ঝাড়খণ্ডের আটত্রিশ পঞ্চায়েত জুড়ে সিটি চন্দনকেয়ারির ওঝাদের সাবেকি দুর্গাপুজো

Chandanceyari Cover

রীনা ভৌমিক

“বাজলো তোমার আলোর বেণু/ মাতলো রে ভুবন”… ভুবন যে মেতেছে তার আযান দিচ্ছে বাতাস। একটু চোখ মেললেই বৃষ্টিধোয়া সবুজ গাছপালা আর লাল মাটির গল্পস্বল্প নয়নসুখ মন্তাজ! বাদল সহিস তাঁর ছোট্ট নাতনির সঙ্গে মশকরায় মশগুল, ”টিপিক টাপাক জলে/ চিঁটা মাটি গল্যে/ আমি হড়কে হ্যলি গ’/ আমি পড়ে হ্যলি গ’/ তোকে ভাল্যে ভাল্যে।” অর্থাৎ টিপটাপ জল পড়ে চিঁটা মাটি গলছে। ‘ভাল্যে’ মানে দেখা বা তাকানো। ‘হড়কে হ্যলি’ মানে পিছলে গেলাম। আমি তোর দিকে তাকাতে তাকাতে পিছলে পড়ে গেলাম। শিশু নাতনি কিছু না বুঝেই ‘হি-হি’ করে উঠোন মাতাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ অকারণে চরাচরে জাগছে খুশির হিন্দোল!

আরও পড়ুন: ছোটবেলার পুজো দেখতে যেতাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও চণ্ডীপুরে

চন্দনকেয়ারির সাবেকি পুজোর কথা জানতে হলে একটু পিছনে যেতে হবে। তখন চন্দনকেয়ারি মানভূমের অংশ ছিল। বলছিলেন, চন্দনকেয়ারির বিখ্যাত জমিদার বংশের সন্তান সুভাষ চন্দ্র ঝা। এবং তাঁর সঙ্গে তাঁর আর এক ভাইকেও পেয়েছি। সুশান্ত কুমার ঝা। আমরা কথা বলছিলাম ‘ওঝা টোলা’য় সুশান্তদার বাড়িতে। এরিয়াটা জমিদার বংশজদের বাসস্থান। সুভাষদা বলে চলেছেন, যেখানেই মানুষ সেখানেই ধর্মের আটচালা। ওঝা বা ঝা ঘর চার খুঁটায়। ১) রামজীবন ওঝা, ২) ভুবনমোহন ওঝা, ৩) মধূসুদন ওঝা এবং ৪) সুধাকর ওঝা। ১২৭৩ থেকে ৭৫ বাড়িতেই পুজো করেন রামজীবন ওঝা। তারপর এখন যেখানে হয়, সেখানে শিফ্ট করা হয়। পুজোটা সর্ব এজমালি ছিল ওঝা বংশের। রামজীবন ওঝা সঞ্চালন করতেন পুজো। এই মুহূর্তে সর্বজনীন বলা হলেও পুজোর ব্যয়ের সিংহভাগ ওঝারাই বহন করেন আজও।

পুজো প্রচণ্ড নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় এই যে, ওনারা মৈথিলী ব্রাহ্মণ হলেও নিজেদের বাঙালি পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। বাংলায় কথা বলেন। বিয়ে-শাদি এবং পুজো সম্পূর্ণ বাংলা পাঁজি মেনে করেন। সুশান্তদা নবপত্রিকার ব্যাখ্যা করছিলেন, “কলাগাছ, মানপাতা, কচু, হরিদ্রা, ধান্য, বিল্ব (এক বৃন্তে জোড়া বেল), জয়ন্তী ও অশোক। বিজ্ঞানে শরীরের আষ্ট অঙ্গ ও ব্রেন। এই নিয়ে নবপত্রিকায় মাকে আবাহন করা। পুজোর সাতদিন আগে ও বোধনের দিন যাঁরা পুজোয় বসেন, নান্দীমুখ করে নিজেদের শোধন করেন।

আরও পড়ুন: দুর্গা দশমীর শেষে আরেক দুর্গাপুজো

নীল জামা সুশান্ত ওঝা, পাশে সুভাষ চন্দ্র ওঝা

সপ্তমীতে নবপত্রিকা পালকিতে আনা হয়। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে বিধিবৎ পাক অন্নের সঙ্গে পাঁঠা বলি হয়। পাঁঠার কলেজা ও ফেফড়া ঘি নুন হলুদ দিয়ে ভেজে চামুণ্ডাকে অর্পণ করা হয়। সন্ধিপুজোর সময় চাল-কুমড়ো বলিও হয়। দশমীতে বিদায়ের আগে মাকে দ‌ই, চিঁড়ে ও চামুণ্ডার জন্য চ্যাং বা ল্যাটা মাছ পোড়া ভোগ দেবার প্রচলন আছে।

পাঁঠা বলির কথা উঠতে সুভাষদা বলেন, “দেবীমাহাত্ম্যের অধ্যায় থেকে জানা যায় শুম্ভ নিশুম্ভের বধ করতে দেবী দুর্গা নিজের দেহ থেকে মাতৃকাগণের সৃষ্টি করেন। কালীকে মাতৃকা বলে উল্লেখ আছে পুরাণে। তিনি রক্তবীজ দৈত্যের রক্তপান করে চামুণ্ডা নাম পান। মনে করা হয় বলির রক্ত দিয়ে চামুণ্ডাকে সন্তুষ্ট করা হয়।”

নবপত্রিকা বিসর্জনকে বারি বিসর্জনও বলা হয়। নবপত্রিকা বিসর্জনের সময় এক বিরল দৃশ্যে প্রতিবার‌ই আমার চোখ আটকে যায়। নবপত্রিকা পালকিতে নিয়ে পুরোহিত দল যখন শান্তিজল ছিটাতে ছিটাতে বিসর্জন ঘাটের দিকে এগোন, পথের ধুলোয় আবালবৃদ্ধবনিতা সাষ্টাঙ্গ উপুড় হয়ে পড়েন। পুরোহিতেরা তাদের শরীর মাড়িয়ে গন্তব্যে এগোন। সুশান্তদাকে জিজ্ঞাসা করায় উনি বলেন, এটা মানুষের মায়ের প্রতি অটুট আস্থার প্রতীক। সুভাষদা খেই ধরেন, “এখানের মানুষেরা মনে করেন যে তাদের শরীরের ওপর দিয়ে মায়ের গমন হলে মা তাদের আরোগ্য প্রদান করবেন।”

মূর্তি বিসর্জনের আগে মণ্ডপের এককোণে স্বর্ণবণিকেরা তাঁদের তরাজু বা ওজনদাঁড়ি দিয়ে ধুলো কাঁকড় পাথর ওজন করে সগুন আঁকেন। বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ বাটি গেলাস বা বিভিন্ন পাত্রে জ্যান্ত চ্যাং বা ল্যাটা মাছ নিয়ে বসে থাকেন। বিসর্জন-ফেরতা মানুষ সেই মাছ দেখে তাদের ষোলোআনা দান করে ‘শুভ শুভ’ বলে ঘরে ফেরেন। বাতাসে কান্না মোচড়ায়, ‘আসছে বছর আবার হবে’!

বোধন থেকে বিসর্জন জুড়ে তুলকালাম। মণ্ডপের ভেতর নিষ্ঠা ও আস্থার মেজাজ তো বাইরে বালক ভোজন, ধুনুচি নাচ, যাত্রাপালার গুলজারে চন্দনকেয়ারির পথেঘাটে কত্তো কী সংযোজন। আটত্রিশ পঞ্চায়েত জুড়ে সিটি চন্দনকেয়ারি আশপাশের কত মানুষের পদধূলিতে পূণ্যধাম হয়ে ওঠে, তা বলাই বাহুল্য। সুভাষদা জানান, ”এবারের পুজো জুড়লে ১৫৪তম পুজো হচ্ছে এখানে। সকলের নিমন্ত্রণ র‌ইল।”

মনটা কেমন করে উঠল। মহামারির প্রকোপে ঠাকুরের কদকাঠি ছোট করা হচ্ছে সর্বত্র। মেদবিহীন পুজোর ফরমান জারি হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। ঔচিত্যও আছে। ‘জান হ্যায় তো জাহান হ্যায়’। ভালো থাকুন বন্ধুরা। এবছর না হয় রয়ে সয়ে পুজো উপভোগ করা যাক। কিছু আনন্দ শিকেয় তোলা থাক আসছে বছরের জন্য!

ছবি রিঙ্কি মেহতাসুভাষ চন্দ্র ওঝা

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *