শান্তিপুরের বড় অদ্বৈত অঙ্গনে শারদীয়ায় পূজিতা হন দেবী কাত্যায়নী

রাহুল হালদার

সজ্ঞানে হোক আর জ্ঞান হওয়ার আগে, হিসাবে বলছে জীবনে আটত্রিশবার দুর্গাপুজো অতিক্রম হয়ে গেছে কিন্তু এবছরের মতো ব্যতিক্রমী আর আশঙ্কাপূর্ণ পরিবেশ কত বছরে এসেছিল, সেটা ইতিহাসের পাতায় কোথাও লিখিত আছে কি না, জানা নেই। তবে এই পরিবেশই আমাদের প্রথম জানান দেয় বাঙালির সবথেকে বড় উৎসব দুর্গোৎসবের আগমনের বার্তা। দীর্ঘ একঘেমেয়ি বর্ষার পর শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ভেলা মনকে উৎফুল্ল করে তোলে। এতদিন ধরে জলে পরিপুষ্ট নদী, খাল, বিলের ধারে গজিয়ে ওঠা কাশগাছের সাদা ফুলের দোলা, সোনালি রোদের মিষ্টি আহ্বান, ভরা বর্ষার জলে পরিপুষ্ট হয়ে সদ্য যৌবনা নদী, বিলের জলে শালুক, পদ্ম সৌন্দর্য আর রাতে শিউলি ফুলের মোহময় সুগন্ধ মনকে প্রফুল্ল করে একঘেয়েমি জীবন থেকে দু’দণ্ড মুক্তি দিয়ে আপামর বাঙালি মেতে ওঠে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয় দুর্গাপুজোয়।

আরও পড়ুন: ২৭৫ বছরের পুরনো রানাঘাটের দে চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো

বাঙালি সমাজে উৎসবের আকারে দুর্গোৎসব সূচনার ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে যে, লর্ড ক্লাইভ যখন পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করেন তখন সেই যুদ্ধ জয়কে স্মরণীয় করে রাখবার জন্য সমস্ত ইংরেজদের নিয়ে একটি বড় উৎসবের বাসনা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বাংলায় এত সংখ্যক ইংরেজদের নিয়ে উৎসব করবার মতো কোনও গির্জা ছিল না। ক্লাইভ যখন কি করবে ভেবে পাচ্ছেন না, তখন কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে পরামর্শ দেন যে, দুর্গাপুজো করে পলাশি যুদ্ধজয়ের উৎসব পালন করতে। কারণ ইংরেজরা চেয়েছিলেন এই বিজয় উৎসবে দেবতার কৃপাও যেন পাওয়া যায়। নদিয়ারাজের পরামর্শ তাদের পছন্দ হলে কৃষ্ণচন্দ্রের মনের ইচ্ছাকে বৈধতা দেওয়া হল। এরপর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র দুর্গাপুজোকে দুর্গোৎসবে পরিণত করেন।

প্রাচীন জনপদ শান্তিপুরও দুর্গোৎসব পালনে পিছিয়ে নেই। বৈষ্ণব ভূমি শান্তিপুর কার্তিক পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত রাধা-কৃষ্ণের মিলনোৎসব রাসোৎসব এখানকার প্রধান উৎসব হলেও এখানকার পুরনো জমিদার বাড়ি, কিছু সম্ভ্রান্ত ও বনেদি বাড়ি আর কিছু বারোয়ারির মধ্যে যথার্থই মিলনোৎসবের মতো পূজিতা হন দেবী দশভূজা।

আরও পড়ুন: আশি বছর বন্ধ দুর্গাপুজো, তবে সুত্রাগড়ের ইন্দ্রবাড়িতে এখনও অক্ষত দুর্গা প্রতিমার পাটা

অদ্বৈত প্রভুর বংশধর শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ি বৈষ্ণব মতের অনুসারী হলেও এই বাড়ির পুজো দালানে মহাসমারোহে ব্যতিক্রমী দশভুজা দেবী কাত্যায়নী প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে হয়ে ধরে পূজিত হয়ে আসছেন। পুজো সূত্রপাতের ইতিহাসের অনুসন্ধানে আমরা যে কাহিনিটি জানতে পারি সেটা হল, বড় গোস্বামী বাড়ির রাধারমণ জিউ বিগ্রহ যা পূজিত হন, সেই বিগ্রহ পুরীর রাজা ইন্দ্রদুন্মের থেকে যশোরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর মুঘল আমলে সুবেদার  মানসিংহ যখন বাংলা আক্রমণ করেন, তখন বিগ্রহের পবিত্রতা রক্ষার্থে শ্রী অদ্বৈতচার্যের বংশধর মথুরেশ গোস্বামীর হাতে যশোররাজ বসন্ত রায় সমর্পণ করেন। এরপর মথুরেশ গোস্বামী রাধারমণ জিউকে শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়িতে স্থাপিত করেন এবং সেখানেই তিনি পূজিত হতে থাকেন।

এরপর মথুরেশ গোস্বামীর মৃত্যুর পর রাধারমণকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া না গেলে বাড়ির মেয়েরা পণ করেছিলেন, রাধারমণকে খুঁজে পাওয়া গেলে তাঁরা কাত্যায়নী ব্রত করবেন। এরপর রাধারমণকে দিগনগরের একটি স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। রাধারমণ মূর্তি উদ্ধার হওয়ার পর থেকে বড়গোস্বামী বাড়িতে কাত্যায়নী দুর্গোৎসবের সূচনা হয়, যা আজও বৈষ্ণব রীতিতে দেবী পূজিতা হন।

বড়গোস্বামী বাড়ির সত্যনারায়ণ গোস্বামীর থেকে জানা যায়, দেবী কাত্যায়নীর পুজোয় ছত্রিশ প্রকারের ব্যঞ্জন রন্ধন হয় এবং সেই ভোগ পুজোর পরে উপস্থিত সকল খাওয়ানো হয়। নবমীর সকালে শান্তিপুরের সকল নগরবাসী, দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনায় এক বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। এবছর যেহেতু মানুষকে মহামারির সঙ্গে লড়াই চালাতে হচ্ছে, তাই পুজোর অন্য সকল উপাচারে সীমাবদ্ধতা রাখলেও প্রার্থনা অনুষ্ঠানটি বাদ দেওয়া হয়নি। আর দশমীর দিনে সকালে দেবী বিসর্জনের পর বাড়ির ইষ্টদেবতা রাধারমণের উদ্দেশ্যে নানা প্রকার ব্যঞ্জন রন্ধন করে দেবতাকে সেটা উৎসর্গ করা হয়।

ছবি লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *