কানাডা থেকে এসে কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন ফাদার গাস্তোঁ রোবের্জ

অনিন্দ্য বর্মন

ফাদারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের সেমিনার হলে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ওপর একটি আলোচনাসভার প্রধান অতিথি ছিলেন ফাদার গাস্তোঁ রোবের্জ। সেদিন অবাক হয়ে শুনেছিলাম এক বিদেশি কীভাবে শুধুমাত্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়ে দেশ ছেড়ে কলকাতায় এসে বসবাস করছেন! নিজের দেশের ঐতিহ্য এবং মহিমায় গর্বিত হয়েছিলাম। পরবর্তীতেও বহুবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আলোচনাসভায় ফাদারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। ব্যক্তিগত কোনও কাজে সেন্ট জেভিয়ার্সে গেলেও রিসেপশন কাউন্টারে ফাদারের খোঁজ করতাম। উনি অনুমতি দিলে দেখা করতাম। আশ্চর্য লাগত এটা ভাবতে যে, উনি কিন্তু আমার মুখটা মনে রেখেছিলেন। শেষবার দেখা হয়েছিল সম্ভবত ২০১৬-১৭তে। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলেছিলেন— অ্যানিন্ডা, রাইট?.

Film academician Father Gaston Roberge passes away - DTNext.in

কে এই ফাদার গাস্তোঁ রোবের্জ? ১৯৩৫-এ কানাডার মন্ট্রেয়াল শহরে ফাদারের জন্ম। মন্ট্রেয়ালে থাকার সময় এক আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রথম সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজির দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু অফিসের বড়কর্তা ছুটি না দেওয়ায় সিনেমাগুলো তাঁর দেখা হয়নি। ১৯৬১-তে ২৬ বছর বয়সে ফাদার কলকাতায় আসেন। অবশ্য তার আগেই নিউ ইয়র্কের একটা সিনেমা হলে অপু ট্রিলজি দেখার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। ভারতে তাঁর কাছে একমাত্র পরিচিতি ছিল কলকাতা। এই শহরও তাঁকে এতটাই আপন করে নিয়েছিল যে, আর কখনও তিনি নিজের দেশে ফিরে যাননি। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে দেখার চেষ্টা করেছেন এক ভারতীয়র চোখ দিয়ে। নিজেকে সেইদিক থেকে সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় মনে করতেন। চলচ্চিত্র ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর কৌতূহল ছিল। ভারতীয় সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা করেছেন। পড়েছেন ভরত মুনির লেখা নাট্যশাস্ত্র। প্রথম প্রথম কলকাতার স্ট্রিট ফুড খেতে ভীষণই ভালোবাসতেন।

Father Gaston Roberge - A Master Teacher of Film Theories | Shoma Chatterji

ব্যক্তি হিসেবে ফাদার ছিলেন অকপট। স্বীকার করতেন যে, নিউ ইয়র্কে প্রথমবার পর পর অপু ট্রিলজির তিনটে সিনেমা দেখে অনেককিছুই বুঝতে পারেননি। অবশ্য সেদিন কী দেখেছিলেন, সেটা অনেক পরে আরও বহুবার সিনেমাগুলো দেখার পর উপলব্ধি করেন। সবথেকে যেটা তাঁকে নাড়া দিয়েছিল, সেটা হল অপু-দুর্গার কাঁচা আম তেল দিয়ে মেখে খেতে দেখার দৃশ্যটা। বাবা-মা যাতে জানতে না পারে, বাচ্চা ছেলেটা রান্নাঘর থেকে তেল চুরি করছে, আম মেখে খাওয়া…। খুব অবাক হয়েছিলেন দেখে যে, কীভাবে সত্যজিৎ তাঁর ক্যামেরায় মানুষের মনকে ধরেছেন। তা থেকে অতি সন্তর্পণে অপু নারকোলমালা নামিয়ে আনে, তাতে সংসারের খরচ বাঁচিয়ে রাখা অল্প কয়েক ফোঁটা সরষের তেল। যখন দুই ভাই-বোন লুকিয়ে আম খাচ্ছে, তখন তাদের মুখের ক্লোজআপ। আহা, কি আনন্দ দু’জনের মুখে! খাচ্ছে, হাসছে, আবার খাচ্ছে। আর ক্যামেরা বারবার দু’জনের মুখের ক্লোস-আপ নিচ্ছে। যাতে মা জানতে না পারে, অপু আওয়াজ করায় দুর্গা তাকে চাঁটি মারে, আমের টকে অপুর মুখ কুঁচকে যাওয়া— এসবই কী সাবলীলভাবে সত্যজিৎ ক্যামেরায় ধরেছিলেন। মানুষের তুচ্ছ মুহূর্তও যে কত আনন্দের হতে পারে, তাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছিল।

The Apu Trilogy – Satyajit Ray's Cinematic Jewel Still Relevant in the 21st  Century - The Review Monk

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র নিয়ে বিশেষ পড়াশোনা করেছিলেন ফাদার। তাঁর প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন— সাব্লিমিটিতে ভরপুর কাজ করা সত্ত্বেও সত্যজিৎ কোনও বিশেষ ধারা বা পন্থা অবলম্বন করতেন না। তিনি থাকতেন তাঁর নিজের জগতে। সহানুভূতি, সমবেদনা, ক্ষমা এবং ভালোবাসা— এই নিয়েই গঠিত হয়েছিলেন সত্যজিৎ। নিজের নিরাভরণ রূপের ছাঁচে গড়েছিলেন অপুকে। মৃত্যুর পরও অপু আগলে রেখেছিল দুর্গার সমস্ত গুপ্তস্মৃতি। দিদির গায়ে সে আঁচড়টুকুও লাগতে দেয়নি। আম জাড়ানো বা দুর্গার হার পুকুরে ফেলে দেওয়ার মধ্যেই অপুর মানবিক দিক ফুটে ওঠে। আসলে অপুর মধ্যে দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠেন সত্যজিৎ। তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, তিনি সেই বন্ধন তৈরিতে বিশ্বাসী যা মানুষকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসে, তাদের একসঙ্গে বেঁধে রাখে। একে কি মনুষত্ব ছাড়া আর কিছু বলা চলে?

The Apu Trilogy: Behind the Universal | The Current | The Criterion  Collection

একবার ফাদারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আপনার প্রথম কীভাবে আলাপ হয়? ফাদার বলেছিলেন— “১৯৭০ সালে প্রথম সত্যজিতের সঙ্গে দেখা হয়। ‘পথের পাঁচালী’ আমাকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল। অপু আর সত্যজিতের মধ্যে পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রচুর মিল পেয়েছিলাম। যেন সত্যজিতের যাত্রার মধ্যেই অপুর যাত্রা লুকিয়ে রয়েছে। নাকি সত্যজিৎ অপুর মধ্যে দিয়ে নিজের যাত্রা পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তার পর আমি দেখলাম ‘আগন্তুক’, যেখানে প্রধান চরিত্রের সঙ্গে অপুর আশ্চর্য সাদৃশ্য। অপুই যেন বহু পথ পেরিয়ে আগন্তুকের মনমোহন মিত্র। সেই খোঁজ, সেই পথ চলা, সেই অন্তিম গন্তব্য, সবই যেন এক তারে বাঁধা। ৮০ বছরের এক ফিউশন ওয়ার্ক— অপু মিত্র। আগন্তুক দেখিয়েছে কীভাবে একটি বোতামের চাপে একটা গোটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব, কীভাবে পাসপোর্ট বা আইডি কার্ডের মাধ্যমে মানুষের পরিচিতি তৈরি হয় এবং মানুষের মনেই একমাত্র নতুন সভ্যতার বীজ লুকিয়ে থাকে।”

Father Gaston Roberge - A Master Teacher of Film Theories | Shoma Chatterji

অকপট ফাদারের অনেক কিছুই ছিল অপছন্দের। যেমন ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশ্লেষণ বিদেশি ধাঁচে করার প্রচেষ্টা। কলকাতায় আসার পর এক আলোচনাসভায় এক বাঙালি সমালোচকের কাছে শোনেন যে, সত্যজিতের অপু চরিত্রের মধ্যে প্রচুর গলদ আছে। তিনি সদ্য ভারতে এসেছেন, তাই এই নিয়ে কিছু বলেননি। কিন্তু অবাক হয়েছিলেন। তাঁর হৃদয়ে ছিল সত্যজিতের অপু-দুর্গা। অথচ পড়াশোনা জানা এক বাঙালি, ভারতীয় সমালোচক পাশ্চাত্যধর্মী আলোচনা বা ফিল্ম ক্রিটিসিজমকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন! তার মানে তো নিজের সংস্কৃতি ভুলে বিদেশি দর্শনকে মেনে নেওয়া। এক রবিবারের সকালে সত্যজিতের বাড়ি গিয়ে দেখেন বৈঠকখানায় সত্যজিৎ বিমর্ষ হয়ে বসে আছে। জানা যায়, কিছু আগে কয়েকজন তরুণ এসেছিল। তারা ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্র বলে পরিচয় দিয়ে সত্যজিতের লেখা সিনেমার চিত্রনাট্যগুলো দেখতে চায়। কিছুক্ষণ পর চিত্রনাট্যগুলো সত্যজিৎকে ফেরত দিয়ে চলে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর সত্যজিৎ হঠাৎ দেখেন ‘চারুলতা’-র চিত্রনাট্যটা মিসিং। সেদিন সত্যজিৎ রায় পুলিশে খবর দেননি, নিজের প্রয়োজনমতো চিত্রনাট্য আবার লিখেছিলেন। কিন্তু এই বিষয়টা ফাদার মানতে পারেননি।

বিগত প্রায় ৬০ বছর ফাদার কলকাতায় বসবাস করছেন। ১৯৭১-এ সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন চিত্রবাণী। ১৯৮৬-তে সেন্ট জেভিয়ার্সে প্রতিষ্ঠা করেন এডুকেশনাল মিডিয়া রিসার্চ সেন্টার। তারপর থেকেই তাঁর ঠিকানা সেন্ট জেভিয়ার্সের ওই ঘরটি। আমি যে সামান্য কয়েকবার সেখানে গেছি, প্রত্যেকবারই ফাদার চলে আসার সময় হাতে লজেন্স দিয়ে আশীর্বাদ করতেন। বড্ড ভালো ছিলেন ফাদার। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

A Remembered Conversation… | Crazy Mind's Eye

শুধু একটাই আপশোস থেকে যাবে। ব্যক্তিগত কারণে লকডাউনের মাঝেও ফাদারকে বহুবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। যোগাযোগ করতে পারিনি। ২৬ আগস্ট ফাদারও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

Film Academician Father Gaston Roberge Passes Away
Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *