পঞ্চাশ পূর্ণ ‘বাবু মশাইইই…’

শুভ্রাংশু রায়

তাঁর মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে বিজ্ঞাপনটি সম্প্রচার হওয়া শুরু হয়েছিল বিভিন্ন টিভি চ্যালেনে। ক্যানসারে ভেঙে পড়া শীর্ণকায় চেহারা নিয়ে পর্দার সামনে আবার দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। রাজেশ খান্না। হ্যাভেলস কোম্পানির ফ্যানের বিজ্ঞাপনে। আধ মিনিটের কিছু বেশি সময়ের বিজ্ঞাপনের শেষে রাজেশ খান্নার মুখে ডায়লগ ছিল “বাবুমশাই মুঝসে মেরে ফ্যান কই নেহি ছিন সাকতা”।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

বিজ্ঞাপনে ভেঙে পড়া রাজেশ খান্নার চেহারা দেখে তাঁর ফ্যানরা তো বটেই, আরও অনেকেই বেশ চমকে উঠেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই এলো সেই দুঃসংবাদ। রাজেশ খান্না ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ফিল্মি কেরিয়ারে যার সঙ্গে এক সময় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল এবং যার কাছে রাজেশ খান্না বম্বের (অধুনা মুম্বই) সিনেমা জগতের সাম্রাজ্য খোয়ান সেই অমিতাভ বচ্চন রাজেশ খান্নার মৃত্যুর খবরে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। সাতসকালেই দৌড়ে গিয়েছিলেন রাজেশ খান্নার বাংলোতে। টিভির চ্যালেনগুলিতে বারবার খবরের মাঝেমাঝে সম্প্রসারিত হচ্ছে একটি বিশেষ সিনেমা ক্লিপিংস। মৃত রাজেশ খান্না ওরফে আনন্দ সায়গলের দেহের ওপরে কান্নায় ভেঙে আছড়ে পড়ছেন ডাক্তার ব্যানার্জি ওরফে অমিতাভ বচ্চন। সেদিন যেন রিল আর রিয়েল লাইভ মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছিল। আনন্দ সিনেমার সেই শেষ দৃশ্য কোথায় সারা ভারতকে যেন সেদিন অন্য সব খবর থেকে বিরতি নিতে বাধ্য করেছিল।

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

উইকি বলছে, হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘আনন্দ’ ছবিটির মুক্তির তারিখ ১২ এপ্রিল ১৯৭১। কিন্তু সমসাময়িক দৈনিক পত্রিকা এবং ফিল্মি ম্যাগাজিনে দেওয়া বিজ্ঞাপন অনুসারে আনন্দ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭১-এর ৯ এপ্রিল। অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হল। অর্ধ শতাব্দী পেরিয়েও এই ছবি দেখে মনে হয়, যেন গত সপ্তাহে বানানো। সকালে চায়ের দোকানে আড্ডাছলে ‘আনন্দ’ প্রসঙ্গ তুলতেই বাকি সব প্রসঙ্গ তায় নিবার্চন নিয়ে আলোচনাও গায়েব। আনন্দ-এর আনন্দে ভেসে গেলেন প্রায় সবাই। এক সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তি তো ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি হায়’ দু-কলি শুনিয়েও দিলেন। পাশের এক দোকানদার আলোচনা শুনে নিজের দোকান ছেড়ে এসে মুকেশের গাওয়া এই ছবির কালজয়ী গান ‘কহি দূর যব দিন ঢল জায়ে’ নিজের মোবাইলে চালিয়ে দিয়ে বলে গেলেন ‘এই রকম সিনেমা আর হবে না’। বলে রাখা ভালো, সেই ব্যবসায়ীর জন্ম ১৯৮১-তে। অর্থাৎ আনন্দের মুক্তির আরও দশ বছর পরে।

সুপারস্টার রাজেশ খান্নার প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের ফিল্মি কেরিয়ারে সুপার ডুপার হিট সিনেমার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। তবু কোথায় যেন ‘বাবুমশাইই’ শব্দটা তাঁর সমগ্র অভিনয় জীবনের একমাত্র সিগনেচার ডায়লগ হয়ে রয়ে গেল। এমনিতে ‘বাবুমশাই ‘ শব্দটি সাধারণ বাঙালি ভদ্রলোককে সম্বোধন অর্থে প্রচলিত। বিশেষত হিন্দিভাষী মানুষজনের মধ্যে। সিনেমায় ডাক্তারবাবু অর্থাৎ যাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য রাজেশ খান্না ওরফে আনন্দ সায়গল এসে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই ডাক্তারের নাম ছিল ডাঃ ব্যানার্জি। অর্থাৎ পর্দায় অমিতাভ বচ্চন এক বাঙালি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যাঁকে সবসময় আনন্দের সম্ভাষণ ছিল ‘বাবুমশাইই’।

‘আনন্দ’ সিনেমায় কেবলমাত্র পর্দায় অন্যতম প্রধান চরিত্র বাঙালি ছিল এটা বললেই মনে হয় এই প্রসঙ্গের পুরো গল্পটা শেষ হয় না। এই সিনেমার গল্প স্ক্রিন প্লে এবং পরিচালনার ভার ন্যস্ত ছিল হৃষিকেশ মুখার্জির ওপর। ছবির সুরকার ছিলেন সলিল চৌধুরি। অভিনয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে কলকাতার অভিনেত্রী সুমিতা স্যানাল ছিলেন লিড রোলে। অবশ্য পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জির প্রাথমিক পর্যায়ে আনন্দ সায়গল চরিত্রের জন্য এক কিংবদন্তি বাঙালি শিল্পীর কথা ভেবেছিলেন। শুধু ভাবা নয় নিজে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সেই শিল্পীর বাড়িতে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বেল বাজানোর পরে বাড়ির দোতলার জানলা খুলে শোনা যায়, সেই শিল্পী স্বয়ং গলা পাল্টে হৃষিকেশ মুখার্জিকে মুখের ওপর বলে দেন― “কিশোর কুমার গাঙ্গুলি ঘর পে নেহি হ্যায়”। ফলে হৃষিকেশবাবুর পরিকল্পনায় বদল করতে হয় এবং আনন্দের ভূমিকায় আমরা রাজেশ খান্নাকে দেখতে পাই।

‘আনন্দ’ সিনেমাটি ছিল সেই মাত্র দু’টি সিনেমার মধ্যে একটি, যেখানে রাজেশ খান্না এবং অমিতাভ বচ্চনকে একইসঙ্গে পর্দায় দেখা গেছে (অপর সিনেমাটির নাম ‘নমক হারাম’। ১৯৭৩ সালে রিলিজপ্রাপ্ত এই সিনেমাটিরও পরিচালক ছিলেন হৃষিকেশ মুখার্জিই)। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বক্স অফিসে আনন্দ রীতিমতো সাফল্য পেয়েছিল। এই সিনেমাটি তৎকালীন সময় প্রায় দু’কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Paramita Ghosh

    আপনার লেখা বরাবরই প্রিয় ….তাই আর বেশি কিছুই বললাম না ….

  • Debashis Majumder

    Hinger Kochuri obolombone tairi Bengali movie Nishipodmer Hindi Remake Amar Prem e Rajesh Khanna nijei Bangali choritre obhinoy korechhilen. Sei movie o 50 years complete er mukhe. Tobe Anand Movie te Rajesh Khanna aar Ramesh Deo er acting chirokal mone rakhar moto. Aar arek Bangali kingbodonti Manna Dey r gaoa gaan Zindegi Kaisi Hai Paheli moner monikothay theme jabe chirokal. Thanks to the author for this wonderful article.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *