অবিরাম শিবরাম

সুদীপ দেব

যে শিবরাম চক্রবর্তীকে অধিকতর পাঠক চেনেন, সেই চকরবরতির লেখা কিন্তু শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। তারপর ১৯২১ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত ‘জমিদারের রথ’ ও ‘ছেলেবয়সে’ নামে দু’টি বড় রচনা ও কিছু ছোটগল্পকার হিসেবে তাঁকে পাওয়া গেলেও রসসাহিত্যের দিকে তিনি সরে আসেন এর পরবর্তী সময়ে। তিনি নিজে বলেছেন তাঁর প্রথম হাসির গল্প ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’, যা ১৯৩৫ সালে (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হলেও ১৩৩১ বঙ্গাব্দে ‘কল্লোল’ পত্রিকার ফাল্গুন সংখ্যায় ‘আরেক ফাল্গুন’ নামে একটি হাসির গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, মোটামুটি ১৯৩৫ সালের পর থেকেই শিবরাম চক্রবর্তী ধারাবাহিকভাবে হাসির গল্প লিখতে থাকেন। তাঁর লেখার মধ্যে চলে এল শ্লেষ, যমক, অনুপ্রাস বা পান-প্রয়োগের শিব্রামীয় ভঙ্গিমা। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ সম্ভবত ‘জমিদারের রথ’। আত্মজীবনীতে বইটি সম্পর্কে শিবরাম নীরব থাকলেও বইটির ভাষা, রচনাভঙ্গি ও কাহিনি থেকে বোঝা যায় এটি তাঁর কলকাতায় আসার পর অর্থাৎ ১৯২১ সালে রচিত। এর মূল উপজীব্য ছিল এক অত্যাচারী জমিদারের দুঃখজনক পরিণতি। চাঁচলের জমিদার শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরীর সঙ্গে বাস্তব সাদৃশ্য ছিল ঘটনার। পরবর্তীকালে বইটি ‘ফুটল বিয়ের ফুল’ নামে পুনঃপ্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি সাধুভাষায় লিখিত, এবং সম্ভবত এই একটি রচনাই শিবরাম সাধু বাংলায় লিখেছিলেন।

তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ছেলে বয়সে’ উপন্যাসে তিনি চলিত বাংলায় বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের বিভিন্ন সমস্যা উপস্থাপিত করেছিলেন। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করা যায়, সেই সময়ে বসে শিবরাম চক্রবর্তী সমকামিতার মতো বিষয়কে এই উপন্যাসের অন্যতম উপজীব্য করেছেন। উপন্যাসের চরিত্র তারেক বলছে, ‘’তোমাদের সমাজ মেয়েদের পিঁজরের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। তাদের পাচ্চিনে, তাই তো তাদের ভাইদের ভালোবেসে noble revenge নিচ্চি।’’ যৌনতার পাশাপাশি কিশোরদের রাজনৈতিক বিপথগামিতাও এই উপন্যাসের অন্যতম বিষয়বস্তু। শিবরামের এই অচেনা লেখনীর পরিচয় পেলেও এই উপন্যাসেই তাঁর ভবিষ্যৎ পান-আসক্তির চিহ্ন দেখা যায় দু-এক জায়গায়— ‘’আমি রোজ সকালে চা খাই এবং সঙ্গী যিনি থাকেন তাঁকেও দয়া করে চাখাই।’’
শিবরাম নিজের লেখা নিয়ে বলেছেন, ‘’জীবন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, ইতো নষ্ট ততো ভ্রষ্ট। বেশির ভাগই ট্র্যাজেডি। তবে কিনা একজনের দুঃখের কারণ অপরের উপভোগের বস্তু হতে পারে। আমার জীবনের যোগ-বিয়োগগুলো আমি তাই অপরের উপভোগ্য করে তুলেছি।’’

সেই জন্যই বোধহয় ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’র বিতর্কিত প্রাবন্ধিক, ‘দেবতার জন্ম’-এর মতো গল্পের লেখক, ‘মানুষ’, ‘চুম্বন’ শীর্ষক কবিতার রচয়িতা, বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে লেখা ‘চাকার নীচে’ বা ‘যখন তারা কথা বলবে’র নাট্যকার এরপর সরে এসে রসসাহিত্যের দিকে মূল ফোকাসটা ফেললেন। হয়ে উঠলেন পান-এর কারিগর। পানাহার বা তাম্বূলসেবনের কোনও আকর্ষণ না থাকলেও শিবরাম ছিলেন প্রবলভাবে পানাসক্ত। অল্পস্বল্প Pun যে বাঙালির প্রাত্যহিক কথাবার্তার মধ্যে ছিল না তা নয়, সাহিত্যেও কোথাও কোথাও হয়তো ছিল, কিন্তু বিশেষ করে সে সময়কার শিশুসাহিত্যিকরা ছিলেন একটু গম্ভীর ধরনের। একটু-আধটু মজা তাঁরা সৃষ্টি করতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের কারও লেখাতেই পান-বাহার দেখা যেত না। তা ছাড়া এমন ধারণার প্রচলন ছিল যে, পান নাকি হাস্যরসের নিম্নমানের পরিচয় বহন করে। এই অচলায়তন ভেঙে শিবরামের গল্পেই প্রথম সার্থকভাবে বাংলা সাহিত্যে পান-প্রয়োগ দেখা যায়, তিনিই দেখিয়েছেন প্রকৃত পানিং-এ রয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত হাসি। সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা তাঁর অফুরান হাস্যরস আশ্রিত গল্পগুলি দাঁড়িয়ে আছে পান-এর উপর। বর্ণনার সংলাপে ঘন ঘন পান। এমনকী মূল কাহিনির ফাঁকফোকরগুলোও তিনি শুধু পান দিয়েই ভরাট করে দিতে পারতেন। পোলাপানদের জন্য লেখা গল্পে তো বটেই, ‘দৈনিক বসুমতী’তে ‘বাঁকা চোখে’ সাপ্তাহিক ঘটনাভাষ্যে শিবরামের সহজাত নৈপুণ্যের পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে।

এই পানপ্রয়োগ শিবরামের দৈনন্দিন জীবনের সংলাপেও ক্রমে এসে পড়েছিল। একবার লেখক তারাপদ রায়ের সঙ্গে দেখা হল কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে। শিবরামের সঙ্গে একটি মেয়ে ছিল সেদিন। তারাপদ রায়কে ডেকে শিবরাম মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই একে বিয়ে করবি?’
মেয়েটি স্মিত হেসে জবাব দিল, ‘এঁকে আমার পছন্দ হচ্ছে না, আমার পছন্দ আপনাকে।’
শিবরাম গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘কিন্তু আমি তো বিয়ে করতে পারব না, আমার তো পাত্রী ঠিক আছে।’
‘আপনার যত বাজে কথা। আপনার পাত্রীকে কখনও দেখতে পাই না কেন?’

‘দেখবে কীভাবে? সে তো গেছে ঝরিয়া।’ দু-জনের অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে শিবরাম আবার বললেন, ‘শোনোনি ঠাকুর গান লিখেছেন, ফাগুনের ফুল গেছে ঝরিয়া।’

শিবরাম নিজে অকৃতদার হলেও নারী সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না। প্রেমকে তিনি এক অপরিহার্য মধুর বিড়ম্বনারূপে অনুভব করেছেন।
শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে লিখতে গেলে বিভিন্ন মানুষের স্মৃতিকথার ওপর ভরসা করতে হয়। এত মজার মজার সংলাপ, ঘটনা তাঁর গল্পের বাইরে বাস্তব জীবনেও জড়িয়ে ছিল, যেগুলো নিয়ে অনেক বই রচনা হয়ে যায়। লেখক রূপক চট্টরাজ এমনই একটি মজার গল্প বলছিলেন একদিন। দেশ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তাঁকে পাঠিয়েছেন শিবরামের কাছ থেকে নতুন গল্প আনার দায়িত্ব দিয়ে। সঙ্গে করে গল্প বাবদ দশটি টাকা অগ্রিম। মুক্তারাম স্ট্রিটের সেই বিখ্যাত মেসবাড়ির ঘরটিতে শিবরাম সবাইকে জুতো পরেই প্রবেশ করতে বলতেন, কারণ হিসেবে বলতেন তাঁর ঘরে যা নোংরা আছে তাতে জুতোরই কালিমালিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা। তা সেই ঘরে গিয়ে রূপকদা শিবরামের কাছে তাঁর আর্জি পেশ করলেন। শিবরাম বললেন, ‘গল্প পেতে পারো, কিন্তু একটা শর্ত আছে।’
‘কী শর্ত?’
‘তোমাকে তোমার পায়ের তলাটা একবার দেখাতে হবে।’


রূপকদা জিব কেটে বললেন, ‘ছি ছি, আপনাকে আমি লাথি দেখাব কীভাবে।’
‘উঁহু, তবে তো গল্প পাবে না।’
অগত্যা বাধ্য হয়েই রূপকদা বললেন, ‘একবার পা দেখালেই গল্প দেবেন তো?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’
রূপকদা চকিতে একবার পা তুলেই চট করে নামিয়ে নিলেন। শিবরাম এবার মুচকি হেসে বললেন, ‘উঁহু, গল্প তোমার পাওয়া হবে না।’
‘কেন? এই তো বললেন ইয়ে আপনাকে লাথি দেখালেই গল্প দেবেন!’
‘আরে তোমার জুতোর সোল তো এখনও অক্ষত। গল্পের জন্য তাগাদা মেরে মেরে আগে জুতোর শুকতলা খয়ে যাক, তবেই না!’
ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসার আগে রূপকদা বললেন, ‘ও হ্যাঁ, এই টাকাটা সাগরদা দিয়েছিলেন…’


ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়েই শিবরাম বললেন, ‘আরে গল্প তো রেডি আছে। নিয়ে যাও।’ বলে তোষকের তলা থেকে পান্ডুলিপি বের করে দিলেন।

কল্পবিশ্ব থেকে প্রকাশিত ‘হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন’ সমগ্রের প্রথম খণ্ড


আজ শিবরামের মৃত্যুদিন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বাক্স প্যাঁটরা বাঁধা হয়ে গেছে। ট্যাক্সিটা এলেই চলে যাব।’ ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট পেলেন সেই ট্যাক্সির দেখা। এই প্রসঙ্গে বাদল বসুর ‘পিওন থেকে প্রকাশক’ স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করে এই লেখা শেষ করব।
“২৮ আগস্ট ১৯৮০। কোনও একটা ছুটির দিন ছিল। হঠাৎ গৌরাঙ্গপ্রসাদবাবু ফোন করলেন আমাকে। বললেন, ‘শিবরামবাবু নেই। ডেডবডি পিজি হাসপাতালে।’
আচমকা শোনা সেই মৃত্যুসংবাদ যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। বারবার শিবরামবাবুর হাসিমুখ মনে পড়ছিল। আর মনে পড়ছিল সেই অনবদ্য গৌরচন্দ্রিকা, ‘বুঝলেন বাদলবাবু…’


কোনওমতে নিজেকে সামলে ছুটলাম পিজি হাসপাতাল। ওখানে গিয়ে শুনলাম, আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। মৃতদেহ চলে গিয়েছে ঠান্ডা ঘরে। ঠান্ডা ঘর! যেখানে বেওয়ারিশ দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয়?
আমি আর গৌরাঙ্গবাবু ছুটলাম হিমশীতল শবাগারে। হাসপাতালের এক কর্মচারী আমাদের নিয়ে গেলেন সেই জায়গায়, যেখানে মৃতদেহ রাখা হয়। সেই কর্মচারী এক-একটি ড্রয়ার টেনে একটা করে মৃতদেহ বের করেন আর জানতে চান, ‘এটা আপনাদের?’
কিছুতেই শিবরামবাবুর মৃতদেহ আর পাই না। কতগুলো মৃত মুখ যে দেখলাম, গুনে শেষ করা যাবে না। একটা সময় আমাদের মনে হচ্ছিল মৃত্যুসংবাদটা বোধ হয় ঠিক নয়। এও যেন শিবরামবাবুর এক রসিকতা। শিবরাম চক্রবর্তীর কখনো মৃত্যু হতে পারে নাকি?
এমন সময় সেই ড্রয়ার বেরল। শিবরামবাবুর প্রসন্ন মুখ।”

Shibram Chakraborty's 35th death anniversary

সুদীপ দেব। জন্ম: ২৬ জানুয়ারি ১৯৮০। স্নাতক, বর্তমানে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞানের গল্প প্রকাশিত হয়েছে ‘কল্পবিশ্ব’ এবং অন্য ওয়েবজিনে। তাঁর সম্পাদনায় শিবরাম চক্রবর্তীর অনন্য সৃষ্টি বর্ধন ভ্রাতৃদ্বয়ের যাবতীয় গল্প-উপন্যাস একত্রিত করে প্রকাশিত হয়েছে ‘হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন’ সমগ্র। পুনরুদ্ধার হয়েছে বহু হারিয়ে যাওয়া লেখা। প্রকাশক মন্তাজ পাবলিকেশনস। শিবরাম-গবেষণা ও বই সম্পাদনার কাজে যুক্ত থাকলেও নিজেকে পাঠক হিসেবে দেখতেই পছন্দ করেন। বই ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর একান্ত সঙ্গী।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *