ফেলুদা ‘ফেরত’ এসে মন জয় করল

অরিন্দম পাত্র

সিজন ১: "ছিন্নমস্তার অভিশাপ"

“তাই ঘনালে অন্ধকার

নেই কারণ ভয় পাওয়ার

গল্প নিয়ে ফেলুদা ফিরছে আবার…”

সত্যিই ফেলুদা ফিরে এলো। আবার ফিরে এলো! This time he is back with a bang. আর পাঁচজন সাধারণ বাঙালির মতো আমিও আশা আর আশঙ্কা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম ফেলুদার ফেরত আসার। আশঙ্কা… কারণ রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর কপিরাইট মুক্তির মতোই এবারের ফেলুদা যে লেজেন্ডারি রায় পরিবারের হাতে তৈরি নয়। তবে সে আশঙ্কার অচিরেই বিনাশ ঘটল পুরো ছ’টি এপিসোড দেখে। নাহ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পরিচালনা ও চিত্রনাট্যের উপর ভর করে ফেলুদা সত্যিই ফিরে এলেন দারুণভাবে!

আরও পড়ুন: সুধীন-শ্যামল জুটি এবং বাঙালিয়ানায় মোড়া জিঙ্গল বেল

‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ ফেলুদার সেই গুটিকতক উপন্যাসের মধ্যে পড়ে, যেটি এখনও পর্যন্ত বড় বা ছোট পর্দায় চিত্রায়িত হয়ে ওঠেনি। হাজারিবাগে নিবাসরত এক বাঙালি অবসরপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান অ্যাডভোকেট মহেশ চৌধুরি মশাইয়ের মৃত্যুরহস্য এবং পারিবারিক কেলেঙ্কারির সমাধানের উপর পুরো গল্পটি দাঁড়িয়ে। পাশাপাশি সার্কাস থেকে পালিয়ে যাওয়া এক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে নিয়েও রোমাঞ্চ ঘনীভূত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় সত্যজিৎ রায়ের কুশলী কলমে। আট থেকে আশি সবারই এই গল্পের প্রতিটি লাইন ও হেঁয়ালি মুখস্থ, তাই গল্প নিয়ে কিছু বলা নিছকই বাতুলতা। সৃজিতবাবু চিত্রনাট্য রচনা করেছেন পুরোপুরিভাবেই আসল গল্পের ছায়া অবলম্বনে, কোথাও কোন মেজর চেঞ্জ করেননি তিনি। টানটান ছ’টি এপিসোড যার একেকটি ২৫ মিনিটের, অর্থাৎ মোট ১৫০ মিনিটের চিত্রনাট্য খুব সুন্দর সাজিয়েছেন পরিচালক। ওয়েব সিরিজের বদলে এটি একটি ফিচার ফিল্ম হলেও মন্দ হত না! পাশাপাশি ইদানীংকালের আড্ডাটাইমসেই প্রদর্শিত পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ফেলুদার মতো এই ফেলুদাকে আধুনিক বা সমসাময়িক করে তোলার কোনও চেষ্টাই করেননি তিনি। গল্পে উল্লিখিত টাইম ফ্রেমই বজায় রেখেছেন সৃজিত। মহেশ চৌধুরির বর্তমান ও অতীত জীবনের ঘটনাবলিকে খুব সুন্দরভাবে সময়কালের ব্যাবধান বজায় রেখে তুলে ধরা হয়েছে পর্দায়। পাশাপাশি প্রতি এপিসোডের শেষে বর্তমান ট্রেন্ড অনুযায়ী একটি করে চমকের জোগানও দিয়ে গেছেন পরিচালক।

আরও পড়ুন: হকি জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদের উপর বায়োপিক মুক্তি পাবে ২০২২ সালে

অভিনয়ে ফেলুদার ভূমিকায় অনবদ্য টোটা রায়চৌধুরি। অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোলের মাধ্যমে পরিচালক যখন টোটা রায়চৌধুরিকে ফেলুদার ভূমিকায় মনোনীত করেন, তখন আমার ব্যক্তিগত ভোট ছিল আবির চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি। টোটাকে মেনে নিতে মন চায়নি আমার। কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, টোটা আমার মন কেড়ে নিয়েছেন। স্বয়ং সত্যজিৎবাবুর আঁকা ফেলুদার ইলাস্ট্রেশনস অনুযায়ী টোটার সাজসজ্জা পাশাপাশি দৃঢ়চেতা, নির্ভীক ফেলুদার ভূমিকায় টোটা জমিয়ে অভিনয় করে গিয়েছেন পুরো সিরিজ জুড়ে। চারমিনার হাতে নিয়ে ফেলুদার ভিন্টেজ লুকে অথবা গায়ে শাল জড়িয়ে, পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত টোটাকে দেখে অনেক সময়ই চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। নিশ্চয়ই একথা অনস্বীকার্য যে, আসল ফেলুদা বলতে শ্রদ্ধেয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় অথবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সব্যসাচী চক্রবর্তীর গ্রহণযোগ্যতা চিরকালীন কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যাওয়া ফেলুদার মুখ হিসাবে এই মুহূর্তে টোটা রায়চৌধুরিই যে সবচেয়ে যোগ্য, তাতে আর কোনও সন্দেহ রইল না। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের গলার স্বরেও অল্পবিস্তর পরিবর্তন এনেছেন টোটা।

সবচেয়ে বড় রিস্ক ছিল নতুন জটায়ুর চিত্রায়নে। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই কিন্তু জনরোষের মুখে পড়তে পারতেন নতুন জটায়ু ওরফে অনির্বাণ চক্রবর্তী। প্রথম কয়েকটি দৃশ্যে ওনাকে দেখে একেনবাবু-একেনবাবু ফিলিংস এলেও যত গল্প গড়িয়েছে, ততই নিজের মতো করে জটায়ু চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করেছেন অভিনেতা। সত্যি বলতে কী আইকনিক জটায়ু সন্তোষ দত্ত মহাশয়ের সঙ্গে শারীরিক সাদৃশ্যের নিরিখে এই জটায়ুই সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ইদানীংকালের মধ্যে। সেই সুযোগটার ভরপুর সদ্বব্যাবহার করেছেন অনির্বাণবাবু! না, তিনি সন্তোষ দত্ত হয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু নিজের মতো অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন আমাদের নতুন জটায়ু। তোপসের ভূমিকায় কল্পন মিত্রকে প্রথম দর্শনে চট করে দেখলে ঠিক যেন ‘সোনার কেল্লা’র মুকুল বলে মনে হয়, অর্থাৎ বাচ্চাবেলার কুশল চক্রবর্তী। তোপসের ইনোসেন্স পুরোপুরিভাবে রয়েছে কল্পনের মধ্যে। তবে অভিনয়ে কিছুটা আড়ষ্টভাব রয়েছে, সেটা আশা করা যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই দূর হয়ে যাবে।

এই সিরিজের কাস্টিংয়ের একটা বড় বৈশিষ্ট্য প্রতিটি চরিত্রের জন্য নির্বাচিত অভিনেতারা ঠিক যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছেন। সত্যিই, ধৃতিমান চ্যাটার্জি ছাড়া আর কাউকেই মহেশ চৌধুরির ভূমিকায় মানাত না। এতটাই জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি হেঁয়ালিপ্রিয় মহেশবাবুর চরিত্রকে। বড় ছেলে অরুণের ভূমিকায় অরিন্দম গাঙ্গুলি অথবা ছোট ছেলে প্রীতিনের ভূমিকায় সমদর্শী দত্ত যথাযথ। রিংমাস্টার ‘কান্ডারীকার’ থুড়ি কারান্ডিকারের ভূমিকায় ঋষি কৌশিক একটা সারপ্রাইজ প্যাকেজ। স্বল্প পরিসরে জমিয়ে অভিনয় করেছেন ঋষি। বাদবাকি সবাই যথেষ্ট চরিত্রানুগ অভিনয় করেছেন।

এই সিরিজের সম্পদ এর ঝকঝকে সিনেমাটোগ্রাফি আর লোকেশন। ডুয়ার্সের মূর্তি নদীকে অক্লেশে হাজারিবাগের ভেড়া নদী অথবা ডুয়ার্সের জঙ্গলকে হাজারিবাগের জঙ্গলে পরিণত করেছেন ডিওপি। একটাই দুর্বল জায়গা তা হল আবহ সংগীত, যা মন ভরাতে পারেনি। কিন্তু রূপম, রূপঙ্কর আর অনুপমের গাওয়া টাইটেল মিউজিকটি আমার দারুণ ভালো লেগেছে। এখনও গুনগুন করে যেন কানের পাশে বেজে চলেছে। আর হ্যাঁ, বাঘের গ্রাফিক্স বেশ কিছু জায়গায় দুর্বল আবার বেশ কিছু জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। উদাহরণস্বরূপ বাঘের জটায়ু-তোপসের সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোনোর দৃশ্যটা চোখে লেগেছে দুর্বল গ্রাফিক্সের জন্য, কিন্তু ক্লোজ আপ শটে কারান্ডিকারের বাঘের হাঁ মুখে মাথা প্রবেশ করানোর দৃশ্য যথেষ্ট ঠিকঠাকই লেগেছে। সবমিলিয়ে আমার কাছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ফেলুদা, নতুন জটায়ু, নতুন তোপসে আর নতুন পরিচালক বেশ পছন্দসই হয়েছে। ব্যক্তিগত মত, দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু আমার মতে ফেলুদার মতো একটা ফ্র‍্যাঞ্চাইজিকে এত তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেওয়ার বদলে যদি নতুন নতুন প্রচেষ্টা জারি থাকে, ক্ষতি কি?

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *