অতিমারির ভয়ংকরতার মধ্যেও পুজোর আনন্দ নতুন করে বেঁচে থাকার খোরাক

পারমিতা ভট্টাচার্য

ছোটবেলায় প্রতি বছর ঠাকুরের মূর্তির বিসর্জনের দিন মনখারাপ হয়ে যেত। এই যাঃ, দুর্গাপুজো ফুরিয়ে গেল যে! ‘আসছে বছর আবার হবে’— এই পাখি-পড়া বাক্যটি দিয়ে আজও মনকে বোঝাই। আর বোঝাতে বোঝাতেই এসে পড়ে মহালয়া। খুব ছেলেমানুষ বয়সের একগুচ্ছ ভালো লাগার টান এক এমনি ভালো লাগায় ভরিয়ে তোলে মন।

সেই যে ফিলিপ্সের রেডিয়োতে আগের দিন রাতেই স্টেশন ধরে রাখতেন বাবা, কলকাতা ক থেকে সম্প্রচারিত হত মহালয়া। না, সারাবছর যখন-তখন চালানোর জন্য মহালয়ার সিডি বেরোয়নি সেসময়। ভোর চারটের সময় পাড়ার অধিকাংশ বাড়ি থেকে ভেসে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মন্দ্র কণ্ঠস্বর। অনেকটাই বুঝতাম না তখন, তবুও কী এক অপূর্ব সুর দিনভর মনের মধ্যে গুনগুন করত। আমাদের সামনের বাড়ির গুলুদা, নেশা করে সারারাত ফুটপাথে শুয়ে থাকতেন মাঝেমাঝেই। মহালয়ার দিন ভোরবেলা রাস্তা থেকে শোনা যেত ওনার রেডিয়ো থেকে ভেসে আসছে মহালয়ার সুর। গঙ্গায় পুজো দিতেও যেতেন।

আরও পড়ুন: কুমারীপূজা: বাংলাদেশের দিনাজপুরের রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম

পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা হয় মহালয়ার দিন। আর ওই সন্ধিক্ষণে নাভি পর্যন্ত জলে নেমে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দান করার রীতি, এক সাবেক প্রথা। শাস্ত্র বলছে, দেবীপক্ষের সূচনায় অর্থাৎ কৃষ্ণা-চতুর্দশী তিথিতে প্রথম আলোয় অসুরনাশিনী দুর্গার আবাহনই হল মহালয়া।

ওগো আমার আগমনী আলো—
জ্বালো প্রদীপ জ্বালো জ্বালো।।

‘ওঁ আগচ্ছন্তু মে পিতর ইমং গৃহ্ণন্তু অপোহঞ্জলিমা।’
পিতৃগণ আগমন করুন ও এই জলাঞ্জলি গ্ৰহণ করুন।

আসলে, এইসবের ঊর্ধ্বে গিয়েও মহালয়া একটা যেন অব্যক্ত আনন্দ এনে দেয়। এই অতিমারির ভয়ংকরতার মধ্যেও ওই আনন্দই বারবার নতুন করে বেঁচে থাকার খোরাক, অনেক কিছু হারানোর পরেও আলোর আশা জাগিয়ে তোলে। দক্ষিণ কলকাতার এক অঞ্চলে আমার আশৈশব বড় হয়ে ওঠা। ওইদিন বাড়ির সামনে ছোট পুজো প্যান্ডেলের বাঁশ পড়ত রাস্তার একধার জুড়ে। আর ছোট্ট আমি জালনায় দাঁড়িয়ে নতুন বাঁশের গন্ধ নিতাম। ছুটে গিয়ে বাড়ির সকলকে খবর দিতাম, এবছর পাড়ায় পুজো হবে। সেসময় পুজোর বাজেট এত কম ছিল যে, প্রতি বছর পাড়ার দাদা, কাকাদের ভাবতে হত। মহালয়ার দিন থেকে দাদা আর দাদার বন্ধুরা মিলে বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলতে যেত। পাড়ার অবস্থাপন্ন বাড়ির কর্তার কাছ থেকে বেশি টাকা দাবি করার জুলুম তখন ছিল না। খুশি হয়ে যে যা দিতেন, তাতেই চলে যেত কাজ। আমাদের প্রতিবেশী এক কাকু শুনেছি অনেক টাকা চাঁদা দিতেন। আজ তাঁদের বাড়ি শূন্য পড়ে আছে, বিক্রি বা প্রমোটারের হাতে ওঠার অপেক্ষায় দিন গুনছে। পাড়ার পুজোর ভোল পাল্টেছে আজ, রাজনৈতিক দলের অনুদানে পুজোমণ্ডপ সেজে ওঠে।

আরও পড়ুন: উলা বীরনগরের প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস

কোনও একবছর মহালয়ার সময় আমরা সপরিবারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে যে কী মনখারাপ, কী বলব। একটু একটু করে প্যান্ডেল তৈরি হওয়া, দেখাই হল না! তবে সেবার ট্রেনে করে যেতে যেতে প্রথম দেখেছিলাম মাঠ-ভরা কাশফুল। সহজ পাঠে সদ্য পড়া কবিতা চোখের সামনে এরকম জীবন্ত হয়ে উঠবে, বুঝতে খানিক সময় লেগেছিল— ‘চিকচিক করে বালি কোথা নাই কাদা,/ একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।’ সেবার বিহারের রাজগীর শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ট্রেনের জানলা ধরে বাইরে তাকিয়ে ঢালা নীল আকাশ, সবুজের গালিচা বিছানো মাঠের বিস্তৃতি ছোটবেলার মনকে কী যে এক মায়ায় জড়িয়েছিল, তা বলতে পারব না। হঠাৎ দৃশ্যপট গেল বদলে। নদীর গা-ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা কাশের জঙ্গল, সবুজের সমারোহ এক লহমায় দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। বাবা বললেন, বুঝতে পারছ, ট্রেন কিন্তু বাংলা ছেড়ে বিহারে ঢুকে পড়েছে। ঠিকই তো, বাইরের প্রকৃতি কেমন যেন রুক্ষ হয়ে পড়েছে। ছুটি কাটিয়ে দশমীর দিন আবার কলকাতায় ফেরা।

কলকাতা শহরের নাগরিক জীবন আমার কাছে মহালয়ার দিন থেকে পুজোর আমেজ তৈরি করেছে। আজও করে। তখনকার সময়ে অডিয়ো ক্যাসেটের চল ছিল, সেই পেন্সিলের পিছন দিয়ে গোটানো ক্যাসেট। নতুন গান তৈরি হয়ে দোকানে আসত মহালয়ার দিন বা তার দু-তিনদিন পরেই। বাবা ‘মেলোডি’ দোকান থেকে কিনে আনতেন বেশ কিছু ক্যাসেট, শাস্ত্রীয় সংগীতের সংগ্ৰহই অবশ্য বেশি থাকত সেখানে। একবার অবাক করে দিয়ে আমার জন্য এনেছিলেন রামায়ণের একটি গীতিনাট্যের রেকর্ড। নানা গুণিজনের কণ্ঠে তৈরি হয়েছিল রেকর্ডটি। এখনও আছে আমার কাছে, কিন্তু, রেকর্ড প্লেয়ারটি খারাপ হয়ে যাওয়ায় সে এখন বাতিলের দলে।

মহালয়ার সময় বাড়িতে আরও আসত যেটা, সেইটি হল পূজাবার্ষিকী। দাদার আর আমার জন্য ‘আনন্দমেলা’ আর ‘সন্দেশ’, এছাড়া ‘দেশ’। সেসময় পূজাবার্ষিকী পত্রপত্রিকাগুলি গুণমানে খুবই ভালো ছিল। যেমন ভালো ভালো সাহিত্য, তেমনি ভালো মানের পাতা, বাঁধাই ইত্যাদি। দামও ছিল মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে। এক একটা গল্প দু-তিনবার করে পড়ার নেশা ছিল। আর রঙিন ছবিগুলো দেখতে কী যে ভালো লাগত, কী বলব! কিছু গল্পের বইও পূজাবার্ষিকীর হাত ধরে চলে আসত বাড়িতে। তবে অনেকগুলোই বাবা-মায়ের পড়ার জন্য। সেরকম কিছু বই আজও আছে বাড়িতে। আরেক সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল রেডিয়ো। পুজো উপলক্ষে কত ভালো ভালো গান বাজত রেডিয়োতে। আধুনিক বাংলা গান, রকমারি ছড়ার গান, আগমনী গান, আরও কত। ছিল মন কেমন করা শ্যামাসংগীত, আর ছিল বেতার-নাটক। ছাদের সিঁড়িতে বসে বড়দের নাটক শোনার এক অন্য অনুভূতি ছিল। নির্জন দুপুরে, সবে রোদের তাত কমতে থাকা রোদের আমেজ মেখে নাটকের আসরে ডুবে যেতাম। পুজোর ছুটির অলস দুপুরগুলো শিশুমনে কেমন এক মুগ্ধতার জন্ম দিত।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

মনে আছে, কোনও এক মহালয়ার সকালে কালীঘাট পোটোপাড়ায় ঠাকুর তৈরি হওয়া দেখতে গিয়েছিলাম। তখন অবশ্য ঠাকুর বানানো শেষ, গয়নাগাটি পরে মণ্ডপ যাওয়ার জন্য মা দুগ্গা প্রস্তুত। ছোট বলে আমার দৃষ্টিতে অনেক বড় লাগছিল মূর্তিগুলো। ঝটতিপড়তি পড়ে থাকা নানা রঙের রাংতা আর সাদা শোলা সংগ্ৰহ করে এনেছিলাম পটুয়াদের কাছ থেকে। পরে পাড়ার মণ্ডপে দুর্গা ঠাকুরের সাজের মধ্যে একই রাংতার কারুকাজ দেখে বড়ই গর্বিত হয়েছিলাম, আমার কাছেও যে আছে ওরকম। আর একবার দেশপ্রিয় পার্কের ঠাকুর দেখতে গিয়ে এক বিপত্তি হয়েছিল। তখন এরকম থিম পুজোর হিড়িকে মানুষ মেতে ওঠেনি। তাই মণ্ডপগুলিতে সুস্থ হয়ে ঢোকা, বেরোনো যেত, তার সঙ্গে প্রতিমা দর্শনও হত নির্বিঘ্নে। দেশপ্রিয় পার্কের মণ্ডপে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখার সময় বিশাল বড় ঝাড়লণ্ঠনটা ভেঙে পড়েছিল মুখের সামনে। আজকের দিনে হলে কত লোকজন যে জখম হত, কে জানে! তবে সেবার কারো কিছু তেমন হয়নি। আমার মাঝখান থেকে ঝাড়বাতির রঙিন কাচ প্রাপ্তি হয়েছিল। কতরকম নকশা করা টুকরোগুলো, ছোটবেলার অমূল্য সম্পদের অন্যতম ছিল।

আজকালকার আনন্দ অবশ্য অন্যরকম। মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঠাকুর দেখা। আধুনিক কথায় ‘প্যান্ডেল হপিং’। করোনা, অতিমারি, মাস্ক এসব বর্জিত শব্দ বর্জন করে গা ভাসাল এবছর। দু’টো টিকা নিয়ে ফেলেছি, হুঁ-হুঁ বাওয়া, করোনার ক-ও ঘেঁষতে পারবে না। নয়তো বলছি কী? সব হবে, খাওয়া, ঘোরা, ট্রেনে প্লেনে টিকিট কেটে বেড়াতে যাওয়া। কিছু বাদ নেই। এখন আবার মহালয়া আর ষষ্ঠীতে কোনও পার্থক্য নেই। মহালয়ার দিনই পুজোর মণ্ডপ উদ্বোধন আর আমাদের তাড়াতাড়ি করে ঘুরতে বেরোনো। যদি একটু কম ভিড় হয় মহালয়ায়, ফাঁকায় ফাঁকায় ঠাকুর দেখে নেওয়া যাবে। কিন্তু গতবারের মতো এবারও মণ্ডপে ‘নো এন্ট্রি’। কী জানি, ভাগ্যে কী আছে! একবার বাদামতলা আষাঢ় সংঘের পুজো দেখতে যাব মনস্থ করে এক বন্ধুকে ফোন করলাম। সে এবং তার স্বামী ওই ক্লাবেরই সদস্য। তার ভরসায় মহালয়ার দিন সন্ধ্যায় বেরোলাম। কাছাকাছি এসে দেখি, মারকাটারি ভিড়। আবার ফোনে জানতে চাইলাম, গাড়ি পার্কিংয়ের কী ব্যবস্থা। বন্ধুর সপ্রতিভ উত্তর, ‘সামনেই শ্মশান, ওখানে পার্কিং করে চলে আয়।’ আমি অত্যন্ত অপ্রতিভ হয়ে তখন দোটানায় পড়েছি। যাহোক, সেবার ‘বাদামতলা’ না দেখেই ফিরতে হয়েছিল।

আরও পড়ুন: এবার পুজোয় লেনিন বিরিয়ানি

ব্যস্ততম বর্তমান দিনগুলোতে আজকাল পুজোর বাজার বলতে প্রায় করে হওয়া ওঠে না। বছরের নানা সময়ে কেনা জামাকাপড় পুজোয় হয়তো পরে ফেলি। পুজোর চারটে দিন হয়তো অনেকটা বাড়ি বসেই কেটে যায়। অথবা কোনও দু’টো দিন বন্ধু বা আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে কাটে। মহালয়া অনেক আগে থেকেই দুর্গাপুজোর সাজগোজ নিয়ে মেতে ওঠে শহর ও শহরবাসী। রাস্তায় জনসাধারণের চলাচল সহজ করার জন্য বহু আগে থেকেই বাঁশ পড়তে শুরু করে। বড়ো বড়ো ব্যারিকেড তৈরি হয় হাই-বাজেট পুজোগুলোর জন্য। এরপর আলোর রোশনাইতে সেজে ওঠে শহরের অলিগলি। কত মানুষ নিজেদের অন্নসংস্থান করবেন পুজোর ক’টা দিন। এক অন্যরকম পরিবেশ। তার মধ্যেই ঢাকের শব্দে আর ধুনোর গন্ধে গমগম করবে পূজামণ্ডপগুলি। বনেদি বাড়ির পুজোর বাজারে হয়তো দেখা দেবে মন্দা, কিছু কাটতি করেও মা-কে বরণ করে ঘরে তুলবেন বাড়ির কর্তা। এভাবেই কিছু পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে দিয়ে পুজো আসবে, পুজো কাটবে।

নমস্তে রুদ্ররূপিণ্যৈ নমস্তে মধুমর্দিনী।।
নমঃ কৈটভহারিণ্যৈ নমস্তে মহিষার্দিনী।।
নমস্তে শুম্ভহন্ত্রয়্যৈ চ নিশুম্ভাসুরঘাতিনী।
জাগতং হি মহাদেবী জপং সিদ্ধি কুরুষব মে।।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *