খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

এই লেখা ধান ভানতে শিবের গীত? হবেই কারণ তখন ধান ভানলেও চাল মিলত না। আজকের তারিখটি বাঙালির কাছে ভয়ার্ত স্মৃতির, দুর্ভিক্ষের, খাদ্য আন্দোলনের। এবং একইসঙ্গে অনাগত বিভীষিকার বিপদ ঘণ্টিও হতে পারে (২০২০ জুড়ে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রকোপে যে হারে বিশ্বজুড়ে মজুত খাদ্যভাণ্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, লকডাউনের দাপটে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে— তার ফলে খাদ্য সংকট অবশ্যম্ভাবী)! ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট তারিখটা চিহ্নিত হয়ে রয়েছে ‘খাদ্য-আন্দোলন শহিদ দিবস’ রূপে। সেই সময় আমার স্মৃতিতে জাগ্রত থাকার কথা নয়। এই নিবন্ধে সেই দিনটিকে স্মরণ করে লেখার সময়কাল আরও কয়েক বছর এগিয়ে নিয়ে যাই। এই নিবন্ধের ঘটনাক্রম ১৯৬৬ সালে, তখন আমার ষষ্ঠ শ্রেণি। ১৭ ফেব্রুয়ারি কনকনে শীত উপেক্ষা করে বসিরহাটের স্বরূপনগরে একদল ছাত্র থানায় গিয়েছিল খাদ্য আর কেরোসিনের দাবি জানাতে। পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে নুরুল ইসলাম সহ কয়েকজন। অন্যদিকে, ৪ মার্চ কৃষ্ণনগরে পুলিশের গুলিতে শহিদ হল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আনন্দ হাইত (পরদিন হরি বিশ্বাস, অর্জুন ঘোষ)। উত্তাল হয়ে উঠল সারাবাংলা, খাদ্যের ও কেরোসিনের দাবিতে অনড় জনগণ। মনে রাখতে হবে সূচনাপর্বে ছাত্রদের, দরিদ্র মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত এই দাবি আদায়ের আন্দোলন ছিল যেকোনও প্রকার রাজনৈতিক রংবর্জিত। কিন্তু এই মৃত্যু মিছিলের পরে বামপন্থীরা শামিল হয়েছিলেন।

কৃষ্ণনগরের ‘হোমশিখা’ পত্রিকার সম্পাদক কালীপ্রসাদ বসু কর্তৃক লিখিত এবং ১৪/০৪/১৯৬৬-তে প্রকাশিত

১৯৬৬ সাল— আমার বাল্যের সংক্ষিপ্ত শব্দ ভাঁড়ারে যুক্ত করল কয়েকটি ইংরেজি শব্দ— Famine, Levy, Cordon, Ration— অর্থগুলো নিজের মতো করে বুঝে নিলাম। ফেমিন মানে করলাম মৃত্যু, লেভি মানে কর আর রেশন মানে চাল-গম ছাড়াও বেকারির রুটি আর কেরোসিন। সেই প্রথম মুখস্থ করে নিলাম শহিদ আর কমরেড শব্দ দু’টো। বিশেষ অভিঘাত নিয়ে এল কর্ডনিং মানেই চাল ভরা সরু পাশবালিশ— যা মহিলারা সায়ার নীচে বেঁধে নিয়ে গর্ভবতী সেজে চাল পাচার করতেন, লোকাল ট্রেনের ছাদ-দেওয়াল ফাটিয়ে রেল পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে রাখতেন ‘ইসমালগারেরা’ (মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প স্মরণীয়)! এই কর্ডনিং-এর নামে চালওয়ালিদের সঙ্গে পুলিশের কাড়াকাড়ি, যা পরের দশক জুড়েও অব্যাহত ছিল!

মাইলো দানা

আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে যে তিনটে ফসল (ভুট্টা, মাইলো, শটি)-এর চিত্র যুক্ত করছি— সবার সঙ্গে জড়িত আছে ১৯৬৬ সাল। তখন চালের বাজারদর প্রতি কেজি দু’টাকা আশি পয়সা উঠেছে; যা জনগণেশের সামর্থ্যের বাইরে অথচ রেশনে পাওয়া যাচ্ছে পূর্ণবয়স্কদের জন্যে মাথাপিছু মাত্র ৫০০ গ্রাম চাল আর ১ কেজি গম। বাজারে সবজি পর্যন্ত অমিল ও অমূল্য হয়ে গেছে। সরকারি নিদান এল কাঁচকলা ও কানা বেগুন খাওয়ার! আহা, কাঁচকলা আয়রণ-সমৃদ্ধ খাদ্য— ভাতেই সেদ্ধ করে একটু নুন দিয়ে মেখে খেয়ে নিলেই হবে! আর কানা বেগুন তো অতুল্য— (পোকা লেগেছে কারণ বিষ দেওয়া হয়নি) সেদ্ধ করে বা পুড়িয়ে সামান্য তেল লবণ ও লঙ্কা সহযোগে ভাতে (চাল আক্রা, তাই ফেনাভাত) চটকে খাওয়া যাবে!

ভুট্টা দানা

১ কেজি গমে কি আর চলে? বাঙালির খাদ্যতালিকায় তাই ভাতের পরিবর্তে যুক্ত হল রুটি। যুক্ত হলো ভুট্টা — ‘ভুট্টার চাল’ বানিয়ে খিচুড়ি, ভুট্টার ছাতু গুলে খাওয়া, ভুট্টার ও গমের আটা মিশিয়ে রুটি বানিয়ে খাওয়া (না হলে শুধু ভুট্টার আটার রুটির ধার ফেটে যায় পুড়ে যায়)। কিছুদিন বাড়িতে বাজরার রুটিও খেতে হয়েছে। আমার সবথেকে খারাপ স্মৃতি মাইলো খাওয়া— আমেরিকা থেকে ত্রাণের মাইলো এল, যে মাইলো সেখানে শুয়োর-গরু-মুরগি ইত্যাদিদের খাওয়ানো হয় তাগড়াই বানাতে। (উত্তরবঙ্গে দেখেছি পশুখাদ্য হিসেবে মাইলো বিক্রি হতে) সেই মাইলোর কালচে তিতকুটে রুটিও আমাদের ক’দিন খেতে হয়েছিল, কিন্তু অনভ্যস্ত পেটে হজম না হওয়ায় ‘পেট খারাপ’ হয়ে গেলে ফিরতে হয়েছিল ফেনাভাতে (সেই থেকে আজও আমি মজে আছি ফেনাভাত আর পান্তাভাতে)।

ভুট্টা গাছ

ছেষট্টির খাদ্যসংকটেই বাঙালির নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মনে হয় আলুর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। আটার সঙ্গে সেদ্ধ আলু চটকে রুটি (ঘরে তেল বাড়ন্ত না হলে কখনও পরোটাও) বানানো হত। উদ্ভব হয়েছিল ‘আলুর ডাল’। আস্ত আলু সেদ্ধ করে চটকে নিতে হবে মিহি করে আর কড়াইয়ে সামান্য তেল, হলুদ, নুন আর ডালের ফোড়ন দিয়ে সাঁতলে নিলেই— আহা অমৃত! (আমি এখনও স্মৃতি সরাইনি, বাড়িতে অবরে-সবরে আলুর ডাল এখনও খাই)।

শটি গাছ ও মূল

গত শতকের ছয়ের দশক জুড়ে শিশু থেকে কিশোর বয়সিদের দুর্গতি ছিল সীমাহীন। সরকারি কর্ডনিং-এর দরুণ বর্ধমান থেকে নদিয়া সহ অন্য জেলাতে চাল আমদানি বন্ধ হলেও নদিয়া থেকে দুধ রপ্তানি বন্ধ হয়নি। ফলে জেলার শিশুরা দুধ থেকে বঞ্চিত থাকত। তাই সাবু জাল দিয়ে গুড় বা চিনির ছোঁয়া লাগিয়ে তাদের খাওয়ানো হত। আর ছিল ফ্যান। উত্তরবঙ্গে শিশুদের শটি গাছের মূল শিলে ঘষে ক্কাথ বের করে, জলে গুলে, ছেঁকে ফুটিয়ে খাওয়ানো হত।

অজিত পাণ্ডের কণ্ঠে ”ও নুরুলের মা…”

আন্তঃজেলা আমদানি-রপ্তানির ওপর সরকারি বিধিনিষেধের ফলে কেরোসিনের ছদ্ম ঘাটতি দেখা গিয়েছিল, যার জন্য ছাত্রসমাজের পড়াশোনার এবং গৃহকর্মেরও অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল। তাই খাদ্য ও কেরোসিনের দাবিতেই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। আমরা যারা তথাকথিত প্রবীণ, তারা বিশেষ কিছু Epidemic বা ‘মহামারি’র আভাস দেখেছি মাত্র। ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত Small Pox Eradication Program-এর অফিস দেখেছি আর ছোট্ট ছোট্ট নিডল বসানো ভ্যাক্সিন-ইঞ্জেক্টর হাতের ওপর বসিয়ে ঘুরিয়ে ‘টিকে’ নিতে হয়েছে। ১৯৬৬-তে যক্ষ্মা প্রতিরোধে TABC টিকা নিয়েছি। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত প্লেগের গুজরাতের সুরাতে প্রাদুর্ভাবের (মহামারি নয়) খবর পড়েছি। কিন্তু ‘অতিমারি’ দেখিনি। আমরা ভাবছিলাম মশারির মধ্যে আছি— হঠাৎই ২০১৯-এর ডিসেম্বর থেকে এক ‘অতিমারি’ (Pandemic) শুরু হয়ে গেল।

Foreign Ministry calls for united global effort against novel coronavirus -  Chinadaily.com.cn

বিশ্বের শাসকদের কাছেও ‘অতিমারি’ অপরিচিত— তারাও ‘কোভিড-১৯’ অতিমারির দাপটে সন্ত্রস্ত হয়ে সাপের মতোই জনগণের ওপর লকডাউনের ছোবল নামিয়ে আনল! অপরিকল্পিত লকডাউনের কারণে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য খাদ্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল যৎপরোনাস্তি শঙ্কিত। এই সময়কালে প্রতিটি মানুষ যেন মানুষে-মানুষে ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রেখেও একে-অপরের সঙ্গে ‘সামাজিক নৈকট্যে’ থাকেন! এই ‘অতিমারি’ যেন একবিংশ শতকে কোনও ভয়াবহ ‘দুর্ভিক্ষে’র কারণ না হয়!

সংযোজন:
যেসব খাদ্যের নামোল্লেখ করেছি, তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এরকম:

● মাইলো (Milo) — Millet, ইংরেজি নাম Broom corn (তাচ্ছিল্যবোধক ব্রুম বা ঝাঁটা কর্ন!)
● ভুট্টা বা মকাই মানে Sweet corn— Maize, বৈজ্ঞানিক নাম Zea mays.
● শটি বা Shoti— কন্দজ সাদা রঙের হলুদ জাতীয় এই গাছের বৈ. নাম Curcuma aromatica— বার্লির মতো রান্না করে শিশু বা রোগীদের খাওয়ানো হয়। দুধ চিনি দিয়ে পায়েস করেও খাওয়া হয়।
● আলু— ইংরেজীতে Potato, বৈ. নাম Solanum tuberosum.
● কাঁচকলা = Musa = green banana
● বেগুন— ইংরেজিতে Aubergine / Brinjal / Egg plant— বৈ. নাম Solanum melongena

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *