এক আলোর পৃথিবী

ধীমান ব্রহ্মচারী

(এক)

আজ থেকে প্রায় অনেক বছর আগের সেই স্মৃতি। তখন আমি ক্লাস ফাইভে উঠেছি। আমার শহরের বিখ্যাত স্কুল রঘুনাথগঞ্জ হায় স্কুল। আমি সেই স্কুলেই পড়তাম। আমাদের সময় জীবনের চলাফেরা, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজাত বোধগুলো এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায়নি। আমরা তখন সবাই সবার আপন নামক একটা আস্তরণ পড়ে চলাফেরা করতাম। আমাদের বাড়ি কেন, প্রায় সব বাড়িতেই একটা বস্তু থাকত, যেটা হল শাসন। স্কুলে পড়ার অনেক স্মৃতি এখন এই পর্বে এসে মনে পড়ে। আমাদের সময়কালে, স্যারদের নামের সঙ্গে ‘বাবু’ শব্দটা ছিল। সেইমতো আমরাও ‘বাবু’ সম্বোধন করতাম। তখন হেডস্যার ছিলেন স্বপনবাবু। মিতভাষী স্বপ্নবাবু ছিলেন, আমাদের মতো সব স্যারদেরই খুব শ্রদ্ধার ও আনন্দের। এখানে হঠাৎ ‘আনন্দ’ শব্দটা জুড়লাম বলে অনেকেই পড়তে পড়তে ভাববেন, এটা আবার কী। কোনও ব্যক্তি মানুষের চরিত্র বা স্বভাবের ক্ষেত্রে এই শব্দবন্ধটি বেমানান। ঠিকই, কিন্তু একটু অন্যভাবে বললে, যেকোনও স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা পদ্ধতি বা সিস্টেম আছে। স্কুল পরিচালনা যাঁরা করেন, ঠিক তাঁদের নিয়ে তৈরি হয় যেমন― অমুক স্কুল পরিচালন কমিটি। এই বিষয়টা সম্পর্কে আমার কোনও কালেই জ্ঞান বিশেষ ছিল না। তবে আজকের দিনে এসে, বিশেষত আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রুপে কাজ করার ফলে অনেকটাই বুঝতে পেরেছি। তো যাক সে কথা। এখন এই স্কুলে আমি অন্তত ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ছি। তারপর মাধ্যমিক পর্যন্ত। যদিও এই ওয়ানের পার্টটা ছিল, প্রাথমিক বিভাগে। তাই ওখানেও অনেক ছোট ছোট ঘটনা বা স্মৃতি মাঝেমধ্যেই নাড়া দেয়। যদি সুযোগ হয় আসব সে প্রসঙ্গে। আসলে, একটা স্কুল কীভাবে সারাবছর পরিচালনা করা হবে, তা নির্ধারিত হয় একটি ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। এখন অনেক স্কুল এটার ইংরেজি তর্জমা করে বলে, ‘এমসি’। ঠিকই একটি স্কুলের পঠনপাঠন-ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা-দেখভাল এসব কিছুই নির্ধারণ করেন সেই স্কুলের প্রধানশিক্ষক। এবং সেই স্কুলের সহকারী শিক্ষকদেরও প্রতিদিনের কাজকর্মের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ যাতে সুষ্ঠুভাবেই হয়, তার দিকটাও নির্ভর করে যেকোনও স্কুলের সেই প্রধানশিক্ষকের ওপর। সত্যিই আজ অনেকটা অবাক হই, শিক্ষার যে বিরাট ভার সত্যিই হয়তো আমরা আজও ছাত্র হয়ে বুঝলাম না।

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

একটা কথা এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, ‘শিক্ষাকে আমরা বহন করেই গেলাম, বাহন করতে পারলাম কই’। স্কুলজীবন যেকোনও ব্যক্তিচরিত্র নির্মাণের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমাদের সময় অর্থাৎ আমরা যেসময়টাই জন্মেছি, সেই সময়টা যদিও পৃথিবীর সব গোল্ডেন যুগ পেরিয়ে কয়েক শতাব্দী অতিক্রান্ত সময় পর্ব। কিন্তু তবুও আমাদের শিক্ষার এক বিশেষ গুণ ছিল যে, আমরা সবাই মনুষত্বটুকু অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের স্কুলে প্রতিদিন দশটা পঁয়তাল্লিশে বেল পড়ত। কানুদাদু আমাদের বাড়ির পেছনেই তাঁর বাড়ি। তিনিই আমাদের বেল দিতেন। পিঠটা তাঁর ছিল খানিকটা বাঁকানো, হয়তো বয়স কোথাও তাঁকে শাসন করে। স্কুলের গেট বলতে একটা বিরাট মাপের গেট। তারই আবার একটা দিকে মানে ঢুকতে গেলে বামদিকের নিচের কোণে বা বেরোতে গেলে ডানদিকের কোণে ছিল একটা ছোট্ট কাটা গেট। আর আমাদের সময় থেকে দেখেছি নিয়ম। তখন স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতায় মনে হত ধুর এসব খুব বাড়াবাড়ি। অথচ, আজ মনে হয়, জীবনের বাস্তবিক যে চলার পথ, সে পথের অভ্যেস হয়তো স্কুল থেকেই শুরু হয়। এই সেই মন্দির যেখানে প্রতিদিনের নিরন্তর সাধনার পূর্ণতাপ্রাপ্তি চলে দিনের পর দিন। কত সময় কেটেছে সেই স্কুলের মাঠের ঘাসে। সময় তার নিজের নিয়মে ঘটিয়েছে সময়ের বৈচিত্র্য। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-বসন্ত সবাই যেন আমাদের এই মাঠ সংলগ্ন দেবালয়ে অবলীলায় তাদের পরিযায়ী সফর সারত। বেল পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাচ্চুবাবু একটা কঞ্চি নিয়ে নিতেন। শীর্ণ শরীর আর অসম্ভব একটা প্যাশন তাঁর শাসনের। তিনি নিজেই ছিলেন একটা সিস্টেম। আর তাঁর সিস্টেম ব্যক্ত হত আমাদের অবোধ আর সুবোধ ছাত্রদের ওপর। বাচ্চুবাবুর সেই শানিত কঞ্চির মার আমি কোনও দিন খেয়েছি কি না মনে পড়ে না। ওই ঘণ্টা পড়া শেষ হলেই, তড়িঘড়ি করে যারা লেট আসত, তারা মাথা আর সাইকেল কোনওরকমে ওই ছোট্ট গেটে গলিয়ে দিতে পারলেই হল। যেটা দেখে যেন, আর কেউ না হোক উপস্থিত বাচ্চুবাবুকে এটুকু ধোকা বা বোকা যাই বানানো যাক, এই বলে, যে স্যার এই তো ঢুকেই গেছি। একদম লেট নেই লেট কই। এই তো এবার না ঢুকতে দিলে যেন, আপনিই লেট করিয়ে দিলেন। সত্যিই আমরা কতটা ভয় করতাম স্যারের ওই লগাপ্যাটকা একটা কঞ্চিকে। অথচ আজ এটা অতীত। এখন শিক্ষাব্যবস্থা অন্য আদলে তৈরি। এখন প্রযুক্তির প্রহসন দেখছি আমরা আমাদেরই জীবনের তিরিশের গোড়ায়। কিন্তু কথায় আছে চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা। তাই একরকম ভাগ্যের হাতেই সঁপে আত্মার মতো, কেউ সেই কঞ্চির মার খেত, অনেকে বেঁচে যেত।

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

তখনকার সময়, আমাদের প্রায় আড়াই হাজার ছাত্র। বিরাট স্কুল বিল্ডিয়ের মধ্যে আমাদের মাঠে সবাই প্রেয়ারের জন্য দাঁড়িয়ে যেত। মনে পড়ে আমি ক্লাস ফাইভ থেকেই ক্লাস মনিটর ছিলাম। ক্লাস ফোর পাশ করে অ্যাডমিশন দিতে হল। আমার নাম উঠেছিল যদি খুব ভুল না বলি, একশো কুড়িতে। অর্থাৎ বোঝাই যায় খুব সহজে আমার মেধা-বুদ্ধি বা তথাকথিত আইকিউ। আমাদের সময় ভয়ংকর কিছু ছাত্র ছিল। জ্ঞান-মেধা বলতে যা বোঝায়, আমি খুব ছোট থেকেই এদেরকে দেখছি। গৌরব, শুভঙ্কর, ইকবাল, পিনাকী, মনোজিৎ, ভাস্কর, স্বজন, অনির্বাণ, বিশ্বনাথ আরও অনেকেই আছে। পরে এসে শান্ত স্বভাবী খেলাপ্রেমী বন্ধু এসে যোগ দিল এই রথীদের টিমে সোমেশ্বর। কলকাতার ছেলে। সৌম্যজ্যোতি, অরুণ, সুখেন, অভ্রদীপ, কৃশানু এরাও ছিল সেই মাণিক্যের টিমে। আমরা তখনও সেভাবে শিক্ষাকে বাহন করতে পারিনি। বিশেষ করে, আমি তো তখন কুড়ির মধ্যে থাকা ছাত্র। তাছাড়াও মেধা বলতে যেটা বোঝায়, সেটা আমার কোনও দিনই ছিল না। দু’টো বিষয়, এক অঙ্ক আর এক ইংরেজি কোনও দিন কোনও কালেই ভালো ছিলাম না। অঙ্কে আমার সবচেয়ে বেশি পাওয়া নম্বর আটষট্টি। তাও আমার ক্লাস টু কি থ্রি হবে। এখন আর মনে পড়ে না। এই ফাইভের অ্যাডমিশনের পরীক্ষায় সবাই তাক লাগিয়ে সবার প্রথমে নাম উঠল মনোজিতের। আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে, একটু সোজা এগোলেই ডান হাতে একটা গলি, সেই গলিটা সামনের রাস্তা দিয়েই এগোচ্ছে, ওইখানেই ওর বাড়ি। আমরা সবাই ঘাবরেই গিয়েছিলাম, আরে মনোজিৎ! কোথা থেকে? কীভাবে? এবং কেমন করে? এবং শুধুমাত্র তাই-ই নয়, যেখানে শুভঙ্কর, গৌরব ওরা থাকতে। কী-জানি কী-জানি, একটা রব। আমাদের স্কুলেরই প্রাইমারি স্কুলে ফার্স্ট হয়েছিল আমাদের গৌরব। না না ভুল বলিনি, ওটা বিশেষণ বললাম না, ও গৌরব দে। অথচ ফার্স্ট হল মনোজিৎ। তা যাইহোক, সবাই প্রেয়ার লাইনে নিয়মনীতি মেনেই দাঁড়াতাম। মোটামুটি আমাদের সময় স্কুলের একটা স্বচ্ছ ধারণা ছিল, তা হল ভালো পড়াশোনা করা ছেলেরা সর্বদাই সামনের সারিতে থাকত। তা সে ক্লাস হোক বা প্রেয়ারের লাইন। ইংরেজি ‘এল’ যেমন দেখতে তাকে চিৎ করে শুয়ে দিলে যেমনটা দেখতে হয়, ঠিক তেমন একটা বৃহৎ প্রকাণ্ড পরিধি নিয়ে আমাদের এই মন্দির ছিল সারা শহরের পবিত্র স্থান।

আরও পড়ুন: একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

বাংলা সাহিত্য পড়ার সময়, রবীন্দ্রনাথ কী এবং কেন আর তারও পাশাপাশি কতটা প্রাসঙ্গিক?― এই প্রশ্ন জানতে বা উদ্ধার করতে যে পরিমাণ পড়াশোনা-বিচক্ষণতা-সাধনা এবং সর্বোপরি ত্যাগ দরকার সাহিত্যের ওপর, সেটা সত্যই এই সময়ে এসে খুব ভালো করে উপলব্ধি করি। তেমন উপলব্ধি করি জীবনের এই তেত্রিশ বছর বয়সে এসে স্কুলজীবনটা কতটা প্রাসঙ্গিক। আর আমাদের এই স্কুলকেই একবার শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল আমাদের সিনিয়র ছাত্র কিশোর গোপালদা। মন পড়ে, আমরা তখন ক্লাস ফাইভের ‘এ’ সেকশনে পড়ি। ক্লাসে নিমুবাবু ভূগোল পড়াচ্ছেন। নিমুবাবুর দুই স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম আমি আর বিশ্বনাথ। আমরা বিশু বলেই ডাকতাম। আমার বাড়ির রান্নাঘরের দিকেই বলতে পারি উত্তরে ছিল ওর বাড়ি। আমি বিশু একটা দীর্ঘসময় আমাদের ক্রিকেট বা স্কুল টিমের লেফটহ্যান্ড প্লেয়ার। গোদা বাংলায় বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান ছিলাম। যদিও দু’জনেই জন্মগত নই, তবুও বলতে পারি সৌরভ গাঙ্গুলি ফলোয়ার্স। এই তত্ত্ব তখন হয়তো দু’জনেই বুঝতাম না। তো নিমুবাবু আমাদের ক্লাসে আসতেন। খুব ঠান্ডা-শান্ত-মিতভাষী, গায়ের রং সাদা, চুল কোঁকড়ানো এবং সর্বদা মুখে থাকত লবঙ্গ। কথা বলতেন খুব আস্তে আস্তে। এমন সময় বাচ্চুবাবু আর সান্ত্বনা ম্যাম দু’জনেই এলেন। আমাদের সময় ম্যাডাম ইংরেজি ক্লাস নিতেন। আজকেও সেই স্বর অর্থাৎ স্বচ্ছ-সাবলীল-স্পষ্ট ইংরেজির শব্দ কানে ভাসছে, এই কথাগুলো লিখতে লিখতে। ছোট্ট ক্লাস ফাইভওয়ালা মন নিয়ে এটাই ভাবতাম, যদি ইংরেজিটা ভালো করে শিখেনি, তাহলে ম্যাডামের সঙ্গে বেশ ইংরেজিতে কথা বলা যাবে। সত্যিই শৈশব অনেককিছু নিয়ে থাকে। কৈশোর সেগুলো থেকে যেন বাছাই করে আগামীর চলার পথ। সেই ইংরেজি ম্যাডাম ঘরে ঢুকলেন। আমাদের সময় একটা স্বাভাবিক হই-হুল্লোড় হত, যদি কোনও কারণে দৈবাৎ কেউ, সে যে কেউ হোক, ক্লাস চলাকালীন ঘরে ঢুকলে। এবং এই ঘরে আসা প্রায়শই থাকত ক্লাস ফাইভের সময়। কেন-না, সাধারণত আমাদের সময় ক্লাস ফোর পাশ করেই, এই ফাইভে ভর্তি হতে হত, নাম উঠলে। ফলে সামনের মেইন গেটের পাশাপাশি, আমাদের আরও একটা গেট ছিল, সেখান দিয়েও অনেক মানে গার্জেন, মানুষজন আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে অনেকেরই স্কুল-পড়াশোনা এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে বিরাট একটা জ্ঞান বা সবজান্তা গোছের কিছু ছিল না। সেজন্যই গেট দিয়ে সরাসরি ঢুকে ডান হাতে সিঁড়ি নিলেই, আমাদের ক্লাস ফাইভের সেকশন ‘এ’ ঘর। আর যথারীতি ঘরে স্যার, ম্যাম যেইই থাকুন না কেন, মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থেকেই যেত। স্কুলের বাইরেও একটা যেন রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তৃতা শেষে মিছিল ভাঙার জটলা হত। তবে এটা সামলানোর পক্ষে বাচ্চুবাবু একাই কাফি ছিলেন। তাঁর সেই কঞ্চি তুলে বললেন, এই যে সবাই শান্ত হয়ে বসো। কেউ একটাও কথা বলবে না। ম্যাম, তোমাদের কিছু বলবেন। এই যে এদিকে। খুব স্বাভাবিক, একটা চল্লিশ বাই পঞ্চাশ ফুটের ঘরে প্রায় দেড়শো প্লাস স্টুডেন্ট নিয়ে ক্লাস করাটা শুধুই ধৈর্য নয়, একটা বিরাট সাধনা। তো, একটু বচ্চুবাবুর কঞ্চির ভয়ে সবাই ক্ষান্ত হওয়াতে, ম্যাডাম বললেন, তোমাদের স্কুলের আজ একটা বিরাট প্রাপ্তি ও সম্মানের দিন। এবছর মাধ্যমিকে রাজ্যের অষ্টম স্থান অধিকার করেছে, তোমাদের দাদা কিশোর গোপাল (কিশোরদার পদবিটা আজ আর স্মরণে নেই)। তার জন্য আগামী দিন তার সংবর্ধনার আয়োজন হবে। কাল কোনও ক্লাস হবে না, তবে সকলে উপস্থিত থাকবে। আর আজ ছুটি। ব্যস এ-যেন হঠাৎই একটা খাঁচায় থাকা পাখিকে ছেড়ে দেওয়া। হইহই করে সবাই ব্যাগ হাতে আমরা ছুটে মাঠে। সেই মাঠ। বর্ষার জলে পুষ্ট সবুজ ঘাস। বিল্ডিংয়ের জন্য ইতস্তত পড়ে থাকা বালি-ইট-পাথর। সেই পুরনো ছবি। সেই পুরনো স্মৃতির একটা ছবি আজও ভাসে চোখে।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

পরের দিনই তৈরি হল স্টেজ। সে বিরাট আয়োজন। এই আয়োজন আমরা স্কুলে প্রথমবারই দেখলাম। আর দেখব নাই-বা কেন? আমাদের স্কুল রাজ্যের মধ্যে অষ্টম। সেকি এমনি কথা! তাই শহরজুড়ে একটা শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা প্রদান গোছের একটা মরশুম চলল। আমরা ছোট বয়স থেকেই খুব পরিশ্রমী ছিলাম। নিমুবাবুর ডান আর বাম হাত ছিলাম আমি আর বিশু। যেকোনও ধরনের কাজ, তা সে ক্লাস ফাইভেরই অন্য কোনও সেকশনে বই বিলি করতে হবে অথবা সরস্বতী পুজোর চাঁদা তুলতে হবে। সব কাজেই আমরা দু’জন থাকতাম। ডাক পড়ত এই দুই প্রতিবেশী বন্ধুর। আমাদের প্রেয়ার লাইনের যেখানে স্টেজ মতো করা থাকত, আমরা যেখানে উঠে জাতীয় সংগীতের লিড ধরতাম, ঠিক সেখানেই তৈরি করা হল স্টেজ। প্রায় চল্লিশ ফুটের একটা স্টেজ। তার প্রায় তিন দিক ফুল দিয়ে সাজানো। আর বড় বড় সব হ্যালোজেন। সেই হ্যালোজেনের আলো জ্বলায় মনে হত না, তখন দিন না রাত। সামনেই আমাদের উন্মুক্ত সবুজ মাঠ। সেখানে পাতা হল চেয়ার। ওখানে আবার দু’ধরনের চেয়ার পাতা হল। এক সাধারণ মানুষ মানে যাঁরা শুধুমাত্র দর্শক ও শ্রোতা। আর প্রথমের সারির চেয়ার হল স্যার ও বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। ঢালাও খাবারের আয়োজন হল ক্যাটারিং বসিয়ে। এই ক্যাটারিং সম্পর্কে তখন আমি কিছু জানতামনা। মানে এটার শব্দ সম্পর্কেই কোনও ধারণা ছিল না। তো কী কাজের জন্য এই ক্যাটারিং তাই-বা জানব কীভাবে? আর এই ক্যাটারিং খাওয়া শিখেছিলাম পুরুলিয়ায় থাকা আমার এক মামার থেকে। নাম উদয়। আমরা উদয় মামা বলেই ডাকতাম। অসীম সাহসী একই মানুষটা। অশরীরী আর প্রেত-ভূতের উদাহরণ আর অমনি তার সঙ্গে গা শিউরে ওঠা গল্প বলায় জুড়িমেলা ভার। এখন উদয় মামা আর বেঁচে নেই। মারা গেছে। অনেকগুলো বছর কেটে গেল। অদ্ভুতভাবেই এক বৃষ্টির রাতের বেলায়, বাড়ির বাইরের রাস্তায় বাথরুম করতে এসে, ঝড়ে পড়ে থাকা কারেন্টের তারে শট খেয়ে মারা গেছিলেন। খুব খুব কষ্ট পেয়েছিলাম খবরটা শুনে। তখন আজকের সময়ের মতো এত ফোন মেসেজের রমরমা ছিল না। আমারই বাড়ির সামনের বাড়িতে আরও এক বন্ধু ছিল। নাম মহেন্দ্র প্রসাদ চন্দ্র। আমাদের শহরে চন্দ্র বাড়ি বলেই খ্যাত ছিল। ওদের ছিল ব্যবসা। চাল, গমের ডিলার গোত্রের। আর ওদের বাড়িতে ছিল ল্যান্ডফোন। সেই ফোনেই উদয় মামার বড়দাদা কমল মামা আমাদের জানিয়েছিল। সুদূর রঘুনাথগঞ্জ থেকে পুরুলিয়া আসা আমার হয়নি। তবে মা পৌঁছেছিল। কিন্তু শ্রাদ্ধের কাজের দিন।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়রি ১

তো স্কুলের সেই ক্যাটারিং দেখেই হল চক্ষু চড়ক গাছ। অন্তত যেন একটা বিয়ে বাড়ির উৎসব। বিরাট মাপের সব উনুন। তারপর কড়াই, হাতা, খুন্তি, বড় বড় সাইজের নৌকা। একে একে আমন্ত্রিতদের জন্য সব পার্সেল করা হচ্ছে। এই পার্সেল শব্দটাও তখন আমার কাছে ছিল অজানা। অনুষ্ঠানে কারোর খাবার প্যাক করে বাড়িতে পাঠানোর সিস্টেমকে পার্সেল বলে। সত্যিই কথাটা শুনতে হাসি পাবে, কিন্তু ওইসময় আমাদের মফস্‌সলে শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তি খুব অল্প বিস্তরই হয়েছিল।

সেদিন অনুষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা কিছুই খুব খুব ভালো হয়েছিল। অনেক সংবর্ধনা দিয়েছিল কিশোরদাকে সবাই। হেডস্যার থেকে শুরু করে কে না ছিল সেই কৃতী ছাত্রকে অভিনন্দন জানাতে। কিশোরদাকেও ডাকা হয়েছিল তার এই সাফল্যের কারণ আমাদের সবাইকে জানানোর জন্য। এলো মঞ্চ আলো করে। কিশোরদার মাথার সামনেটা আজও মনে আছে বিদ্যাসাগরের কপালের মতো চওড়া ছিল। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। স্পষ্ট ভাষায় বাংলাভাষাতেই বলেছিল তার সাফল্যের কথা। তখনকার সেই অভিজ্ঞতার কথা আজ স্মরণে নেই। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে বাকি সেই পবিত্র দেবালয়ের অনেক কাহিনি ঘটনা আজও অনেক দাগ কেটে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রলেপে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে বাঁক পরিবর্তন করতে হয়। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হল তখন প্রায় সন্ধে। সবাই সবার মতো কিশোরদার সঙ্গে কথাবার্তা সেরে আসতে আসতে চলে গেল। জনসমাগম ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল। সন্ধে নেমে আসতেই মাঠের ঘাসের জলে ইতস্তত থাকা ব্যাঙেরা ডাকতে থাকল।

ধীমান ব্রহ্মচারীর জন্ম ১৯৮৭ সালে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জে বেড়ে ওঠা। তারপর কলকাতায় আসা কলেজ জীবনে। বাংলায় স্নাতকোত্তর। লেখালিখি শুরু ২০০৫ সাল থেকে। প্রথম সম্পাদিত পত্রিকা কবিতা বুলেটিন ২০০৯ সাল থেকে। পরে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় ‘ম্যানিউসক্রিপ্ট’ নামে লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা। পরবর্তীতে ‘এবং অধ্যায়’ নামে একটি পত্রিকা ও প্রকাশনার চালাচ্ছেন। মূলত কবিতা লেখার পাশাপাশি প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প সবই লিখেছেন। তবে সবচেয়ে ভালোবাসেন স্মৃতিকথা লিখতে।  বর্তমানে চুঁচুড়ায় থাকেন। দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীতে চাকরি করেছেন। বর্তমানে চাকরি জীবন থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে এসে প্রকাশনা ও লেখালিখি নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Manjula Mukherjee

    মন ছুঁয়ে যায় গো। তোমার অনেক কাজ আছে।আরো আলাপচারিতায় থাকো।তোমার জন্য শুভেচ্ছা থাকল আমার ভালবাসা জানাই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *