এক কিতাব এক নবাব

আজকের দিনেই ১৯৪১ সালে ভোপাল শহরে এক অভিজাত পরিবারে জন্ম হয়েছিল মনসুর আলি খানের। ক্যালেন্ডারের সোজা হিসেবে আশি বছর পূর্ণ করলেন তিনি। নবাব মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁর একাশিতম জন্মদিনে কলম ধরলেন শুভ্রাংশু রায়। একটু অন্যভাবে নবাব পতৌদিকে মনে করালেন। গঙ্গাজলে গঙ্গা পুজোর মতো তাঁর ওপর লেখা একটি গ্রন্থকে আলোচনায় টেনে এনে।

“এটা সেই সফর ছিল যা টাইগারের, যে সে সময় মাত্র একুশ বছর বয়সি ছিল ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ দেখেছিল। এবং অভিষেকের মুহূর্ত এরচেয়ে খুব কমই নাটকীয় হয়। আবার সেটা যন্ত্রণাদায়কও ছিল। (নরি) কন্ট্রাকটরের ক্রিকেট কেরিয়ার বার্বডোসের বিরুদ্ধে ম্যাচে চার্লি গ্রিফিতের একটি বিষাক্ত বাউন্সারে শেষ হয়েছিল। বল এসে সজোরে তাঁর মাথায় আঘাত করেছিল এবং তাঁর পক্ষে আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা সম্ভবপর হয়নি। টাইগার নিজে সে ম্যাচে শূন্য এবং শূন্য করেছিল। টাইগারকে ভাইস ক্যাপ্টেন করে পাঠানো হয়েছিল যাতে সে কনট্রাকটরের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে কিছুদিন থাকতে পারে। কিন্তু এখন সে নিজেই নিজেকে খাদের কিনারায় দেখতে পেল। প্রত্যেক খেলোয়াড় যাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার ভার টাইগারের ওপর ন্যস্ত হয়েছিল তৃতীয় টেস্টে, বলা বাহুল্য প্রত্যেকে বয়সে তার চেয়ে বড় ছিল।”― ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও ক্যারিশ্মাটিক অধিনায়ক টাইগার অর্থাৎ মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁকে মাত্র একুশ বছর বয়সে ১৯৬২-তে ক্যারিবিয়ান সফরে ঠিক কী পরিস্থিতিতে ব্রিজটাউনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তৃতীয় টেস্টে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছিল। সমসাময়িক ভারতীয় ক্রিকেটার ফারুখ ইঞ্জিনিয়ারের স্মৃতিচারণার সৌজন্যে আমরা জানার সুযোগ পাই সেসব। সুরেশ মেনন সম্পাদিত সেই বইটির নাম পতৌদি-নবাব অফ ক্রিকেট। এই ঘটনার মাত্র এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৬১-তে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মনসুরের প্রথম ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে টেস্ট অভিষেকের সুযোগ হয়। ততদিনে ইংল্যান্ডে ইউনিভার্সিটি ক্রিকেটে তিনি বেশ সাড়া জাগিয়ে ফেলেছেন। তার পর ইংল্যান্ডে মাটিতে এক ভয়ানক দুর্ঘটনায় মনসুরের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও সেই প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে মনসুরের ক্রিকেট জীবনে ফিরে আসা এবং শুধু ফিরে আসা নয়, সর্বোচ্চ স্তরে এতদিন সাফল্যের সঙ্গে খেলে যাওয়া কার্যত আজ এক লোকগাথায় পরিণত।

আরও পড়ুন: নতুন স্বপ্ন নিয়ে ক্রিকেট দৌড়ে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও

জীবনের ৪৬ টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ৪০ ম্যাচে তিনি ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন (১৯৬২- ১৯৭৪)। শুধমাত্র তাঁকে আজ অবধি টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে গণ্য করা হয় না, তাঁর বিষয়ে ক্রিকেট মহলে বহুল চর্চিত মত হল এটাই যে, টাইগার পতৌদির নেতৃত্ব ভারতীয় ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাই এ-বইয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং দ্য হিন্দু পত্রিকার দীর্ঘদিনের এডিটর ইন চিফ এন রাম লেখেন ‘‘মাঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সিগনাল, ফিল্ডিং পরিবর্তনগুলি ভারতীয় ক্রিকেটকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছিল… এবং ভারতীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার ঘটিয়েছিল যে, তাঁরা পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হতে পরাগম, দেশে তো বটেই এমনকী বিদেশের মাটিতেও।”

আরও পড়ুন: জন্মদিনে স্মরণ: দিলীপ দোশি

তবে এই বইটিতে মনকে সবচেয়ে ছুঁয়ে যায় নবাবের সহধর্মিণী শর্মিলা ঠাকুরের ফরোয়ার্ডিং। শর্মিলা লিখেছেন, “তরুণ বয়স থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একই রকম ছিলেন মানুষটা― পরিণত, শান্ত, দায়িত্ববান, ভীষণই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন।” শর্মিলা ঠাকুরের পুরো ফরোয়ার্ডিংটি মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায় আসলে শুধুমাত্র ক্রিকেট মাঠে নয়, হরিয়ানার পতৌদি নামে একদা এই দেশীয় রাজ্যের খানদানি শাসক পরিবারে জন্ম হওয়া মনসুর আলি খান পতৌদি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন নবাব। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেবলমাত্র নিজে সংগীত রসিক ছিলেন না, তবলা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি মিউসিক্যাল ইনস্টুমেন্ট বাজানোর মতো দক্ষতাও তাঁর ছিল। এমনিতে চুপচাপ থাকলেও মনোমত সঙ্গী পেলে মনসুরের রসবোধ উঠলে উঠত, এ কথা জানিয়েছেন পত্নী শর্মিলা এবং তাঁর দুই কন্যা সাবা এবং সোহা আলি খান, যাঁরাও এ বইয়ের অন্যতম লেখক।

আরও পড়ুন: ছোটজনের বড় সাফল্য: খেল জগতের বৃত্তান্ত

জনমানসে অবশ্য ভারত এবং ইংল্যান্ড উভয় দেশের হয়ে টেস্ট খেলা ইফতিকার আলি খানের পুত্র এবং পতৌদির নবম নবাব মনসুর আলি খান পতৌদির পরিচিতি একজন সফল ক্রিকেটার হিসেবেই। এবং সুরেশ মেননের সম্পাদনার গুণে স্কুলজীবন থেকে টেস্ট ক্রিকেটার, অধিনায়ক, সিলেক্টর এমনকী কমেন্ট্রেটর হিসেবে পতৌদিকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ এ বইয়ের পাঠকদের সামনে রয়েছে। আর তা সম্ভবপর হয়েছে এ বইয়ের লেখকসূচির জন্য। এ স্মরণগ্রন্থে একদিকে যেমন ফারুক ইঞ্জিনিয়র, আব্বাস আলি বেগ, বিষেন সিং বেদি, সুনীল গাভাসকর, রাহুল দ্রাবিড়, মাইক ব্রেইলি, ইয়ান চ্যাপেলের মতো ক্রিকেটাররা রয়েছেন তেমনি রয়েছেন টনি লুইস, এন রাম, রাজীব সারদেশাই, এম জে আকবরের মতো ক্রিকেট ভাষ্যকার, কলামিস্ট বা সাংবাদিক।

Sharmila Tagore And Charming Mansoor Ali Khan Pataudi - CricTracker

এমনকী সুরেশ মেনন সম্পাদিত এই বইটিতে নাসিরুদ্দিন শাহের মতো ভিন্ন পেশার ব্যস্ত মানুষও টাইগার পতৌদি সম্বন্ধে তাঁর অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায়। বইটি খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়, এটি সম্পাদনার ক্ষেত্রে সুরেশ মেনন যথেষ্ট যত্ন নিয়েছেন। পরিমার্জিত প্রচ্ছদ, বিশিষ্ট সুন্দর হার্ড বাউন্ড বাঁধাইয়ে ১৮৬ পাতার এই বইয়ে পাঠকদের সামনে তুলে দিয়েছেন পতৌদির ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ের অনুপুভ্খ নথি, সঙ্গে তাঁর খেলার মাঠের আর ব্যক্তিগত জীবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি। এই বইটি সংগ্রহ করলে কেবলমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে পাঠক মনসুর আলি খান পতৌদিকে নানা দিক থেকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পাবেন না, যে সময়কাল ধরে (১৯৬১-১৯৭৫) বাইশ গজে পতৌদি বিচরণ করেছেন সেই সময়ের ভারতীয় ক্রিকেট দলের হাল-হকিকতের খবরও ধরা পড়বে। সেটাও কিন্তু আরও একটি বড় পাওনা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

6 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *