই পারতাম, যে স্যার যে চালের জন্য আপনি আমার এই সাইকেল কেড়ে নেওয়াটাকে উচিত-সৎ আর ধর্মের কাজ ভাবছেন, আমরাও অন্তর্লোকে তাই ভাবছি। কিন্তু যে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। যে সংসারের মানুষরা জানে তারা জমিদার বংশের, অথচ তাদেরই মাসের পর মাস ধারে চাল কিনে খেতে হয়। সেই নির্বাক দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র অন্তর্যামীকেই নালিশ জানিয়েছিলাম। সেদিন বর্মনবাবুর কাছে চুপচাপ গিয়ে ক্লাস করলাম। পলাশ, সমর সবাই চুপচাপ ছিল। বুচুও তখন কিছু জানত না। পড়া শেষ হবার পর প্রতিদিনের মতোই সবাই হইহই করেই বেরোল। শুধুমাত্র আমিই মনমরা হয়ে নিচে নেমে এলাম। শীতের রাতে গলির মুখে এসে দাঁড়ালাম। চারিদিকে কুয়াশার চাদর। গভীর স্তব্ধতা আর নির্বাক নীরবতা অন্ধকার আকাশ থেকে নেমে রাস্তার পোলের ওপর আচ্ছাদন তৈরি করল। আমি আস্তরণ বেয়ে পোলের নিচের আলো পড়ে থাকা পিচ কালো রাস্তা ধরে,  চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরলাম।

ছবি: গুগল

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *