আমাদের প্রতিটা দিনই মে দিবস

ধীমান ব্রহ্মচারী

মে দিবস। অর্থাৎ একটা সরকারি ছুটি। চারিদিক শুনশান। রোয়াকে কেউ জটলা করছে। আবার কেউ রাস্তার মোড়ে একটা সিগারেটে টান দিয়ে আজকের দিনের তাৎপর্য বোঝাচ্ছে। এই পাড়ার হোতা স্থানীয় ব্যক্তিরা নিছকই যে কিছুই জানেন না, তা কিন্তু নয়। জানেন, কিন্তু একটু নিজের চর্চিত ও অর্জিত দাম্ভিকতা জুড়ে যেটা বড়াই করে বলেন, সেটা বেশ অস্বস্তিকর। এবং সেখান থেকে মত-দ্বিমত হয়ে শেষে মতাদর্শ। তো মে দিবস কী? কেন? মুখ্যত এটা প্রশ্ন এলে একটু ইতিহাস তো বলতেই হয়।

আরও পড়ুন: সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’: সুখপাঠ্যের অন্তরালে

জর্জিয়ার ম্যাকন সেন্ট্রাল সিটি পার্কে ১৮৭৮ সালে মে দিবস উদ্‌যাপন

সালটা ১৮৮৬। আমেরিকার শিকাগো শহর। হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। শ্রমিকেরা সেদিন দৈনিক আটঘণ্টার কাজের দাবিতে হে মার্কেটে জমায়েত হয়। আর অনভিপ্রেত একটা ঘটনা ঘটে যায় তারই মধ্যে। জমায়েতকে ঘিরে ছিল পুলিশ। সেই জমায়েত থেকে অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর, আত্মরক্ষার জন্য পুলিশও বিপরীতে শ্রমিকদের ওপর গুলিচালানো শুরু করল। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। এরপর ১৮৯১ সালে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক দলদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে, ‘শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইতিহাস কার্যত আমাদের এই ঘটনাগুলোকেই দেখায়। কিন্তু এক্ষেত্রে একটু তলিয়ে ভাবি। যদি দেখি, আমরা যারা প্রতিনিয়ত শিল্পের জন্য অথবা সংস্কৃতির জন্য কাজ করে চলি, তাদের কি সত্যিই কোনও ছুটির অবসর আছে? আসলে এ-প্রশ্নও অনেকটা বোকা বোকা। নিজের স্বাধীনতা। নিজের ইচ্ছা। নিজের শ্রম এসবেরই তো কোন দিন ক্ষণ, ক্রমিক হয় না। এ-প্রসঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার কথা মনে আসছে। একটু তুলে দিই—

“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য

কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।

চিমনির মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,

গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে,”…

(মে দিবসের কবিতা/ সুভাষ মুখোপাধ্যায়)

কি বিরাট ভাবনায় কবি আমাদের একটা প্রস্তাব ছুড়ে দিয়েছেন। এখন যে-সময়, সে-সময় কিন্তু ফুল খেলবার সময় নয়। কঠিন একটা বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত জীবনের যে দোলাচলতায় আমরা প্রতিনিয়ত খাবি খাচ্ছি। সেই পর্বে দাঁড়িয়ে আমাদের কোনও পরিত্রাতা নেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের ত্রাতা। এই অবসম্ভাবী সত্যকে মানতে আমাদের অনেকটাই কষ্ট পেতে হয়। আশাকে অবলম্বন করে আমাদের আস্থাটুকু জিইয়ে রাখতে হয়।

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

১৯০৭ সালে মেরিল্যান্ডের জাতীয় উদ্যানে সেমিনারে মে দিবস উৎসব

মূলত, আমাদের সামগ্রিক জীবন দেখার যে অভিজ্ঞতা, সেটা অনেকটাই সীমাবদ্ধ। তাই কোনওভাবেই সীমার বাইরে গিয়ে দেখা এবং তৎসংলগ্ন সেটা উপলব্ধি করা দু’টোই আখেরে কঠিন কাজ হয় দাঁড়ায়। আমার বেশ মনে পড়ে, ক্লাস টেন পর্যন্ত আমি যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে এই পয়লা মে উপলক্ষে ছুটি করে দেওয়া হত। আমাদের দোদুলদা বলে একজন কাকু ছিলেন। আমার বাড়ির পিছনের বাড়িটায় ছিল ওঁর বাড়ি। উনি একটা খাতা সব ঘরে ঘরে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতেন। তখন ক্লাসে ক্লাসে যে টিচাররা থাকতেন, তাঁরা ওই খাতা খুলে বলতেন। অনেকটা এরকম, “এই আস্তে। চ্যাঁচামেচি নয়। আগামীকাল এত তারিখ। এই উদ্দেশ্যে বিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।” বলেই তিনি ওই খাতায় একটা সই করে দিতেন। অর্থাৎ অমুক ক্লাসের, অমুক স্যার নোটিশ করে দিয়েছেন, তারই স্বাক্ষর। এদিকে আমরা ছুটির উল্লাসে আরও হইহই করে উঠতাম। কেউ ব্যাগ বাজাত। কেউ টেবিল। একদম পিছনের বেঞ্চের তথাকথিত বাজে ছেলেরা তো দু’একটা শিশ দিয়ে উল্লাস বজায় রাখত। তখন ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চার কাছে, এটাই তো আনন্দ। এটাই তো উল্লাসের মঞ্চ ছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য, এতগুলো বছর-যুগ পেরিয়ে যখন সেইসব দিনগুলোয় ফিরে যাই, তখন আজকের শ্রম-সাধনা-জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে উপলব্ধি করি, আচ্ছা একটা দিন কাজ বন্ধ করে রাখা যায়? কীভাবে যায়? এই তো আমি এখন মে দিবস নিয়ে একটা লেখা লিখছি। শ্রম করছি। আচ্ছা আগামীকালও তো, আগামী পরশুর জন্য কেউ লেখালিখি করবেন? কেউ তো আগামী পরশুর জন্য দোকানের আনাজপাতি-শাকসবজি অথবা ব্যবসার জিনিসপত্র বা কাঁচামাল আনতে আজ মানে পয়লা মে তৎপর হবে। তাহলে, মে দিবস উপলক্ষে ছুটির কী কারণ! তাছাড়াও একটা কর্পোরেট কালচারের আদর্শ নিয়ে আমরা পয়লা মে ছুটি কাটাব অথচ কর্পোরেট কালচারহীন মানুষের কোনও ছুটি থাকবে না। এটাই হয়তো আমাদের মতবাদের ভুল প্রদর্শন।

আরও পড়ুন: নীলাঞ্জন হাজরার কবিতা: ‘অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা’

ইলিনয়ের রক আইল্যান্ডের লংভিউ পার্কে মে দিবস উৎসব। ১৯০৭-১৯১৪

‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় আমার অনার্সে এসে। সেই ক্লাস ফাইভের ছোট্ট অনুভূতি এই পর্বে এসে বিরাট একটা পরিবর্তন ঘটিয়ে দিল। আসলে যক্ষপুরীর সব শ্রমিকদের লড়াই কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গবদ্ধ লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেই। তাকে হয়তো যক্ষ রাজা কাবু করতে পারেনি। তারজন্য তার মুক্তি সর্বদাই শ্রমের আর শ্রমিকের আত্মচেতনায় ঘটে যায়। স্বাধীন সভ্য দেশ তার সাম্রাজ্যবাদী উন্নাসিকতায় হয়তো অনেকটা এগিয়ে এই দিনকে উৎসর্গ করবে সেই পূর্বতন ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে আট ঘণ্টার দাবি অথবা এর থেকে কম সময় নির্ধারিত দাবির কি কোনও যৌক্তিকতা আছে? আমার সেই গ্রামের কত চাষি মানুষ। যাদেরকে আমি কোনওদিন চাষি বলে জানতুম না। যা জানতুম, তা হল বোধনদা, তেতুলিদা, শুক্লাদা। এরা আমাদের বাড়ির কীর্ষান গোত্রের ছিল। তারাই আমাদের জমিজমা দেখাশোনা করত। সকালে সূর্য ওঠার আগে ওরা উঠত। তখনকার সময় গ্রামজীবনটা এতটা আধুনিক ছিল না। সে-সময় ভোরের আলোয় আমাদের উঠোনে পায়রা আসত ধান খেতে। উঠোনের হাঁসের ঘর থেকে হাঁসগুলো বেরিয়ে ড্রেন ধরে পাঁচিলের তলা দিয়ে, বাইরের পুকুরে নেমে যেত। গ্রামে মাঠের পর মাঠে ক্যানেস্তা পেটানো হত পাখি বা গরু-ছাগল যাতে মাঠের ধান বা গম না খেতে আসতে পারে। তীব্র রোডের হাত থেকে বাঁচতে অনেকে মাচা তৈরি করে ছাউনি দিত। ধান কাটার সময় কারোর কোনও বিরাম ছিল না। এখন মে মাস। এই গরমে তাঁদের চামড়া রোদে পুড়ে যেত। পুড়ে কুঁচকে যেত। মাথায় মোটা করে গামছা বাঁধা থাকত। যাতে রোদে মাথা না পুড়ে যায়। কোনও কোনও বার ধানের ফলন হত খুব ভালো। সবার গোলায় ভরা ভরা ধান চোখে পড়ত। প্রতিদিন সন্ধের আলোয় যারা যারা আমাদের জমি দেখাশোনা করত, তারা আসত। বাবা, কাকাদের সবাই সবার হিসেব দিত। শ্রমের মূল্য তারা হয়তো জানত না। কিন্তু শ্রমের উপার্জনের আনন্দ তারা উপভোগ করত। সেই বিরাট বিস্তৃত ক্ষেত্র জুড়ে ছিল না কোথাও মে দিবসের ছুটির অবসাদ। ছিল না কোনও শ্রমের নির্ধারিত সময়মাফিক কাজের আবেদন। হয়তো, এমনই পৃথিবীর মাটিতে আমি জন্মেছি। তাই দেখতে পেয়েছি, এই প্রজাবৎসল জমিদারি ব্যবস্থার রূপ। আবার বাবাদের সঙ্গে এই শুক্লাদা, তেঁতুলিদাদের কোনওদিন ঝগড়া বা অশান্তি দেখিনি। আমাদের সঙ্গে ওদের কোনও দূরত্ব ছিল না। যেটুকু দূরত্ব বেড়েছে, তা এখনকার সময়ে এসে। তাও আবার যোগাযোগ না থাকার দরুন।

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

আসলে আমাদের দৈহিক কাজের জন্য বরাদ্দ যে শ্রম, সেই শ্রম নিয়েই আমাদের লড়াই। শ্রমিকের স্বার্থে হয়তো প্রচ্ছন্নভাবে শ্রম লাঘবের একটা প্রচেষ্টা করা। কিন্তু শ্রমিকের মহান দিনে কর্মবিরতি করে পরোক্ষভাবে সেই শ্রমকেই যেন কোথাও নিশ্চিত স্তব্ধ করার ইঙ্গিত পালনের কর্মসূচি রচনা করি আমরা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • বিষ্ণু চক্রবর্তী

    Information কিছু পেলাম। ভালো লেখা। শুভেচ্ছা রইলো লেখকের প্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *