তিনকাঠির ত্রাতা

অনিন্দ্য বর্মন

গোলকিপিংয়ের আদি বৃত্তান্ত

খেলা শেষের কয়েক মিনিট আগে আগুয়ান বলটিকে গোলপোস্টের ওপর দিয়ে ফিস্ট করে বের করে দিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। নিশ্চিত করলেন যাতে মারকানার মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে— ভামোস, ভামোস!!!

এমিলিয়ানো মার্টিনেজ

অন্তিম মুহূর্তে জিয়ানলুইজি ডোনারুমা ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাঁ-দিকে। সময়ের নিষ্ঠুর দস্তানায় আটকে গেল বুকায়ো সাকা এবং তার দেশের ভাগ্য। ওয়েম্বলির মাঠ ছাপিয়ে উঠে এল একটাই প্রতিধ্বনি— আবিয়ামো ভিন্তো!!!

জিয়ানলুইজি ডোনারুমা

এই একটি মুহূর্তের জন্য আর্জেন্টিনা এবং ইতালির মানুষ অপেক্ষা করছিলেন বিগত বহু বছর। বর্তমান অতিমারি বিপুল প্রভাব ফেলেছে খেলার মাঠে। আয়োজন করা যায়নি ২০২০ টোকিও অলিম্পিক্স, ইউরো কাপ ২০২০, উইম্বলডন ২০২০, আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য বহু ইভেন্ট। বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লিগও অনেকাংশেই বাতিল হয়েছে অথবা ছোট ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতেও অতিমারির প্রভাবে এইবছর মাঝপথেই বন্ধ করতে হয়েছে আইপিএল। পিছিয়ে গেছে আই লিগ, আইএসএল, কলকাতা লিগ সহ আরও অনেক খেলসূচি।

আরও পড়ুন: ‘ইল রিসরজিমেন্ত’ ইতালি জন্ম দিল ফুটবলের নতুন ভাষার

আর্জেন্টিনার কোপা জয়

তবুও ২০২১-এর মধ্যভাগ দর্শকদের দিতে পেরেছে বহু প্রতীক্ষিত ইউরো কাপ এবং কোপা আমেরিকা। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে গত ১১ জুলাই পরিসমাপ্তি ঘটল এই দু’টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার। রবিবার সকালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে, জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা জিতে সকল দর্শকের মন জয় করলেন লিওনেল মেসি। আর রাতে অসম্ভবকে সম্ভব করে, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইউরো কাপ জিতল ইতালি।

ইতালির ইউরো জয়

এই লেখাটি ইউরো অথবা কোপা জয় নিয়ে নয়। এই লেখাটি সেই সমস্ত মানুষদের নিয়ে যাঁরা সাধারণত প্রচারের আলোর বাইরেই থেকে যান। কিন্তু তাঁদের অতন্দ্র প্রহরা এবং সময়োচিত সেভ মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে একটি ম্যাচের ভাগ্য।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

ফুটবল মাঠে আমাদের প্রিয় খেলোয়াড়রা বেশিরভাগই ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলেন। যেদিন থেকে ফুটবল শুরু, সেই থেকেই ফরওয়ার্ডরাই বিশেষ জনপ্রিয়। তাঁরা গোল করেন, ম্যাচ জেতান। লিওনিদাস থেকে পেলে-গ্যারিঞ্চা, ইউসেবিও, জার্ড মুলার, গেব্রিয়েল বাতিস্তুতা, লোথার মাথেয়াস, রোনাল্ডো দ্য লিমা, থিয়েরি অঁরি থেকে আধুনিক সময়ে বহু নামকরা ফরওয়ার্ড আমরা পেয়েছি। ’৭০-এর দশকে হল্যান্ডের (বর্তমানে নেদারল্যান্ডস) টোটাল ফুটবলের মাধ্যমে শুরু হয় মিডফিল্ডারদের জনপ্রিয়তা। ফ্রাঞ্জ বেয়েকেনবাওয়ার থেকে মারাদোনা, পরবর্তীতে জিদান, ফিগো, বেকহ্যাম হয়ে আজ তাঁরাও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ’৯০-এর দশকে ইতালির ডিফেন্সিভ ফুটবল ডিফেন্ডারদেরও জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সৌজন্যে পাওলো মালদিনি এবং আলেহান্দ্রো নেস্তা। ইংল্যান্ডের জন টেরি এবং রিও ফার্ডিনান্ড, স্পেনের সের্জিও বাস্কেৎস, কার্লোস পুয়োল, জেরার্ড পিকে এবং সের্জিও র‍্যামোস— আমাদের উপহার দিয়েছেন বহু অলৌকিক ম্যাচ এবং অপ্রত্যাশিত জয়। তবে অনেকাংশেই প্রচারের আলো থেকে দূরেই থেকেছেন ফুটবল টিম ফরমেশনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনকাঠির ত্রাতা— গোলকিপার।

আরও পড়ুন: বাঙালি যেন ধন্দে: কোপা ফাইনাল নাকি মহালয়ার সকাল!

বিখ্যাত ফরওয়ার্ড, মিডফিল্ডার, ডিফেন্ডার

ফুটবল দুনিয়ায় গোলকিপার হিসেবে সম্ভবত প্রথম প্রচারের আলো দেখেছিলেন রাশিয়ার লেভ ইয়াসিন। ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে তার দস্তানা বারংবার প্রতিহত করেছিল বিভিন্ন ফুটবলারকে। ইয়াসিনের টাইমিং এবং রিফ্লেক্স দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। ১৯৭০-এ গোলকিপিংয়ে অন্য মাত্রা যোগ করেন ইংল্যান্ডের গর্ডন ব্যাঙ্কস। বিশ্বকাপ জিতলেও তাঁর দস্তানায় আটকে গিয়েছিলেন পেলে। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটিও গোল করতে পারেননি। তাঁর একটি শটকে দু’বার প্রতিহত করেন ব্যাঙ্কস। পেলে প্রথম শটটি নিয়েছিলেন ফার্স্ট বারে। ঝাঁপিয়ে গোল সেভ করেন ব্যাঙ্কস। রিটার্ন এবং রিবাউন্ডে পেলে শটটি রাখেন সেকেন্ড বারের কর্নারে। প্রায় উড়ে গিয়ে শটটি গোলপোস্টের ওপর দিয়ে বের করে দেন ব্যাঙ্কস। মুগ্ধ পেলে সেটিকে শতাব্দীর সেরা সেভের আখ্যা দিয়েছিলেন। ’৮০-র দশকে খ্যাতি লাভ করেছিলেন ১৯৮২-র বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির গোলকিপার দিনো জফ।

আরম পড়ুন: অমল জলে অমল পুজো

লেভ ইয়াসিন

’৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে নিয়মিত প্রচারের আলোয় আসা শুরু করেন গোলকিপাররা। তাঁরা একটি দলের কতবড় সম্পদ, তা প্রমাণের নেপথ্যে তিনটি নাম বলতেই হবে। তিনজনই ’৯০-এর দশকে নিজেদের জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলেন— ফ্রান্সের ফ্যাবিয়ান বার্থেস (১৯৯৪), জার্মানির অলিভার কান (১৯৯৫) এবং ইতালির জিয়ানলুইজি বুঁফো (১৯৯৭)। ১৯৯৮-এ ফ্রান্স এবং ২০০৬-এ ইতালির বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন বার্থেস এবং বুঁফো। কান ২০০২-এ বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও প্রতিযোগিতার সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইয়াসিন এবং ব্যাঙ্কসের শুরু করা বিপ্লব তার সঠিক সম্মান আদায় করে নিয়েছিল এই তিনজনের দস্তানার সৌজন্যে। এছাড়াও ’৯০-এর দশকে কলম্বিয়ার রেনে হিগুয়েতা এবং প্যারাগুয়ের হোসে লুই চিলাভার্ট বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্করপিয়ন কিক করে একাধিকবার গোল সেভ করেছিলেন হিগুয়েতা। চিলাভার্টের দখলে আছে গোলকিপার হিসেবে সব থেকে বেশি আন্তর্জাতিক গোল করার রেকর্ড (৮টি)। এছাড়াও চিলাভার্টই একমাত্র গোলকিপার যিনি ক্লাবস্তরে হ্যাটট্রিক করেছেন।

আরও পড়ুন: ‘পেনান্টি স্পেশালিস্ট শিবাজি ব্যানার্জি’ রূপকথা জন্মের চার দশক পেরিয়ে

গর্ডন ব্যাঙ্কস

এরপর ক্লাব এবং জাতীয় স্তরের ফুটবলে নিজের যোগ্য সম্মান এবং জায়গা পেতে শুরু করেন গোলকিপাররা। স্পেনের ইকের ক্যাসিয়াস, জার্মানির ম্যানুয়েল নুয়ের, মেক্সিকোর গিলের্মো ওচোয়া, কলম্বিয়ার ডেভিড অসপিনা এবং ফ্রান্সের হুগো লরিস তাঁদের পূর্বসূরিদের যোগ্য উত্তরাধিকার বহন করছেন। এই মুহূর্তে ফরওয়ার্ড, মিডফিল্ডার অথবা ডিফেন্ডারদের তুলনায়, আগের থেকে গোলকিপারদের জনপ্রিয়তা অনেকটাই বেড়েছে।

ইউরো এবং কোপার গোলকিপার

অতিমারির কারণেই একবছর পিছিয়ে ২০২১-এ শুরু হয় ইউরো কাপ। কোভিড-১৯ সুরক্ষার কারণেই এইবার কোনও একটি দেশে নয়, প্রায় সমস্ত ইউরোপ জুড়েই অনুষ্ঠিত হয় ইউরো কাপের ম্যাচ। বিভিন্ন দেশের মোট ১১টি শহরে এই ম্যাচগুলি অনুষ্ঠিত হয় যেমন— রোম (ইতালি), বাকু (তুরস্ক), কোপেনহেগেন (ডেনমার্ক), সেইন্ট পিটার্সবার্গ (রাশিয়া), লন্ডন (ইংল্যান্ড), বুখারেস্ট (রোমানিয়া), অ্যামস্টারড্যাম (নেদারল্যান্ডস), গ্লাসগো (স্কটল্যান্ড), সেভিয়া (স্পেন), বুদাপেস্ট (হাঙ্গেরি) এবং মিউনিখ (জার্মানি)। এর মধ্যে রোমানিয়া ছাড়া বাকি প্রত্যেকটি দেশই ইউরোর মূলপর্বে অংশগ্রহন করেছিল।

আরও পড়ুন: ‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

ইউরো কাপে যে গোলকিপারদের ওপর সবার নজর ছিল

ঠিক তেমনই কোপা আয়োজিত হওয়ার কথা ছিল আর্জেন্টিনায়। কিন্তু অতিমারির কারণেই শেষ মুহূর্তে স্থানান্তরিত করা হয় ব্রাজিলে। ব্রাজিলের চারটি শহর— রিও দে জেনেরিও, ব্রাসিলিয়া, কুইয়াবা এবং গোলানিয়া— মিলিয়ে আয়োজিত হয় কোপা।

এই বছর ইউরোর মূলপর্বে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল মোট ২৪টি দেশ। যেহেতু লেখাটিতে ইউরো কাপের গোলকিপারদের উল্লেখ থাকবে, এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক প্রত্যেকটি দেশের প্রধান গোলকিপারের নাম এবং বর্তমানে তারা কোন ক্লাবে খেলেন—

স্কটল্যান্ড – ডেভিড মার্শাল – ডার্বি কাউন্টি

নর্থ ম্যাসিডোনিয়া – স্টোল ডিমিত্রিভস্কি – রায়ো ভ্যালেকানো

ওয়েলস – ওয়েন হেনেসি – ক্রিস্টাল প্যালেস

অস্ট্রিয়া – আলেকজান্ডার স্লাগার – এলএএসকে

ইউক্রেন – জিওর্জি বুসান – ডায়নামো কিয়েভ

পর্তুগাল – রুই প্যাট্রিশিও – উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স

রাশিয়া – অ্যান্টোনিও শুনিন – ডায়নামো মস্কো

তুরস্ক – উরকান ক্যাচির – ট্র্যাবসন্সপর

সুইডেন – রবিন ওলসেন – এভার্টন

নেদারল্যান্ডস – টিম ক্রুল – নরউইচ সিটি

চেক রিপাবলিক – থমাস ভ্যাক্লিচ – সেভিয়া

ক্রোয়েশিয়া – ডমিনিক লিভাকোভিচ – ডায়নামো জাগ্রেব

ইংল্যান্ড – জর্ডন পিকফোর্ড – এভার্টন

ফিনল্যান্ড – লুকাস হ্যাডেকি – বায়ার্ন লিভারকিউসেন

স্পেন – উনাই সিমোন – অ্যাথলেটিকো বিলবাও

স্লোভাকিয়া – মার্টিন দুব্রাভকা – নিউ ক্যাসেল

হাঙ্গেরি – পিটর গুলাচি – আরবি লিইপজিগ

সুইজারল্যান্ড – ইয়ান সমার – বরুসিয়া মনচেলগ্ল্যাডবাচ

ডেনমার্ক – ক্যাসপার স্কিমিচেল – লেইসেস্টার সিটি

বেলজিয়াম – থিয়োবা কুয়ের্তো – রিয়াল মাদ্রিদ

পোল্যান্ড – ওয়সেচ সেজেনি – জুভেন্তাস

ইতালি – জিয়ানলুইজি ডোনারুমা – বর্তমানে কোনও ক্লাবে খেলেন না

জার্মানি – ম্যানুয়েল নুয়ের – বায়ার্ন মিউনিখ

ফ্রান্স – হুগো লরিস – টটেনহ্যাম হটস্পার

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

কোপা আমেরিকায় যে গোলকিপারদের ওপর সবার নজর ছিল

ঠিক সেরকমই, এই বছর কোপার মূলপর্বে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল মোট ১০টি দেশ। লেখাটির মধ্যে কোপার গোলকিপারদের উল্লেখও থাকবে, তাই দেখে নেওয়া যাক প্রত্যেকটি দেশের প্রধান গোলকিপারের নাম এবং বর্তমানে তাঁরা কোন ক্লাবে খেলেন—

ব্রাজিল – অ্যালিসন – লিভারপুল (ফাইনালে খেলেছেন ম্যাঞ্চেস্টার সিটির এডারসন)

ভেনেজুয়েলা – গ্ল্যাতেরল – আমেরিকা দে ক্যালি

কলম্বিয়া – ডেভিড অসপিনা – নাপোলি

ইকুয়েডর – পেদ্রো ওর্টিজ – এমেলেক

আর্জেন্টিনা – এমিলিয়ানো মার্টিনেজ – অ্যাস্টন ভিলা

চিলি – ক্লদিও ব্রাভো – রিয়াল বেতিস

পেরু – গ্যালিস – আলান্সা লিমা

প্যারাগুয়ে – অ্যান্টনি সিলভা – পুয়েবলা

উরুগুয়ে – ফার্নান্দো মাসলেরা – গালাতাসারে

বলিভিয়া – লাম্পে – হুয়াচিপাতো

প্রতিযোগিতার সেরা গোলকিপার

প্রত্যেক প্রতিযোগিতার আগেই, কিছু খেলোয়াড়কে খাতায় কলমে ফেভারিট ধরা হয়। এবারের ইউরো এবং কোপাও ব্যতিক্রম নয়। এই খেলোয়াড়দের ওপরই চোখ থাকে সারাবিশ্বের মানুষ এবং ক্লাবকর্তাদের। এরাই বিশেষ মুহূর্তে খেলা ঘুরিয়ে দেন, দল এবং দেশকে জেতান। ঠিক তেমনই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো অথবা লিওনেল মেসির মতোই, ইউরো এবং কোপা শুরুর আগে দর্শকেরা চোখ রেখেছিলেন খাতায় কলমে ফেভারিট গোলকিপারদের ওপরও। একবার তাদের দিকে দৃকপাত করা আবশ্যক–

রুই প্যাট্রিশিও – পর্তুগালের এই গোলকিপারের ওপর নজর সারাবিশ্বের। বিশেষত তাঁর কাঁধে ভর করেই ২০১৬-র ইউরো কাপ জেতে পর্তুগাল। এবারও তিনি পর্তুগিজ গোলপোস্টের ত্রাতা। বর্তমানে খেলেন উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে। দেশের হয়ে অভিষেক ২০১০ সালে। এখনও অবধি মোট ৯৭টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

পর্তুগালের রুই প্যাট্রিশিও

উনাই সিমোন – ২০০৮ এবং ২০১২ ইউরো এবং ২০১০ বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন। বিশ্বস্ত ইকের ক্যাসিয়াসের অবসরের পর আপাতত গোল সামলানোর দায়িত্ব এরই ওপর। বর্তমানে খেলেন অ্যাথলেটিকো বিলবাও ক্লাবে। সম্প্রতি অফ ফর্মে থাকলেও তিনি যে স্পেনের জয়ের জাদুকাঠি, সেটা অনেকেই মানেন। দেশের হয়ে অভিষেক ২০২০ সালে। এখনও অবধি মোট ১৩টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

স্পেনের উনাই সিমোন

থিয়োবা কুয়ের্তো – ২০১৮র বিশ্বকাপে চমক দিয়েছিল বেলজিয়াম। এবং তরুণ প্রজন্মের গোলকিপার হিসেবে উঠে এসেছেন এই গোলকিপার। এই প্রতিযোগিতায় বেলজিয়াম কালো ঘোড়া এবং তাদের জয়ের অনেকটাই এর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে খেলেন রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবে। দেশের হয়ে অভিষেক ২০১১ সালে। এখনও অবধি মোট ৮৯টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

বেলজিয়ামের থিয়োবা কুয়ের্তো

ওয়সেচ সেজেনি – জুভেন্তাসের হয়ে এই বছর নিজের চমকপ্রদ প্রদর্শনে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন এই গোলকিপার। যে কারণে পোল্যান্ডের এই খেলোয়াড়ের ওপর অনেকের নজর থাকবে। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৯ সালে। এখনও অবধি মোট ৫৫টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

পোল্যান্ডের ওয়সেচ সেজেনি

ম্যানুয়েল নুয়ের – খাতায় কলমে ইউরোর সেরা এবং অভিজ্ঞ গোলকিপার। কিংবদন্তি অলিভার কানের যোগ্য উত্তরসূরি। বর্তমানে খেলেন বায়ার্ন মিউনিখে। জার্মানির হয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপ এবং বায়ার্নের হয়ে বুন্দেসলিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, প্রায় সবই জিতেছেন। কিন্তু ট্রফি ক্যাবিনেটে ইউরো নেই। সম্প্রতি অফ ফর্মে থাকলেও তার দস্তানাই দেশের ত্রাতা। যে কোনও মুহূর্তে বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৯ সালে। এখনও অবধি মোট ১০৪টে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

জার্মানির ম্যানুয়েল নুয়ের

হুগো লরিস – খাতায় কলমে ইউরোর দ্বিতীয় সেরা এবং সবথেকে অভিজ্ঞ গোলকিপার। কিংবদন্তি ফ্যাবিয়ান বার্থেসের যোগ্য উত্তরসূরি। বর্তমানে খেলেন টটেনহ্যাম হটস্পারে। ফ্রান্সের হয়ে ২০১৮ বিশ্বকাপ এবং টটেনহ্যামের হয়ে বহু কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। কিন্তু ট্রফি ক্যাবিনেটে এনারও ইউরো নেই। সম্প্রতি ভালো ফর্মেও আছেন। যে কোনও মুহূর্তে বদলে দিতে পারেন ম্যাচ। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৮ সালে। এখনও অবধি মোট ১২৯টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

ফ্রান্সের হুগো লরিস

অ্যালিসন – কোপার গোলকিপারদের মধ্যে অন্যতম অ্যালিসন বেকার। বর্তমানে খেলেন লিভারপুলে। ব্রাজিলের হয়ে ২০১৯ কোপা এবং লিভারপুলের হয়ে জিতেছেন ২০১৯ প্রিমিয়ার লিগ। সম্প্রতি ফর্মে না থাকলেও যে কোনও মুহূর্তে বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। দেশের হয়ে অভিষেক ২০১৫ সালে। এখনও অবধি মোট ৪৭টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

ব্রাজিলের অ্যালিসন

ডেভিড অসপিনা – খাতায় কলমে কোপার সেরা এবং অভিজ্ঞ গোলকিপার। বর্তমানে খেলেন নাপোলিতে। কলম্বিয়ার হয়ে তার দস্তানা বিশ্বকাপ এবং কোপায় বারবার আমাদের মুগ্ধ করেছে। ক্লাব স্তরে এফএ কাপও জিতেছেন। কিন্তু ট্রফি ক্যাবিনেটে এখনও কোপা অথবা কোনও বড় ট্রফি নেই। বরাবরই ভালো ফর্মে থাকেন। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৭ সালে। এখনও অবধি মোট ১১৩টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

কলম্বিয়ার ডেভিড অসপিনা

ক্লদিও ব্রাভো – চিলির হয়ে দু’বার কোপা জয়ী গোলকিপার। এছাড়াও ক্লাব স্তরে অসংখ্য ট্রফি জয়। বর্তমানে খেলেন রিয়াল বেতিসে। বরাবরই ভালো ফর্মে থাকেন। চিলিকে হারাতে হলে তাঁর দস্তানাকে পরাজিত করতেই হবে। অভিজ্ঞতায় সবার থেকে এগিয়ে। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৪ সালে। এখনও অবধি মোট ১৩৩টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

চিলির ক্লদিও ব্রাভো

ফার্নান্দো মাসলেরা – বিশ্বকাপ এবং কোপায় দিয়েগো ফোরলান এবং পরবর্তীতে দিয়েগো গডিনের সবথেকে নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। বিগত দশকে উরুগুয়ের সাফল্যের অনেকটাই নির্দ্বিধায় তারই দস্তানার সফলতা। বরাবরই ভালো ফর্মে থাকেন। আশ্চর্যজনক বহু সেভের মালিকের ওপর অনেকটাই ভরসা করেন উরুগুয়ের জনতা। বর্তমানে গালাতাসারেতে খেলেন। অভিজ্ঞ। জিতেছেন কোপা ২০১১। দেশের হয়ে অভিষেক ২০০৯ সালে। এখনও অবধি মোট ১২৩টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

উরুগুয়ের ফার্নান্দো মাসলেরা

খেলার আলোয় উজ্জ্বল খেলোয়াড়

বাট মির‍্যাকল স্টিল হ্যাপেন্স। আমার প্রথম ফুটবল স্মৃতি ১৯৯৪ বিশ্বকাপ। কিন্তু তা সামান্য কিছু মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে একটি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ব্রাজিল কাগজে-কলমে ফেভারিট। বাবা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এর মানে সম্ভাব্য জয়ী। ’৯৮-এর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিজয়রথ থামিয়ে দিয়েছিল জিদানের ম্যাজিক। রোনাল্ডো-রিভাল্ডো-কার্লোস-দুঙ্গা সমৃদ্ধ ব্রাজিল হেরে যাবে, এটা কেউ ভাবতেও পারেনি। প্রথমার্ধের শেষে আমার ব্রাজিল সাপোর্টার বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তাই মির‍্যাকলস ডু হ্যাপেন।

আর এই বছর ইউরো এবং কোপা, দু’ক্ষেত্রেই তাই-ই হয়েছে। কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে ২০১৮-র বিশ্বকাপের মূলপর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা ইতালি ইংল্যান্ডের ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে তাদের হারিয়ে ৫৩ বছর পর জিতে নেবে ইউরো কাপ। অন্যদিকে, ব্রাজিলের ঘরের মাঠ মারকানায় তাদেরই হারিয়ে ২৮ বছর পর কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হল আর্জেন্টিনা। স্পর্শ করল উরুগুয়ের ১৫ বার কোপা জেতার রেকর্ড। হয়ত ফুটবল মাঠেই এমন রূপকথার জন্ম হয়।

আর এখানেই ইউরো এবং কোপা উলটে দিয়েছে সমস্ত হিসেব। খাতায় কলমে ফেভারিট টিম অথবা গোলকিপার, বেশিরভাগই সেমিফাইনালেও খেলার সুযোগ পায়নি। বরং ফুটবল বিশ্ব পেয়েছে তাদের নতুন নায়ক। গোলকিপার, যাঁদের আগে সেভাবে ধরাই হয়নি, তাঁরা হয়ে উঠেছেন জয়ের কাণ্ডারি। লেখার অন্তিম পর্বে দেখে নেওয়া যাক যে তথাকথিত ফেভারিটদের ছাপিয়ে কারা নায়ক হয়ে উঠলেন।

জিয়ানলুইজি ডোনারুমা – প্রথম যে নামটি করতেই হবে, তিনি হলেন ইতালির জিয়ানলুইজি ডোনারুমা। বর্তমানে কোনও ক্লাবে খেলেন না এবং জিয়ানলুইজি বুঁফোর উত্তরসূরি হিসেবে কতটা যোগ্য, এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর তিনি দিয়েছেন। এসি মিলানে থাকার সময়ে ডোনারুমা সেরকম বড় কোনও ট্রফি জিততে পারেননি। ২০১৬-এ অভিষেক হওয়ার পর ইতালির হয়ে খেলেছেন মাত্র ৩৩টি ম্যাচ। পুরো ইউরো কাপের ৭টি ম্যাচে মাত্র ৪টি গোল খেয়েছেন ডোনারুমা। সেমিফাইনালে স্পেন এবং ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের ফয়সালা হয়েছে টাইব্রেকারে। এবং দু’টি ম্যাচেই ৩টি করে গোল সেভ করেন ডোনারুমা। তার শেষ সেভ ছিল বুকায়ো সাকা-র শট যা ইতালিকে এনে দেয় বহু কাঙ্ক্ষিত ইউরো কাপ। প্রতিযোগিতার সেরা গোলকিপারও নির্বাচিত হয়েছেন ডোনারুমা।

এমিলিয়ানো মার্টিনেজ – তালিকায় অবশ্যই দ্বিতীয় স্থানে থাকবেন আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। অ্যাস্টন ভিলায় খেলা এই গোলকিপারকে কেউই ফেভারিট ধরেননি। কোপায় তার রেকর্ড ডোনারুমার থেকেও চমকপ্রদ। ৭টি ম্যাচে মাত্র ৩টি গোল খেয়েছেন তিনি। তার থেকেও বড় কথা হল যে গ্রুপ লিগে উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ে এবং ফাইনালে ব্রাজিলের নেইমার-ক্যাসেমিরো-এভার্টন সমৃদ্ধ লাইন আপের সামনে আর্জেন্টিনা জিতেছে মাত্র ১-০ ফলাফলে। বারংবার তিনি বিপক্ষকে প্রতিহত করে গেছেন। ফাইনালের দ্বিতীয় হাফে ব্রাজিলের একটার পর একটা শট তিনি আটকেছেন প্রবল দক্ষতায়। সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে তার প্রতিপক্ষ ছিল অভিজ্ঞ ডেভিড অসপিনা। টাইব্রেকারেও মার্টিনেজ ৩টি সেভ করেন। তাকে দেখে এটা ধরা যায় না যে এই বছরই জাতীয় দলে অভিষেক করেছেন এবং মাত্র ৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। প্রতিযোগিতার সেরা গোলকিপারও নির্বাচিত হয়েছেন মার্টিনেজ।

ক্যাসপার স্কিমিচেল – তালিকায় তৃতীয় নাম অবশ্যই ডেনমার্কের ক্যাসপার স্কিমিচেল। লেইসেস্টার সিটির এই গোলকিপার প্রাণপন নিজের দলের গোল রক্ষা করেছেন। গ্রুপ লিগের প্রথম দু’টি ম্যাচেই ডেনমার্ক হেরে যায়। কিন্তু রাশিয়াকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে তারা নক আউট রাউন্ডে জায়গা করে নেয়। সুপার ষোলোয় স্কিমিচেল বারবার আটকে দিয়েছেন গ্যারেথ বেল-এর ওয়েলসকে। সেমিফাইনালে পৌঁছয় ডেনমার্ক। ৬টি ম্যাচে ৭গোল খেয়েছেন স্কিমিচেল। যদিও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টিটা বিতর্কিত। ক্যামেরায় পরিষ্কার দেখা গেছে যে স্কিমিচেলের মুখে লেসার লাইট ফেলা হয়েছিল। তবুও তাঁর খেলা আপামর বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছে। ২০১৩-এ অভিষেক করা স্কিমিচেল ৭১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

ইয়ান সমার – তালিকায় পরবর্তী নাম সুইজারল্যান্ডের ইয়ান সমারের। বরুসিয়া মনচেলগ্ল্যাডবাচের গোলকিপার ইউরোর আগে তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না। ৫টি ম্যাচে মোট ৯টি গোল তিনি খেয়েছেন। কিন্তু সুপার ১৬’য় ফ্রান্সকে হারিয়ে তিনি বিশ্বের নজর কেড়েছেন। টাইব্রেকারে সুইজারল্যান্ড ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারায়। এই ম্যাচের পরই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সমার। তার দস্তানা রুখে দিয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ২০১২ থেকে এখনও অবধি ৬৬টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন সমার।

জর্ডন পিকফোর্ড – ইংল্যান্ডের গোলকিপার জর্ডন পিকফোর্ডের নাম ইউরোর আগে খুব একটা শোনা যায়নি। ইংল্যান্ডের ফাইনালে যাওয়ার পেছনে এভার্টনের এই গোলকিপারের ভূমিকা কম নয়। ৭ ম্যাচে মাত্র ২টি গোল খেয়েছেন পিকফোর্ড। যার মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি তিনি কোনও গোল খাননি। ইংল্যান্ড জার্মানিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। তাই পিকফোর্ডের দক্ষতা সহজেই অনুমেয়। ফাইনালেও ইতালির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে ২টি শট সেভ করেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ২০১৭তে অভিষেক হওয়া পিকফোর্ড ৩৮টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

ইউরো কাপে এছাড়াও যাদের নাম না করলেই নয়, তাঁরা হলেন রুই প্যাট্রিশিও, টিম ক্রুল, থিয়োবা কুয়ের্তো, ওয়সেচ সেজেনি, ম্যানুয়েল নুয়ের এবং হুগো লরিস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। পোল্যান্ড গ্রুপ লিগ পেরোতে পারেনি। ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং পর্তুগাল আটকে গেছে সুপার-১৬ নকআউটে। বেলজিয়াম আশা জাগিয়েও কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেয়। কোপা আমেরিকাতেও যাদের নাম করা উচিত, তারা হলেন অ্যালিসন, এডারসন, ডেভিড অসপিনা, ক্লদিও ব্রাভো এবং ফার্নান্দো মাসলেরা। অবশ্য এরাও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। চিলি এবং উরুগুয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়। কলম্বিয়া হেরে যায় সেমি ফাইনালে। একমাত্র ব্রাজিলই ফাইনালে পৌঁছয়, যদিও ফাইনাল ম্যাচে অ্যালিসনের বদলে এডারসন খেলেন।

ইউরো এবং কোপা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল আগামী প্রজন্মের গোলকিপারদের সঙ্গে। পরিশেষে একটাই কথা বলার, আমরা বলে থাকি পেনাল্টি মিস। হ্যাঁ, ফুটবলের মাঠে পেনাল্টি মিসকে জঘন্য অপরাধ মনে করা হয়। ইতালির বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করেন মার্কাস রাশফোর্ড। সবাই তাকে ধিক্কার জানিয়েছেন। মনে রাখেননি যে তিনি অতিমারি সময়ে কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে পেনাল্টি মিসের থেকেও বড় পেনাল্টি সেভ। আর একজন প্রকৃত গোলকিপার পেনাল্টি সেভ করে হয়ে ওঠেন স্বপ্নের নায়ক। ফুটবলের রূপকথা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *