ইমারজেন্সি এবং কিশোর কুমার: পুরনো বিতর্ক নতুন করে দেখা

শুভ্রাংশু রায়

রাত বারোটার পরে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ১৯৮৩ সালে ‘আগর তুম না হতে’ ছবিতে রাজেশ খান্নার লিপে আর ডি বর্মনের সুরে কিশোর কুমারের গাওয়া এই সুপার হিট গানটি অমিত কুমার নতুনভাবে গেয়ে মিউজিক ভিডিয়ো সহযোগে আপলোড করলেন। জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে। আর আপলোড হতেই প্রথম ঘণ্টায় কয়েক হাজার ভিউ! লাইক আর ভিউ ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আজ অলিম্পিকে ভারত পুরোদমে লড়াইয়ে। নীরজ চোপড়া ইতিমধ্যে জ্যাভলিনের ফাইনালে। দুই পুরুষ কুস্তিগীর ইতিমধ্যেই ফ্রি-স্টাইল বিভাগে তাঁদের প্রথম ম্যাচগুলো জিতে পদক জয়ের দাবিদার। তার মধ্যেও কিশোর কুমার স্মরণ চলছে। ৯২ বছর পূর্ণ করা কিশোর কুমার দিব্য অলিম্পিকের পোস্টের মাঝেমাঝে উঁকি দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তিনি যে চির-কিশোর। কিন্তু সদা হাস্যমুখ কিশোর কুমারের জীবনে বড় ঝড় এসেছিল। না ব্যক্তিগত নয়। রাজনৈতিক। না ঠিক বলা হল না। রাষ্ট্রীয় শক্তির সঙ্গে রীতিমতো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাঁর গানের কেরিয়ার। ক্ষতি হয়েছিল সংগীতপ্রেমী মানুষের। মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় জন্মানো (৪ আগস্ট, ১৯২৯) গাঙ্গুলি পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্রসন্তান আভাস কুমার গাঙ্গুলি ওরফে কিশোর কুমার গাঙ্গুলির ফিল্মি জীবনের শুরুয়াত মোটেই খুব সহজভাবে শুরু হয়নি। যদিও যখন কিশোর কুমার বম্বে আসেন, তাঁর কেরিয়ার বানানোর লক্ষ্যে ততদিনে তাঁর বড়দা অশোক কুমার ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রতিষ্ঠিত নায়ক। কিন্তু কিশোর কুমার তাঁর কেরিয়ার তৈরি করার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠিত দাদার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না।

আরও পড়ুন: কিশোর কুমারের ৯২তম জন্মদিনে অমিত কুমারের অভিনব শ্রদ্ধার্ঘ্য

আসলে প্রথম জীবন থেকেই তিনি ছিলেন কিছুটা খামখেয়ালি, ক্ষ্যাপাটে, একগুয়ে এবং বেপরোয়া। ‘জিও আপনে মর্জি সে’-এ মানসিকতা জীবনের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। আর নিজের মর্জিতে বাঁচতে গিয়ে হামেশাই তিনি জড়িয়ে পড়তেন বিভিন্ন বিতর্কে। তাঁকে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে হরেক রকমের মিথ তৈরিও হয়ে গিয়েছিল, যেগুলির সবটা কিন্তু তাঁর ইমেজের জন্য শুভ ছিল না। ‘ঝুমড়ু’ কিশোরের তাতে মাথা ব্যথা ছিল না। এমনকী বিতর্ক বাদ থাকেনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও। তবে কিশোর কুমারের জীবনের সমস্ত বিতর্কের মধ্যে সব থেকে জবরদস্ত বিতর্ক ছিল বোধহয় ইমারজেন্সি বা জররি অবস্থা চলাকালীন সরাসরি সঞ্জয় গান্ধির সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া।

আরও পড়ুন: এই ঘর, এই উপশম

১৯৭৫-এর ২৫ জুন যখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফাখরুদ্দিন আলি আহমেদ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেটের প্রস্তাবমতো জরুরি অবস্থা জারির কাগজপত্রে সইসাবুদ করেন, সেই সময় কিশোর কুমার তাঁর নিজস্ব গায়কীর জোরে বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্লেব্যাক সিঙ্গার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। সাতের দশকে অল্প সময়ের ব্যবধানে মুক্তি পেয়েছে ‘কাটি পতঙ্গ’, ‘শর্মিলি’ ‘অভিমান’, ‘মিলি’, ‘তেরে মেরে স্বপনে’ ইত্যাদি সিনেমার হিট গান। তাছাড়া স্টেজ শো-তে নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় আসর মাতানোর জন্য বিশেষ নামডাকও হয়েছিল কিশোর কুমারের।

আরও পড়ুন: শাক তোলার গান

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ইমারজেন্সির সঙ্গে কিশোর কুমারের সম্পর্কটা কোথায়? তাহলে ফ্ল্যাশ ব্যাকে ফিরে যেতে হবে সেই দিনগুলিতে। ইমারজেন্সির সময় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ছিলেন মধ্যপ্রদেশের তরুণ তুর্কি নেতা বিদ্যাচরণ শুক্লা। নিজের বিভাগীয় কাজকর্ম দেখার পাশাপাশি তিনি বিশেষ উৎসাহ দেখিয়েছিলেন সিনেমা জগৎকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ইমারজেন্সি চালু হওয়ার কিছু আগে অমৃত নাহাটা, যিনি নিজেও কংগ্রেসের একজন সাংসদ ছিলেন তাঁর নিজ নির্মিত সিনেমা ‘কিস্সা কুর্সি কা’ সেন্সরের জন্য জমা দিয়েছিলেন। রাজ বব্বর, শাবানা আজমি অভিনীত এই সিনেমার চরিত্রগুলির সঙ্গে সে সময়ের বেশ কিছু কংগ্রেসি নেতার মিল রয়েছে, এই অভিযোগে সেন্সর বোর্ড এবং তথ্য সম্প্রচার দপ্তর একান্নটি জায়গায় আপত্তি জানায়। সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয় এবং শুধু তাই নয়, সিনেমার সমস্ত প্রিন্ট নাকি সরকারি উদ্যোগে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গুলজারের ছবি ‘আঁধি’ নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ অভিযোগ ওঠে, এই সিনেমায় সঞ্জীব কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত চরিত্র দু’টির সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধি এবং ফিরোজ গান্ধির ভীষণই মিল রয়েছে।

আরও পড়ুন: সাহেবদের দরকারে ম্যানগ্রোভ নিধন শুরু হয়েছিল এককালে

বিদ্যাচরণ শুক্লার নির্দেশে তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রকের একটি টিম এপ্রিল ১৯৭৬-এ বম্বে যায় সরকারের টোয়েন্টি পয়েন্ট প্রোগ্রামকে সফল করার লক্ষ্যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে। সে উদ্দেশ্যে একটি মিটিং ডাকা হয়, যে মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বি আর চোপড়া, জি পি সিপ্পি, সুবোধ মুখোপাধ্যায়ের মতো নামজাদা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু কিশোর কুমার সে মিটিংয়ে হাজির হননি। মিটিংয়ে কিশোর কুমারের গরহাজিরা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সিপ্পি সাহেব জানান যে, কিশোর কুমার সরকারি কাজকর্মে সাহায্য করতে খুব একটা আগ্রহী নন। শোনা যায়, কিশোর কুমারের গানের প্রতি স্বয়ং সঞ্জয় গান্ধির বিশেষ দুর্বলতা ছিল। কিশোর কুমারের সঙ্গে তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিব সি বি জৈন নিজে টেলিফোনে কথা বলেন এবং সরকারি প্রোগ্রামে সহযোগিতা চান। এমনকী তিনি নিজে প্রয়োজনে কিশোর কুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রস্তাব দেন। কিশোর কুমার পালটা তাঁকে জানান যে, বিনা পারিশ্রমিকে তিনি কোথাও এমনকী অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতেও গাইতে প্রস্তুত নন। শোনা যায়, তিনি নাকি পরিহাসের ছলে জৈন সাহেবকে বলেছিলেন, ‘অল ইন্দিরা রেডিয়ো’তে গান গাওয়ার কোনও ইচ্ছাই নাকি তাঁর নেই।

আরও পড়ুন: মাটি-জল-মুক্তামাছ

সৌজন্য ফেসবুক

কিশোর কুমারের এই ধরনের নিজ মন-মর্জি অনুযায়ী আচরণের সঙ্গে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত হলেও দিল্লির অফিসিয়ালরা মোটে হালকা চালে বিষয়টি নেননি। ফলে সরকারি নির্দেশে কিশোর কুমারের গান রেডিয়োতে বাজানো বন্ধ হয়ে যায়। ফিল্ম প্রযোজকদের কিশোর কুমারকে দিয়ে তাঁদের সিনেমায় গান না গাওয়ানোর জন্য চাপ দেওয়া শুরু হয়। ইন্দিরা গান্ধির সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের আগে পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বজায় ছিল। কিশোর কুমারের ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে। ফলে কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় কিশোর কুমারের গান গাওয়া। ১৯৮১-তে বন্ধুবর অভিনেতা সুনীল দত্তের ছেলে সঞ্জয় দত্তের প্রথম ছবি ‘রকি’-তে আবার কিশোর কুমারের দুরন্ত কামব্যাক হয় সিনেমার সুপার হিট টাইটেল সং ‘রকি মেরা নাম’-এর মাধ্যমে। এছাড়াও ওই সিনেমার আরেকটি গান ‘আ দেখে জারা কিসমে কিতনে হ্যায় দম’ আজও সংগীতপ্রেমীরা বেশ গলা ছেড়েই গেয়ে থাকেন। কিশোর কুমার আফটার অল। গলার আওয়াজ ছেড়েই না তাঁর গান গাইতে হয়!

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

13 comments

  • Debashis Majumder

    Wonderful article. Very much informative and intellectual in presentation

  • Very interesting and inspirational,too.

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    আর কি কি আছে ঝুলিতে ? কিশোর কুমার এবং জরুরি অবস্থা এইরকম হার্ডকোর বিষয় নিয়ে লেখা হতে পারে ভাবতে পারি না। অসাধারণ ! সত্যিই অসাধারণ !

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    আর কি কি আছে ঝুলিতে ? অসাধারণ !

  • দারুন লেখা স্যার ।

  • দারুন হয়েছে লেখাটি।

  • দারুন হয়েছে লেখাটি ।

  • খুব ভালো লাগলো পড়ে।

  • অসাধারণ প্রতিবেদন।

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    Thank you so much for bringing an unexplored world in front of us.
    Very enlightening indeed.

  • Sri Nabarun Chakraborty

    কিশোর কুমারের বাড়ি Income tax department থেকে search করতে এসেছিল। কারণ তাদের ধারণা ছিল কিশোর কুমার এত ছবিতে গান গেয়েছেন এত পারিশ্রমিক পেয়েছেন তিনি কর ফাঁকি দিচ্ছেন। কিশোর যে ছবিতে গান গায় সে ছবি হিট হবে। এই কারণে তাঁর বাড়ি সার্চ হয়। কিশোর কিন্তু সানন্দে তাদের স্বাগত জানান এবং তিনি যে কর ফাঁকি দেননি তার প্রমাণস্বরূপ প্রতিবার দেওয়া ট্যাক্স এর রশিদ কপি এবং যাবতীয় কাগজপত্র ফাইল পেশ করেন। সবকিছু খতিয়ে দেখে ওদের মুখ তো চুনকালি হয়ে গেল ওরা মার্জনা চেয়েছিলেন তখন কিশোর কুমার বললেন- না না এতে আমি কিছু মনে করিনি আপনাদের যখন মনে হবে তখন চলে আসবেন আমি সবকিছু রেডি রাখব।

  • Goutam Chattopadhyay

    লেখাটি তো অনবদ্য। কিন্তু বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে সঙ্গী ছবিগুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *