গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন হতে পারে সুন্দরবন উপকূলের বিকল্প কর্মসংস্থান

সমীরণ মণ্ডল

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের বাস্তুরীতিকে সুস্থ রেখেই সুন্দরবনের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। আয়লা থেকে আমফানে বারেবারে সুন্দরবনের মানুষের স্বপ্ন ভাঙে, ভাঙে ঘর— এরা হয়ে ওঠে যাযাবর। এই মুহূর্তে সবথেকে বড় প্রশ্ন, সুন্দরবনের মানুষের জীবিকা কী? না, সুন্দরবনের মানুষের সঠিক কোনও জীবিকা নেই। এক ফসলি জমি থেকে বছরে একবারই ফসল হয়। ধান পাওয়া যায় এক বিঘা জমি থেকে নয় থেকে দশ বস্তা। সুন্দরবনের মানুষের হাতে জমিও সীমিত।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের বিবর্ণ গ্রামের ফিনিক্সদের সঙ্গে কিছুক্ষণ

File:Nypa fruticans Blanco2.386.jpg - Wikimedia Commons

পরিবারপিছু গড় জমির পরিমাণ এক থেকে চার বিঘা। অর্থাৎ চার বিঘা জমি থেকে বছরে একবার যে ধান পাওয়া যায়, খরচ-খরচা বাদ দিয়ে একটি চারজনের পরিবারের ভরণপোষণ সম্ভব নয় সেই ইনকাম থেকে। তাই সুন্দরবনের মানুষকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে জঙ্গল-কেন্দ্রিক বিভিন্ন সময়ভিত্তিক পেশার উপরে নির্ভর করতে হয় জীবন বাজি রেখে। এছাড়াও সুন্দরবনের পরিযায়ী শ্রমিক আজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছে। এমতাবস্থায় অবশ্যই সুন্দরবনের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলের কিছু সম্ভাবনা রয়েছেই কেওড়া চাষ ও প্রক্রিয়াকরণ, ম্যানগ্রোভ নার্সারি এবং গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন।

আরও পড়ুন: সুন্দরবন সিরিজের কবিতা

আজ আলোচনা করা যাক গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন সম্পর্কে। বাংলাদেশের একটি বৃহৎ সুন্দরবনের অংশ এই কাজটি করে চলেছে বহু বছর ধরে। ভারতের সুন্দরবনের জন্যও ভাবা যেতে পারে বিষয়টি।

গোলপাতা বা নিপা পাম ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের পাম জাতীয় একটি গাছ। ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের কাদায় ভরা স্বল্প বা মধ্যম লবণাক্ত নদী চরে বা উন্মুক্ত উপকূলে বীজ লাগিয়ে চাষ করা যায়। দুই মাস বয়সি ২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার চারাগাছ স্থানান্তরিত করা যায় অথবা চাষের জন্য বিলিয়ে দেওয়া যায়।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে আবিষ্কার ১০ প্রজাতির নতুন মাছ, খুশির হাওয়া বিজ্ঞানীমহলে

গোলপাতার কাণ্ড ও পাতা নোনা হলেও এর রস মিষ্টি। এবং খেজুর রসের থেকে ঘন। ১৬ ফোটা খেজুর রসে যখন এক ফোটা গুড় তৈরি হয়, সেখানে ৮ ফোটা গোল রসে এক ফোটা গুড় তৈরি হয়। আষাঢ় মাসে গোলপাতা গাছে ফল আসার পর পৌষ মাসে ফল সহ কাঁধি মাটি চাপা দিয়ে নুইয়ে দিতে হয়। অগ্রহায়ণ মাস থেকে দিন পনেরো কাঁধির ডান্ডিতে পা দিয়ে মৃদু আঘাত করে হালকা ম্যাসাজ করতে থাকতে হয়। ১৫ দিন এভাবে ম্যাসাজ করার পর ফলের কাঁধির আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করে ফলের থোকা অংশটা কেটে নিতে হয় ডান্ডিটা রেখে। ডান্ডির কাটা অংশটি তিনদিন শুকানোর পর সকাল-বিকাল আরও দিন পনেরো খেজুর গাছ কাটার মতো ডান্ডির মাথা থেকে হালকা করে চেঁছে দিতে হবে।

এরপর প্রতিদিন বিকেলে ডান্ডির মাথা সামান্য কেটে সুতলি বা এই ধরনের দড়ি দিয়ে নিচে একটি মাটির পাত্র বেঁধে বা পেতে রস সংগ্রহ করতে হয়। এভাবে পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত  রস সংগ্রহ করা যায়। প্রতিটি ডান্ডি থেকে দিনে ২৫০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম রস সংগ্রহ করা যায়। একটি গোলবহর বা গোলবাগানে যদি ১৫০টি ডান্ডি থাকে, তাহলে প্রায় ১০০ কেজি রস একদিনে সংগ্রহ করা যায় এবং যা থেকে ১২ কিলো গোল গুড় উৎপান হবে। এক কিলো গুড় ৯০ থেকে ১২০ টাকা দামে বিক্রি হলে দিনে কমবেশি ১২০০ টাকা ইনকাম হবে। এবং তিন মাসে ১৫০ ডান্ডি থেকে প্রায় এক লক্ষ টাকা ইনকাম করা যেতে পারে কোনও খরচ ছাড়াই।

এ ছাড়া গোলপাতা বিভিন্ন ছাউনি তৈরির কাজে বিক্রি করাও যেতে পারে। কমপক্ষে পাঁচ বছর বয়সি গোলপাতা গাছের মাঝের এবং আশপাশের কয়েকটি পাতা রেখে সব পাতাই কেটে নেওয়া যায়। পাতা কাটতে হয় শুকনো মরশুমে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে।

ছবি সংগৃহীত

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *