সুন্দরবনের বিবর্ণ গ্রামের ফিনিক্সদের সঙ্গে কিছুক্ষণ

ড. পারমিতা দাস 

এ বছর অক্টোবরের ৪ তারিখ সকাল আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম সুপ্রিয়দা আর আরও ১৬ জনের এক সমাজসেবী দলের সঙ্গে। আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনের জন্য এই দল ৬ মাস ধরে অনেককিছুই করছেন, মোবাইলে তার অনেক ছবি ও ভিডিয়ো দেখেছি এবং দলের কুশীলবদের বারবার কুর্নিশ করেছি। কিন্তু নিজের সেখানে পৌঁছনর সাহস হয়নি। এই দলের একজন প্রধান উদ্যোক্তা শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুব্রত দাশগুপ্তর উৎসাহে অবশেষে ৪ তারিখ সকাল আটটার সময় মুখে করোনা থেকে বাঁচবার নিরাপত্তার কাপড় বেঁধে আমাদের দলের গাড়িতে উঠে পড়লাম।

খুব শীঘ্রই কলকাতার সীমানা অতিক্রম করে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল। ইট কাঠ পাথরের কাঠামোর বাইরে একটু সবুজের ছোঁয়া পেতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। সকাল সকাল বেরিয়েছি। তাই পথে বনলতা সেন রোডে জলখাবারের জন্য আমরা নামলাম সকাল ন’টা নাগাদ।  সেখানে এক ধরনের পরোটা খেলাম— পেটাই পরোটা বা পেটা পরোটা আর মটর ডাল। শুনলাম, ওজন দরে বিক্রি হয়। বিরাট তাওয়ায় একটা বড় চতুর্ভুজ আকৃতির পরোটা বানিয়ে, ভাজা হয়ে গেলে, দু’বার ভাঁজ করে, ঝাঁকিয়ে ঝুড়িতে রেখে দেয়। প্রথমে দেখলে মনে হয় পরোটা ছিঁড়ে রাখা হয়েছে। যাই হোক, ভারী ভোজন করে আবার আমরা রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যস্থল হাসনাবাদের বেলিয়াডাঙার উদ্দেশ্যে।

আরও পড়ুন: রাধাদামোদর মন্দির, মাংলই (পাঁশকুড়া থানা, মেদিনীপুর)

সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেলাম। সেদিন আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দু’শো নতুন শাড়ি দেবার ব্যবস্থা হয়েছিল। গিয়েই দেখলাম, কিছু অল্প বয়সি ছেলেরা গ্রামের মহিলাদের জড়ো করে রেখেছে। পরে জানলাম, এরা ইছাপুর বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য তাদের নেতৃত্বে আছেন পার্থদা। বুঝলাম, সুন্দরবনের মানুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের সেতু এরা। এই সেতু ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারতাম না বোধহয়, বিশেষ করে পুকুর সংস্কারের মতো দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ কাজ। গ্রামের মেয়েরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমরা প্রত্যেক মহিলাকে একটি করে নতুন শাড়ি দিলাম। করোনার প্রকোপে এবার আর পুরনো শাড়ি দেওয়া হয়নি। আর অনেকে শাড়ির জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে কিনা জানি না। কারণ আমাদের এগিয়ে যেতে হল টিয়ামারি, ঘেরিয়াপাড়া গ্রামের উদ্দেশ্যে। সেদিন বনগাঁ থেকে হাঁসের বাচ্চা এনে দেওয়া হয়েছিল কয়েকটি পরিবারকে। আমরা সেই বাড়িগুলি দেখতে রওনা দিলাম। কিছুদূর গাড়িতে যাবার পর হাঁটা শুরু করতে হল, কারণ গ্রামের ভিতরে সরু রাস্তায় গাড়ি যাবে না। সবাই বলল, আধ ঘণ্টার পথ। আমাদের মনে হল এমন কিছু না, তাই খুব সহজেই রাজি হয়ে হাঁটা শুরু করে দিলাম।

ফাইল চিত্র

ভিতরে রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। দু-পাশে অনেক পাকা বাড়ি আছে। কিন্তু পাকা বাড়ি হলেও জানলা দরজা আমাদের শহরের বাড়ি ঘরের মতো না। কাঠ বা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আটকানো। পাকা বাড়ি মানেই জীবনযাত্রায় সমৃদ্ধি তা নয়। এখানে গরু পোষার চল খুব কম ঘরে। বেশিরভাগ হাস-মুরগির খামার নয় মাছের ভেরি। ছোট বড় সব রকমের ভেরি আছে। বাজার ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে গ্রামের মধ্যে মাংসের দোকান দেখা যায়। ইলেকট্রিসিটি গ্রামে পৌঁছেছে। কিন্তু খুব কম বাড়িতেই পাখা চলার আওয়াজ পেলাম। তাই মনে হয়, সব বাড়ি ইলেকট্রিসিটির সুবিধা ভোগ করতে পারে না।

কিছুক্ষণ পর দু-পাশে গ্রামের সার সার বাড়ি শেষ হয়ে গেল। মাঝখানে সরু ইটের তৈরি কিন্তু উঁচু-নিচু রাস্তা আর দু-দিকে ধানের ক্ষেত আর নয়তো ভেরি। পথ চলতে চলতে শুনলাম, এই সব অঞ্চল জলমগ্ন ছিল দু-মাস আগেও। বুঝালাম, কেন গাড়ি আসতে পারেনি এখানে। গ্রামের লোকদের চলার মাধ্যম প্রধানত পা। মাঝেমাঝে অল্প বয়সি ছেলেরা বাইক নিয়ে যাচ্ছে। দু-একজন মহিলাকে সাইকেলে দেখলাম। সরু রাস্তার দুই দিকে যতদূর দেখা যায়, ধানের ক্ষেত আর নীল আকাশ নেমে এসেছে ক্ষেতের ধারে। এত কাছ থেকে এত সুন্দর দৃশ্য গ্রামের আমি দেখিনি আগে। দু-দিকে নয় সবুজ ধানের ক্ষেত, নয় ভেরির জল— এছাড়া কিছুই দেখায় যায় না। পথের ধারে বাঁশের মাচা ভেরি পাহারা দেবার জন্য রাখা হয়েছে। সেই অপরূপ দৃশ্য দেখে প্রখর রোদ আর আর্দ্র আবহাওয়ায় হাঁটবার কষ্ট ভুলে গেলাম। এইভাবে প্রায় ৪৫ মিনিট হাঁটবার পর আবার গ্রামের বাড়ি দেখা গেল। এবার আমরা একটা বাড়ির আঙিনাতে গেলাম। সেখানে একটা কাঠের খাঁচায় ৯টা হাঁসের বাচ্চা খেলা করছে। এই খাঁচাও ওদের বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে দেখলাম একটা মুরগিও আছে। সুপ্রিয়দা একটা হাঁসকে যত্নসহকারে বার করে এনে দেখালেন। এই হাঁসের বাচ্চাগুলি ১৪ দিনের মাত্র। তাও বনগাঁ থেকে আনতে আনতে অনেকেই মারা গেছে। তাই প্রতি পরিবারকে ৯টি করে দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা দরকার, প্রত্যেক পরিবার মানে প্রত্যেকটা বাড়ি নয়। ইছামতী বিজ্ঞান মঞ্চের ছেলেরা এই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু গরিব পরিবারকে চিহ্নিত করেছে। তাঁদেরকে হাঁসের ছানা দেওয়া হল যাতে তারা হাঁসের ডিম বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করতে পারে। সুপ্রিয়দার থেকে জানলাম, বছরে তিনশো ডিম দেবে এক একটি হাঁস আর এই হাঁসগুলি জল ছাড়াও বেঁচে থাকবে।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মীপাড়ায়, ১৯৬৪-র একদিন

ফাইল চিত্র

আমরা আর কিছুটা হাঁটলাম। এবার একটা মোড়ে এসে ডান দিকে পথ বেঁকে গেছে, যেখানে আর ইট পাতা রাস্তা নেই। এক মাস আগে এই অঞ্চল জলে ডুবেছিল। মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, আমাদের জলে পা ডুবিয়ে যেতে হচ্ছে না মানে এটাকেই একটা ভালো রাস্তা ভাবতে হবে। এই অঞ্চলের নাম ঘেরিয়াপাড়া। পথে যেতে যেতে গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে দেখা হল। তারা বলল, ২০০৯ সালে আয়লায় গ্রাম খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন ইটের রাস্তা ভেঙে গিয়েছিল আর ইট তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের আশা ছিল যে, নতুন রাস্তা করে দেওয়া হবে। খুব অবাক হলাম মানুষের নির্মমতার পরিচয় পেয়ে। শুধুমাত্র ভালোভাবে হাঁটার রাস্তাটুকুও তাদের নেই। শুকনো কাঁদায় রাস্তা মাখামাখি। বোঝা যায়, একটু বৃষ্টিতেই রাস্তার কী অবস্থা হয়! এই অঞ্চলের মানুষরা সবচেয়ে দরিদ্র। এখানে তিনটি পরিবারকে হাঁসের ছানা দেওয়া হয়েছে। এরা হাঁসের ছানা পেয়ে খুশি। কিন্তু এরা ভালো জানে না এদের কীভাবে লালন-পালন করতে হবে। এদেরকে তা শিখিয়ে দেবার জন্য ইছামতী বিজ্ঞান কেন্দ্রের কিছু যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একটি পরিবারের সঙ্গে আলাপ করলাম, যারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে তামিলনাড়ুতে ছিল করোনা আবহাওয়ার আগে। চারটি সন্তান। স্বামী মিস্ত্রি ও স্ত্রী কাপড়ের কাজ করত। তারা ফিরে এসে বিকল্প জীবিকা কিছু পাচ্ছিল না। হাঁসের বাচ্চা পেয়ে তারা খুশি। এদের কাছে পৌঁছতে মোট এক ঘণ্টা লাগল। এরপর একই পথ দিয়ে ফেরার পালা। আমরা একটা পুকুর পেরিয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে লক্ষ করলাম পুকুরের ওপারে একতলা বাড়ি, খুব একটা ভালো অবস্থার না। সেই বাড়িটি হল ঘেরিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু বিদ্যালয়ে যাবার পথ কই? আমরা দেখলাম, জলের মধ্যে দিয়ে একটা বাঁশ পাতা, তার ওপরে আর একটা বাঁশ। মাঝে মাঝে তিন চারটে বাঁশ দিয়ে নিচের আর ওপরের বাঁশকে ধরে রাখা হয়েছে। দেখে খুব বিস্মিত হলাম আর শিউরে উঠলাম ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয় যাবার সংগ্রামের কথা ভেবে। এই অঞ্চলে ইলেকট্রিসিটির তার পৌঁছয়নি। এক ঘণ্টার এই রাস্তায় কোনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার, দোকান, ওষুধের দোকান কিছুই দেখলাম না। নিশ্চিন্তে হাঁটার অধিকারটুকুও যাদের নেই, তাদের মধ্যে পড়াশোনার উৎসাহ কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, আমি শিক্ষক হয়েও তা জানি না! তাৎক্ষণিক কোনও প্রয়োজন মেটানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। চার চাকার কোনও যান ঢোকবার ব্যবস্থা নেই। আমরা যেখানে আমাদের চার চাকার গাড়ি ছেড়ে এসেছি, সেখান থেকে এই ঘেরিয়াপাড়া গ্রামের দূরত্ব এক ঘণ্টা। অসুস্থ অবস্থায় কি এক ঘণ্টা হাঁটা সম্ভব, নাকি বাইকের পিঠে চড়া সম্ভব? ঘেরিয়াপাড়া গ্রাম যেন সেই অনাধুনিক জীবনে পড়ে আছে। ফেরার পথে কিছু মহিলা দুঃখে জানাল, তাদের হাঁসের ছানা দেওয়া হয়নি বলে। বুঝলাম, মাসের পর মাস আমাদের প্রতিষ্ঠান এত কাজ করেছে, কিন্তু তাতে এই বিপুল জনসংখ্যার কিয়দংশের উপকার হয়েছে। সবার কাছে আমরা পৌঁছতে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা আমাদের থেকেই যাবে, কারণ আমরা সরকারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারব না। 

সেই এক ঘণ্টার পথ আবার পেরিয়ে এলাম ৪৫ মিনিটে। বেশ কষ্ট হল। কিন্তু আমার ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের কষ্ট ওদের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম। যাবার সময় সুন্দর প্রকৃতিকে দেখে মনে হচ্ছিল সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ‘কোন্‌ দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল…’ কিন্তু ফিরতে ফিরতে মনে হল যেখানে এক মুঠো মিড-ডে মিলের আশায় রাস্তাহীন পথে বাঁশ পেরিয়ে জলে পা ডুবিয়ে বাচ্চারা স্কুলে যায়, যেখানে ইটের রাস্তা ভেঙে আর রাস্তা তৈরি হয় না, নতুন রাস্তার আশায় বছরের পর বছর চলে যায়, যে অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বারবার এসে তাণ্ডব চালায়, মানুষের সংগ্রামের শেষ হয় না, যেখানে চিকিৎসা পৌঁছনর উপায় নেই, তবু মানুষ বাঁচে, বাঁচতে চায় সে আমাদের সুন্দরবন, সে আমাদেরই দেশের অংশ। খবরের কাগজে শহরের মানুষের আত্মহত্যার খবর প্রায় আসে। সেখানে সুন্দরবনের মানুষের নাম খুবই কম উঠে আসে। সুন্দরবন খবরের কাগজে আসে যখন কোনও ঝড়ের তাণ্ডবে মানুষ জীবন হারায় আর বেঁচে থাকা মানুষ শেষ কড়ি বরগাটুকু হারায়, যখন জীবনের সন্ধানে মধু খুঁজতে যাওয়া বা কাঠ কাটতে যাওয়া মানুষ বাঘের পেটে যায়। জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি এদের থেকেই বোধহয় পাওয়া যায়।

ফাইল চিত্র

কিছুটা তৃপ্তি আর কিছুটা নিজের সীমাবদ্ধতার অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে এলাম। চোখের সামনে স্মৃতি হয়ে রইল ঘেরিয়াপাড়া স্কুলে যাবার রাস্তা আর শাড়ি নেবার লাইনে দাঁড়িয়ে শাড়ি না পাওয়া সেই মহিলাদের মুখ। মনে পড়ল ঘেরিয়াপাড়া গ্রামের ইটবিহীন কাদামাখা রাস্তা আর হাঁসের ছানা পেল না এমন মহিলাদের মুখ, আর তাঁদের অনুরোধ। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অভাব-অভিযোগ এক মুহূর্তেই উবে গেল।

কভার ছবিটি সুন্দরবনের এক গ্রামের স্কেচ, ১৮৩৯-এ ফ্রেডেরিক পিটার লেয়ার্ড অঙ্কিত

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *