রানাঘাটে রঙের উৎসব

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

কথামুখে থাকুক ৬ দশক আগের স্মৃতি। গোরুর গাড়ি থেকে টেনে আনা বিচুলির আঁটি, শুকনো সুপুরির/ নারকেলের/ কলার পাতা জড়ো করে হাঁড়িমাথা কাকতাড়ুয়া বানিয়ে পূর্ণিমার আগের রাতে চাঁচড়ে ন্যাড়া পোড়ানো হ’ত “আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল…” গাইতে গাইতে। দুগ্গা পুজোর বাড়তি পটকা ন্যাড়ার পেটে গুঁজে দিলে তো ভারি মজা! আরও মজার ছিল কচিকচি হাতে কঞ্চি দিয়ে হাঁড়ি ফাটানোর খেলা— একেকটা বাড়ি আর ছাইয়ে মুখ লুকোনো  আগুনের হল্কা ছিটকে পড়া।

আরও পড়ুন: বিশ্ব জল দিবসে জলের মতন কিছু কথা

দোলের দিন আভা/ শোভা আবির, বাঁদুরে রং, রুপোলি রং, বেলুনের জলরং, পিতলের/ টিনের (পরে প্ল্যাস্টিকের) পিচকিরি— তার সঙ্গে যুক্ত হ’ত পোড়ানো ন্যাড়ার কালি, গোবরজল, এমনকী নর্দমাও।

সংখ্যালঘু রং-বাজেরা গাঁজা বা সিদ্ধি বা তরলের নেশায় মাতবে এ আর কি এমন আশ্চর্যের! আর এই সবের কল্যাণে ছোটখাটো মারামারি কিংবা রাস্তায় গড়াগড়ি খাওয়া আর বিদ্যুতের তারে ছেঁড়া পোশাক জড়িয়ে থাকা— এসব দৃশ্যও দৃশ্যমান হ’ত। এমন খণ্ডচিত্র নিয়েই হ’ত রানাঘাটের দোল সমাপন।

আরও পড়ুন: তামিলনাড়ুর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন: পিরামালাই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং ফরওয়ার্ড ব্লক

ছবি লেখক

দোলের সন্ধ্যায় বাবুদের চকচকে  সাদা ধুতি-শার্ট/ পাঞ্জাবিতে অথবা মহিলাদের পাটভাঙা শাড়িতে কিশোর-কিশোরীর পিচকিরি থেকে উড়ে আসা গোলাপি রঙের আঁকিবুকি দেখে হতভম্ব মানুষের বিরক্তি এবং কঠিন ধমকের রেশ কাটার আগেই রং যেত উবে। ফেনপথেলন + পটাশ পারম্যাঙ্গানেট + অগুরু এসেন্সের দ্রবণে বানানো ‘ভ্যানিশ রং’-এর মজা দেখে রংদাতাদের হো-হো হাসি গমক তুলত পরিবেশে।

দোলপূর্ণিমার রাতে শহরের  প্রান্তে ইটভাঁটাগুলোয় সাঁওতাল পরগনা, বিহার, ছোটনাগপুর থেকে আসা ঠিকাশ্রমিকদের অথবা শহরের নানা এলাকায় ছড়িয়ে থাকা খোট্টাপল্লি, কিংবা হরিজনপল্লির অবাঙালি বাসিন্দাদের দেহাতি সম্মেলক হোরিগীত “আরে সারারারা সারারারা সারারারা হো” কানে ভেসে আসত। শোনা যেত ঢোলক, করতালি, ঝাঁঝর,  কাঁসরের উত্তেজক সঙ্গত। পরের দিন হোলি— সকাল সকাল লোকবাদ্য বাজাতে বাজাতে “হোলি হ্যায়” ধ্বনির সঙ্গে চড়া রংমাখা হাসি মুখে তারা পার্শ্ববর্তী পাড়াগুলোতে নগর-সংকীর্তণ করত। আর তাদের কাঁখের/ মাথার ধামায় গৃহস্থ মহিলারা ঢেলে দিতেন চাল-ডাল-আলু-নয়া পয়সা দিয়ে সাজানো সিধে। সন্ধ্যায় তাদের পল্লিতে জমে উঠত খুশির বনভোজন।

আরও পড়ুন: দশটি লিমেরিক

ছবি লেখক

দোলের ক্ষেত্রে সুপ্তভাবে হলেও রাধাকৃষ্ণের লীলাভাব খেলা করে! (মনে পড়ে আমার এক অনুজ বন্ধু বাচ্চু’র দার্শনিক উক্তি: ব্রাহ্মণবাড়ির রাধা-কৃষ্ণের সঙ্গে অব্রাহ্মণের কৃষ্ণ-রাধার বিয়ে দিতে যাদের জাতজ্ঞানে আঁটকায় না, তারাও সন্তানের বিয়েতে জাতের ধুয়ো তোলে!) আসলে দোল মানে দুই বংশের দুই মুরতির রঙিন যুগল সম্মিলন তো!

সে যাই-ই হোক, এখনও প্রাচীন বর্ধিষ্ণু পরিবারের বয়স্করা নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ব্যাখ্যান করতে গিয়ে “বাড়িতে দোল দুর্গোৎসব হ’ত” বলতে শ্লাঘা বোধ করেন।

আরও পড়ুন: এই টুম্পা, ব্রিগেড চল!

গত শতকে বিভিন্ন দিনে রানাঘাটের বহু প্রাচীন পরিবারে/ মন্দিরে এই সময় দোল হ’ত। রাধাবল্লভতলা ও শীতলাতলার অষ্টমদোল,  নাশড়াপাড়ার ব্যানার্জি বাড়ির রাধানাথের নবম দোল কিংবা মহাপ্রভুপাড়ার প্রামাণিক বাড়ির দোল এরকম কয়েকটি উদাহরণ। (সবমিলিয়ে ৮-১০ দিন রানাঘাটবাসী কিছুটা সতর্ক থাকত রঙের ব্যাপারে।)

বিগত ১৫/১৬ বছর ধরে এই শহরেও দোলের উদ্‌যাপন অনেক সুসংস্কৃত হয়েছে রঙের ব্যবহারে, গানে-গানে নগর প্রদক্ষিণে,  মার্জিত আচরণে। শহরের সুবুদ্ধিকে স্বাগত জানাই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *