বাংলা সাহিত্যে ‘হাতি’

রাহুল দাশগুপ্ত

বাংলা সাহিত্যে নানাভাবে বিভিন্ন সময় এসেছে হাতির প্রসঙ্গ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘অভিযাত্রিক’-এ (১৯৪১) লিখেছেন, “একটি হাতির দাঁতের ক্ষুদ্র নারীমূর্তি আমার কি ভালোই লেগেছিল! চারপাঁচ ইঞ্চির বেশি বড় নয়, পুরনো হাতির দাঁত, হলদে হয়ে গিয়েচে-কি কমনীয়তা আর জীবন্ত লাবণ্য মূর্তিটির সারা গায়ে। বারবার চেয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। শুনলুম এক সময়ে এখানে হাতির দাঁতের জিনিসপত্রের ভালো শিল্পী ছিল। এই ক্ষুদ্র মূর্তিটি কোন অজ্ঞাত কারিগরের শিল্পপ্রতিভার অবদান জানিনে, মন কিন্তু তার পায়ে আপনিই শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে।” কিশোর উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’-এও (১৯৩৭) রয়েছে হাতির বর্ণনা, ‘‘সে রাত্রে বড় অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলে সে। চারধারে ঘন বাঁশের জঙ্গল। বুনো হাতির দল মড় মড় করে বাঁশ ভাঙছে। একবার সত্যিই সে যেন বুনো হাতির গর্জন শুনতে পেলো। সমস্ত বনটা কেঁপে উঠলো।”

আরও পড়ুন: লখিন্দরের জন্ম

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখায় বারবার এসেছে হাতির প্রসঙ্গ। ‘হাতির ভিতরে শিয়াল’ গল্পে রয়েছে ‘‘রাজার যে হাতিটা তাঁর আর সকল হাতির চেয়ে ভালো আর বড় আর দেখতে সুন্দর, সেইটে তাঁর পাটহস্তী। সেই হাতিতে চড়ে রাজামশাই চলাফেরা করেন, আর তাকে খুব ভালোবাসেন। টুনটুনি আর নাপিতের কথা’ গল্পে টুনটুনিকে হাতি বলে, “অত জল খেতে পারবো না, আমার পেট ফেটে যাবে। ‘হাতি’ নামের রচনায় উপেন্দ্রকিশোর হাতি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘হাতি যা দিয়ে হাতের কাজ করে, সে হচ্ছে তার নাক। সেটি যে কি আশ্চর্য জিনিস, তা তোমরা সকলেই জানো। আর হাতির দাঁতের কথা ভেবে দেখ, সে জিনিসটিও কম আশ্চর্যের নয়। এখন আমরা মোটে দুরকমের হাতি দেখতে পাই। আমাদের দেশের হাতি, আর আফ্রিকার হাতি। আমাদের দেশে একরকম পুরনো হাতির হাড় পাওয়া গেছে, তার একেকটা দাঁত প্রায় চৌদ্দ ফুট লম্বা ছিল। এদের বলে, ‘স্টেগোডন গণেশ’। আরেকটা হাতির নাম হয়েছে ‘ডাইনোথিরিয়ম’। ইউরোপে এর অনেক হাড় পাওয়া গেছে। আর এক ধরনের হাতির ছিল চারটে দাঁত। দুটো উপরে, দুটো নীচে। পণ্ডিতেরা একে বলেন, ‘ম্যাস্টোডন’। সাইবেরিয়ার বরফের ভিতরে আরেক রকম হাতি পাওয়া গিয়েছে, তার নাম হয়েছে, ‘ম্যামথ’। এরা কিনা বরফের উপরে চলাফেরা করতে পারতো, কাজেই এদের গায় মুনিদের দাড়ির মতো লম্বা লম্বা রোয়া ছিল।”

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেও এসেছে হাতির প্রসঙ্গ। ‘কিচ কিন্দের’ নামের রচনায় তিনি লিখেছেন, “এমন সময় অন্ধকার থেকে হাতি আমার পিঠে শুঁড় বুলিয়ে বলছে, ‘ওরে বাপ নয় রে মানুষ/ উড়ে পড়ল ফানুশ!’ হাতি শুঁড়ে করে তুলে নিয়ে আমাকে পিঠে উঠিয়েছে। হাতিতে চড়ে আমার ভারি আহ্লাদ হয়েছে। আমি হাততালি দিয়ে বলছি, ‘তাই তাই তাই মামার বাড়ি যাই।’ অমনি হাতি বলছে, ‘তোমার মামার বাড়ি কোথায় বলো তো?’ ‘আমার মামাবাড়ি যশোর দক্ষিণডিহি চেঙুঠে পরগণা।’ ‘আচ্ছা চলো সেখানেই যাচ্ছি,’ বলেই হাতি চলতে আরম্ভ করলে, হুস হাস থপাস থপাস।’’ ‘একে তিন তিনে এক’ রচনায় লিখেছেন, কিন্তু একা মাহুত এক হাতি আর এক ডঙ্কা আর এই ছিরিপদ কত অযাত্রা ঠেকাবে? কেল্লার ফটকের কাছে এসে আটকা পড়লেম। ফেরাও হাতি।

আরও পড়ুন: বাংলায় বিবিধরূপে মনসা পার্বণ ও রান্নাপুজো

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জলসাঘর’ গল্পে রয়েছে এইরকম বর্ণনা, ‘‘…ওদিক হইতে একটা হাতির গর্জন শোনা গেল। হাতিটা অস্থির হইয়া উঠিয়াছে। ক্রমাগত ডাকিয়া ডাকিয়া সে পায়ের শিকলি ছিঁড়িবার চেষ্টা করিতেছিল। মাহুত রহমৎ প্রভুর সাড়া পাইয়া উঠিয়া আসিয়া আপনার হাতির নিকট দাঁড়াইয়া ছিল। সে অতি মৃদু অনুযোগের সুরে বলিল, ছোটগিন্নী শিকলি ছিঁড়ে ফেলবে। হস্তীনীটির নাম ছোটগিন্নী। বিশ্বম্ভরবাবুর মায়ের বিবাহের যৌতুক এই ছোটগিন্নী। তখন নাম ছিল মতি। মতি একটা চিতাবাঘকে খুঁড়ে ধরিয়া পদদলিত করিয়াছিল। রায় হাতিতে উঠিতেন শুড় বাহিয়া। রায় তাহার গুঁড়ে হাত বুলাইয়া বলিলেন, এখন নয় মা। ছোটগিন্নী কথা বুঝিল। সে শুঁড়খানি রায়ের কাঁধের উপর রাখিয়া লক্ষ্মী মেয়েটির মতোই শান্তভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। ছোটগিন্নীর শুঁড়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে রায় বলিলেন, লক্ষ্মী মেয়ে, মা আমার লক্ষ্মী মেয়ে!

আরও পড়ুন: পোকেমন মুভির অ্যাশ, পিকাচু এবং টিম রকেট

‘হাতি’র প্রসঙ্গ বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে অবিস্মরণীয়ভাবে এসেছে বোধহয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসের শুরুতেই আছে হাতি-সংক্রান্ত খবর। সেটা এইরকম, “আসামের জঙ্গলে মোগল তোপখানার ভারি ভারি কামান বয়ে নিয়ে যেতে হাতির খুব দরকার। খুন্তাঘাটের কাছাকাছি বকির খান পাইকদের নিয়ে হাতি ধরছিলেন। কয়েকটা হাতি বন্দীও হয়। পাইকদের গাফিলতিতে কিছু হাতি পালিয়ে যায়। কিছু হাতিখেদা সর্দারকে বকির খান ফাঁসি দেন। তিনি হুকুম দিলেন, হয় পালিয়ে যাওয়া হাতিদের ধরে নিয়ে আসো, নয়তো হাতি পিছু হাজার রুপেয় দাও।” অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘‘বেশ ক’বছর হলো চলন্ত পাহাড়-প্রমাণ দুই বেহেদর হাতি, সুধাকর আর সুরতসুন্দর শাহী পিলখানায় আলো করে আছে। হোসেঙ্গাবাদের জঙ্গলে ওরা ধরা পড়েছিল। এখনো পুরোপুরি পোষ মানেনি বলে ওদের জন্যে একজন করে আলাদা দারোগাও মোতায়েন থাকে। বছর তিরিশ বয়সের কেলরা জাতের এই হাতি দুটিকে বড় একটা বের করা হয় না। হলদে চোখ, কানের ওপর দুটি সাদা আঁচিল, গায়ে গজঝম্প, মেঘডম্বুর, সুধাকর আর সুরতসুন্দর যখন দুর্গের ছায়ায় এসে দাঁড়ালো সারা আগ্রা তখন শাহী খেলা দেখতে ভেঙে পড়েছে।”

আরও পড়ুন: ‘নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি’: বঙ্গে বিশ্বকর্মা

এই উপন্যাসে বারবার এসেছে হাতির প্রসঙ্গ। একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে এভাবে, ‘‘পাশাপাশি দুই হাতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। একটি হাতি অন্যটির চেয়ে বেশি উঁচু। গায়ের রং ঘোর কালো। শীতকালের সন্ধ্যে রাতে অকালবৃষ্টিতে মশালের দাপানো শিখা মুছে যাওয়ার যোগাড়। তাতেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে হাতিটির দুটি চোখই হলুদ বর্ণ। ডান কানের পাশে একটি বড় মতো আঁচিল। এই হাতিটির নাম ফিল-ই-ফতে। বেহেদর জাতের হাতি। শাহেনশা শাহজাহানের পেয়ারের হাতি। পাশের হাতিটিকে দেখে মনে হবে ফিল-ই-ফতেরই ছেলে। বয়সও কম। ছাই ছাই গা। গলঘন্টটি ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে সামান্য দুলতেই ঢং ঢিম-এইসব আওয়াজ হচ্ছিল। এর নাম ফতে জং। শাহজাদা দারাশুকোর পেয়ারের হাতি। বলা যায়, এখন ফতে জংয়ের লড়াই হামলার বয়স, যাকে বলে হাতি-ঘেঁষা ভাষায় ওর এখন কেলরা দশা।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক সাহিত্যপত্র

শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কর্ণাটরাগ’ (১৯৬২) হাতি নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের একটি অনবদ্য উপন্যাস। নীলগিরি উপত্যকার প্রসিদ্ধ উটকামণ্ড বা উটি থেকে চল্লিশ কিলোমিটার নীচে মহীশুরের গুডালুর অঞ্চলের মাইল দশেক পশ্চিমে প্রাচীন কর্ণাটদেশের বিস্তীর্ণ অরণ্য এই রোমান্স-আখ্যানের পটভূমি। কাহিনিটিকে প্রাচীন কর্ণাটরাগের সঙ্গে তুলনা করেছেন লেখক, যা শুনেছেন তিনি অথর্ব আববাসীর মুখ থেকে। প্রাচীনকালে হাতিশিকারের পর রাজাকে ঘিরে চারণকবিরা যে প্রশস্তি-সংগীত গাইতেন, তাই কর্ণাট রাগ। এই আখ্যানেও ‘জুবেদা’ নামে এক হস্তিনীর মৃত্যু হয়েছে, আববাসীকে যে গভীরভাবে ভালোবাসত, আববাসীকে অনবধানতায় আহত করে যে পাগল হয়ে যায়। আববাসীকে গভীরভাবে ভালোবাসত তার স্ত্রী মুন্নিও, রাজার নির্দেশে প্রধান শিকারি সহজলাল জুবেদাকে মারতে আসে, পঙ্গু আববাসী চায় মুন্নির পুনর্জীবন, মুন্নিকে বাঁচাতে সে তাকে ঠেলে দিতে চায় সহজলালের কাছে, অনিচ্ছুক মুন্নি আববাসীর কথা রাখতে সহজলালের সঙ্গে মিলিত হতে যায় এবং এই দৃশ্য দেখে ক্ষিপ্ত জুবেদা মুন্নিকে পায়ের চাপে পিষ্ট করে মেরে ফেলে ও নিজেও সহজলালের গুলিতে মারা যায়। একজন পুরুষ এবং তাকে ঘিরে এক হস্তিনী ও এক নারীর অরণ্যের পটভূমিতে ত্রিকোণ প্রেমের এই অভিনব রোমান্স-আখ্যান বাংলা সাহিত্যে এক অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতাকেই তুলে ধরে।

আরও পড়ুন: ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

কবি রণজিৎ দাশের হাজার বছরের ভারতীয় কবিতায় এসেছে হাতির প্রসঙ্গ। তিনি লিখেছেন, “শুনেছি যে হাতির ছানা গর্তে পড়লে মানুষেরা যদি তাকে উদ্ধার করে, তাহলে সেই উদ্ধারের প্রমাণটুকুও মুছে দিতে হয়। তাকে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেবার আগে, ওই ছানার নিজস্ব বিষ্ঠা সতর্কভাবে তার সর্বাঙ্গে লেপে তার শরীর থেকে মানুষের হাতের গন্ধ নিশ্চিহ্ন করে দিতে হয়। নতুবা জঙ্গল তাকে গ্রহণ করে না।”

হাতিদের সম্পর্কে এক ঔপন্যাসিক বয়ান কিন্নর রায়ের ‘মেঘপাতাল’ (১৯৯৫)। ১৯৯৩-এর ডিসেম্বরে দলমা পাহাড় থেকে হাতিরা নেমে আসতে থাকে। জঙ্গলের পর জঙ্গল কেটে বানানো হয়েছে গ্রাম, গড়ে উঠেছে নতুন নতুন বসতি, হাতির চলার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বানানো হয়েছে চাষের খেত, মদের দোকান, ভিডিয়ো হল, বাসস্থানের অভাবেই লোকালয়ে নেমে এসেছে হাতিরা, বাসভূমি বিচ্ছিন্ন হয়ে না খেতে পেয়ে ‘গুন্ডা’ হাতি হয়ে গেছে। কীভাবে মানুষ তাড়া করে ফেরে হাতিদের, সেই প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে নানা মিথ, লোকভাবনা, ছড়া, সংবাদপত্রের রিপোর্ট। সাবু নামের একটি অলীক কথক চরিত্রের ভিতর দিয়ে লেখক পরিবেশের কথা, রাষ্ট্রজীবনের ভিতর মানুষের দুঃখের কথা শুনিয়েছেন। সাবু শেষপর্যন্ত হাতির দলেই মিশে যায় আর হয়ে ওঠে মিথের অংশ।

আরও পড়ুন: ‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

হাতি নিয়ে আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস সৈকত রক্ষিতের ‘বৃংহণ’। হাতির ডাককেই বলে ‘বৃংহণ’। সৈকত লিখেছেন, ‘‘তাল পড়তে শুরু করে বিকেলের দিকে। রাত্তিরে পড়ে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে তাল পড়লেও সে তাল ভোরবেলাতে আর পাওয়া যাচ্ছে না। দল বেঁধে হাতি এসে খেয়ে চলে যাচ্ছে। যত্রতত্র তালের আঁটি পড়ে থাকলে বুঝে নিতে হয়, এইসব জায়গাতে হাতি এসেছিল। আর সেটা দেখেই সতর্ক থাকতে হয়। এরাও সেইভাবেই নিজেদের সতর্ক রাখে। তা না হলে তালের জন্য শেষতক জীবনও বিসর্জন দিতে হতে পারে। এই নির্জন স্তব্ধ অরণ্যে কখনও কখনও হাতির চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হয় তার বৃংহণ। যখন ডাকে ডাকতেই থাকে।” ‘সিরকাবাদ’ উপন্যাসেও হাতি নিয়ে চমৎকার কাজ করেছেন সৈকত। তিনি লিখেছেন, “ভীম সিরকাবাদে থাকতো। হাতি তাড়ানোর কাজে তার কোনও জুড়ি নেই। স্রেফ একটা ডান্ডা হাতে নিয়ে সে গজগজিয়ে পালে ঢুকে যেত। তারপর গোঠের গরুর মতো তাড়িয়ে নিয়ে যেতো তাদের। গেল বছরের আগের বছর একটা পাগলা হাতিকে নিরুপায় বুঝে সে ঘায়েল করেছিল। লোহার রড দিয়ে। তাতে ডান দিকের দাঁতটা তার অনেকটা ভেঙে পড়েছিল। মুগুরের মতো। ডান্ডা ঘোরাতে ঘোরাতে সে যখন হাতির সঙ্গে নিজের নামের গাওয়ালী ছড়া বলতে বলতে ক্ষেতে নেমে যায়, সে দৃশ্য দেখার মতো। তার অলৌকিক মন্ত্রে দামাল হাতিও ওপর-নিচে মাথা দোলাতে দোলাতে জঙ্গলে ফিরে যায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *