একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

অভিষেক ভট্টাচার্য

…এমন সময়ে আচমকা সভা আরম্ভ হইয়া গেল, যাহার মধ্যে উৎপল দত্তের কথামতো নাট্যকার, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ সকলেই ছিলেন।

এটুকু বললেই অবশ্য সব বলা হয় না। কারণ বাঙালি বেজায় খচড়া হয়ে গেছে আজকাল। ক্যাঁক করে চেপে ধরবে, কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন। ওই সকল দার্শনিকদের মধ্যে মহামতি প্লেটো ছিলেন কি না। বা পরমজ্ঞানী অ্যারিস্টটল। এবং ক্রমে ক্রমে মহামতি প্লেটো যথার্থ পরিমাণে ফেমিনিস্ট ছিলেন কি না, অ্যারিস্টটল কি তাহলে প্রকৃতপক্ষে পুরুষতান্ত্রিকতারই ধ্বজা উড়াইতেন এই সব বান্টুমার্কা প্রশ্নও উঠিবে। যা দিনকাল পড়েছে! অতএব, খুব হুঁশিয়ার! যা করার করিতে হইবে অতীব সন্তর্পণে। গোয়েন্দা দীপক অবশ্য এইসবের পরোয়া করে না। কোথা হইতে সহসা কী হইয়া গেল বোঝা যাইল না, গুড়ুম গুড়ুম শব্দে দুইবার পিস্তল গর্জিয়া উঠিল। মাটিতে লুটাইয়া পড়িল দুর্ধর্ষ দস্যু মোহনলাল। কিন্তু আমরা গোয়েন্দা দীপক নই। আমাদের দু’টি মাত্তর হাত সম্বল। সেই হাত দু’টি দিয়া আমরা খাই এবং বাথরুমে লুকাইয়া ইয়ে করিয়া থাকি। ওসব কেন্দ্রের কি রাজ্যের কোনও ষড়যন্ত্রেই আমাদের কোনও হাত নেই। এটা ডিসক্লেমার। হুলা, হুলা! আই অ্যাম এ ডিস্কো ড্যান্সার! জিন্দেগি মেরা গানা…। ম্যাঁয় কিসিকা দিওয়ানা…। অবশ্য হাত থেকেই বা কী হয়েছে? হাত দিয়ে ক’টা লোকই বা আর বড়লোক হয়? তাই মালিকপক্ষের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। হাত থাকতে হাতের মর্ম বোঝে না। হাত নাই তার হাতব্যথা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

Satyajit Ray

যাই হোক, বোঝাই যাচ্ছে যে সভা আরম্ভ হয়ে গেছে। এবং আমরা আগাগোড়া, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছি না। ফলে একটু সত্যজিৎ-স্টাইলের জাম্পকাট। সিন ওয়ান। আনন্দমোহনের ঘর। আনন্দমোহন বিছানায় শুয়ে। প্রতাপ আর প্রদ্যুম্ন নিচুগলায় আলোচনা করছে। আনন্দমোহন বাঁ-দিকে ঘাড়টা সাড়ে সাতাশ ডিগ্রি ঘোরায়। সত্যজিতের নিখুঁত হিসেব। হুঁ-হুঁ বাওয়া, দেকলে হবে, খর্চা আচে! ডিঙ্গোর ঘর। প্লাস্টিকের মেশিনগান হাতে ডিঙ্গো। আনন্দমোহন আবার এপাশে তাকায়। ক্রন্দনরত শিশু হারবার্টকে কোলে লইয়া ললিতকুমার ও শোভারানি। শিশু হারবার্ট।

এসব কী যে হচ্ছে, কেন যে হচ্ছে! দুর্চ্ছাই, কলা খাই! সারাদিন খালি লেনিন লেনিন করে চেল্লালে হবে? মার্ক্স না জন্মালে গবিব মানুষ কি তাঁদের লড়াই জানতেন না? অতএব আবার গুড়ুম করিয়া পিস্তল গর্জিয়া উঠিল। ধরাশায়ী হইল একটি পাখি। হঠাৎ বুকে বিঁধল যে তীর, স্বপ্ন দেখা হল ফাঁকি। গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে…। আহা, শ্যামল মিত্র! ওরে সেসব কী দিন ছিল রে! ওসব আর হবে না গো, মন্টুর মা, আর হবে না! তাই গান শোনাতে হায়, কণ্ঠ কেঁপে যায়! হুলা, হুলা!

এতক্ষণ আমরা একটিও ডায়লগ বলিনি। অথচ ক্যামেরা চলে যাচ্ছে। ফলে সত্যজিৎ ক্রমশই অধৈর্য হচ্ছেন। এইবার তাঁর বাজখাঁই ব্যারিটোনে বলে উঠবেন, ‘কাট! কাট!’ এবং তারপর সবাই অপদস্থের একশেষ হবে। সাতমণ তেল পুড়বে অথচ রাধিকা নাচবে না। লজ্জা, লজ্জা! তাই জনগণ, ফাজলামি ছেড়ে এবারে একটু সিরিয়াস হোন। খেয়াল রাখুন, এটা মাধ্যমিক— স্কুলের নয়, বোর্ডের পরীক্ষা। এবং শেষের সেদিন আপনার পাশে কেউ থাকবে না। সে বড় ভয়ংকর। আসিছে নামিয়া ন্যায়ের দণ্ড, রুদ্র, দীপ্ত, মূর্তিমান। মঞ্চে এখন শম্ভু মিত্র। রাজা অয়দিপাউস। গণতান্ত্রিক বিপ্লব সূচীশিল্প নহে। আপনি জানেন না আপনি কী হারাইতেছেন। বন্দুকের নল ছাড়িয়া নিজের নলকে ক্ষমতার উৎস ভাবিতেছেন। ধিক আপনাকে!

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়রি ১

মোদ্দা কথাটা হল, সতেরোটা মুজাহিদিন হই-হই করে ‘কিশমিশ-পিসতা! কিশমিশ-পিসতা!’ বলে তেড়ে এল আর অমনি লক্ষ্মণ সেন খিড়কির দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন। এ কী হল? কেন হল? কবে হল? শুরু হল, শেষ হল, কী যে হল— জানি না তো! তারপরে অনেক কিছু হয়েছে। অন্ধকার যুগ, পানিপথ, আনারকলি, তাজমহল। এবং শেষে ইংরেজের বাচ্চাগুলো সদ্য সদ্য রেনেসাঁ শিখে এসে গোটা দুনিয়াময় জাহাজে করে ঘুরে ঘুরে সব্বাইকে এইসান প্যাঁদান প্যাঁদাল যে বোবারাও বাবা বলল। সে কী ভয়ানক কাণ্ড! সব ব্যাটারা মায়ের ভোগে! ওদিকে আন্দিজ, টিটিকাকা থেকে এদিকে রামুকাকা— সব্বাই ধুতি, ল্যাঙট, গোসাপের ছাল— যে যা পরত সব ছেড়ে বাপ-বাপ বলে শার্টপ্যান্ট পরল। তারপর আর কী? তারপর দে দনাদ্দন ক্যালানি! এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই!

এইখানে সত্যজিৎ একটু ভুরু কোঁচকাবেন। বাঁ-হাতটা উল্টে ঘড়িটা একবার দেখবেন হয়তো। তারপর বিরাট ব্যারিটোনে বলবেন— ‘‘ওয়েট! ওয়েট! সবকিছুই কি আর খারাপ হয়েছে ওতে? তাও কি হতে পারে? দি-সিকা? বাইসাইকেল থিভস? ও জিনিসটা তো নেহাৎ ফ্যালনা নয় ভায়া!” এবং আমরা এর জবাবে পুরো বোমকে যাব। কিছুই বলতে পারব না। পারা যায় নাকি কখনও? সত্যজিতের সঙ্গে কোনও মানুষে কি পারে? ওরেব্বাবা! ওই বিরাট হাইট! ওই জায়ান্ট পার্সোনালিটি!

ফলে আমরা জাস্ট হারিয়ে যাব। এ বিরাট, বিপুলা মহাসমুদ্রের মাঝে একটি ক্ষুদ্র বালুকণা। তখন সত্যজিৎই হাসবেন আবার। বলবেন— ‘‘যাই হোক! ভালো হচ্ছে, ভাই। যা করছ চালিয়ে যাও। কন্টিনিউ।” তখন আবার ক্যামেরা চলবে। ঘড়ঘড়ঘড়। পৃথিবী আবার শান্ত হবে। মঞ্চে আসবেন দুখু মিঞা। এবং আমরা বিশাল সমুদ্রের ফেনায়িত মেঘগর্জনে ফুট কাটার মতো ভুল করে বলে ফেলব একটি বাক্য— ‘‘স্বর্গ ও মর্ত্যে এমন অনেক জিনিস আছে হোরেশিও, যা তোমরা দার্শনিকেরা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।” এবং ঝমঝমাঝম ঝাঁঝর বাজবে। পৃথিবী রজঃস্বলা হইবে। ঋত্বিক ঘটক আসিবেন ও ফের চলিয়া যাইবেন। হে মার্ক্সবাদী বাঙালি, হে সবজান্তা বাঙালি, তুমি কি সন্ত হরিদাসের নাম শুনিয়াছ?ঊনবিংশ শতকে জন্ম, ‘‘প্রথমে হরিদাসকে কেহ দেবতা ভিন্ন মানুষ বলিতে পারেন নাই। তাঁহার মনুষ্য-দেহে দেবতার তুল্য অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। চক্ষে যাহা দেখিলেও সহসা বিশ্বাস করা যায় না, মনে ভাবিতে গেলেও যাহা কল্পনাতে আসে না; শত শত হিন্দু ও মুসলমানকে এবং অন্যূন ছয় শত ইউরোপীয়কে হরিদাস তাহা প্রত্যক্ষ দেখাইয়াছিলেন।” এইরূপে অনেক কিছু বলা হইবে। এবং সত্যজিৎ ক্যামেরার পেছন থেকে থাম্বস আপ দেখাবেন। যার মানে, ঠিক আছে, চালিয়ে যাও। এবার আমরা নতুন বল পাব। চক্ষে জল, বক্ষে বল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল। ফলে যা কখনও বলা হয়নি সেসবও অনেক কিছু স্যাটাস্যাট করে বলা হতে থাকবে। ‘‘তদ্দৃষ্টে হরিদাস ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন, ইংরাজদিগকে কটূ করিয়া গালি দিতে লাগিলেন,— ‘তোমরা ফিরিঙ্গি, নাস্তিকের শেষ। ধর্ম্মাধর্ম্ম কিছুই মান না। লোকের কাছে আমাকে অপদস্থ করিবার জন্য তোমরা লাহোরে আসিয়াছ। কিন্তু এমন আশা করিও না যে তোমাদের সাধ পূর্ণ হইবে।” দিব্যি ক্যামেরা চলছিল, কিন্তু সহসাই এমত সময়ে বণিকেরা লেখকদের উদ্ভাবন করিবেন। ফলে আমাদিগের হাটে হাঁড়ি। আমরা কুঁই-কুঁই করে কিছু বলবার চেষ্টা করব, কিন্তু শ্রদ্ধেয় অ্যাডাম স্মিথ সাহেব আমাদের যাবতীয় মিনমিন করাকে নিমেষে নস্যাৎ করে দিয়ে ঘোরতর গর্জনে বলবেন— ‘চোপরাও!’ ফলে ভারতবর্ষকে বণিকদিগের জন্য খুলিয়া দেওয়া হইবে। মধ্যযুগীয় ফরাসি ব্যারনদের লম্পট ভূতেরা আকাশ থেকে দেখে মুচকি হাসবে। জল্লাদের উল্লাসমঞ্চে ডিস্কো নাচ হবে। শ্রীপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায়রা তাই দেখে কষ্ট পাবেন। এবং আমরা, আবারও, জাস্ট কিচ্ছু করতে পারব না। কেবল বালুকাবেলায় শুয়ে শুয়ে হাঁপি টেনে যাব। তখন সবে সূর্যাস্ত হইতেছে, পশ্চিমাকাশে ঈষৎ মেঘ। জেড পাথরের সেই ঘর ও কিলা-উইয়ের সেই স্বর্ণবেলা। ফলে এরকম সময়ে, যখন সকলে সেলফোন হাতে নিয়ে লাইন করে ক্যাওড়াতলায় চলেছে, আমরা পুংদণ্ডটি হাতে লইয়া অরণ্যদেবের সুন্দরী স্ত্রী ডায়নাকে কল্পনা করিব। ঝরনার জলে সদ্য চান করে উঠে আসা ঈষৎ হাস্যময়ী সুন্দরী ডায়না। তখনও তাহার গাত্রত্বক বাহিয়া টপ টপ করিয়া জল ঝরিতেছে। ফলে যা হবার তাই হবে। আবারও সব্বাই মায়ের ভোগে যাবে। দার্শনিক বলবেন— ‘কিন্তু ওরা তো—’, ইতিহাসবিদ দমাস করে টেবিলে চাপড় মেরে বলবেন— ‘শেম, শেম!’ এবং সকলের বলা শেষ হইলে উৎপল দত্ত বলিবেন— ‘এইটাই আমার ভয় ছিল।’ ঠিক এখানেই সত্যজিৎ তাঁর ব্যারিটোন গলায় ঘোষণা করবেন— ‘কাট!’ এবং আমরা সিন টু-তে ঢুকিয়া পড়িব।

আরও পড়ুন: আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না, বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী

সিন টু। ডিঙ্গো এয়ারগান দিয়ে পাখি মারছে। নেপথ্য থেকে জি মেজরে বাখের Minuet ভেসে আসে। জবাবে এপাশ হইতে একটি বিশুদ্ধ রায়বেঁশে নৃত্য পরিবেশিত হয়। পাবলিক দু’টোর থেকেই ক্ষীর খায় ও বগল তুলিয়া নৃত্য করে। খাপে খাপ, পঞ্চুর বাপ, হলে সিটি। দর্শকাসনে বসিয়া একটি লোক আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়া চারিদিকে লক্ষ্য করিতেছিল। দুরন্ত সার্চলাইটের ন্যায় বনবন করিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার তীক্ষ্ণ চক্ষু দুইটি চতুর্পার্শ্বের সবকিছু নিমেষে বুঝিয়া লইতেছিল। কেহই জানিল না, চাদরের আড়ালে লুক্কায়িত এই ব্যক্তি আসলে গোয়েন্দা দীপক। এবং এইখানে ‘এসব কী ছ্যাবলামি হচ্ছে’ বলে বিশিষ্ট কোনও বুদ্ধিজীবী হয়তো আপত্তি করবেন। কিন্তু আমরা এখন সেসব জাস্ট গায়ে মাখব না। আমরা রক্তবীজের ঝাড়, আমাদিগকে মারে কে। বাওয়াল কেউ ঠেকাতে পারবে না বাওয়া! সাহেবগুলো তো দিনরাত ধরে ঠ্যাঙাল। পারল থামাতে? উল্টে এমন বেত্তান্ত শুনিয়ে দেব যে ধুদ্ধুড়ি নড়ে যাবে। আমরা বেলগাছের আদিম বেহ্মদত্যি, পোস্টমর্ডানিজমের গাঁড় মারি। আমরা কাড়িয়া পিরেত। যুগ যুগ ধরিয়া এই গাছের কোটরে আমরা বাস করিতেছি। ওসব আলট্রা, নিও আমাদের কাছে মারাতে এসো না বাওয়া, ছাতের ওপর থেকে এমন একটি এগারঞ্চি ঝাড়ব যে বৌকে কালই হাতের নোয়া খুলতে হবে! মহামতি প্লেটো এইখানে ডায়লগ লিখবেন বলে পেন বের করে খসখস করে নোট নেবেন। ডায়োজিনিস পিপে থেকে বেরিয়ে এসে হ্যারিকেন হাতে সৎ মানুষ খুঁজে বেড়াবেন। দীননাথ গর্জন করিয়া বলিবে— ‘‘কী বলছেন মশাই? ভূত নেই? তাহলে আমরা দেখলুম কী করে?” এই সময়ে পেছন থেকে ঝমাঝম হিচককের সাসপেন্স মিউজিক বাজবে। কী হয়, কী হয়। কিন্তু অবশেষে যাহা হইবে তাহা একটি বৃহৎ অশ্বডিম্ব। এবং এইখানে খচড়া বাঙালি এতবার ভূত ভূত করা হচ্ছে শুনে এই লেখাটিকে আরেকটি ভূতের গল্প (আরেকটি প্রেমের গল্পের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই) বলে ক্লাসিফিকেশন করবার চেষ্টা করবে। তাহাদের সে চেষ্টা বিফলে যাইবে, কারণ গোয়েন্দা দীপক। একহাতে জ্বলন্ত টর্চ, অন্যহাতে রিভলভার, দীপক প্রবল বৃষ্টির মধ্যে তিনতলার ছাত হইতে রেনপাইপ বাহিয়া বিদ্যুৎগতিতে নিচে নামিয়া গেল। এইখানে জেনারেল ডায়ার ব্রিটিশ সেনাদিগকে ওপেন হুকুম দিবেন— ‘ফায়ার!’ এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে গুলি চলবে। দেওয়ালে দেওয়ালে গুলির দাগ, চারিদিকে শ্মশানের স্তব্ধতা। এর অনেক পরে, আমাদের এই লেখা শেষ হইয়া যাবার পশ্চাৎ অনেক যুগ, মহাযুগ, অধিযুগ, প্যালিওলিথিক, চালকোলিথিক অতিক্রান্ত করিয়া ডাইনোসরেরা আবার এই স্থানে ফিরিয়া আসিবে। এবং তাহাদের কেহ কেহ এস্থলে ডিম পাড়িবে। কিন্তু আপাতত আমাদের ডাইনোসরের ডিম নিয়ে মাথা ঘামাইবার সময় নাই। কারণ, এইবারে স্লগ ওভার শুরু হয়ে গিয়েছে। মঞ্চে এখন উৎপল দত্ত। এখন হীরক রাজা। এখন ভুবন সোম। কমরেড, শেষ যুদ্ধ শুরু আজ। আজ ডি-ডে। আজ লেনিনগ্রাড। আজ ফরাসী বিপ্লব। নর্ম্যান্ডি উপকূলে মার্কিন সেনারা এইমাত্র ল্যান্ড করেছে। দ্রিমু যখন তখন সবট্রাতেই দ্রিমু। ফিসফিস করে মাইক হাতে নিয়ে উৎপল দত্ত বলবেন— ‘‘It is the cause. Yet I shall not shed her blood.” এবং ফিসফিস করে তিনি আরও অনেক কিছু বলবেন যার কিছুই খচড়া বাঙালি বুঝবে না। ফলে তারা সেল্ফি তুলবে। ঠিক এইসময়েই হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন গ্রিকবীর আলেকজান্ডার। এবং তিনি আসরে নামবেন। ‘বন্দি, জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়াও তোমার এই চরম অকুতোভয়তা দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছি। যাও বীর, মুক্ত তুমি!’ এবং এই মহান উদারতা দেখিয়া হিন্দি সিনেমার যত নামকরা ভিলেন, মায় ওমরেশ পুরী পর্যন্ত ক্ল্যাপ দেবেন। বাঃ, বহুত খুব! মুগ্যাম্বো খুশ হুয়া। এইখানে সত্যজিৎ একটু গলাখাঁকারি দিয়ে জানিয়ে দেবেন যে তিনি ওমরেশ পুরীকে এই রোলের জন্যে সাজেস্ট করেননি। ফলে তাঁকে সরে যেতে হবে। খচড়া বাঙালি আবার মোবাইল নিয়ে টেপাটেপি শুরু করবে, মানে স্ক্রিন টেপাটেপি। এবং এইখানে আমরা যাবতীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করিয়া একটি আইটেম সং ঢুকিয়ে দেবই দেব। নইলে ঝাড়া তিন ঘণ্টার মুভি, এতক্ষণ পাবলিককে বসিয়ে রাখবে কে, তোর বাবা? আইটেম সং শেষ হতে দৃশ্য বদলে যাবে। সবাই দেখবে একেবারে সামনেই উদ্যত ছোরা হাতে দস্যু খুনে মোহন! ওই বুঝি সে নিরীহ স্ত্রীলোকটিকে গাড়িচাপা দিয়া খুন করিল! ওই বুঝি গাড়ির চাকায় তরুণীর ফুলের ন্যায় শরীরখানি পিষ্ট হয়! কিন্তু সে তাহা পারিবে না, কারণ ধুরন্ধর গোয়েন্দা দীপক পূর্বেই তাহার গাড়ির কলকব্জা বিকল করিয়া রাখিয়াছে। ফলে সকলেই বুঝিতে পারিবে যে ‘‘ডাক্তার হানিবগর্জার হরিদাসের ক্ষমতা বিশ্বাস করিতেন। তিনি তাহার পোষকতার জন্য যে যুক্তি দেখাইয়াছেন, তাহা অকাট্য। যৎকালে লাহোরে সাধুর পরীক্ষা হইয়াছিল হানিবগর্জার সাহেব সেসময়ে ছুটি লইয়া দেশে গিয়াছিলেন। ছুটি ফুরাইলে তিনি রণজিৎ সিংহের রাজ্যে ফিরিয়া আসিতেছেন, জাহাজে সেনাপতি ভেঞ্চুরার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল।” সবই প্ল্যানমাফিক চলিতেছিল, কিন্তু এইসময়ে আলবাল কথায় অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে বলে আকাশ থেকে আচমকা ফরাসি ব্যারনদিগের ভূতেরা হুড়মুড় করিয়া নামিয়া আসিবে এবং দর্শকগণের ঘাড়ে পড়িবে। উহাদের পুরোভাগে দাঁড়াইয়া নেতৃত্ব দিবেন ক্যাপ্টেন অ্যাডাম স্মিথ।  আবারও ঝমাঝম করিয়া সাসপেন্স মিউজিক বাজিবে। কী হয়, কী হয়। অবাক হইয়া দর্শকগণ দেখিবে একে একে পেরু, বোলিভিয়া, ভিয়েতনাম, কিউবা ও অ্যাঙ্গোলার পরাজয় ঘটিতেছে। গোটা বিশ্বময় কমিউনিজম কেলিয়ে পড়ছে। এমন সময়ে বুদুম করিয়া গোলা ফাটিবে। কামান দাগিবেন স্বয়ং শের আফগান। অবশেষে ভোঁপ্পর-ভোঁ করিয়া ব্যান্ড বাজিবে এবং আমেরিকা জয়লাভ করিবে। নূতন সহস্রাব্দের সূচনা হইবে। আমেরিকা ফট করিয়া উৎপল দত্তের হাত হইতে মাইকখানি কাড়িয়া লইবে এবং ‘এ রাজ্যে নাহি রবে হিংসা, অত্যাচার, নাহি রবে দারিদ্র্য, যাতনা’ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’ বলিয়া দুম করিয়া অভিনয় শেষ করিয়া দিবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন মুহূর্তে কোলাপ্স করিবে। একশত বৎসরের মহান নভেম্বর বিপ্লবের পর মঞ্চে কতকগুলি পোড়া কাঠ ও ছাই ইতস্তত উড়িতে থাকিবে। উৎপল হতভম্ব হইয়া মঞ্চের উপরে একা দাঁড়াইয়া থাকিবেন। ক্রমে আলো নিভে আসবে। আস্তে আস্তে তাঁর মুখাবয়বটি আউট অব ফোকাস হতে থাকবে ক্যামেরার কাছে। ড্রপসিন নেমে আসতে থাকবে। সত্যজিৎ দু’দিকে মাথা নাড়তে থাকবেন। পাবলিক তিন ঘন্টার সিনেমা মাত্তর দশ মিনিটেই খতম হয়ে গেল বলে বিরক্ত হয়ে ‘দূর শালা, এর চেয়ে ঘরে বসে নেটফ্লিক্স দেখলে ভাল হত!’ বলে খচেমচে সিসিডিতে স্যান্ডুইচ প্যাঁদাতে যাবে। একটা বাচ্চা ট্যাঁ করে কেঁদে উঠতে গিয়ে মার কাছে এক ধমক খাবে। এবং আমাদের আর জাস্ট কিচ্ছু বলার নেই বলে আমরা, আবারও, এবার ওয়ান্স অ্যান্ড ফর অল, এ বিপুলা, বিরাট পৃথিবীর জনসমুদ্রের মধ্যে হারিয়ে যাব। জাস্ট হারিয়ে যাব। মিশে যাব বঞ্চিতের, বাঞ্চোতের দলে। গণবিপ্লব ব্যর্থ হইয়াছে। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই। শ’য়ে শ’য়ে মিলে গেল, প্রজাপতি উড়ে গেল, হাতে রইল পেন্সিল। নেই কাজ তো খই ভাজ। হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে। আসুন, নমস্কার।

অভিষেক ভট্টাচার্যের জন্ম ২৬ অক্টোবর ১৯৮৬, কলকাতায়। আড়িয়াদহ কালাচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ২০০৪ সালে টেকনো ইন্ডিয়া কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ। বর্তমানে একটি বহুজাতিক বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *