বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

টানা হাসপাতালে মৃত্যুপরোয়ানা লিখে চলেছি। মাঝেমাঝে নিজেকে কোনও উপন্যাস চরিত্র মনে হয়। ঠিক যেন লিও তলস্তয়ের উপন্যাসে নেপোলিয়নের ফৌজের সামনে যুদ্ধরত কখনও অ্যান্ড্রু, কখনও বা পিয়ারে। এই করোনাকালে লড়তে থাকা ডাক্তারবাবুদের অনেকেই ইতিমধ্যে শহিদ হয়েছেন। তাঁদের কেউ-কেউ আমার বিশেষ পরিচিত। সেই কারণেই আমার পরিবারকে ডেকে এনে বোঝাই। আমি না থাকলে কোথায় কী রাখা আছে। তারপর খুঁজতে থাকি উপন্যাসচরিত্রগুলোর মধ্যে। ভেসে ওঠে কিছু চেনা সহযোদ্ধার মুখ। তাঁরা বিশ্ব সাহিত্য ইতিহাসে নিজেদের অমর করে তুলেছেন। আজ বলব এমনই চার ডাক্তারবাবুর কথা।

আরও পড়ুন: হাতুড়ি

অতিমারির অবসাদ ঘিরে ধরলেই শরণাপন্ন হই আমার বই-আলমারির। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এ একধরনের বিবলিওথেরাপি। কিছু কিছু বই আছে যা পড়লে মনে হবে, এই যে গঙ্গায় ভেসে আসা মৃতদেহ, ইছামতীপারে জ্বলতে থাকা গণচিতা, এইসব দৃশ্যকল্প সুপ্রাচীন। ঠিক যেমন ১৭২২ সালে প্রকাশিত ড্যানিয়েল ড্যুফোর সৃষ্টি ‘এ জার্নাল অফ দ্য প্লেগ ইয়ার’ উপন্যাসটি। ১৬৬৫ থেকে ১৬৬৬ সালে ব্রিটেনে আছড়ে পড়া প্লেগ মহামারিতে পাওয়া যাবে ‘কোয়ারেন্টাইন’ হবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সন্ধান মিলবে স্বজনহারার বেদনা। তবু আমি আজ বলব ১৯৪৭-এ কামুর ‘প্লেগ’ উপন্যাসের চিকিৎসক ডাঃ বার্নার্ড রিওর কথা। আলজেরিয়ার শহরে একা রিও লড়ে চলেছেন এক মারণরোগের সঙ্গে। তার পরিবার অবিন্যস্ত হয়ে পড়ছে। স্ত্রী অসুস্থ। তবু রিও হারবেন না। তার লড়াই শুধু এই রোগের বিরুদ্ধে নেই। এই রোগকে ঘিরে মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও। সেই লড়াই আজও চলছে। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে দেখি তাকে, কখনও নির্জন ব্লকে স্থানীয় অবুঝ মানুষকে বোঝাতে দেখি, কখনও শহরের আইসিইউ-তে আপাদমস্তক ঢাকা রিও-কে দেখতে পাই খাওয়াদাওয়া ত্যাগ করে কীভাবে রোগীদের সেবা করে চলেছেন।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের গ্রাম থেকে কলকাতার পিজি-তে পৌঁছনো ডাক্তার শ্রীকান্ত চ্যাটার্জীর কাহিনি

ডাক্তার রিওর ঠিক অপরপ্রান্তে রয়েছেন আরেক ডাক্তারবাবু। তিনি একসময় সেনাবাহিনীর চিকিৎসক ছিলেন। এই ডাক্তারের লড়াই কোনও জীবাণু বা ভাইরাসঘটিত অতিমারির বিরুদ্ধে নয়। তিনি লড়ছেন তাঁর নিজের ভিতরের দোলাচলের সঙ্গে। তাঁর আশপাশে বদলে যাওয়া সমাজ ও সামন্ততন্ত্র ঠিক যেন তার বদলে যাওয়া নিজস্ব ব্যক্তিজীবন। তাঁর হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা লারার পরিণতি নিয়ে নিজের ভিতর চলতে থাকা সেই আশঙ্কা কোয়ারেন্টাইনে বন্দি এক ডাক্তারবাবুর ছেড়ে আসা পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তার থেকে কোনও অংশে কম নয়। কাহিনিতে ডাক্তার জিভাগো আসলে বরিস পাস্তেরনেকের অন্তঃসলীল অবচেতন। তার ব্যক্তিগত জীবনে পার্জের শোষণ বিন্দুবিন্দু জীবন্ত হয়ে উঠেছে জিভাগোর শরীরে। কিন্তু আমার দেখা জিভাগো মানুষটির কাছে মিশা বা নিকির কাছে ফিরে যাবার উপায়ই নেই। লারা আর ইউরি জিভাগোর অজ্ঞাত প্রেমকাহিনির মতো তার নিজের জীবনকাহিনিও একদিন হারিয়ে যাবে ভেন্টিলেটরের বিপবিপ শব্দে।

আরও পড়ুন: নেগেটিভ যখন পজেটিভ

কিন্তু কখনও কখনও কোনও কোনও ডাক্তারবাবু শতপ্রতিকূলতা সত্ত্বেও জিতে যান লড়াইয়ে। এবার আসি তেমনই এক ডাক্তারবাবুর কথায়। শহরের বিলাসবহুল স্পা-এর জলে যে সংক্রমণকারী জীবাণু থাকতে পারে, একথা প্রথমে মানতে চাননি কেউ। কিন্তু সেই চিকিৎসক এতে দমে যাননি। তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে। শেষ অবধি ডাক্তার থমাস স্টকম্যানের কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। ১৮৮২ সালে বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের নাটক ‘এন এনিমি অফ দ্য পিপল’-এর এই কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাঃ স্টকম্যানের কথা হয়তো অনেক বাঙালিই জানবেন না। সেই কারণেই টেনে আনি তারই এক সুযোগ্য এক উত্তরসূরির প্রসঙ্গে চণ্ডীপুর গ্রামের ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের চরণামৃতে ভয়ংকর অতিমারির জীবাণুর সন্ধান পেলেন ডাক্তারবাবু। ডাঃ অশোক গুপ্ত। তার গবেষণাপত্র একইসঙ্গে আঘাত করল ধর্মীয় ভাবাবেগ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনকে। বিরোধিতা শুরু হল নিজের রাজনীতিবিদ ভাইয়ের কাছ থেকেই। ডাক্তারবাবু তাঁর চাকরি হারালেন। তাঁর মেয়ে স্কুলশিক্ষিকার পদ হারালেন। তাদের বাড়ি ছেড়ে দেবার নোটিশ দেওয়া হল। তবু ডাক্তারবাবু দমে গেলেন না। মানুষের জন্য তাঁর লড়াই চালিয়ে গেলেন। তারপর শেষে ডাক্তারবাবু জিতে গেলেন। এই ‘গণশত্রু’ ছবিটি ইবসেনের স্টকম্যান চরিত্রর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আজ বারবার নিষেধের পরেও রাজপথে রোডশো মিছিল হয়। কুম্ভমেলা হয়। মানুষকে করোনামাতার আর আল্লাহ্‌তালার দোহাই দেওয়া হয়। সেই ভয়ানক ভূমিধসের মাঝে দাঁড়িয়ে একদল ডাক্তারবাবুরা একা একা লড়ছেন। তাঁদের নানান মাধ্যম তুলোধোনা করলেও তাঁরা দমে যাচ্ছেন না। আর ঠিক যেভাবে ডাঃ অশোক গুপ্তর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল জেগে ওঠা তরুণ সমাজ, ঠিক তেমনই এই অতিমারির মধ্যেও একদল তরতাজা যুবক-যুবতী প্রাণের তোয়াক্কা না করে কখনো অক্সিজেন সিলিন্ডার বা কখনো ওষুধপথ্য সহযোগে সাথ দিচ্ছেন ডাক্তারবাবুদের।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

শেষমেশ বাজিতপুর যাবার পথে গাওদিয়া গ্রামে এসে নোঙর করি। হারু ঘোষ সেদিন তার আদরের মেয়ে মতির জন্য পাত্র দেখতে যাচ্ছিল। খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের নীচে ঠেস দিয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশের দেবতা তার কাঁচাপাকা চুল পুড়িয়ে ঝলসিয়ে দিল। সে নিজে কিছু টের পেল না। কিন্তু হারু ঘোষের অপমৃত্যুর সেই ছবি চিরকালের জন্য বাঙ্ময় হয়ে রয়ে গেল শশী ডাক্তারের চোখে। ‘‘হারুর মাথার কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পেল না।”

আরও পড়ুন: প্রতিজ্ঞা করি, আগামীকাল আবার চেষ্টা করব পৃথিবীকে আরও একটু সুস্থ করে তোলার

উপরোক্ত ডাক্তারবাবুদের তুলনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র শশী ডাক্তার একদম স্বতন্ত্র। কেন এই কথা বলছি? কারণ সে যেন অনেক বেশি মাটির তৈরি। বর্ষার জলে সে গলে যায়, রোদের প্রখর তেজে তার শরীরে ফাটল ধরে, আর রঙের প্রলেপ পড়লে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। তার মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব ডাক্তার জিভাগোর মতো বাইরে প্রকাশ পায় না। সে শুধু মনে মনে কুসুমের কথা ভাবে। গাওদিয়া গ্রামের কথা ভাবে। কষ্ট পায়। কিন্তু ছেড়ে যেতে পারে না। মায়ার টান। এই অতিমারিতে সকলকেই আর আশপাশে দেখি। কিন্তু শশী ডাক্তারের উপস্থিতি যেন খুব বেশি করে অনুভব করতে পারি। তার সেই উপস্থিতি এই কঠোর মুহূর্তে আমার সামনে যেন এক কাচের স্বর্গ গড়ে তোলে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *