আঁকা-লেখা

ধীমান ব্রহ্মচারী

এই বন্যার জল সেবারে প্রায় সাত দিন ধরে আটকে ছিল। ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল অসংখ্য মানুষ। আমাদের শহরের গঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় যাদের কাঁচা বাড়ি ছিল, অনেকেরই আর সেই পুরনো বাড়িতে কিছু পায়নি। অনেকেই প্রায় আবার ধার-দেনা করে একটু একটু করে নতুন করে সাজিয়েছিল। প্রকৃতির এত বড় বিপর্যয় এর আগে কোনোদিনই দেখিনি। তাই জানতামও না। সেই প্রথম এত বড় দুর্যোগকে খুব কাছ থেকে দেখলাম।

আমি ছোট থেকে আঁকার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে সাল খুঁজতে গেলে ক্লাস ফোর। সেই সময় আমাদের ‘ছন্দবিচিত্রা’ নামে একটা স্কুল ছিল। সেখানে তিন জন মাথা ছিলেন। একজন স্যারের কথা খুব মনে পড়ে, নামটা ভুলে গেছি। উনি আমাদের বেতনের হিসাবপত্র বেশি দেখাশোনা করতেন। আর ছিলেন বাচ্চুকাকু বলে একজন। ইনি আমাদের পরিচিতও বটে। আমাদের খুব কাছের এক প্রতিবেশী আমরা শ্যামলী পিসি বলতাম। ওনারা ছিলেন তিন বোন দুই ভাই। শ্যামলী, বকানী আর গার্গী পিসি। এদিকে নারাণকাকা ও দীপককাকু। একটু খটোমোটো শুনলেও ঠিকই আমরা নারাণকে কাকা বলতাম, আর ওঁর দাদাকে কাকু। কি জানি আসলে, ছোট থেকে ওভাবে বলে বলে একটা অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছিল। জ্ঞান হওয়া দেখে আসছি ওদের বাড়ির সঙ্গে আমাদের বাড়ির আত্মিকযোগ। এ-বাড়ির রান্না ও-বাড়ি যেত। আবার ও-বাড়ির রান্না প্রায়শই আসত আমাদের বাড়িতে। সেই সময়ে মানুষের মধ্যেও ছিল কত সামঞ্জস্যতা-শৃঙ্খলা। আমি আর দিদি খুব ছোট থেকেই বকানী পিসির কাছেই পড়তাম। পদবি ছিল রায়। খুব সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারমাফিক তাঁদের ছিল জীবনযাত্রা। এই নারাণকাকু পেশায় ছিলেন উকিল। আমাদের জঙ্গিপুর কোর্টেই প্র্যাকটিস করতেন। পাশাপাশি সকাল ও সন্ধের সময় পড়ার ব্যাচ চালাতেন। এই নারাণকাকুর বন্ধুই ছিলেন বাচ্চু কাকু। বাচ্চুকাকু প্রতিদিন সকাল দশটায় তাঁর স্কুটার নিয়ে চলে আসতেন, নারাণকাকা ডেকে গাড়িতে বসিয়ে কোর্টে যেতেন। সেই সূত্রেই মাঝেমধ্যে রাস্তা-ঘাটে দেখা হলে আমার সঙ্গে দু’একটা কথা বার্তা হত। সেই থেকেই যা পরিচয়। আর এদিকে স্কুলে আঁকতাম। উনিও মাঝেসাজে আমাদের মায়নে পত্র কালেক্ট করতেন। আর ছিলেন আমাদের চোখে দেখা অন্যতম এক শিল্পী রবীনকাকু। ইনিই আমার আঁকার গুরুদেব। অনেক স্নেহ পেয়েছি। খুব ভালোবাসতেন আমাকে। মাসের পর মাস মাইনের টাকা বাকি থাকত। বাবা দিত মাঝেমাঝে, আবার আটকে গেলে পাঁচ থেকে ছ’মাসের আটকে যেত। খুব খারাপ লাগত, মাসের চারটে রবিবার দুপুরবেলা প্রায় দেড়টা থেকে সাড়ে চারটে অবধি ছিল আমাদের এই ক্লাস। আমাদের স্কুলেই হত সেই ক্লাস। রবীনকাকুই ম্যানেজ করে একটু এই বাচ্চু কাকুকে বলত, ওঁর ফি-টা দাদার সঙ্গে কথা হয়েছে, একটু সময় লাগবে হয়ে যাবে। আমাকে ক্লাস নেবার সময় আমার মুখ চোখ দেখেই হয়তো বুঝতে পারত,  আর তার জন্যই বলত, ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না, আমি বলে দিয়েছি। নে এটা শুকিয়ে গেলে কালো রংটা ছোপ ছোপ করে লাগা। আসলে তখন হয়তো আর্ট পেপারে বসে জলরঙে কোনো এক বর্ষার বাদল ঘন মেঘের আড়ালে রোদের তির্যক রেখার ছবি আঁকছি। কালো ঘন মেঘ একটু একটু করে সরে যাচ্ছে ততক্ষণে। সেই কালো মেঘের রংটা আমায় তুলি দিয়ে দিচ্ছি। কি অদ্ভুত জীবনের দোলাচলতার সঙ্গে সঙ্গেই আমার কাজের প্রভাব কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। জানি না এখন এই বয়সে খুব ভালো করে বুঝতে পারি। যে পরাবাস্তব যে একটা প্যারালাল ইউনিভার্স কোথায় যেন সেই সময় থেকেই আমার সঙ্গে একটু একটু করে হাত ধরে এগোত। এখানে আরও তিনজন আমার শ্রদ্ধেয় শিল্পীর কথা মনে পড়ে। সখা, শিশু আর পুষ্পেন্দুদা। আমার এ-যাবৎ দেখা তিন চিত্রকর। তিনজনই ছিল আমার খুব শ্রদ্ধার। তিনজনেই ছিল শিল্পীর জাত।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৩য় অংশ)

এত ছোট বয়সে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি শিল্প-সাহিত্যের তেমন কিছুই বুঝতাম না। আজকে এত বছর পর বুঝতে পারি ওঁরা সব কী ছিলেন! যতবার রামকিঙ্কর বেইজ, যামিনী রায়, ভ্যান গগ এঁদের কথা শুনি, পড়ি। যখন এঁদের বিশ্ব কাঁপানো সৃষ্টি দু’চোখ ভোরে দেখি, তখন আরও বেশি এঁদের কথা ভেবে রিলেট করতে পারি। কত বিরাট প্রতিভা না থাকলে এমনকী শিল্পের প্রতি এত দায়বদ্ধতা না থাকলে হয়তো, শিল্প নিয়ে এভাবে কাজ করা যায় না। সেই ছোট্ট থেকেই পুষ্পেন্দুদা, সখাদা আর শিশুদাকে আমার খুব কাছ থেকে দেখা। তিনমূর্তিই ছিল তিন স্বতন্ত্রতার প্রতীক। কারোর হাত জল আর রঙের কথা বলত। কেউ আবার চাঙড় চাঙড় মাটি কেটে কেটে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ অথবা যিশু খ্রিস্টের ছবি বানাত। শিশুদা একটু অন্যরকম ছিল, ওঁর বিভিন্ন ছবি বা স্কাল্পচার নিয়ে কিছু অভিনব ভাবত বারবার। একটা ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ছে। একদিন আমরা সবাই স্কুলের মাঠে বসেই আঁকছি। শীতের রোদ আমাদের গায়ে এসে লাগছে। পুষ্পেন্দুদা একটা ছবি এঁকেছে,  কিন্তু কিছুতেই মেন যে ফিনিশিং আমরা তখন ছবির ভাষায় বলতাম, ‘কমপ্লিট’ ওটা কিছুতেই হচ্ছিল না। শিশুদা তখন রবীন (রবীনকাকুর)-দা’র কিছু জুনিয়রদের একটু দেখিয়ে দিত। আমাদের মোটামুটি সিনিয়র হিসেবেই থাকত। পুষ্পেন্দুদা বলল, শিশু এটা শেষ হচ্ছে না। শিশুদা বলল, কেন হচ্ছে না। দে দেখি। পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরিয়ে একটা টান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখল। শিল্পীর চোখ খুঁজছে গাফালতি। খুঁজছে সে হয়েও না শেষ হওয়ার কারণ। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ছবিটা কল তলায় পেতে জল ঢেলে দে। শুকোলেই হবে। পুষ্পেন্দুদাও কম বড় শিল্পী নয়। ওঁ-ও বলল, একবার করে এসেছি। আসলে পুষ্পেন্দুদাও ছিল আমার কাছে নমস্য। ছবির কোথায় থামতে হয়, কোথায় কালোকে ব্যবহার করতে হয়, কোথায় জল লাগতে নেই এসবে মাস্টার। কিন্তু শিশুদার গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তার প্রয়োগ অনেকটা এগিয়ে থাকত সবসময়ের জন্য। তারজন্যই বলল, একবার ধোয়া আছে তো? আর একবার ধুলেই কুয়াশাটা পরিষ্কার হয়ে ফুটবে। আমি তখন ওখানেই ছিলাম বলল, চ তো তাহলে কল টিববি। আমাদের স্কুলে তখন একটা টিউবয়েল ছিল। হর-হর করে জল পড়ত। আমি সঙ্গে গেলাম। কল টিপলাম। পুষ্পেন্দুদা ছবিটা ভালো করে ধুলো। তারপর ছবিটা তুলে এনে রাখল। শিশুদা বলল দেখ এবার এলো? ইতিমধ্যেই রবীন (কাকু)-দা এলো, বলল কীরে তোদের হয়নি? পুষ্পেন্দুদা বলল, দেখ না এটাকে নিয়ে এতক্ষণ ধরে সময় গেল। রবীন(কাকু)-দা দেখল, বলল বাঃ। এ নিশ্চয় শিশু হাত দিয়েছে। একটা প্রবাদ আছে না, জহুরি জহর চেনে। এই শিশুদাকে ওঁরাই তৈরি করেছে। ঠিক একটা ছবিতে কতটা পর্যন্ত রং বা কতবার ধুলে সেটা ঠিক হয়ে আসে এই মেজার্মেন্ট বা অদৃশ্য মাপ ঝোপ খুব ভালো বুঝত। আমরা সবাই দেখলাম ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা একটা গ্রামের রাস্তা। যেটা সোজা একটা বাঁশবাগানের মধ্যে দিয়ে ঢুকে, ভেতরে চলে গেছে। আর সামনের দিকে বেরিয়ে আসা রাস্তার বা হাতে খেজুর রসের তিনটে হাড়ি নিয়ে এক গ্রামের মানুষ উঠেছে গাছে। কোমরে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে নিজেকে বেঁধেছে। গাছে একটা হাড়ি লাগিয়ে, নেমে আরও একটা হাড়ি নিয়ে ওপরে উঠছে। রাস্তার ধরে একটা হাড়ি পড়ে রয়েছে। এই পুরো ছবিটায় একটা ঘন কুয়াশার মধ্যে সবকিছুই একটা কুয়াশা কুয়াশা ভাব। শিশুদা বলল, তুই একবার ধুলে হত না, এটা আরও একবার জল খেত। আমি তখন শুনলাম। ভাবলাম কতটা সাধনা না থাকলে এভাবে ছবিকে প্রমিনেন্ট করে বাস্তব করে তোলা যায়।

এমন সময় সেই বাচ্চু কাকু এলো। বলল,  ব্রহ্মচারী, তোর তো অনেক বাকি থেকে গেল বাবাকে একটু বলিস। আমাদের খুব চাপ হবে-রে। আমতা আমতা করে বললাম, হ্যাঁ বলেছি। শুনে বলল, বললে হবে। একটি ব্যবস্থা করতে হবে তো। সবাই তখন মাঠেই বসে আছে, একটু সংকোচ আর ইতস্তত হয়ে মুখটা নামিয়ে নিলাম। একটা ভাঙা বাড়ির ছবি আঁকছিলাম। সেখানে বেশ কিছু ছিল ভাঙা। বুকটা হু-হু করে উঠল। মনটা একটু বিচলিত হয়ে গেল। কী একটা আপন মনে ওই ভাঙা বাড়িটার আরও কত ইট ভাঙতে লাগলাম। উনি ততক্ষণ চলে গেলেন। মনে মনে ভাবলাম, বাবা তো মাইনেগুলোর একটু ব্যবস্থা করতে পারে। পরক্ষণেই ভাবলাম আজ সকালেই তো বাজারআলা পবিত্রকাকু তাগাদা দিতে এসেছিল, বলে গেছে বাবাকে বলো, আমি এসেছিলাম। বাজারে বিল সাড়ে তিনশো টাকা হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

আসলে আমাদের সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র আসত মাসকাবারি। তা সে মুদি-মিষ্টি-মাছ-বাজার-বাসন-জামা-কাপড় থেকে সবই। তাই মাসের প্রথমে সবাইকে পেমেন্ট দিতে হত। কিন্তু একটা সময়ের পর থেকে এই পেমেন্টগুলো আর টাইম টু টাইম হল না। আমাদের বাজার আসত পবিত্রকাকু বলে এক বাজার ওয়ালার কাছ থেকে। খুব স্বল্পভাষী,  বেঁটেখাটো। সারাবছর একটা গেঞ্জি আর সবুজ লুঙ্গি। জ্ঞানত এভাবেই তাঁকে দেখে এসেছি। কোনো কালেই আমার সকালে ঘুম থেকে ওঠা হত না। মা খুব সকালে এসে ঘরের মশারি খুলতে খুলতে বলত, আটটা বেজে গেল। ছেলেটা এখনো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। পড়াশোনা হবে না। পড়াশোনার ছেলেরা আটটা অবধি কেউ ঘুমোয়। বরাবরের মতোই প্রতিদিন এভাবেই আচমকা উঠে, অনেকক্ষণ ঘুম থেকে উঠে গেছি,  এইরকম একটা আবভাব নিয়ে উঠে পড়তাম। তবে প্রতিদিনের বাজার দোকান আমিই করতাম। খুব ছোট থেকেই বাজারের কাজকর্ম করতে করতে আমি অনেকটাই ধাতস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। বাজারের ব্যাগ নিয়ে চলে যেতাম পবিত্রকাকুর কাছে। বাজারে কী কী নিতে হবে, এই ফর্দ প্রায় বারবার ভুলে যেতাম। প্রতিদিন কিছু না কিছু আনতে ভুলে যেতাম। বাড়িতে এসে মা বকাবকি করলেই বলতাম, ওটা পবিত্রকাকুর কাছে ছিল না। এতে বকার হাত থেকে অনেকটাই রেহাই পেতাম, কেন-না আমাদের ক্যাশ টাকায় আর কারোর থেকে বাজার আসত না। তাই পবিত্রকাকুর কাছে যা যা থাকবে, তার বাইরের অনাজপাতি দরকার হলেও কিছুই করার থাকত না পরেরদিন অপেক্ষা করা ছাড়া।

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • বিষ্ণু চক্রবর্তী

    অভিবাদন জানাই লেখককে। অনবদ্য লেখনী। শুধু নারায়ণ কাকা, সম্বোধনের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়েছে কোথাও কোথাও, অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিচ্যুতি। পাঠক হিসেবে আবেগিক হলুম পাঠ করে।

  • Dhiman brahmachari

    ধন্যবাদ।

  • Majulamukherjee.

    আঁকা, লেখার সামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থাপন অনবদ্য। লেখনী কতো সুনদরভাবে তার ছন্দ বয়ে চলেছে। আরো আশা বেশি বেশি করে।

  • প্রশান্ত নাথ

    শুধু শব্দের বাঁধুনিই নয়,ছবি আঁকতে আঁকতে এগিয়ে চলা।
    অসাধারণ! অনন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *