অমরত্বের অন্বেষণ

ড. সৌমিত্র চৌধুরী

কেন জরায় আক্রান্ত হয় শরীর? টগবগে যুবক কেমন করে পক্ককেশ দন্তহীন বৃদ্ধে পরিণত হয়? অজর অমর হবার কোনও উপায় আছে কি? নিদেন পক্ষে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন। নিরন্তর উত্তর খুঁজেছে মানুষ, দেশে দেশে কালে কালে।

আড়াই হাজার বছর আগে জরা ব্যাধি মৃত্যু অতিক্রম করে নির্বাণ লাভের পথ বাতলেছেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। ভারত ভূখণ্ডে ভেষজ কবিরাজ সম্প্রদায় রসায়নের কথা বলেছেন। গাছ-গাছালির উপাদানকে ব্যবহার করে আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাব্য উপায়, আংশিক হলেও, আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরা। মধ্যযুগে মহাকবি গেটে ফাউস্ট উপন্যাসে ডেভিল মেফিস্টোফিলিসের মুখ দিয়ে বার্ধক্য জয় করবার উপদেশ দিচ্ছেন, ‘সংযত জীবনযাপন করো। আলস্য ত্যাগ করে জমি চাষ করো প্রত্যহ। ঘাম ঝরাও। আর বর্জন করো অস্বাস্থ্যকর খাদ্য।’

রোগমুক্তি ও আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টি জটিল। জানা-অজানা বহু কাহিনিতে ঠাসা। শেষ কথা বলবার সময় আসেনি। অধুনা বিজ্ঞান আরও জানাচ্ছে, বার্ধক্য মানে অসংখ্য ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের পরিণতি। আবার ভিন্নমত, বয়োবৃদ্ধি ও ক্রনিক রোগ সমান্তরালভাবে চললেও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

আরও পড়ুন: সূর্যে নাকি লকডাউন

বার্ধক্যের সঠিক সংজ্ঞা অমীমাংসিত। তবুও, আবিষ্কৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আধুনিক বিশেষজ্ঞ সম্প্রদায় বয়সের আক্রমণ প্রতিহত করবার কতগুলো পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেমন— শাকসবজি, ফল আহার করুন। সঙ্গে পরিমিত শরীরচর্চা। ত্বকের যত্ন নিতে আবশ্যিক বিউটি টিপস মেনে চলা। প্রসঙ্গান্তরে উল্লেখনীয়, ত্বকের জেল্লা ফোটানো অর্থের নিরিখে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কারবার। অস্ত্র ও ওষুধ ব্যবসার পরেই। সে আলোচনা বর্তমান নিবন্ধের অন্তর্ভুক্ত নয়।  

কথার শুরু দীর্ঘ জীবন ও সুস্থ শরীর সম্পর্কিত। জরা ব্যাধির আক্রমণ প্রতিহত করে রোগ মুক্ত দীর্ঘ জীবন লাভের রাস্তা দেখিয়েছেন অতীতের সাধু, জ্ঞানী, বদ্যি সম্প্রদায়। বর্তমান কালেও বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের উপর ভিত্তি করে উপযোগী পরামর্শ দিচ্ছেন ডাক্তার ও ডায়েটিশিয়ান। তাদের উপদেশের মধ্যে সুস্বাস্থ্য লাভের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে আবার স্ববিরোধিতাও আছে। সেই আলোচনা পরিহার করে সোজা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা শুরু হোক। জরা ব্যাধি মৃত্যুর কারণ কী? জরা মুক্ত জীবন কি সম্ভব? বিজ্ঞনীরা কী বলছেন?

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম কেপলার নিউটন হুকের কাল থেকে। মানে সাড়ে তিনশো বছর আগে। মানুষের ধ্যান-ধারণা, সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে কয়েক শতকের বিজ্ঞান গবেষণা। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে…’ এই সনাতন ধারণার উপর আধুনিক বিজ্ঞান প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। জন্ম মানেই বাল্য, কৈশোর, যৌবন অতিক্রম করে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া। তারপর জরা। কারোর ক্ষেত্রে দু’কুড়ি টপকানোর আগেই। অনেকে সাড়ে তিন কুড়ির পরও তরতাজা। তারপর কোনও এক সময়ে, বয়স আরেকটু বাড়লেই জরার কবলে পড়তেই হয়।

আবার বয়স না-বাড়লেও কিছু রোগে অকাল বার্ধক্য নেমে আসে। যেমন, জিন-ঘটিত রোগ প্রজেরিয়ায় (Projeria) আক্রান্ত শিশুদের বৃদ্ধের মতো দেখায়। কুড়ি বছরের বেশি কেউ বাঁচে না এ-রোগে। আবার সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কোনও ভারী অসুখ— লিভার প্যাংক্রিয়াসের রোগ, হৃদ্‌রোগ বা জীবাণু সংক্রমণ— এক ধাক্কায় শরীরে জরা ডেকে আনে। তারপর আসে বার্ধক্য।

জরা আর বার্ধক্য একে অন্যের দোসর। অস্পষ্ট সীমারেখায় চিহ্নিত। কার আক্রমণ আগে, বলা যাবে না। বলা যাবে, জীবনের রঙ্গমঞ্চে একেকটি অধ্যায় ক্রম অন্তর্হিত। তারপর শেকসপিয়ারের সংলাপ, ‘স্যান্স টিথ স্যান্স আইস স্যান্স এভরিথিং…।’ বাল্য-কৈশোর-যৌবন অতিক্রম করে বার্ধক্যের কবলে পড়া। তারপর শেষ অবস্থা। চক্ষু কর্ণ দন্ত বিহীন, চলৎশক্তি রোহিত, মৃত্যুর প্রতীক্ষারত বৃদ্ধের অবশিষ্ট সংক্ষিপ্ত জীবন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুফল হিসাবে মানুষ জীবনকে দীর্ঘায়িত করতে শিখেছে অনেকটাই। স্বাধীনতার সময় কালে ভারতবাসী বাঁচতেন গড়ে ৩২ বছর। ১৯৬০ সালে ভারতবাসীর গড় আয়ু ছিল ৪০, আর আমেরিকানদের ৫০। বর্তমানে আমেরিকার মানুষের গড় আয়ু ৭৮, চিনে ৭৫ আর ভারতে ৬৬ বছর।

বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘায়ু ও সুস্থ হয়ে বাঁচতে পারছে মানুষ। অর্থাৎ বয়স ধরে রাখবার কৌশল অনেকটাই তার আয়ত্তে। কেমন করে সম্ভব হচ্ছে? দীর্ঘ জীবন ও সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি কোথায়?

আরও পড়ুন: সূর্যে নাকি লকডাউন

চাবিকাঠি থাকে কোষের গভীরে। কোষের ভিতর ক্রোমোজম, তার ভিতর ডিএনএ; ডিএনএ-র মধ্যে লেখা থাকে বংশগতির খুঁটিনাটি। দীর্ঘ জীবনের রহস্যও। তাই দীর্ঘ আয়ুর অধিকারী যিনি তাঁর সন্তান সাধারণত দীর্ঘ জীবনের অধিকারী। আর নীরোগ দীর্ঘ জীবনের আধুনিক তত্ত্ব, শরীরের কোষের সুস্থতা বজায় রাখা।

জড় বস্তুর ধ্বংস হয় কেবল বাইরের আক্রমণ থেকে। যেমন ঝড়-বৃষ্টি-রোদে বাড়ির দেওয়ালে রং চটে গেলে প্লাস্টার ধ্বংস হবে। তারপর ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেওয়ালের ইট। ক্রমে ইমারতটাই রোদ বৃষ্টিতে আক্রান্ত হতে হতে জরাজীর্ণ আকার নেবে।

শরীরের ধ্বংস বহিঃশত্রুর আক্রমণ হেতু ঘটতে পারে। আবার ঘটে ভিতরের আক্রমণ থেকে অতি ক্রিয়াশীল মুক্তমূলক তৈরির ফলে। আক্রমণকারীরা কোষ ধ্বংস করে শরীরটাকেই অসুস্থ করে ফেলে। অতএব, মূল কথা শরীরের কোষগুলোকে বিভিন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারলেই মিলবে রোগমুক্ত জীবনের চাবিকাঠি। কিন্তু আয়ু বৃদ্ধির চাবিকাঠি?

আয়ু বৃদ্ধির প্রধান চাবিকাঠি থাকে অন্যত্র। কোষ বিজ্ঞান লিপিবদ্ধ করেছে বৈজ্ঞানিক তথ্য। কোষ বিজ্ঞানের ইতিহাস প্রাচীন নয়, মাত্র ৩৫০ বছরের। ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে কোষের গঠন, বৈচিত্র্য, বিভিন্ন উপাদানের কাজ অনেকটাই এখন জানা সম্ভব হয়েছে। এমনকী কোষের অভ্যন্তরে জিনের ক্রিয়াকর্মও আমরা বুঝতে পেরেছি।

অসংখ্য ছোট ছোট কোষ (Cell) দিয়ে তৈরি মানুষের শরীর। স্নায়ু ত্বক হাড় মাংস সবই। কোষ গঠন করে বিশেষ কাজের উপযোগী কলা বা টিসু (Tissue)। যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, মাংসপেশি একেক ধরনের টিসু। কয়েকটি নির্দিষ্ট ধরনের টিসু তৈরি করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ— চোখ, কান, নাক, ফুসফুস। এক কথায়, কোষের বিন্যাসই টিসু বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির মূল। যেমনভাবে ইটের পর ইট গেঁথে সৃষ্টি হয় ইমারত, তেমনি মানুষ বা জীবজন্তুর গোটা শরীর তৈরি করেছে অসংখ্য কোষ।

অতি ক্ষুদ্র, খালি চোখে দেখা যায় না। তবু সেই ছোট কোষের ভিতরেই থাকে বহু সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি আর অনেক রাসায়নিক উপাদান। এদের সাহায্য নিয়েই সুস্থ দেহের প্রতিটি কোষ জীবন্ত এবং সর্বদাই কর্মব্যস্ত। খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপ করলে কোষের ক্রিয়াকর্ম খুব বেড়ে যায়। তখন পরিশ্রম অনুভূত হয়। কিন্তু আমাদের আরাম কিংবা ঘুমের সময়ও কোষদের ছুটি মেলে না; তাদের পরিশ্রম করে যেতে হয়। জীবদেহ বাঁচিয়ে রাখতে বিচিত্র কাজ সমাধা করে আণুবীক্ষণিক কোষ।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাচের লেন্সের সাহায্য নিয়ে কোষের আকার বাড়িয়ে তাকে দৃশ্যমান করে দেয়। যন্ত্রটি আবিষ্কার করলেন কোনও বিজ্ঞানী নন, এক বস্ত্র ব্যবসায়ী। হল্যান্ড দেশের অ্যানটোনিও ভন লিয়েনহুক (১৬৩২-১৭২৩)। নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে প্রথম দেখতে পেলেন জলের মধ্যে অসংখ্য পোকার মতো বস্তু কিলবিল করছে। রক্তের মধ্যেও এরা উপস্থিতি। লিয়েনহুক প্রথম দেখেছিলেন এদের আর নাম দিয়েছিলেন, আনিম্যালকুলি (Animalculi)। অনেক পরে, এই পোকার মতো কিলবিলে বস্তুদের আমরা ব্যাক্টেরিয়া, সামগ্রিকভাবে জীবাণু (Microbe) নামে চিনতে শিখেছি।

সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রে বিবর্ধনের মাত্রা তিনশো গুণ (300x)। পরে উন্নততর যৌগ অণুবীক্ষণ যন্ত্র (Compound microscope) তৈরি হল এবং বিবর্ধনের মাত্রাও বেড়ে হল অনেক গুণ (2000x)। ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (১৬৩৫-১৭০৩) যৌগ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞান বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন (Micrographia 1665)।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে সোলা বা কর্কের গঠন শৈলী বুঝতে গিয়ে তিনি দেখলেন এদের ভিতরে অসংখ্য ছোট ছোট কুঠুরি (Cell) আছে)। বাংলা পরিভাষায় কোষ। ল্যাটিন ভাষার সেলা (Cella, ক্ষুদ্র কক্ষ) থেকে সেল (Cell) শব্দের উৎপত্তি।

‘উদ্ভিদ এবং প্রাণী দেহ অসংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি’ হুকের এই আবিস্কার বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন এনে দিল। বিশ্বব্যাপী শুরু হল কোষ সম্পর্কে জোরদার অনুসন্ধান। সাড়ে তিনশো বছরের সুদীর্ঘ গবেষণা আমাদের জানিয়েছে— লিপিড (Lipid) পর্দার আবরণে বদ্ধ থাকে জীবনের সংক্ষিপ্ততম রূপ অর্থাৎ কোষ। আবরণের ভিতর মূলত দু’টো অংশ, নিউক্লিউয়াস আর সাইটোপ্লাজম। বংশগতির ধারক জিনের (Gene) অবস্থান নিউক্লিয়াসে আর সাইটোপ্লাজমে থাকে অসংখ্য ছোট যন্ত্রপাতি। কোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোজোমের অভ্যন্তরে জিনের অবস্থান। ক্রোমোজোম বেশ কিছু জিনের সমন্বয়; ডিঅক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA) জিনের প্রধান উপাদান। ডিএনএ তৈরির মূল উপাদান কয়েকটা জৈব যৌগ, বলা হয় নিউক্লিওটাইড।

ডিএনএ-র একেকটা নিউক্লিওটাইডের গঠনে থাকে ফসফেট গ্রুপ, রাইবোস (সুগার) আর নাইট্রোজেন যুক্ত জৈব যৌগ বা বেস (Nitrogen)। অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, থায়ামিন। ডিএনএ-র আবিষ্কর্তা আমেরিকার বৈজ্ঞানিক জে ডি. ওয়াটসন এবং ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক এফ এইচ সি ক্রিক। তাঁরা জানালেন (১৯৫৩) ক্রোমোজোমের অভ্যন্তরের জিন অনেকটা যেন মনি দিয়ে গাঁথা মালা। মালার একেকটি মনিই হল জিন। প্রতিটি জিন আপন স্বাতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল এবং বংশগতির ধারক। মনুষ্যকুলে কেউ লম্বা, কেউ নীলাক্ষী, কেউ শৈশবেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত— এসব জিনের গঠনেই চিহ্নিত। জিন আদতে ডিএনএ-র এক ক্ষুদ্র অংশ যার মধ্যে প্রোটিন তৈরির কোড বা নির্দেশ লেখা থাকে। ডিএনএ-র নির্দেশ (সাংকেতিক ভাষা, কোড) মেনে প্রোটিন তৈরির কাজ করে রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA)।

শরীরে কোষের সংখ্যা পঁচাত্তর লক্ষ কোটি (75x 1012 )। আর কোষও বহু ধরনের, প্রায় দু’শো রকম। জটিল উপায়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তি তৈরি করে কোষ নিজেকে তথা সমগ্র দেহকে বাঁচিয়ে রাখে। একটা কোষ থেকে অপর কোষের সৃষ্টি হয়। শরীরের বৃদ্ধি, ধ্বংস আসলে কোষেরই বিভাজন ও মৃত্যুর বিবরণ। নিউক্লিয়াসে জিনের মধ্যে সঞ্চিত নির্দেশ অনুযায়ী কোষেরা জীবন প্রক্রিয়া চালাতে থাকে। তৈরি করে শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান (প্রোটিন), কোষের ভিতর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় বস্তু বাইরে বের করে দেয়। জিনের ক্ষয়ক্ষতির মেরামতিও নিপুণ দক্ষতায় চালাতে থাকে (রিপেয়ার জিন)। কিন্তু জিনের ত্রুটি (Mutation) মাত্রাতিরিক্ত হলে অনেক সময়ই মেরামত করা সম্ভব হয় না। যেমন দশটা সিগারেট একটা জিনের ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটায় (Mutation)। দশ বছর দৈনিক দশটা সিগারেট খেলে ৩০০০০ জিনের মিউটেশন অবশ্যম্ভাবী। এই ত্রুটি সংশোধন করবার ক্ষমতা না থাকলে আক্রমণ হাতে পাড়ে অনেক ধরনের ব্যাধি— এমনকী ক্যানসার। শরীরের প্রতিরক্ষা যন্ত্র তখন অনেক চেষ্টা করেও ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে পারেনা। ফলে কোষের ধ্বংস (Apoptosis, necrosis) ঘটতে থাকে। অনিবার্য পরিণাম বহু ধরনের রোগ। ডেকে আনে জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু। ব্যাধিমুক্ত দীর্ঘ জীবনের চাবিকাঠি এখানেই— কোষের ক্ষয় আটকানো, ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে পুনরায় সজীব ও সক্রিয় করে তুলতে পারা।

প্রথম বিষয়, কোষের ক্ষয় আটকানো। শরীরের ক্ষতি ডেকে আনে চার পাশের অনেক উপাদান। যেমন— সূর্য থেকে ধেয়ে আসা অতিবেগুনি রশ্মি, পরিবেশে উপস্থিত ক্ষতিকারক বস্তু এবং দেহের ভিতর উৎপন্ন অসংখ্য রাসায়নিক যৌগ। এসব থেকে দূরে থাকতে পারার মধ্যে রয়েছে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবনের চাবিকাঠি। এখন অবধি আমরা জানি ক্ষতিকারক পদার্থগুলো ‘ফ্রি র‍্যাডিকাল’ (Free radical) বা মুক্তমূলক নামের উপাদান। এর আওতায় আছে অনেক ধরনের রাসায়নিক বস্তু। যেমন— প্রচণ্ড ক্রিয়াশীল অক্সিজেনমূলক, ক্রিয়াশীল অ্যামিন ইত্যাদি। পরিবেশ বা শরীরে খাদ্যবস্তুর বিপাক ক্রিয়ায়, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে (অতি পরিশ্রম অনিদ্রা অ্যালকোহল সেবন) তৈরি হয় এসব উপাদান। এগুলোই কোষের লিপিড প্রাচীর আক্রমণ করে। কোষের ভিতর ঢুকে জিনের উপর আক্রমণ হানে। ডেকে আনে ক্যানসার এবং অন্যান্য রোগ।

আরও পড়ুন: মানভূমের মনসা পরব

মুক্ত মূলকের আক্রমণ প্রতিহত করা কি সম্ভব? উত্তর, সম্ভবপর। কীভাবে প্রতিহত করা যাবে? সঠিক পুষ্টির সাহায্যে মুক্ত মূলকের আক্রমণ ঠেকিয়ে প্রতিরক্ষাতন্ত্রের ক্ষয় এবং বার্ধক্যজনিত অসুখ অনেকটাই দূরে রাখা সম্ভব। প্রয়োজন সঠিক মাত্রার (অতিরিক্ত যেন না হয়) অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট জাতীয় খাবার (ফল, শাক-সবজি, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ক্যারোটিন ইত্যাদি) খাওয়া। খাদ্যে বিভিন্ন উপাদানের সঠিক অনুপাত বজায় রাখা। প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট তেল জল ভিটামিন খনিজ লবণ— নির্দিষ্ট অনুপাতে বয়স এবং ব্যবহারিক প্রয়োজন মেনে খেতে হবে। খাদ্য তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলতে হবে মিষ্টি জাতীয় খাদ্য, অতিরিক্ত তেল-লবণ। উচিত কায়িক পরিশ্রম করা— ব্যায়াম, হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা। জীবনযাত্রার ধকল (Stress) কমানো। গান-বাজনা শোনা, কাব্যচর্চা বা আনন্দে থাকার মধ্য দিয়ে জীবনের স্ট্রেস কমিয়ে ফেলা সম্ভব। এসব করতে পারলেই জমে থাকা মুক্ত মূলক শরীর থেকে বাইরে চলে আসবে। এ যুগের বিজ্ঞান আরও জানাচ্ছে, শিশু বৃদ্ধ যুবক সকলেরই শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কারণ স্থূল শরীর (ও শীর্ণ দেহ) সহজেই রোগে আক্রান্ত হয়। অধুনা বিজ্ঞান দীর্ঘ জীবন লাভের আরেকটি তথ্য জানাচ্ছে। বয়স্ক ব্যক্তিদের দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলোকে— রক্তচাপ, বাত, ডায়াবেটিস হাঁপানি ইত্যাদি, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে সর্বদায় নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। 

বর্তমান বিজ্ঞান দীর্ঘ জীবন লাভের পেছনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বই উদ্ঘাটন করেছে। তেমন একটি বিষয়, টেলোমেয়ার (Telomere) তত্ত্ব। টেলমেয়ার শব্দের আক্ষরিক অর্থ— শেষ অংশ (গ্রিক telo শব্দের অর্থ শেষ আর meros মানে অংশ)। ক্রোমোজোমের প্রান্ত সীমায় এর অবস্থান এবং ডিএনএ-র অংশ বিশেষ। টেলোমেয়ারের মধ্যে নিউক্লিওটাইডগুলো বিশেষ অনুক্রম (sequence) মেনে সাজানো থাকে (চিত্র 4)। টেলোমেয়ারকে তুলনা করা হয় জুতোর ফিতের প্রান্তে থাকা প্লাস্টিকের সঙ্গে। ক্রোমোজোমের লম্বা শরীরকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে টেলোমেয়ার। ভাঙন ঘটলেই তো জিনের ক্রিয়াকর্মে ব্যাঘাত ঘটবে। সৃষ্টি হবে রোগ এবং তার ফল, সংক্ষিপ্ত জীবনকাল। ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোষের প্রত্যেক বিভাজনের পর টেলোমেয়ারগুলো সংক্ষিপ্ততর হয়ে যায়। দীর্ঘকাল বিভাজন ক্রিয়ার ফলে টেলোমেয়ার লম্বায় খুবই ছোট হয়ে পড়ে। ফলে কোষের বিভাজন ক্রিয়া বাধা পায় আর শরীরের কর্মক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়। জরার কবলে পড়ে শরীর। সৃষ্টি হয় বহু রোগ এমনকী ক্যানসারও।

টেলোমেয়ারের ক্রিয়া পরিচালনা করে টেলোমারেস নামের এনজাইম। এর উৎপাদন হ্রাস পেলেই টেলোমেয়ারের ক্রিয়াকর্ম কমে যায়। টেলোমারেস এনজাইমের ক্রিয়াশীলতা বাড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞান বার্ধক্য এবং ক্যানসার রোগকে প্রতিহত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দু’বছর আগের সেপ্টেম্বরে ল্যানসেট পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রের আরেকটি তথ্য প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য। যোগ ব্যায়াম এবং ধ্যানের মধ্য দিয়ে জীবনযাপনের সামগ্রিক ধরনে বদল ঘটিয়ে শরীর ও মনের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব। এর ফলে প্রথমত স্ট্রেস হবে কম। দ্বিতীয়ত, মুক্ত মূলকের উৎপাদন কমে যাবে। আর সবচাইতে বড় ব্যাপারটা ঘটবে কোষের গভীরে। ক্রোমোজোমের মধ্যে টেলোমেয়ার অনুক্রম (telomere sequence) অপরিবর্তিত থাকবে। 

অদ্যাবধি আবিষ্কৃত তথ্যের মূল কথা, অতি ক্রিয়াশীল অক্সিজেন মূলক (Reactive oxygen species, ROS) কোষের বিপর্যয় (Mutation) ডেকে আনে। আমাদের গবেষণায়ও উঠে এসেছে কোষের উপর অতি ক্রিয়াশীল নাইট্রোজেন মূলক বা অতি ক্রিয়াশীল নাইট্রোজেন (Reactive nitrogen species, RNS) মূলকের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা। আবার অতি ক্রিয়াশীল অক্সিজেন মূলক, আমরা জানিয়েছি, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে পারলে ক্যানসার কোষও ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ ‘ROS’ নামক ক্ষতিকর বিষটি আবার মাত্রা ভেদে ওষুধের কাজও করতে পারে। কিছু ধাতুর জৈব যৌগ (Metal chelate) তৈরি করে এবংপ্রয়োগের মাধ্যমে আমরা ক্রিয়াশীল অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন মূলক তৈরি করে ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছি। এই ধরনের যৌগের পেটেন্ট নিয়েছি। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার বহু বিজ্ঞান পত্রিকায়। পাঠকের জ্ঞাতার্থে কয়েকটি মাত্র প্রকাশিত গবেষণা পত্র উল্লেখ করলাম— BMC cancer, Nov, 2006; Biochemie, Jan., 2012; European journal of Pharmaceutical Science, Feb, 2014।

আগের প্রসঙ্গে আসি। অতি ক্রিয়াশীল অক্সিজেন মূলক, ‘ROS’ অনেক বিপদ ডেকে আনে। আমাদের খাবারেও থাকে বহু ক্ষতিকর মুক্ত মূলক। যেমন— কাবাব জাতীয় চটজলদি খাবারে তৈরি হয় বিধ্বংসী মুক্ত মূলক, নাইট্রসো অ্যামিন। এ ছাড়াও অনিদ্রা বা বিশ্রামহীনতার জন্য শরীরে অনেক ক্রিয়াশীল অক্সিজেন বা অন্য ক্রিয়াশীল মূলক তৈরি হয়।   

কোষের ভিতর শক্তি (Energy) তৈরির যন্ত্রের নাম মাইটোকন্ড্রিয়া। এখানেও তৈরি হয় ক্রিয়াশীল অক্সিজেন মূলক। এই উপাদান কোষের ভিতর মাইটোকন্ড্রিয়া-ডিএনএ (Mytochondrial DNA)-এর মিউটেশন ঘটিয়ে বিপদের পর বিপদ ডেকে আনে।

বয়সকালে মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্ষমতা অর্থাৎ শরীরে শক্তি তৈরি করবার সামর্থ কমে যায়। পেশি শক্তি হ্রাস পায়, ফলে অথর্ব হয়ে পড়ে মানুষ। ন্যুব্জ অশক্ত বৃদ্ধ ক্রমশ মৃত্যু বা চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে চলে। জীবন চক্রের এই একমুখীন পরনতি অবশ্যম্ভাবী। — ‘জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ…’ অর্থাৎ জাত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত…’ (গীতার কথা)।

কিন্তু, ‘জন্মিলে মরিতে হবে রে, জানে তো সবাই…’ এই সনাতন ধারণার উপর আধুনিক বিজ্ঞান প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। কেমন করে? মৃত্যুহীন কোনও প্রাণী থাকতে পারে নাকি?

উত্তরে বলতে হয়, থাকতে পারে শুধু নয়, আছে। কী সেই মৃত্যুবিহীন প্রাণী। নাম তার ‘হাইড্রা’। গ্রিক পুরাণে হাইড্রার অনেক গল্প থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞান জানাচ্ছে, প্রাণীটির মরণ নেই। আশ্চর্য কথা! কেমন এই প্রাণী?

ক্ষুদ্র নলাকার। হাইড্রা পরিষ্কার জলে বাস করে। অযৌন উপায়ে নিজের দেহ থেকে অন্য হাইড্রার জন্ম দেয়। অদ্ভুত এই প্রাণীর শরীরে বার্ধক্যের কোনও চিহ্ন দেখা যায় না। আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণার পাতায় এই প্রাণীটিকে ‘অমর’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি হাইড্রার নলের মতো অংশে স্টেম কোষ থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে। কেমন এই স্টেম কোষ? স্টেম কোষে লুকিয়ে আছে অনন্ত সম্ভাবনা। অধুনা বিজ্ঞানে এই বিষয়টি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্টেম কোষ থেকেই মাতৃ জঠরে তৈরি হয় শিশুর হাড় চামড়া মাথা লিভার চোখ কান। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেহ তৈরিতে স্টেম কোষ অপরিহার্য। এ যুগে স্টেম কোষ ব্যবহার করে অনেক রোগ সারিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। আর এই স্টেম সেলের সাহায্য নিয়েই নিজেদের শরীর থেকে অন্য দেহ তৈরি করতে পারে হাইড্রা।

মানুষের ক্ষেত্রে স্টেম সেলের অভাব ঘটলে কোষের বৃদ্ধি, পেশির শক্তি ধরে রাখা সম্ভবপর নয়। কারণ, স্টেম সেল তৈরি এবং সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখে এক বিশেষ জিন। বয়সকালে এই জিনের কার্যকারিতা কমে আসে। জিনটির নাম ফক্স-ও জিন (FoxO gene)। সমস্ত প্রাণী ও মানব শরীরে থাকে ফক্স-ও পরিবারের জিন।

দীর্ঘ জীবন লাভের পেছনে এই ফক্স-ও জিন এবং স্টেম কোষের ভূমিকা অপরিহার্য। জার্মানির কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিকরা গতবছর আবিষ্কার করেছেন এই তথ্য। মানুষ এবং অন্য বহু প্রাণীর শরীরে বয়স কালে স্টেম কোষের সংখ্যা খুব কমে যায়। হ্রাস পায় ফক্স-ও জিনের কার্যকারিতা। বিজ্ঞানী টমাস বস (কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক) জানাচ্ছেন, ‘এই জিনের উপস্থিতির কারণেই হাইড্রা অমর।’

আর মানুষের ক্ষেত্রে কী হয়? আয়ু  বৃদ্ধি করে কি এই জিন? অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ইদানীং জানা গেছে, এই জিন মানুষেরও আয়ু বাড়িয়ে দেয়। পরীক্ষা আরও জানিয়েছে, শতায়ু মানুষের শরীরে এই ফক্স-ও জিন এবং স্টেম কোষ ভীষণ রকম ক্রিয়াশীল।’

কতদূর বাড়তে পারে মানুষের আয়ু? দু’শো-তিনশো বছর বাঁচলেও কোনও দিন কি মানুষ অমর হতে পারবে? উত্তর জানা নেই। তবে শেষ কথা বলবার সময় আসেনি এখনও। বিজ্ঞান থেমে থাকে না। অনন্ত অন্বেষণ চলতেই থাকবে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমরা।

ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী, ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল স্যায়েন্টিস্ট, চিত্তরঞ্জন জাতীয় কর্কট রোগ গবেষণা সংস্থান, কলকাতা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *