বন্যালাগা গাঁয়ে…

ধীমান ব্রহ্মচারী

সেদিনের রাতের বেলায় বাড়ি ফিরে এসেছিলাম ঠিকই। কিন্তু আজও সেই রাতের বিছানায় একপাশে পাশ ফিরে চোখের কোণে জল ফেলার স্মৃতি মনে আছে। বাড়িতে এসেই প্রথমে মা-কে বললাম। মা শোনা মাত্রই খুব খুব মাথা গরম করে ফেলেছিল। অরুণবাবুর প্রতি মা বেশ কিছুক্ষণ রগরগে কথা আওড়াল। বাবা বাড়িতে ছিল না। বাবা গ্রামে গেছিল। আমাদের তখন ধান কাটাকাটির সময়। তাই অনেক সময় বাবাকে গ্রামের বাড়ি যেতে হত।

এখন যেমন করোনার প্রাদুর্ভাব। এরকম আমাদের বিশ্ব ইতিহাসে প্রায় দেখা গেছে শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মহামারি ও মোড়কের প্রাদুর্ভাব। বহু মানুষ মারা গেছে। কত ইতিহাস পড়েছি জেনেছি বইয়ের পাতায় পাতায়। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক-দার্শনিক আলবেয়ার কামুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’। সত্যিই পাতায় পাতায় শিহরণ তোলে। তবে আজকে যে সময়ে বসে এই স্মৃতির কথা লিখছি,  সেইসব সময়ে এইসব জানতাম কই। এ তো এই সেদিন হল জানলাম। যেদিন থেকে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা শুরু করলাম। তবে সে সময়ের জানা মানে আমাদের ওই সেই বইয়ের পাতার কবিতা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ফ্যান’। মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ অবধি, আমাদেরও ঠিক তেমনটাই ছিল। এমনই একদিন বাংলা কবিতার ক্লাস। আমাদের স্কুলের বিখ্যাত বিখ্যাত স্যাররা ছিলেন। সবাই তাঁদের নিজ মেধা ও জ্ঞানের মধ্যে দিয়েই আমাদের মতো ছাত্রগুলোকে আজকের পৃথিবী দেখার চোখ ও উপলব্ধির জন্য তৈরি করে দিয়েছেন মন। এক এক সময় ভেবে দেখেছি, জন্ম থেকে শৈশব থেকে যৌবন থেকে শেষে বার্ধক্য এই চক্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় স্কুল। আমাদের স্কুলই আমার এই পরিণত চিন্তার প্রকাশ। সেখানে যাঁরা মানুষ গড়ার লক্ষ্যে দিন-রাত এক করে নিজের শ্রম দিয়ে নির্মাণ করেন, তাঁরা সত্যিই কিছু পান না। বিনিময়ে তাঁরা থেকে যান একটা বিদ্যালয়ের শিক্ষক অর্থাৎ ‘স্যার’ এই পদবি নিয়ে। আর এখনকার শিক্ষাব্যবস্থার হাল নিয়ে অযথা সময় নষ্ট নাইবা করলাম। এরই পাশাপাশি নানান রকম রাজনৈতিক ক্রিয়াকপাল স্কুল সেক্টরটাকেই করেছে আরও ভয়ানক। দলীয় সংগঠনের একচেটিয়া রাজত্ব চলে কেমন আজকের স্কুলে স্কুলে। স্যারদের অনেক ক্ষেত্রে দলীয় রীতিনীতি মানতেই হয় নাহলেই চোখ শাসানি। আমাদের সময় কিন্তু স্কুলের মধ্যে রাজনীতির কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না। আর যাইহোক স্কুলটা শেষমেশ স্কুলই ছিল।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

তো এই ‘ফ্যান’ কবিতা পড়ানো হবে ক্লাসে। আমাদের বাংলা নিতেন পূর্ণেন্দুবাবু। তাছাড়াও নিতেন রবিনবাবু। খুব ভালো মজার মজার গল্প উপমা আকারে আমাদের শোনাতেন। তিনি ধুতি পাঞ্জাবি পরে আসতেন। দেখতে ছিলেন একেবাড়ে মহাত্মা গান্ধির মতো। ওইরকম বিস্তৃত চওড়া কপাল। আমাদের মূলত তিনি রচনা পড়াতেন। কাহিনির মধ্যেই তাঁর ছিল দারুণ একটা সজাগবোধ, যা দিয়েই ছেলেরা মস্তিষ্ক বিকাশের পথ দেখত। পূর্ণেন্দুবাবু। আমাদের স্কুলের মোটামুটি শিপ অফ বেঙ্গলি। তাঁর কথা ছিল অনেকটা চাপা। স্যার যখনই পড়াতেন আর পড়ানোর সময় এমন অনেক ছেলে থাকত যারা দু’একবার ফিসফাস করত। খুব শান্ত প্রকৃতির এই স্যারের কোনোদিন ছাত্রদের ওপর মার ধোর করা মনে পড়ে না। শুধুমাত্র বলতেন, তোরা ওখানে যে গল্প করছিস, পড়া ধরলে পারবি তো? ব্যাস এটা এটুকুই। তারপর বলতেন, আচ্ছা বল, এই যে মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে এই কবিতা লেখা হয়েছে। তো সাল টা ঠিক কত? ব্যস সবাই তখন চুপচাপ। আর কারোর কোনো কথা নেই। বোঝায় যায় না, ঘরে কেও আছে কিনা। আসলে তখন আমাদের মধ্যে ব্যক্তি সম্মানও ছিল একটা বড় ফ্যাক্টর। তাই আপন সম্মান রাখতে দ্বিতীয়বার কেউই সাহস দেখত না। আমাদের ক্লাসে তখন একে একে বাংলার তাবড় তাবড় রত্ন। শুভঙ্কর-গৌরব-পিনাকি-ইকবাল-স্বজন-মনোজিৎ-বিশ্বনাথ-সুখেন-সোমেশ্বর-অরুণ-কৃশানু এরা সব এক এক দিক্‌পালের মতো রাজ করত।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

তবে এক্ষেত্রে সোমেশ্বর আমাদের শহরের ছেলে ছিল না। কলকাতার ছেলে। বাবা ছিলেন স্কিনের ডাক্তার। চাকরি সূত্রে ওরা আমাদের রঘুনাথ গঞ্জে পোস্টিং পেয়েছিল, তাই ওকেও আমাদের স্কুলেই ভর্তি হতে হল। ক্লাস এইটে ও এখানে ভর্তি হয়। তার আগের সময়টা ছিল একটু আলাদা। কেন-না আমি জ্ঞান অবস্থায় একটা জিনিসই দেখে এসেছি, ক্লাসে ফার্স্ট বয় বলতে যা বোঝায় তা হল গৌরব আর শুভঙ্কর। চিরকালের চিরকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী। বাস্তবে তা না থাকলেও আমার এই বয়সে এসেও সেইরকম গোত্রের কিছুটা মনেই হয়। এরা দু’জনেই প্রায় ক্লাস ওয়ান থেকে সেভেন সামলে এসেছে একবার ও ফার্স্ট তো, এ সেকেন্ড। পরেরবার ও সেকেন্ড তো, এ ফার্স্ট। এরপর ক্লাস এইট থেকে প্রায় ফার্স্ট পজিশনে আসতে থাকে সোমেশ্বর। কম্পিটিশন যেন আরও বাড়তে থাকল। যাক সে কথা। পেমেন্দ্র মিত্রের ‘ফ্যান’ পড়াচ্ছেন পূর্ণেন্দুবাবু। সেই সময়কার ইতিহাস। সমাজ বাস্তবতা। এবং সেই সময়েই দরিদ্রতার মানুষের দু’টো ফ্যান চাওয়ার আর্তনাদ। জানি না ক্লাসের সবার উপলব্ধি আর আমার উপলব্ধি এক কিনা। তবে আমি একটু বেশিই উপলব্ধি করতে পারতাম। তার কারণ নিজেদের সংসারের অবস্থা। তবে এর পেছনে একটা বড় কারণ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আজ ২০২১ সাল। আজ থেকে ঠিক ২১ বছর আগের সেই ভয়াবহ বন্যা। সাধারণত আমাদের শহরে কোনোদিন নৌকা চলা কেউই দেখেননি। যাঁরা ষাট পেরিয়ে সত্তরের ঘরে ছিলেন তারাও কোনোদিনই শহরের রাজপথে নৌকা চলার সাক্ষী ছিলেন না। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই ছিল যে ভয়াবহ বন্যায় আমাদের অনেকটাই নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ টিনের চাল উড়ে যায়নি, জলের তোড়ে মাটির দেওয়াল ভেঙে ভেসে যায়নি। কিন্তু যা গেছে সেই যাওয়ার কষ্ট আজও সমানভাবে মনকে নাড়া দেয়। আমাদের বাড়ি ছিল এইজমালিক (শরিকি বাড়ি)। অর্থাৎ চার কাকা ও দুই পিসির বাড়ি। আর জন্ম থেকেই আমি দেখে আসছি আমাদের দোতলায় দু’টো ঘর। জেঠিমাদের ওপরে একটা, নিচে একটা। সেজো কাকার দু’টো। আর ছোটো কাকার একটা। বাদবাকি সবারই নিজের নিজের রান্নাঘর ও বাথরুম। আমাদের মেইন রাস্তার ওপর বাড়ি। পাঁচিল এতটাই উঁচু ছিল সবাই মজা করে বলত প্রেসিডেন্সি জেলের পাঁচিল। প্রায় তিরিশ ফুট। আকস্মিক এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সংসারকে লন্ডভন্ড করে দিয়ে যাবে তা কেই-বা জানত।

আরও পড়ুন: এক আলোর পৃথিবী (২)

সেদিনের দিনটা আজও আমার মনে আছে আমার জন্মদিনের আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর। আমাদের বাংলা পরীক্ষার দিন। পরীক্ষার সময় আমার পেন মা সদন করে আনত ঠাকুর বাড়ি থেকে। অর্থাৎ মায়ের বিশ্বাস ছিল যে, ওই পেনে পরীক্ষা দিলে সেই পরীক্ষা কোনোদিনই খারাপ হবে না। আর পরীক্ষার সময় মাছ ভাত, শাক, মিষ্টি দই। দই শুধু খেতাম না। তুলসী তলার মাটি, চন্দন আর দই দিয়ে ফোঁটা পড়ে যেতাম কপালে। তারপর মোটামুটি হিন্দু শাস্ত্রের তেতত্রিশ কোটি দেবতার পায়ে প্রণাম। মানে ঠাকুর ঘরে গিয়ে সিংহাসনে-মেঝেতে-দেওয়ালে প্রথমদিন অন্তত সব ঠাকুরের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, দাদু-দিদা, ঠাকুমা-ঠাকুরদা তারপর বাবাকে, শেষে মাকে প্রণাম করে তবেই বাড়ি থেকে বেরোনো। হ্যাঁ এখানে আরও একটা ব্যাপার আছে। তা হল, বছরের এই সময়টাই স্কুল যেতাম রিকশায়। তাও যেতে যেতে কারোর মুখ দেখা যেত না। দেখা গেলে মায়ের বিশ্বাস তা নাকি অশুভ হবে।

আরও পড়ুন: এক আলোর পৃথিবী

যাক, সেদিনও এর ব্যতিক্রম নয়। যথারীতি মুষলধারে গত রাত থেকে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই স্কুলের দিকে আমাদের রিকশা এগোচ্ছে। আমাদের বাড়ি ছেড়ে স্কুল যাবার পথে পণ্ডিত প্রেস মোড়। এই পণ্ডিত প্রেস অর্থাৎ বাংলা সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। ওরফে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘দাদা ঠাকুর’ নামে। সেই মোড় পেরিয়েই পোস্ট অফিস। তারপর দরবেশ পাড়া মোড়। সেখান থেকে ডান হাত নিলে ম্যাকেঞ্জি পার্ক মোড় রাস্তা উঠছে। এখন যেখান জঙ্গিপুর বইমেলা হয়। এই দরবেশ পাড়া থেকে ডানদিকে এগোচ্ছি, দেখছি পাশের হাইড্রেনে কাতারে কাতারে জল বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই যারা আসছে মোটামুটি সবারই হাঁটু অবধি প্যান্ট গোটানো। ব্যাপারটা কি! ইতিমধ্যেই অনেকে বলল, স্কুল বন্ধ, হবে না। বন্যার্থীরা সব স্কুলে এসেছে। স্কুল ছুটি। রিকশা আর একটু এগোতেই দেখলাম সামনের রাস্তা যেন নেই। আছে একটা সমুদ্র। সেখানে আশপাশের সব বাড়ি জলের তলায়। আমাদের রিকশা আর এগলো না। বেশ কিছু মানুষ হাতে চটি তুলে, কেউ বাজারের ব্যাগ তুলে, বউরা কাপড় তুলে সব এদিকেই আসছে। আসলে আমাদের জায়গাটায় সবচেয়ে উঁচু জায়গা শহরের। দারুণ একটা মজা মনের মধ্যে শুরু হল। কি মজা! কি মজা! আর পরীক্ষা হবে না। যাক বাঁচা গেল। সত্যিই সেদিনের পরীক্ষা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু জীবনের বড় একটা পরীক্ষায় হয়তো আজও ফেল করেই আছি।

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

ওদিকে স্কুলে জল ঢোকার মূলত কারণ একটাই। সেটা হল, আমাদের শহরের পশ্চিমে একটা নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে। নাম খড়খড়ি। কলকাতা থেকে সোজা উত্তরবঙ্গে যে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক চলে গেছে, যেটা অমরপুর বাস স্টপ। সেটা পৌঁছতে এই নদী পার হতে হয়। যদিও প্রায় চল্লিশ ফুটের উঁচু ব্রিজ রয়েছে। আর গতরাত থেকে প্রবল বৃষ্টিতে প্রায় বন্যার পরিস্থিতি হয়েছে। খড়খড়ির জল ফুলে উঠেছে এবং জল উপচিয়ে দু-পারে ঢুকেছে। সেই তোড়েই শহরের অনেকাংশ জলের তলায়। আর এইসব নদীর পাড়ে থাকা কয়েকশো পরিবার আশ্রয় নিয়েছে ধর্মশালায়-স্কুলে।

রিকশা আমাদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে এলো। বাবা বাড়িতেই ছিল। বেলা পেরিয়ে বিকেল। বাবা এই সময় মেঘলা আকাশে দুর্যোগ নিয়েই কোথায় একটা বেরোল। বাবা কোনোদিনই কোথায় কখন কী করত আমরা জানতাম না। আর এই সময় আমাদের জেঠিমাদের সঙ্গে তেমন সুসম্পর্ক ছিল না। কথা বলাবলি দীর্ঘদিন বন্ধই ছিল। এই আবার বেশ কিছুদিন হল আমাদের সঙ্গে একটু একটু করে কথা বলা শুরু হয়েছে। সন্ধে নামার প্রস্তুতি, আবার বৃষ্টি শুরু হল। এদিকে আমাদের বাড়ির পূর্বেই গঙ্গা। সে গঙ্গারও নাকি জল বেড়েছে। সুধীর সেনের পাঁচিল নাকি হাফ ডুবেছে। আমাদের বাড়ি থেকে গঙ্গা মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটা পথে। সদর দরজা থেকে পূর্ব দিকে সোজা বেরোলেই একটা বড় রাস্তা। তারপরই ডানহাতে রঘুনাথগঞ্জ থানা। আর একটু বাঁ-দিকে এগিয়ে ডানহাত দিয়ে একটা মাটির রাস্তা নেমে যাচ্ছে সোজা গঙ্গার ঘাটে। আর এই রাস্তাটার দু’ধারে দু’টো আট ফুটের পাঁচিল। যে রাস্তাটা সোজা গঙ্গার ঘটে নেমেছে, পাড় থেকেও আরো পাঁচ কী ছ’ফুটের নিচে প্রবাহিণী ভাগীরথী বয়ে গেছে। সুতরাং সেই জল প্রথমে পাড়ে উঠে তার ওপর আবার সুধীরবাবুর পাঁচিল হাফ ডুবিয়েছে। অনেক লোকজন গঙ্গার এই স্ফীতি দেখতে ভিড় করেছে। গঙ্গার ঘাটে যেখানে খেয়া পারাপার হয় সে-ঘাটের নাম ছিল সদরঘাট। আমরা সবাই উৎসাহ নিয়ে সেই পাঁচিলে চেপে উঠে দেখতে লাগলাম। দেখলাম সেই সদর ঘাট জলের তলায়। সবাই বলাবলি করতে লাগল ফরক্কার জল ছাড়াতেই এখানে গঙ্গার জল পার ভাসিয়ে শহরে উঠছে। বড়রা আমাদের বিপদ দেখে বাড়ি ফিরে যেতে বলে চোখ রাঙাল। আমরাও কিছুটা ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। সন্ধে নেমে এলো আমাদের বাড়ির মেইন রাস্তায় তখনো জল ওঠেনি।

আরও পড়ুন: শম্ভু মিত্র: বাঙালির অহংকার

মেইন রাস্তার ধারে শুধুমাত্র মহেনদের চালের একটা দশ চাকার লরি দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে মাল খালাস হচ্ছিল। ঠাকুর না করে কোন বিপদ বাড়ে, এই আশায় কর্মচারীরা জোরকদমে বস্তা বস্তা চাল লরি থেকে নামিয়ে গুদামে ভরছে। সন্ধে পেরিয়ে রাত। জেঠিমার মেয়ে সাম(শ্রাবণী)দির সঙ্গে মা ওপর থেকে এই দুর্যোগের কথা মাঝে মাঝেই বলাবলি চলছিল। আমরা নই। হ্যাঁ-রে সাবুনি জলটল বাড়তে পারে তো। নিচ থেকে প্রত্যুত্তরে সামদি বলল, না না কাকিমা এখানে জল উঠবে না। না ওদিকে থানার দিকে নাকি জল উঠেছে। আমিও মাঝে মাঝে বাইরের বারান্দায় গিয়ে উঁকি দিচ্ছি। লোডশেডিং। চারিদিক অন্ধকার। বাড়ির বিপরীতে নিচেই সেই লরির লোকজনও জল জল করে মাঝেমধ্যে বলছে। আমি বারান্দায় ছিলাম দাঁড়িয়ে, দিদিও এলো। মা ওদিকে কথা বলতে বলতে নিচে নেমে গেছে। বারান্দা বেয়ে বাইরের ঘরের দরজা খুলে রাস্তার নিচের বারান্দায় মা আর সামদি দাঁড়িয়ে দেখছে। হঠাৎ একটা চিৎকার। লরির মাল খালাস করতে করতেই কে একজন চেঁচিয়ে উঠে বলল, জল লেগেছে। সবাই মিলে কাজের গতি বাড়িয়ে দিল। এরই মধ্যে একজন টর্চ নিয়ে আমাদের বাড়ির নিচের বারান্দার দিকে আসতেই, মা তাকে বলল, এদিকে ড্রেনের দিকে আলোটা ফেলত। আলো ফেলতেই দেখা গেল শহরের ড্রেন উপচে জল বাড়ছে। রাস্তা থেকে আমাদের বাড়ির বারান্দা সাড়ে তিন ফুট উঁচুতে। আর যাইহোক বারান্দায় জল আসবেনা। আসতে পারে না। রাত তখন আটটা। এরপর আস্তে আস্তে জল খুব তাড়াতাড়িই আমাদের প্রথম দুটো সিঁড়ি গ্রাস করল। বিপরীতে লরির চাকা ততক্ষণে হাফ ডুবেছে। সেই প্রথম স্বচক্ষে বন্যার অভিজ্ঞতা চাক্ষুষ করলাম। এতদিন নম্বর পাওয়ার জন্যই বন্যায় হারিয়ে যাওয়া সম্পদহীন-ঘরবাড়ি ছাড়া মানুষের কাহিনি নিয়ে রচনা লিখতাম। সেদিন জীবনের রচনা লেখার পালা শুরু হচ্ছিল আমাদের সবার অজান্তেই। ইতিমধ্যেই বাবর গলা পাওয়া গেল। এসে বলল রাতে আরও জল বাড়বে। খড়খড়ির ব্রিজে নাকি জল উঠে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শব্দটার সঙ্গে সেবার প্রথম পরিচয় হল। আসলে আমরা অদৃষ্টের দাস। সর্বদায় আমরা এই মহা অবিনশ্বর ব্রহ্মের কাছে পরাজিত হয়। কিন্তু সেদিনও জানা ছিল না, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের মুখের হাসি চিরদিনের জন্য কেড়ে নেবে। রাত দশটা। নিচ থেকে সামদি আরও একবার বলল, কাকিমা বারান্দা অবধি জল এসে গেছে। আমরা উৎসাহ নিয়ে আবার বারান্দায় এলাম। অন্ধকার রাতে ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল আমরা একটা সমুদ্রে জাহাজে করে ভাসছি। আর যাচ্ছি। ঘোলাটে জল ঘূর্ণির মতো পাক খেতে খেতে সারারাস্তা গ্রাস করল। মহেনদের লরি ততক্ষণে সমস্ত মাল খালি করে ফিরে গেছে। ওদের গোডাউনে জলের ছোট্ট সর্পিলাকার স্রোত একটু একটু করে ধাক্কা দিচ্ছে। ছোট্ট চোখ দিয়ে দেখছি অনবরত, যে একটা শহর আস্তে আস্তে জলের তলায় যাচ্ছে। শুধুমাত্র আমরা নই, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে মহাপ্লাবনের লীলা খেলা দেখছে। চোখে ছিল অবাক দৃষ্টি। মনে ছিল শঙ্কা। রাত এগারোটা। আমরা সবাই খেতে বসলাম। আবার মেঘের ডাক। বিদ্যুৎ চমকে উঠল। ঘোলাটে জলে ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • বিষ্ণু চক্রবর্তী

    মানুষ কখনো কখনো চরম আকস্মিকতায় হেসে পড়ে। আমি হাসি মুখে পড়লুম। লেখককে অভিনন্দন।

  • Daruuuuuun laglo, Sir! Porte Porte chokher samne bheshe uthchilo sabkichu chobir Moto.

  • বাসবেন্দু

    ধীমানকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলেই বলছি, এর’ম লেখা লেখার মুন্সিয়ানা ধীমানের চিরকালই আছে। অভিজ্ঞতাকে সরলভাবে লেখার ক্ষমতা খুব কম লোকেরই থাকে, ধীমানের আছে আর সেটা ও জানে। ধীমানের কলমে এখানে মফস্বলের প্রেম সম্পর্কিত লেখা পড়তে চাই।

  • সত্রাজিৎ গোস্বামী

    চমৎকার ঝরঝরে লেখা। সাম্প্রতিকের মাটিতে দাঁড়িয়ে অতীত রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে মানুষের জীবনে বিপর্যয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সেতু বেঁধেছে ধীমান। খুব ভালো লাগলো পড়ে। চলতে থাকুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *