পালাবদলের প্রেক্ষাপট: মার্কিন মুলুকের নির্বাচন

সায়ন ঘোষ

অবশেষে শেষ হল। পাতার পর পাতা নিউজপ্রিন্ট খরচা, দমফাটা উত্তেজনা, হাজারটা সমীক্ষা, বিশ্বজুড়ে কাগজের হেডলাইন এবং ২ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত একটা চাপা উত্তেজনা, আর প্রত্যেক পদে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে প্রাচীনতম গণতন্ত্রকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ। না, ভোটদানের অধিকার হয়তো নেই, কিন্তু যে নির্বাচন গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয় সেরকম নির্বাচন খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাটাও বিরল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার মহামহিম রাষ্ট্রপতি, মুক্ত দুনিয়ার উপর গত চার বছর ধরে যিনি হুংকার ছেড়ে এসেছেন। সমস্ত সমীক্ষাতেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, ট্রাম্পের পূর্বসূরি, বারাক ওবামার সহকারী জো বাইডেনকে এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর সম্ভাব্য জয়ীকে শনাক্ত করতে সময় লাগল প্রায় পাঁচদিন। কেন, সেটা বোঝার জন্য সবার আগে বোঝা দরকার আমেরিকার ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেম।

আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আটচল্লিশটা রাজ্য, এর সঙ্গে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ আর উত্তর পশ্চিমে সুবিশাল আলাস্কা নিয়ে সর্বমোট পঞ্চাশটি রাজ্য আর রাজধানী ওয়াশিংটনকে ঘিরে ডিসট্রিক্ট অফ কলোম্বিয়া নামে একটা কেন্দ্রশাসিত রাজ্য। প্রত্যেকটা রাজ্যে জনসংখ্যা আর আয়তনের উপর ভিত্তি করে ইলেকটোরাল কলেজের ভোট আছে। বড় রাজ্য (আয়তন বা লোকসংখ্যা)-গুলো হল— ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫), টেক্সাস (৩৮), নিউ ইয়র্ক (২৯), ফ্লোরিডা (২৯)। আমাদের দেশের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যাপারটা বোঝাতে সুবিধা হয়। মনে করুন, পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি ইলেকটোরাল কলেজে ভোট। সমস্ত পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ভোট দেবেন সরাসরি ট্রাম্প বা বাইডেনকে। এবার, গোটা বাংলার ভোটের ভিত্তিতে দেখা হবে, সর্বমোট ভোট কে কতগুলো পেয়েছেন। ধরুন, কলকাতা উত্তর, কলকাতা দক্ষিণ, যাদবপুর, দমদম, হাওড়া আর দুর্গাপুর আসানসোল— এই ছ’টা আসনে বড় মার্জিনে এগিয়ে বাইডেন। আর বাকি ছত্রিশটা আসনে এগিয়ে ট্রাম্প, কিন্তু সেখানে প্রত্যেকটা আসনে জেতার মার্জিন খুব কম। কিন্তু ভোটগনণার সময় যদি দেখা যায়, ছ’টা শহরের ভোটে বাইডেন এতটাই এগিয়ে গেছেন, রাজ্যের সর্বমোট আসন তখন বাইডেনের পকেটে— অর্থাৎ ৪২টি আসন বাইডেনের। গোটা মার্কিন দেশেই এই নিয়ম, শুধুমাত্র নেব্রাস্কা আর মেইন— এই দু’টো রাজ্যে ইলেকটোরাল কলেজের ভোট ছাড়াও কিছু কংগ্রেশনাল জেলা আছে, সেগুলো আলাদা হিসেব হয়, যেমন এবার মেইন রাজ্যে বাইডেন চারের মধ্যে তিনটে আসন পেয়েছেন, নেব্রাস্কাতে তেমন একটি আসন পেয়েছেন বাইডেন, অনেকটা আমাদের দেশের মতো।

এবার, আমেরিকার রাজ্যগুলো কে কাকে ভোট দেবে অনেকটাই ভবিষ্যদ্‌বাণী করা যায়। পশ্চিম উপকূলে ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন, পূর্ব উপকূলে নিউ ইয়র্ক বা উত্তর পূর্বে নিউ ইংল্যান্ডের ছোট জনঘনত্বপূর্ণ রাজ্যগুলো, যেমন ম্যাসাচুসেটস, কানেক্টিকাট, ভারমন্ট, বা মধ্য-পশ্চিম আমেরিকায় ইলিওনয়-এরা বরাবর ডেমোক্র্যাট-পন্থী। এগুলো শক্ত ঘাটি ডেমোক্র্যাটদের। ঠিক তেমন, মিডওয়েস্ট বা দক্ষিণে টেক্সাস, কেন্টাকি, টেনাসি, ওকলাহামা, মিসৌরি— এগুলো সবসময় রিপাবলিক ঘেঁষা। মানে, আমেরিকার ম্যাপ ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে, পূর্ব আর পশ্চিম উপকূল, যেখানে জনঘনত্ব বেশি, সেখানে ডেমোক্র্যাট আর মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় রিপাবলিকদের আধিপাত্য।

পরে থাকে কয়েকটা রাজ্য— যেগুলোকে বলে ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট, অনেকটা আমাদের কেরলের মতো। এই রাজ্যগুলো হল ফ্লোরিডা, পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইয়ো, আইওয়া, এরিজোনা, নিউ হ্যাম্পসায়ার, উইশকন্সিন, পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া। তবে এই রাজ্যগুলোর মতিগতি বোঝা দায়। কখনও ডেমোক্র্যাট, কখনও রিপাবলিক। আর তাই এই রাজ্যগুলোতেই সবচেয়ে বেশি প্রচারে খরচা করে সমস্ত প্রার্থী। এই রাজ্যগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ রাজ্য যারা দখলে রাখতে পারবে, হোয়াইট হাউজ তার। এই তালিকাটা আবার পাল্টে যায় অনেক সময়। যেমন এবার নির্বাচনের পরে অনেকে ফ্লোরিডাকে আর ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট বলতে নারাজ। ফ্লোরিডাতে একটা বড় অংশ ভোটার কিউবা থেকে শরণার্থী হয়ে এসেছেন, কিউবার কাস্ত্রো পরিবারের উপর এদের অনেকদিনের রাগ, এবং প্রাক্তন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে দীর্ঘদিন পরে কিউবার সঙ্গে দৌত্য, সফর এগুলোকে ভালোভাবে নেয়নি ফ্লোরিডার কিউবান ভোটাররা। ঠিক তেমন, আমেরিকার মধ্যভাগে, গ্রেট লেকস এর আশপাশে মিডওয়েস্ট রাজ্যগুলো— উইশকনসিন, ইন্ডিয়ানা, মিচিগান, ওহাইয়ো (ইলিয়নয়ের মধ্যে পড়বে না, আব্রাহাম লিঙ্কনের রাজ্য বরাবর ডেমোক্র্যাট)— এই রাজ্যগুলো ২০১৬ সালে দু’হাত ভরে ট্রাম্পকে আশীর্বাদ করেছিল। ‘Make America Great Again’ এই স্লোগানে মুগ্ধ হয়ে আশা করেছিলেন এই অঞ্চলের মানুষগুলো, কারণ একের পর এক বন্ধ কারখানার সারির দিকে তাকিয়ে তাঁরা ভেবেছিলেন কিছু কর্মসংস্থান হবে। মিচিগান রাজ্যের ডেট্রয়েটকে এক সময় বলা হত মোটরগাড়ির নগরী। সে ডেট্রয়েট আজ একের পর এক পরিত্যক্ত কারখানা। ভারী শিল্প অধিকাংশ পাততাড়ি গুটিয়েছিল এই অঞ্চল থেকে। এবার উইশকনশিন আর মিচিগান আবার ফেরত গেছে ডেমোক্র্যাটদের কাছে। বাইডেন এই জায়গাগুলো থেকে যথেষ্ট খেটে খাওয়া, ভারী শিল্প শ্রমিক, শ্বেতাঙ্গের ভোট পেয়েছেন।

আর এক রাজ্য, আমেরিকা মেক্সিকো সীমান্তে, এরিজোনা এবার বিরূপ ট্রাম্পের প্রতি। সীমানায় বেড়া লাগানোর জন্য তর্জন-গর্জন এখানকার লোকে ভালোভাবে নেয়নি। ফ্লোরিডা যেমন কিউবাম বা অন্যান্য লাতিন আমেরিকার অভিবাসীতে ভর্তি, এরিজোনাতে আবার মেক্সিকান অভিবাসীর প্রাধান্য— যারা ডেমোক্র্যাটদের বড় ভোটব্যাঙ্ক।

আমেরিকার জনসংখ্যার ভিত্তিতে বড়  শহরগুলো যদি দেখা যায়— নিউ ইয়র্ক সিটি, লস অ্যাঞ্জেলস, শিকাগো, হিউস্টন, ফিনিক্স, ফিলাডেলফিয়া, স্যান অ্যান্টনিও, স্যান ডিয়েগো, ডালাস— এগুলো সবক’টাই ডেমোক্র্যাটদের ঘাটি। এই শহরগুলোর মধ্যে টেক্সাসের হিউস্টন, স্যান অ্যান্টনিও আর ডালাস— এই তিনটে শহর ডেমক্রাটদের মার্জিন টেক্সাসকে রিপাবলিকদের হাত থেকে মুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু বাকি শহরগুলো কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের সেই রাজ্যে বড় লিড দিয়েছে। গ্রামে বড়লোক, জমিদার বা জোতদার সম্প্রদায় বরাবর রিপাবলিকদের ভোটব্যাঙ্ক। এর পাশাপাশি আর একটা ফ্যাক্টর— শহরতলির শ্বেতাঙ্গ এবং সদ্য কলেজ পাশ সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ২০১৬-তে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল, তাঁরা এবার মুখ ঘুরিয়েছে ট্রাম্পের থেকে। আটলান্টা, ডেট্রয়েট, ফিলাডেলফিয়ার শহরতলিতে ট্রাম্প খুব বড় ভোট হারিয়েছে, যা মূলত মধ্যবিত্ত ভোট। তেমন, ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের সংখ্যালঘু, কৃষ্ণ সম্প্রদায়, ল্যাটিনো, ইমিগ্র্যান্ট, কলেজ পাস, শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের ভোট ধরে রেখেছে। শেষের সম্প্রদায়টার কিছু ভোট ২০১৬ সালে ট্রাম্পের ঘরে গিয়েছিল।

আমেরিকাতে ভোট দেওয়া অনেকদিন আগে শুরু হয়। প্রথমত, এখানে ভোটের দিন ছুটি নেই। ফলে, দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিকরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে রুজি হারানোর জন্য, কিছুদিন আগে ভোট দিয়ে দেন, নিকটবর্তী মুদিখানার চেন, লাইব্রেরি, টাউন হলে ভোট দিয়ে দিতে পারেন। আমেরিকার ৩৩টি রাজ্যে এভাবে ভোট দেওয়া যায়, একে বলে ‘Early Voting’। এছাড়াও, চাইলে আগে থাকতে ডাকযোগে ব্যালট পাঠিয়ে দেওয়া যায়। বয়স্ক, প্রতিবন্ধীরা এভাবে ভোট দিতে পারেন। এবার করোনা সংক্রমণের ভয়ে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন, যা ফারাক করে দিয়েছে গণনার সময়। কীভাবে? সেটা পরে আসছি।

দক্ষিণপন্থী রিপাবলিক দল, এবং মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট দল— দু’দল প্রচার করেছিল চুটিয়ে। এবার করোনাভাইরাসের প্রকোপে কিছু বিধিনিষেধ ছিল। বাইডেন প্রচার করেছেন তাঁর নিজস্ব স্টাইলে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো থোড়াই কেয়ার করেছেন করোনাকে। ভোটপ্রচার চলাকালীন করোনা আক্রান্ত হয়ে পরেন ট্রাম্প। মূলত টেলিভিশন বিতর্ক হয় দুই প্রার্থীর, দেশের সমস্ত চ্যানেল সেই বিতর্ক প্রচার করে। প্রথম বিতর্ক চলাকালীন ট্রাম্প এত বাধা দিয়েছিলেন, অনেকটা কলতলার ঝগড়াতে পরিণত হয়। পরের বিতর্কগুলোয় এজন্য প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট কমিশন, যারা পরিচালনা করে, তারা  সিদ্ধান্ত নেয়, বক্তৃতায় বাধা যাতে না আসে। ঠিক হয় একজন যখন বলবেন, অন্যজনকে ‘মিউট’ করা হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষকে মিউট করতে দ্বিধা করেনি সে-দেশের বিতর্ক পরিচালনা সমিতি, কবে যে বৃহত্তম গণতন্ত্র এ শিক্ষা নেবে!

আমেরিকাতে ভারতের মতো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নেই। স্থানীয় প্রশাসন দায়িত্বে থাকে ভোট পদ্ধতির। এবার আমেরিকাতে যত মানুষ আর্লি ভোটিং আর পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন, তা আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। প্রথমে ভোটগণনার খবর আসতে থাকে বড় শহরগুলো থেকে। সেখানে প্রত্যাশিতভাবে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে যায়। মূল ভূখণ্ডে চারখানা টাইম জোন আমেরিকায়, ফলে যখন পূর্ব উপকূলে খবর আসতে শুরু করেছে, পশ্চিম উপকূলে তখনও ভোট দেওয়া চলছে। ফ্লোরিডার মতো প্রচুর আসনওয়ালা রাজ্যে ট্রাম্পের এগিয়ে থাকা, পেনসিলভানিয়ার মতো আর এক বড় ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটে ট্রাম্প এগিয়ে, এমনকী আর এক ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য জর্জিয়াতে এগিয়ে থাকাতে অশনির সংকেত দেখতে শুরু করেন ডেমোক্র্যাটরা। মনে রাখতে হবে, এই জর্জিয়াতে সবচেয়ে বড় শহর আটলান্টাতে প্রচুর ব্ল্যাক পপুলেশনের বাস। যারা ক’দিন আগে প্রচণ্ড ক্ষেপে ছিলেন জর্জ ফ্লয়েডের খুন হওয়া নিয়ে।

ঘড়ির কাঁটা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে এবার নজরে পড়ে সেন্ট্রাল টাইম জোনের দুই রাজ্য উইসকনসিন এবং মিচিগানের দিকে। সেখানে তখন ডেমোক্র্যাটরা আশার সামান্য আলো জ্বলিয়ে রেখেছেন। এদিকে পিছিয়ে পড়ার আন্দাজ পেয়ে ট্রাম্প টুইটের ঝড় তোলেন, কখনও রিকাউন্টের দাবিতেও সরব হন। টুইটার ট্রাম্পের অনেকগুলো মেসেজকে ব্লক করে। আগেরবার হিলারিকে ভোট দেওয়া নেভাডা রাজ্যতে একেবারে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি চলতে থাকে ট্রাম্প আর বাইডেনের। এর মধ্যে খবর আসে জর্জিয়া থেকে। জর্জিয়ায় সেক্রেটারি অফ স্টেট ঘোষণা করেন। সেখানকার সবচেয়ে বড় শহর আটলান্টাতে ভোট গণনা বাকি, মেল ব্যালটও বাকি। আশি হাজার ভোটের মার্জিনের লিড কমতে থাকে ক্রমশ জর্জিয়াতে। একই ঘটনা হতে থাকে পেনসিলভেনিয়াতেও। কয়েকদিন সময় লাগতে থাকে সেই সমস্ত দেরিতে আসা মেল ব্যালট গুনতে, শেষমেশ জর্জিয়া আর পেনসিলভেনিয়াতে জেতার পর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন বাইডেন-কমলা হ্যারিস জুটি। দেখা যায়, মেল ব্যালটে বৃদ্ধরা, শ্রমিকরা একেবারে দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছেন বাইডেনকে। করোনাভাইরাসের এই প্রকোপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা, শারীরিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে।

গোটা ভারতের উত্তেজনার ফাঁকে বহু মানুষের প্রশ্ন, বাইডেন কেমন হবেন ভারতের জন্য? এর আগে হাউডি মোদী, নমস্তে ট্রাম্প— এগুলোতে কাজের কাজ কতটা হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কতটা বেড়েছে, সেগুলো প্রশাসনিক ব্যাপার, আদৌ আমজনতার কতটা লাভ সন্দেহ। তবে রাষ্ট্রনায়কদের বন্ধুত্বের বদলে কূটনৈতিক বন্ধুত্বটা অনেক বেশি জরুরি। আমি বলব আর এক দল মানুষের কথা। এইচ ওয়ান বি ভিসা নিয়ে যাঁরা আমেরিকাতে কাজ করতে আসেন বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার হয়ে। এদের বড় অংশ ভারতীয়। ট্রাম্প জমানায় এই এই ভিসাহোল্ডারদের অবস্থা সবচেয়ে করুন। রেকর্ড সংখ্যক মানুষের ভিসার আবেদন নাকচ হয়েছে, পত্রপাঠ দশ দিনের মধ্যে তাঁদেরকে আমেরিকা ছাড়তে হচ্ছে এক দশকের বেশি সময় থাকার পরে। তাঁদের সন্তানরা জন্মগতভাবে আমেরিকান নাগরিক। কিন্তু বাবামায়ের ভিসার উপর নির্ভর করে তাঁদের ভবিষ্যৎ। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য লাগে ‘গ্রিন কার্ড’, যা অন্যান্য দেশের মানুষজন আবেদন করলে কয়েক মাসের মধ্যে পেয়ে যান। কিন্তু বছরের পর বছর আমেরিকায় কাজ করেও ভারতীয় ভিসা হোল্ডাররা পান না। কারণ আমেরিকায় গ্রিন কার্ড কতগুলো দেওয়া হবে তা সুনির্দিষ্ট, আর ভারতীয়দের সেই দীর্ঘ লাইনে খুব সামান্য সংখ্যক মানুষ পেতে পারেন প্রত্যেক বছর। বাংলাদেশ, নেপাল বা ভুটানের নাগরিকের যা পেতে লাগে কয়েক মাস, ভারতীয়দের লেগে যাবে সত্তর বছর। এই তুঘলকি নিয়মের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়ছেন বেশ কিছু সংগঠন, দেশ অনুযায়ী ভিসার কোটা তুলে দেওয়ার জন্য। এজন্য একটা বিল পাস হয়েছে আমেরিকান নিম্নকক্ষ হাউসে, আটকে আছে সেনেট বা উচ্চকক্ষে। কী হবে তাঁর ভবিষ্যৎ সময় বলবে। কিন্তু দিনের পর দিন ঠিকভাবে ট্যাক্স দিয়ে, প্রাণপাত পরিশ্রম করে যে মানুষগুলো রয়েছেন, তাঁদের কথা ভাবার সময় আছে কি রাষ্ট্রনায়কদের? হাউডি মোদির প্রদীপের রোশনাইয়ের তলায় সবচেয়ে অন্ধকার এই সুবিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভিসা এক্সটেনশনের ঝামেলা, পদে পদে হেনস্থা, তাঁর জন্য কি আদৌ আন্তরিক রাষ্ট্রনায়করা?

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *