কৃষকরা যা যা পেরিয়ে আসছেন

সিদ্ধার্থ বসু

‘বর্গীরা লুটছে ধান, নিম খুনে ভরে জনপদ

তোমার চেয়েও বড় হে শ্যামাঙ্গী, শস্যের বিপদ’

আমি থাকিনি দিগন্তছোঁয়া ফসলক্ষেতের সহবাসে। ফলত জানি না, ভরা ফলনের দিনেও যথাযথ দাম না পেয়ে কীভাবে ধ’সে যায় মানুষ।

আমার খুব স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে সব।

—স্বাধীনতার পর সবচেয়ে প্রকাণ্ড কৃষক আলোড়ন।

—রাষ্ট্রও নতজানু, সম্বলহীনদের মরিয়াপনার কাছে।

—এবার এ জন্মেই সাক্ষী থেকে যেতে পারব সেই মহাকাব্যের: গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা।

—কৃষি আসলে আমাদের আত্মায়, আত্মপরিচয়ে।

এইসব ভাবি। আর দেখি, দিল্লির ১০ ডিগ্রি শীত উপেক্ষা করে জলকামানের নির্মমতার সামনে শরীর পেতে দাঁড়িয়েছেন কৃষকেরা। দেশদ্রোহী, মাওবাদী ইত্যাকার সুকৌশলী অপরায়নে বিশেষ টলানো যাচ্ছে না তাঁদের।

আরও পড়ুন: প্রত্যয়ের পথিক

ছবি সৌজন্য indiatvnews.com

যদিও জানি, এবং খুব সম্ভব ঠিকই জানি— এক জায়গা থেকে শুরু হয়ে ক্রমে যে মূল দাবির দিকে হেলে পড়ছে গোটা আন্দোলনের ভরকেন্দ্র, তা কখনোই সাধারণ ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকের স্বার্থরক্ষাকারী হতে পারে না। সোজা কথায় মিনিমাম সেলিং প্রাইস (সংক্ষেপে এমএসপি) নিশ্চিত হলে ভূমিহীন গরিব মানুষের লাভের চাইতে ক্ষতিই বেশি হয়। কারা কিনবে এই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বিক্রয়মূল্য দিয়ে কৃষিজ পণ্য? অন্য গরিব চাষিরাও তো বটে। বরং চাষের খরচ যাতে কমে, সে দাবি ওঠা উচিত আরও স্পষ্ট করে।

প্রাসঙ্গিক দাবিগুলো আসলে আন্দোলনের ভিতরেই ছিল। এবং এটা ঘটনা যে, ১. The Essential Commodies (Amendment) Bill 2020, ২. The Farmers Agreement of Price Assurance and Farm Services Bill 2020 ও ৩. The Farmers Produce Trade and Commerce Bill 2020— এ-তিনটি কৃষকবিরোধী ও জনবিরোধী বিল প্রত্যাহারে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে না পারলে এই মিনিমাম সেলিং প্রাইসের দাবির লড়াই নেহাতই মধ্য ও উচ্চ শ্রেণির ধনী কৃষকদের স্বার্থবাহী আন্দোলনে পর্যবসিত হবে।

আরও পড়ুন: খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

প্রথমত, মোট ২০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মজুত করার ঊর্ধ্বসীমা ও তুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে কৃষকদের থেকে এই সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার জন্য সরকার আর বাধ্য থাকবে না, সঙ্গে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা এখন থেকে যত ইচ্ছা দ্রব্যাদি অনির্দিষ্টকালের জন্য গুদামজাত করে কৃত্রিমভাবে বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি পেপসিকো, আদানি, রিলায়েন্স-এর মতো বড় বড় কোম্পানিরা চুক্তি করতে পারবে। এবং এইসব বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে কৃষকদের চুক্তি হওয়ার পর কোনও কারণে উৎপন্ন ফসল পছন্দ না হলে তা কিনতে কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ফসল নষ্ট হলে সেই আর্থিক ক্ষতির দায় নিতে কোম্পানিগুলো বাধ্য থাকবে না।

তৃতীয়ত, ক্রেতা ব্যাবসায়িক সংস্থাগুলির সঙ্গে কৃষকরা সরাসরি কেনাবেচা করতে পারবে (অন্য কথায় তাদের করতেই হবে) মুক্তভাবে। এক্ষেত্রে সরকার আর কোনও রকম হস্তক্ষেপ করবে না।  এমনকী বিদ্যুতের সরবরাহ সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতে কৃষককে ভরতুকি বন্ধ করার ব্যবস্থাও করা হবে।

অতএব, এই সমস্ত বন্দোবস্ত অব্যাহত রেখে শুধুমাত্র এমএসপি নির্ধারিত রাখা হলে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকের পরিস্থিতি কিছুমাত্র বদলাবে কি?

ছবি সৌজন্য AP

‘যে যেখানে লড়ে যায় আমাদেরই লড়া’

কিন্তু তবু, তবু, এই ‘Stand with Farmers’ ট্রেন্ড সেঁটে আঁচ পোহানো আমাদের মতো মৌতাতমশগুল ফেসবুকারদের চোখেও না প’ড়ে পারছে না রাজধানীর এই তীক্ষ্ণ শীতের কামড় তুচ্ছ করে ট্রাক্টরারূঢ় ধনী কৃষকদের আশপাশে, ঘেঁষে-ঘষেই, নেমেছেন আরও অগণিত ছেঁড়া জুতো ও খালি-পা উদ্‌ভ্রান্ত মুখও। আন্দোলন আরও এগোলে— সফল বা আপাত বিফল যা-ই হোক না কেন— তাঁদের দিন তাতে কিছুই বদলাবে না। কিন্তু তালি-খাওয়া জুতোজোড়ায় সযত্নে ফিতে বাঁধতে বাঁধতে তাঁরা সাক্ষী হয়ে থাকবেন একটা অলৌকিক নভেম্বর-ডিসেম্বরের, যখন দেশের সম্পন্ন কৃষিজীবীদের পায়ে পা মিলিয়ে তাঁরা একটা রাষ্ট্রকে থামিয়ে দিতে পেরেছিলেন বেশ কিছুটা সময়ের জন্য। তাঁদের দাবি, যদি সে তরঙ্গভঙ্গের চূড়ায় ভেসে নাও উঠে থাকে, যদি শ্রেণিগত স্বার্থ কিছু নাও আদায় হয় তাতে (যার সম্ভাবনা খুবই বেশি, প্রায় পুরোটাই), তবু শয়তানের চোখে চোখ রেখে লড়ার যে অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা ফিরবেন, খরায় ফেটে-পড়া মাটিতে তাঁদের সে রক্তপায়ের ছোঁয়ায় দু’য়েকটা বীজ ভিজে উঠবেই। আজ। নইলে কাল।

Similar Posts:

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *