Tryst with Destiny-র চার গল্প একসুতোয় মালা গেঁথে ভালোলাগা তৈরি করে

অরিন্দম পাত্র

সোনি লিভ বরাবরই ভালো কন্টেন্ট-নির্ভর সিরিজ উপহার দেয় কিন্তু জাঁকজমকহীনভাবে। নেটফ্লিক্স-এর আন্তর্জাতিক মানের প্রজেক্ট, প্রাইমের জনপ্রিয়তা বা ডিজনি-হটস্টারের কৌলিন্য কোনোটাই সোনি লিভ-এর নেই, ছিলও না কখনও। কিন্তু উলুবনে থুড়ি ভারতীয় দর্শকমনে মুক্তো ছড়ানোর কাজটা সোনি লিভ খুব খারাপ করে না। তারই সাম্প্রতিকতম প্রমাণ চারটি গল্পের এই অ্যান্থোলজি সিরিজ ‘Tryst with Destiny’.

আরও পড়ুন: প্রথম সিজনের চেয়ে পিছিয়েই থাকবে ‘স্পেশাল অপ্স ১.৫’

Tryst With Destiny review: SonyLIV series is a showcase of acting talent

সাধারণত বিভিন্ন পরিচালকের আলাদা আলাদা কাজের সমাহার আমরা দেখতে পাই অ্যান্থলজি সিরিজগুলিতে। এক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব একাই পালন করেছেন প্রশান্ত নায়ার, চারটি গল্পের লেখকও তিনিই। কিন্তু প্রতিটি গল্পের মধ্যেই একটি যোগসূত্র রেখে দিয়েছেন পরিচালক। তাই আপাতদৃষ্টিতে আলাদা প্রেক্ষাপটের গল্প হলেও চতুর্থ এপিসোডের শেষে এসে সবক’টি গল্পই একসূত্রে মিলিত হয়ে যায়। মূলত এই কারণেই সিরিজটি দেখে খুব ভালো লেগেছে আমার। এই সিরিজের চিত্রনাট্য রচনা (যা আন্তর্জাতিক Tribeca Film Festival-এ সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার এনে দেয় প্রডাকশন টিমকে ২০২০ সালে) ও অভিনয় মূলত আমার কাছে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছে।

সিরিজের চারটি গল্প ‘Fair & Fine’, ‘The River’, ‘One BHK’ & ‘The beast within’ মূলত শুধুমাত্র মানব চরিত্রের কিছু দোষ বা ভুলত্রুটির উপরেই আধারিত নয়, বরং একটি বৃহদাকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে আমাদের দেশের কিছু কিছু ভেদাভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের দিকে আলোকপাত করে যেগুলি থেকে বেরিয়ে আসার দৃঢ় অঙ্গীকার আমাদের পূর্বপুরুষ করেছিলেন সেই ১৯৪৭ সালেই। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সেই বিখ্যাত স্পিচ ‘Tryst with Destiny’… সেই নাম ধার করেই এই সিরিজটিরও নামাঙ্কন করেছেন পরিচালক প্রশান্ত নায়ার।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ ২২ মাস পর ফের দুবাইয়ে শো করলেন অরিজিৎ সিং

Tryst With Destiny actor Vineet Singh says Mukkabaaz made up for 10 years  of struggles - Binge Watch News

১. প্রথম গল্পে রয়েছে এক কোটিপতি ব্যাবসায়ীর কাহিনি, যিনি জীবনে কোন কিছু থেকেই বঞ্চিত নন। তবে একটি বস্তু, যা তিনি নিজেও কখনও খরিদ করতে পারবেন না, তা হল গায়ের রং। শেষমেশ নিজের পরের প্রজন্মের Destiny পাল্টাতে এমন কী করলেন তিনি? এও যেন এক ঔপনিবেশবাদের কাহিনি। সাদা ইংরেজ ঠিক যেরকম কালো ভারতীয়দের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, এখানেও যেন তারই এক উল্টো প্রতিচ্ছবি নজরে পড়বে সবার।

২. দ্বিতীয় গল্পটি সবচাইতে রিয়ালিস্টিক ও আমাদের মনে দাগ কেটে যায়। এক প্রান্তিক দলিত দম্পতির আখ্যান তুলে ধরেছেন ডিরেক্টর এই গল্পের মাধ্যমে। স্বাধীন ভারতেও যে দম্পতি প্রতিদিন পরাধীনতা ও নিষ্পেষণের শিকার। সাহসী এই গল্পটির স্টোরিলাইন হয়তো খুব ক্লিশে লাগবে কিন্তু সিনেম্যাটিক অ্যাঙ্গল থেকে দেখলে সবচেয়ে উজ্জ্বল।

৩. তৃতীয় গল্পের প্রটাগনিস্ট এক ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল যার নাম কুবের হলেও যে কার্যত কপর্দকশূন্য। অথচ বাড়তে থাকা পারিবারিক চাহিদার কারণে যে পা বাড়াতে বাধ্য হয় দুর্নীতির অন্ধকার গলিপথে।

আরও পড়ুন: ‘ভারতও জেহাদি দেশ হয়ে গেল’, কৃষি আইন প্রত্যাহারের কঙ্গনার গলায় হতাশার সুর

Did You Know This Interesting Fact About Drishyam Films' Tryst With Destiny?

৪. চতুর্থ ও শেষ গল্পটি প্রতিশোধপরায়ণতার গল্প বলে। কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিশোধ নয়, এ প্রতিশোধ বণ্যপ্রাণীর বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষে কী হয়, জানার জন্য তো আপনাকে চোখ রাখতে হবে সোনি লিভের পর্দায়।

অভিনয় এই সিরিজের দ্বিতীয় ভালো লাগার জায়গা। স্বাভাবিকভাবেই চার শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা থাকায় প্রত্যাশার পারদ ঊর্ধ্বগামী হবেই! আমার পছন্দ অনুযায়ী সাজালে সবচেয়ে ভালো অভিনয় দেখতে পেয়েছি দ্বিতীয় গল্পের প্রটাগনিস্ট দলিত যুবকের চরিত্রে বিনীত কুমার সিংয়ের কাছ থেকে এবং অবশ্যই ওনার সহধর্মিণীর চরিত্রাভিনেত্রী কানি কুশ্রুতির কাছ থেকে। অসহায় দলিত দম্পতির জীবনযন্ত্রণা ওনারা অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। খুব কম সংলাপ, মূলত চোখের ভাষা দিয়ে অভিনয় করেছেন দু’জনেই! তারাভরা আকাশের নীচে চন্দ্রাহতের মতো নির্বাক হয়ে শুয়ে থাকা গৌতম যখন প্রতি রাতে তার স্ত্রীর যৌন নির্যাতনের শিকার হবার সময়কালীন আর্তচিৎকার শুনত, সেই দৃশ্যটি চোখে জল এনে দেয়। পাশাপাশি কানি কুশ্রুতির রিয়ালিস্টিক অভিনয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে হয়। চতুর্থ গল্পের প্রটাগনিস্ট ভাউয়ের চরিত্রে অমিত সিয়ালের অভিনয় আমার চোখে দ্বিতীয় সেরা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া বন্যপ্রাণী তথা গোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে ভাউয়ের যে রাগ ও ক্রোধ, তা দারুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন অমিত। শেষমেশ তাঁরই ভুলে আরেকটি নিরীহ প্রাণ হিংস্র বাঘের কবলে পড়ে চলে যাওয়ায় ভাউয়ের আত্মগ্লানি যথেষ্ট সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। এই গল্পটির দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম ছিল। সঙ্গে আরও কম ছিল অমিতের স্ক্রিনটাইম। তারমধ্যেও ওনার এই অভিনয় প্রদর্শন বেশ মনোগ্রাহী লাগে। প্রথম গল্পের কোটিপতি শিল্পপতির চরিত্রাভিনেতা আশিস বিদ্যার্থী আমার চোখে তৃতীয় স্থান লাভ করবেন। বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া আশিস যেভাবে উপলব্ধি করেন তাঁর এই বিষয়ে অপারগতার কথা ও যেভাবে তারপর আগ্রাসী হয়ে ওঠেন এই ‘অভিশাপ’ থেকে মুক্তি পেতে, তা দেখতে বেশ ভালো লাগে। তবে তৃতীয় গল্পের কুবের চরিত্রে জয়দীপ আহলাওয়াতের অভিনয় ততটা ভালো না হবার মূল কারণ চরিত্রটি আমার মতে খুব ভালোভাবে লেখা না হওয়া।

আরও পড়ুন: বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করবেন ক্যাটরিনা!

Tryst With Destiny: Jaideep Ahlawat, Amit Sial and Vineet Kumar's Anthology  Film To Release on SonyLIV on November 5! (Watch Video) | 📺 LatestLY

সিনেমাটোগ্রাফি এই সিরিজের আরেক সম্পদ। সেটা তারাভরা আকাশের নীচে গৌতমের একাকী শুয়ে থাকাই হোক অথবা সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়ে নানা রঙে রাঙা আকাশকে ব্যাকড্রপে রেখে গৌতমের ভ্যানগাড়িতে চাপিয়ে পুরো পরিবারকে নিয়ে যাওয়াই হোক। দ্বিতীয় গল্পে এরকম বহু অসাধারণ ফ্রেম ক্যামেরাবন্দি করেছেন ডিওপি। চতুর্থ গল্পের মহারাষ্ট্রের বৃষ্টিস্নাত জঙ্গলের সবুজাভ ফ্রেমগুলিও তারিফ করার মতোই।

সবশেষে যে কথাটা বলতে চাই তা হল, গতানুগতিক ধাঁচের যে কাজগুলি হচ্ছে এই মুহূর্তে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তার মধ্যে এই সিরিজটি বেশ অন্যরকমের। সবার হয়তো এই সিরিজ ভালো নাও লাগতে পারে। তবে যাঁরা অন্যরকম গল্প ও ভালো অভিনয় দেখতে পছন্দ করেন, তাঁদের বেশ ভালো লাগবে এই সিরিজ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *