‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

তাঁর শুভনাম শ্রীশিবকুমার চট্টোপাধ্যায় নামে কতজন আর তাঁকে চিনত! যতটা চিনত ‘গুলিনদা’ নামে— আবালবৃদ্ধবণিতা— এক ডাকে! রানাঘাটের বাইরে উচ্চাঙ্গ সংগীত জগতের গুণিজনরা অবশ্য তাঁকে সসম্ভ্রমে ‘গুলিনবাবু’ অথবা তাঁর শুভনামেই ডাকতেন।

মনে পড়ে সেই ধূসর ’৭০-এর দশকের কোনও এক ভোরে আমি গালিফ স্ট্রিট থেকে ট্রামে চেপে এসপ্ল্যানেডের দিকে যাব। গড়পার রোডের কাছ থেকে এক সৌম্যপুরুষ উঠে আমার পাশের সিটেই বসলেন, তাঁর হাতের কেসবন্দি সারেঙ্গিটা কোলের ওপর রেখে সোজা করে ধরে রাখলেন। কৌতূহলে জিজ্ঞেস করলাম সেটি সারেঙ্গি কিনা? তিনি বললেন, এই ‘যন্ত্র’ চেনেন? কথায় কথায় তিনি আমার নিবাস জানতে চাইলে জানাই ‘রানাঘাট’। শুনেই তিনি কপালে হাত ঠেকিয়ে দু’চোখ বন্ধ করে বললেন ‘আপনি নগেন দত্ত মহাশয়ের দেশের লোক? আমার গুরু নগেনবাবু। আপনি গুলিনবাবুকে চেনেন?’ আমি নাম জানতে চাইলে জানতে পারি আমার সহযাত্রী ছিলেন পণ্ডিত রামনাথ মিশ্র।

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

সূত্র: সঙ্গীতা বোস

জীবিত অবস্থায় তিনি সংগীত সমাজে যতটা শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পেরেছিলেন, জনারণ্যে ঠিক ততটা পরিচিতি তাঁর ছিল না। তাছাড়া, রানাঘাট অঞ্চল আমার ব্যক্তিগত অনুভবে নিতান্তই বিস্মৃতিপরায়ণ। ফলে গতবছরে ‘কোভিড’ অতিমারি-গ্রস্ত সময়ের দোহাই পেড়ে যে তাঁর জন্মশতবর্ষ ভুলে থাকা যাবে, এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে! কেমন অনাদরে রানাঘাটবাসীর ক্যালেন্ডারে ধোঁয়া হয়ে গিয়েছিল ২ অক্টোবর, ২০২০ তারিখটি!

আমি গানের লোক নই নিছকই এক শ্রোতা। নেহাৎ কলেজের বান্ধবীর পিতা— সেই সুবাদে গুলিন জেঠুর সঙ্গে আমার পরিচিতি ছিল। তাঁর বাড়িতে সংগীত শিক্ষার আসরে দূরে বসে শুনতে-দেখতে পেয়েছি তাঁকে, বেশ কিছু অনুষ্ঠানেও তাঁর গান শোনার সুযোগ হয়েছিল।

মনে পড়ে, সম্ভবত ১৯৭৪ সালে পুরসভার বটল পামগাছে ছাওয়া প্রশস্ত ময়দানে পুরসভার ১১০ বছর  পূর্তিতে ‘রাণাঘাটের গান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তাঁর অসামান্য ভাষ্য ও গানের সম্মিলন। গানে সহযোগিতায় ছিলেন আরেক গুণী শিল্পী সরোজ দত্ত, তবলায় ছিলেন তাঁর ভাই (মান্তান) সুনীত চ্যাটার্জি, সুজিত ব্যানার্জি সহ আরও কয়েকজন গুণী শিল্পী।

শ্রীশিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল ১৯২১ সালের ২ অক্টোবর রানাঘাটের কাছেই বর্ধিষ্ণু গ্রাম আনুলিয়াতে। তাঁর পিতা ছিলেন রানাঘাটের সুপরিচিত চিকিৎসক ডা. শৈলেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। নজরুল সংগীতের সুবিখ্যাত শিল্পী ডা. অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর ছোট বোন। তাঁর অনুজ মান্তান (সুনীত) চট্টোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত তবলা বাদক এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সহকারী।

আরও পড়ুন: বাঁকুড়ার লোকদেবতা লোকেশ্বর

প্রখ্যাত সংগীতগুরু নগেন্দ্রনাথ দত্ত (সূত্র: দেবনারায়ণ দত্ত)

তাঁর দাদামশাই শ্রীনগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মহাশয় ছিলেন সেই যুগের প্রখ্যাত ধ্রুপদ শিল্পী— মূলতঃ তাঁর কাছে এবং আরেক দিক্‌পাল শ্রীনগেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয়, ওস্তাদ কাদের খান, ওস্তাদ আহমদ খাঁ সাহেব, দেবব্রত সিংহ ঠাকুর প্রমুখের কাছে তিনি সংগীত শিক্ষা নিয়েছিলেন।

উল্লেখ থাকুক যে, তিনি প্রয়াগ সংগীত মহাবিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ উপাধি (পিএইচডি সমতুল) লাভ করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

আকাশবাণীর লখনউ ও কলকাতা সহ বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়মিত তাঁর উচ্চাঙ্গ সহ টপ্পা, আগমনী, পুরাতনী ইত্যাদি বিভিন্ন ধারার সংগীত সম্প্রচারিত হ’ত।

তানসেন সংগীত সম্মেলন, ডোভার লেন কনফারেন্স, বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন প্রভৃতি সংগীত সমারোহে তাঁর নিত্য ডাক পড়ত।

প্রয়াগ সংগীত মহাবিদ্যালয়, বঙ্গীয় সংগীত পরিষদ, ভাতখণ্ডে-সহ বিভিন্ন শিক্ষায়তনের তিনি প্রশ্নকর্তা ও পরীক্ষক ছিলেন।

আরও পড়ুন: বিবিধ পরব, বহু-মানভূম

প্রখ্যাত ধ্রুপদিয়া নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। (সূত্র: দেবনারায়ণ দত্ত)

সংগীতশাস্ত্রী শিবকুমার ছিলেন আদর্শ সৃজনশীল গবেষক। তিনি অসংখ্য রাগ সৃষ্টি করেছিলেন, যেমন শিবপ্রিয়া, হিমাল টোড়ী, যোগক্রিয়া, কৈলাসী টোড়ী ইত্যাদি। তেমনি তিনি তালের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা করতেন।

শিবকুমারের বিশেষত্ব ছিল টপ্পা, আগমনী ও বিজয়া। আবার হোরীগীত ও দোলের গানের সম্ভার, শ্যামাসংগীত, ভজন অথবা পদাবলি সর্বত্র ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ।

বাংলার নিজস্ব সম্পদ পদাবলি, প্রাচীন কবিদের তিনি আলোকিত করে রেখেছিলেন। বিদ্যাপতি, জয়দেব ছাড়াও ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, নবীনচন্দ্র সেন, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, গিরীশ ঘোষ, দাশরথি রায়, শ্রীধর কথক, রামনিধি গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, কালী মির্জা (কালিদাস চট্টোপাধ্যায়), কবি রায়শেখর, মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, তুলসী লাহিড়ী, রমাপতি বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়াল মিত্র, কৈলাসনাথ মুখোপাধ্যায়, ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ গীতিকারের নাম দৃষ্টান্তস্বরূপ। এঁদের কবিতায় তিনি সুরারোপ করেছেন। আবার তাঁর বড়দি সন্ধ্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরতি গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলার অগ্রগণ্য কবি গোবিন্দ চক্রবর্তী প্রমুখের লেখা গানেও তিনি সুরারোপ করে গাইতেন।

সত্যজিত রায় ‘চারুলতা’ (১৯৬৪) ছবিতে তাঁকে দিয়ে একটি অনবদ্য টপ্পা গাইয়েছিলেন। অপরদিকে তরুণ মজুমদার নিধুবাবুর জীবনী নিয়ে ‘অমরগীতি’ (১৯৮৩)  চলচ্চিত্রে তাঁকে দিয়ে একটি পাঞ্জাবি টপ্পা গাইয়েছিলেন।

‘গুলিনদা’ শুধুই গান গাইতেন না, তিনি স্বনামে/ ছদ্মনামে অজস্র বন্দিশ/ গীতও রচনা করে সুরারোপ করেছিলেন। তাঁর ‘কুমার সাহেব’ ও ‘নাগকেশর’ ছদ্মনামে লেখা ও আহীর ভৈরব রাগে সুরারোপকৃত তিনটি বন্দিশ আমি পেয়েছি গুলিনদার সুযোগ্য ছাত্রী শ্রীময়ী সঙ্গীতা বসুর কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, বন্দিশ তিনটি স্বয়ং শিবকুমারের স্বহস্তলিখিত।

গুলিনদার উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে পেয়েছি সরোজ দত্ত, ভূপেন চন্দ, উপেন চন্দ, সোমেশ ঘোষাল, ইরা ঘোষ, কমলা ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম, শিল্পী কুণ্ডু, ছবি প্রামাণিক প্রমুখের নাম। চিত্রা বসু, রেখা সরকার (চ্যাটার্জি), স্বপন ব্যানার্জি, জয়দেব প্রামাণিক, সঙ্গীতা বসু, শর্মিলা বর্মণ, সুকন্যা গোস্বামী, নন্দিনী মিত্র (রায়), রূপা দত্ত, রাজশ্রী মিত্র (ঘোষ), চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, এবং হিমিকা দাশগুপ্ত প্রমুখ শিষ্য এখনও তাঁদের গুরুজির স্মরণচর্চায় নিমগ্ন আছেন। উল্লেখ্য যে, তাঁর নাতনি শিবপ্রিয়ারও প্রথম গুরু ছিলেন তিনিই।

আরও পড়ুন: বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা, এক অনুপম সাহিত্যরস

শ্রীময়ী বৈশালী চ্যাটার্জির (গুলিনদার খুড়তুতো বোন টুকুদির কন্যা) সৌজন্যে তাঁর সংগ্রহে থাকা গানের রেকর্ডটার ছবি থেকে যে তথ্য পাচ্ছি তা নিম্নরূপ:

‘শিবকুমার চ্যাটার্জী সংগীতশাস্ত্রী’

His Master’s Voice (HMV)

Extended Play (EP)

Bengali Light Classical Songs

Published in 1971

Record no. 7EPE.1167

প্রথম পিঠে:

মন মানে যদি দু’নয়ন (রচনা/ সুর: কালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়)

প্রেম করা হল এ কি দায় (রচনা/সুর: রামনিধি গুপ্ত)

দ্বিতীয় পিঠে:

রাই মুখ অরবিন্দে (রচনা/ সুর: প্রাচীন)

ছাড় অঞ্চল চঞ্চল শ্যাম (রচনা/ সুর: মহেশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়।

একইসঙ্গে উল্লেখনীয় যে, তাঁর অসংখ্য শিষ্য-শিষ্যাদের মধ্যে স্মরণীয় নাম ভি বালসারা, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, সোমেশ ঘোষাল, সরোজ দত্ত প্রমুখ।

১৯৯৩ সালের ১৫ মে তারিখে মাত্র ৭২ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ফলে এবং প্রায় চিকিৎসা না পেয়েই নিজ বাসভবনে তিনি প্রয়াত হন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)

বিশেষ উল্লেখ:

তাঁর স্মরণে ফেসবুক গ্রুপ Ranaghat চর্চাকেন্দ্র গত তিনমাস ধরে স্মরণচর্চা চালিয়ে আসছে। এবং রানাঘাট পুরসভার অকুণ্ঠ সহযোগিতায় দোসরা অক্টোবর সন্ধ্যায় পুর উৎসব ভবন ‘তটিনী’-তে এক মহতী সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছে।

প্রচ্ছদ চিত্রঋণ: পুলক কর্মকার

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *